হঠাৎ বৃষ্টি


হঠাৎ বৃষ্টি

ঈদের বাজার বেশ জমে উঠেছে গত কয়েকদিনে। আর মাত্র ক’দিন বাদেই ঈদ। ঈদ নিয়ে চলছে নানা জল্পনা কল্পনা। শহরের বড় বড় শপিংমল, সুপার মার্কেটগুলোতে লোকজনের ভিড় কমছে না। নারী-পুরুষ শিশু-কিশোর ছোট-বড় সব বয়সী মানুষের ব্যস্ততা আর মনোযোগ ঈদের কেনাকাটা ঘিরে। পছন্দের শাড়ি, জামাকাপড় আর জুতো কেনার জন্য এক মার্কেট থেকে অন্য মার্কেটে ছুটছে। মেয়েরা জামা-কাপড়, শাড়ি- লেঙ্গেগার সাথে ম্যাচ করে নানা ধরনের গয়না কিনতে ব্যস্ত। ঈদ কেনাকাটায় মেয়েদের বাড়তি আগ্রহ থাকে গয়নার দিকে। আজকাল পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে অনেকেই গয়না পরে। পছন্দের সেই গয়না কিনতে তার হামলে পড়েছে চাঁদনি চক, গাউছিয়া, নিউ মার্কেট এলাকায়।

পকেট কিংবা ওয়ালেট ভর্তি কড়কড়ে নতুন নোট নয়তো ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড নিয়ে ঈদের বাজার করতে এসেছে মানুষজন। কেউ পকেট কিংবা ওয়ালেট থেকে নগদ কড়কড়ে নতুন নোট বের করে দিচ্ছে দোকানদারকে। আবার যারা আর একটু আধুনিক এবং স্মার্ট তারা কার্ডের মাধ্যমে দাম পরিশোধ করছে শপিংমল আর সুপার মার্কেটগুলোতে সব দোকানেই ফিক্সড প্রাইস মানে এক দরেই কেনাকাটার ব্যবস্থা। এখানে দরদাম করার উপায় নেই। ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক পছন্দের পোশাক, জুতো গয়নাগাটি, কসমেটিক্স ঐ ফিক্সড প্রাইসেই কিনছে সবাই এখানে।

তবুও ক্রেতার কমতি নেই। দলে দলে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরী দোকানগুলোতে ভিড় করছে। কোথাও কোথাও গিজ গিজ করছে মানুষ। ধাক্কাধাক্কি চলছে। পছন্দের পোশাক কিংবা শাড়িটির জন্য এক সঙ্গে কয়েকজন হাত বাড়াচ্ছে। অনেক সময় এ নিয়ে কাস্টমারদের মধ্যেও রাগারাগি, বাগবিন্ডা, কটু কথার উত্তাপ সৃষ্টি হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত পছন্দের জামা, লেহেঙ্গা, সালোয়ার কামিনটি কিনতে পারার আনন্দে এক ধরনের পরিতৃপ্তি, আনন্দ, স্বন্তির ছাপ ফুটে উঠছে তাদের চোখেমুখে।

দুই.
মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের ফুটপাতে ভিড় ঠেলে হাঁটছে আবদুল মজিদ। বয়স খুব বেশি না হলেও ঢাকা শহরে বউ আর ছোট্ট তিনটি কন্যা সন্তানের সংসার নিয়ে লড়াই করতে করতে একপ্রকার বিপর্যস্ত। তার কোলে এখন ছোট মেয়েটিÑকাঁধে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। আরেক হাতে ধরা বড় মেয়ের হাত। পাশে হাঁটছে মজিদের বউ ইসমত আরা। তার হাতের মুঠোয় মেজ মেয়ের হাত। পরিবারের কর্তা মজিদ কাজ করে একটা প্রাইভেট কোম্পানির অফিসে। পিয়নের চাকরি। বেতন খুব বেশি একটা না। কোনোভাবে টেনেটুনে সংসার চালাতে হয়। ফরিদপুরের ভাংগা উপজেলায় বাড়ি। ছোটবেলায় কাজের ধান্ধায় ঢাকা শহরে আসা তার। এখানে ওখানে কাজ করে ধাক্কা খেতে খেতে অবশেষে এই পিয়নের চাকরিতে এসে ঠেকেছে।

এই শহরে থাকতে গিয়ে হঠাৎ একদিন ইসমত আরার সঙ্গে পরিচয়। মেয়েটা দেখতে,শুনতে চমৎকার। বাড়ি নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায়। একটা গার্মেন্টসে কাজ করতো। সুইং অপারেটরের চাকরি। বেতন-টেতন ভালোই ছিল। রাস্তায় একদিন হরতালের সময় গ্যাঞ্জামের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। পুলিশ টিয়ারশেল ছুঁড়ছিল বিক্ষুদ্ধ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে। রবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেডও ছুঁড়ছিল। চরম ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে কীভাবে যেন পড়ে গিয়েছিল তারা দু’জনই। এর আগে তেমন পরিস্থিতিতে কখনও পড়েনি গ্রাম থেকে আসা সাধারণ মেয়ে ইসমত আরা। ভীষণ ঘাবড়ে গিয়েছিল। টিয়ার গ্যাসের কারণে চোখ মেলে তাকাতে পারছিল না। হোঁচট খেয়ে রাস্তার পাশে ফুটপাতে পড়ে গোঙাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, সে যেন মারা যাচ্ছে। আল্লাহ গো, আমাকে বাঁচাও, এই বিপদ থিকা রক্ষা করো, চাপা কণ্ঠে বলছিল সে।

আবদুল মজিদ পুলিশের ধাওয়া খেয়ে ফুটপাত ধরে প্রাণপনে ছুটছিল। হঠাৎ ফুটপাতে বেকায়দা ভঙ্গিতে পড়ে থাকা টিয়ার গ্যাসে কাবু ইসমত আরাকে দেখতে পেয়ে থমকে দাঁড়িয়েছিল। মেয়েটিকে চেনে না সে। আগে কখনও দেখেনি। কিন্তু ভয়ানক বিপদের মধ্যে রয়েছে সে। তাকে এভাবে রাস্তায় ভয়ানক বিপদের মধ্যে একাকী ফেলে রেখে যেতে মন চায়নি। যদিও আশেপাশে সবাই প্রাণ বাঁচাতে যে যার মতো দিগবিদিকশূন্য হয়ে ছুটে পালাচ্ছিল। একজন অসহায় তরুণী রাস্তার পাশে ছুটতে গিয়ে টিয়ার গ্যাসে কাবু হয়ে পড়ে আছে, কেউ তার সাহায্যে এগিয়ে আসছে না। পুলিশের ছড়ড়া গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড, রবার বুলেট থেকে বাঁচতে প্রাণপনে ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। মজিদও ছুটছিল। কিন্তু মেয়েটিকে এভাবে এখানে ফেলে রেখে নিজের জান বাঁচাতে পালিয়ে যেতে কোনোভাবেই মন চায়নি তখন। সে তার আপনজন না হোক, আত্মীয়, বন্ধু-স্বজন না হোক কিন্তু মনের গভীর থেকে এক ধরনের মানবিক তাগিদ অনুভব করছিল তাকে রক্ষা করার, নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার। তাতে যদি নিজের জীবন বিপন্ন হয়, শরীরে পুলিশের রবার বুলেট, ছড়ড়া গুলি আঘাত করে কিংবা সন্দেহভাজন বিশৃঙ্খলাকারী বিক্ষোভকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পুলিশের হাতে আটক হতে হয়। তাতে কিছু যায় আসে না।

এই মেয়েটির জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত সে। তেমন একটি সাহসী অদম্যভাব কোত্থেকে যেন এসে গিয়েছিল। ফুটপাত থেকে ইসমত আরার অচেতন শরীরটা কোনোভাবে দু’হাতে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে কীভাবে যেন ছুটেছিল সেদিন, সারা শরীরে এতো প্রচন্ড শক্তি, ক্ষমতা কীভাবে যে এসে জমা হয়েছিল- আবদুল মজিদ আজও ভেবে পায় না। সিনেমার পর্দায় নায়কদের যেমন দেখা যায়, ঠিক তেমন একজন বীরপুরুষ হয়ে উঠেছিল সে তখন। সামনের একটি সরু গলির ভেতর ঢুকে ইসমত আরাকে নিয়ে ছুটছিল মজিদ। অনেকক্ষণ ছোটার পর একটা নিরাপদ জায়গা দেখে থেমেছিল। জায়গাটা সুনসান। আশেপাশে লোকজন নেই। শহরে গন্ডগোল হওয়ায় সবাই রাস্তাঘাট ছেড়ে যে যার মতো ঘর-বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল।

ততক্ষণে ইসমত আরার জ্ঞান ফিরেছে। অচেনা একজন মানুষের বাহুডোরে অপরিচিত একটা জায়গায় নিজেকে আবিষ্কার করে ভয়ে আতঙ্কে চিৎকার করতে গেলে মজিদ তাকে নিজের ঠোঁটে আঙ্গুল রেখে ইশরায় চুপ থাকতে বলায় নিজেকে দমন করেছিল সে। মজিদ পুরো ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরেছিল দ্রুত। ততক্ষণে তার সবকিছু মনে পড়েছিল। হরতালের সময় হঠাৎ হাঙ্গামার মধ্যে পড়ে যাওয়া, পুলিশের তাড়া খেয়ে দিগবিদিকশূন্য হয়ে ছুটতে গিয়ে টিয়ার গ্যাসের ঝাঁঝে দু’চোখে কিছু দেখতে না পেয়ে ফুটপাথে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়ার পর থেকে আর কিছু জানে না সে। ততক্ষণে সে বুঝতে পেরেছিল সেই ভয়ঙ্কর বিপদের কবল থেকে এই অচেনা মানুষটি তাকে উদ্ধার করেছে নিজের জীবনের ঝ ুঁকি নিয়ে। তা না হলে ততক্ষণে কী যে ভয়ানক পরিণতি হতো তার, সেটা সৃষ্টিকর্তাই জানেন। সেই থেকে সবচেয়ে কাছের একজন আপন মানুষ ভাবতে শুরু করেছিল সে মজিদকে। সেই দিন থেকে আবদুল মজিদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল ইসমতের জীবন।

দু’জন পরস্পরকে গভীরভাবে ভালোবেসে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। প্রেমিক-প্রেমিকা হিসেবে খুব বেশি দিন, পার করেনি তারা। এক মাসের মধ্যে বিয়ে করেছিল। পরিবারের অমতে নয়, দুপক্ষের অভিভাবকদের সম্মতিতে নতুন জীবন শুরু করেছিল মজিদ আর ইসমত। বিয়ের পরও গার্মেন্টস এ স্যুইং অপারেটরের চাকরিটা করে যাচ্ছিল ইসমত। কিন্তু সন্তানসম্ভবা হওয়ার পর একসময় চাকরিটা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। এরপর আর তার গার্মেন্টস এ চাকরিতে ফিরে যাওয়া হয়নি। স্বামী মজিদের গভীর ভালোবাবাসার আবেশে ভেসে যেতে যেতে তিনটি কন্যার জন্ম দিয়েছে। যদিও পর পর এতগুলো সন্তানের মা-বাবা হওয়ার ইচ্ছা ছিল না এই দম্পতির। একটি ছেলের আশায় চেষ্টা করতে করতে এখন তারা তিন কন্যার বাবা-মা। বড়টি ইকরা, তার বয়স ছয়। এরপর সুমাইয়ার সাড়ে তিন। আর কোলেরটি ফিরোজা, এক বছরেও কম তার বয়স।

এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরছে পরিবারটি। কোথাও থামছে, কোথাও কাপড় উল্টেপাল্টে দেখছে। দরদাম জিজ্ঞেস করছে, আবার হাঁটা ধরছে। সীমিত আয়ের এই পরিবার ঈদের আনন্দটুকু সাধ্যমতো ভাগ করে নিতে চায়। মজিদ তার তিন মেয়ের জন্য একই নকশার ফ্রক কিনতে চায়। মিরপুরের কয়েকটা শপিং মলে এর মধ্যে ঢুঁ মেরেছেও। বিভিন্ন দোকানে ঢুকে বাচ্চাদের ফ্রক পছন্দ করেছেও। কিন্তু দাম শুনেই সব ইচ্ছা ভেঙে গেছে। প্রতিটির দাম এতো বেশি যে তিন কন্যার জন্য নির্ধারিত বাজেটেও কুলোবে না। তাই শেষ পর্যন্ত ফুটপাতেই তাদের জন্য জামা খুঁজছে। তার সাথে রয়েছে বউ ইসমত আরা। ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও বউ আর সন্তানদের দিকে তাকালে ক্লান্তিভাবটা নিমিষেই কেটে যাচ্ছে। ওদের সবার আনন্দের জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত ঢাকা শহরের সীমিত আয়ের মানুষটি। বউ বলেছে, ‘আগে তিন মাইয়ার জামা কিনমু, এরপর জামার সাথে মিল কইরা চুড়ি, কানের দুল কিনমু। এরপর যদি টাকা থাকে তা হইলে নিজেগো লাইগা কিছু একটা কিনার ইচ্ছা আছে।’

মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের ফুটপাত জুড়ে শত শত দোকান বসেছে ঈদকে সামনে রেখে। ভ্রাম্যমান দোকানগুলোতে ভিড়ের কমতি নেই ক্রেতার। সীমিত আয়ের মানুষজন পরিবার ও স্বজনদের জন্য এসব দোকান থেকেই কেনাকাটা করছে। ক্রেতাদের উপস্থিতিতে জমে উঠেছে বেচা-বিক্রিও। বিক্রেতারাও কেউ কেউ হ্যান্ড মাইকে রেকর্ড করা জামা কাপড় জুতোর দাম বাজিয়ে, কেউ আবার মুখে বলেও সাধারণ ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। মজিদ আর ইসমত এই ঈদ বাজারে ঘুরছে তাদের তিন কন্যার জামা, জুতা, কানের দুল আর চুড়ি কেনার আশায়। হয়তো যে টাকা নিয়ে এসেছে তা দিয়ে সবকিছু কেনা সম্ভব হবে না। তবু যতটুকু পারা যায় সেই চেষ্টা করে যাচ্ছে।

তিন.
সানজানার ঈদ শপিং বলতে গেলে যা বোঝায় তা শেষ হয়ে গেছে আগেই। বসুন্ধরা, যমুনা এবং শহরের কয়েকটি বিখ্যাত বুটিক হাউজ ঘুরে কয়েক সেট জামা, সালোয়ার কামিজ, শাড়ি কিনেছে। সাথে কিছু বিদেশি ব্র্যান্ডের কসমেটিক্স। এতো কেনাকাটার পরও আরও কিছু জিনিস বাকি রয়ে গেছে। জামা, শাড়ি,কামিজগুলোর সাথে ম্যাচ করে মানানসই, পছন্দের গয়না কিনতে হবে। আর এজন্য সবচেযে নির্ভরযোগ্য জায়গা হলো চাঁদনী চক মার্কেট। গাড়ি নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে চাঁদনী চক আসতে ট্রাফিক জ্যামের ধকল সইতে হয়েছে অনেক। ঈদের আগে ঢাকা শহরে রাস্তায় কোত্থেকে যে এতো গাড়ি চলে আসে? প্রতিদিনই এতো গাড়ির চাপে জ্যাম লেগে থাকে শহরের সব রাস্তায়।

বিশেষ করে ব্যস্ত শপিং মল এবং সুপার মার্কেটগুলোর চারদিকের রাস্তাগুলোতে এটা তো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। অনেক ধকল পেরিয়ে ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে চাঁদনী চকের সামনে পৌঁছে। সানজানা গাড়ি থেকে নেমে সামনে নিউ মার্কেটের আশেপাশে কোনো নির্ধারিত স্পটে গাড়ি নিয়ে তাকে অপেক্ষা করতে বলে। যেখানে সেখানে যেন গাড়ি না রাখে, সাবধান করে দেয় সে ড্রাইভারকে। অনির্ধারিত জায়গায় গাড়ি পার্ক করলে ট্রাফিক পুলিশ এসে হাজার হাজার টাকার মামলা দিয়ে দেবে এটা মাফ নেই। তখন বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা সৃষ্টি হবে। সানজানা এটা চায় না।

সানজানা চাঁদনী চক মার্কেটে ঢুকতে গিয়ে প্রচন্ড ভিড়ের মুখোমুখি হয়। বেশিরভাগ মেয়েমানুষ। তার মতো ঈদের জন্য গয়নাগাটি কিনতে সবাই ভিড় করেছে। এখানে রূপা এবং সিটিগোল্ডের লেটেষ্ট ডিজাইনের সুন্দর সুন্দর গয়নাগাটি পাওয়া যায়। ঈদ উপলক্ষে দোকানগুলোতে নতুন নতুন আইটেম এসেছে। এখানে সানজানার চেনাজানা কয়েকটা দোকান রয়েছে। প্রতিটিতেই কাস্টমারের প্রচুর ভিড়। কোনোটিতেই ঢুকে নির্বিগ্নে নিজের পছন্দের গয়না বাছাই ও দরদামের সুযোগ নেই। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর একটি দোকানে ঢুকতে পারে সানজানা।

চার.
কাওরান বাজারের দুই নম্বর সুপারমার্কেটে ঢোকার পথে জুতার কয়েকটি অস্থায়ী দোকান বসেছে ঈদকে উপলক্ষ করে। সেখানে দাঁড়িয়ে দুই শিশুকে নিয়ে জুতা দেখছে দুজন নারী। বয়স্ক নারীটি হলো রহিমা। দুই ছেলে আর ছেলের বউ, দুই নাতি নিয়ে সংসার। তারা থাকে আগারগাঁওয়ের বেগুনবাড়িতে। সিদ্দিক মাস্টারের ঢাল এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকে। রহিমার স্বামী ১২-১৩ বছর আগে মারা গেছে। রিকশা চালাতো মানুষটা। রহিমার কোলে কয়েকমাস বয়সী এক ছেলে শিশু। ছেলের ঘরের নাতিকে নিয়ে কোলে ঈদের বাজার করতে এখানে আসা। ছেলের বউ আঁখির সাথে রয়েছে ১০-১১ বছরের একটি মেয়ে। তার নাম মুনমুন। আঁখি দোকানে থরে থরে সাজনো জুতাগুলো থেকে নামিয়ে তার মেয়েকে পরাচ্ছে। নিজেও কিছু জুতা পরছে। কোন জুতাটা কিনলে ভালো হয়, পাশ থেকে রহিমা ছেলের বউকে বলছে।

রহিমার বড় ছেলে ওমর একটি রিকশা গ্যারেজে কাজ করে। মাসে বেতন পায় ৯ হাজার টাকা। ছোট ছেলে ওসমানের বয়স মাত্র ১৬ বছর। অভাবের কারণে কিশোর বয়সী ছেলেটিও কাজে লেগে পড়েছে। একটা অফিসে ফাইফরমাশ খাটে। মাসে বেতন পায় ১০ হাজার টাকা। এ মাসে এখনও বেতন হয়নি। কবে হবে জানে না সে।

রহিমার পরিবারের ঈদ বাজেট মাত্র দুই হাজার টাকা। পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছয়। বড় ছেলের দেওয়া দুই হাজার টাকা নিয়েই বাজার ঘুরে দেখছে তারা। এই টাকায় সবার জন্য কিছু হবে না জেনেও তারা এই দোকান, সেই দোকান ঘুরছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। তাই আগে পরিবারের দুই কনিষ্ঠতম সদস্য অর্থাৎ দুই শিশুর জন্য কেনাকাটা চলছে। আঁখি অনেকটা মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে। দোকানির সঙ্গে জুতার দরকষাকষিতে ব্যস্ত সে।

‘ভাই, আমরা গরিব মানুষ। যে দাম চাইতেছেন, তাতে তো কিনতে পারমু না। দুই বাচ্চার জন্য কিনতে আইছি। একটু দয়া করেন ভাই। যেই দাম কইলাম, দিয়া দেন। এর চেয়ে বেশি দিলে আর কিছু কিনতে পারমু না আমরা। আমার দুই বাচ্চার ু জুতা কিন্যা বাকি যা থাকবো সেইডা দিয়া জামা-টামা কেনার চেষ্টা করমু।’

পাশে দাঁড়ানো রহিমা দোকানিকে নরম গলায় বলে, ‘বাবাগো, মাত্র দুই হাজার টেকা লইয়া ঈদের বাজার করতে আইছি। এখন দুই হাজার টাকায় কিছু হয়না- এইডা জানি, বুঝি। কিন্তু আমাগো সামর্থ্য তো এত দুরই। এর চেয়ে বেশি কোত্থেকে পামু? এখন আইছি নাতি-নাতনির লাইগা কিছু কিনতে। ওরা ছোডো মানুষ। আমার কিছু লাগবো না। আমার বউডাও কইছে তার দুই বাচ্চার লাইগা জামা-জুতা কিনতে পারলেই চলবো। তারও কিছু লাগবো না!’ নিজেদের অক্ষমতা, সীমাবদ্ধতার কথা বলতে বলতে তার গলাটা বুজে আসতে চায়। চোখ দুটো ছল ছল করে। জুতার দোকানির মায়া হয় পরিবারটির জন্য। সেও বলে, ‘আচ্ছা ঠিক আছে খালাম্মা। আপনারা যে দাম কইছেন সেইটাই দেন। আমার কিছুটা লস হইবো। হোক লস। সব সময় লাভ করন যায় না। আমারও তো বউ-বাচ্চা আছে। আপনাগো দুঃখ কষ্ট আমিও বুঝি।’

জুতা কিনতেই তাদের ঈদের বাজেটের দুই হাজার টাকার তিনভাগের এক ভাগ শেষ হয়ে যায়। এরপর তারা মুনমুনের জন্য একটি জামা এবং তার ছোট ভাইটির জন্য একটি পাঞ্জাবি কিনতে কাপড়চোপড়ের দোকানগুলোর দিকে পা বাড়ায়। হাতে যে টাকা রয়েছে তাতে মেয়ে ও ছেলের জন্য ঈদের পোশাক কেনা সম্ভব হবে কিনা ভেবে অনিশ্চয়তার দোলচালে দুলছে আঁখির মন।

পাঁচ.
হঠাৎ করে আকাশে কালো মেঘ জমেছে। গত কয়েকদিন ধরে ঝড়বৃষ্টি হবে সবাই বলাবলি করছিল। চৈত্র মাস চলছে। এখনও ঢাকায় কালবৈশাখী কিংবা মৌসুমের প্রথম বৃষ্টি হয়নি। হঠাৎ করেই চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে। প্রথমে হালকা ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করে। এরপর বিজলী চমকাতে থাকে। গম গম করে বজ্রপাতের শব্দ কাঁপিয়ে তুলছে চারপাশ। এর মধ্যে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামাতে শুরু করে। এখনও ঝড়ো হাওয়া বইছে। শিলাবৃষ্টিও হচ্ছে। ছোট-বড়-মাঝারি আকারের শিলা পড়ছে মাটিতে। বাড়ির ছাদে, টিনের চালে, ঘরের খোলা বারান্দায়। ঢাকা শহরের কর্মব্যস্ততার মধ্যে হঠাৎ করে ছন্দপতন ঘটিয়েছে চৈত্রের এই কালবৈশাখীর ঝড় ও বৃষ্টি। ঈদের আগ মুহুর্তে লোকজন ঈদের কেনাকাটা নিয়ে মজেছিল। হঠাৎ ঝড়বৃষ্টির কথা তাদের মাথায় ছিল না। সবাই যারা এতক্ষণ বাইরে রাস্তায় ফুটপাতের বাজারে কেনাকাটা করছিল। তারা অনেকটা বিরক্ত হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি শুরু করে।

বৃষ্টি পড়ছে অবিরাম ধারায়। এ সময় সাধারণত এতক্ষণ ধরে একটানা অঝোর ধারায় বৃষ্টি হয় না। শিলাবৃষ্টির কারণে পরিবেশটা একেবারে হিমশীতল হয়ে গেছে। শীত প্রায় বিদায় নিয়েছিল। পুরোদুমে গরম অনুভব হচ্ছিল গত বেশ কয়েকদিন ধরে। এই মুহুর্তে মনে হয় পৌষ মাসের শীতল পরিবেশ ফিরে আবার এসেছে। কেনাকাটা, বেচা-বিক্রি বাদ দিয়ে সবাই এখন কাছের বিভিন্ন মার্কেট, অফিস ভবনের নিচে আশ্রয় নিয়েছে ঝড়বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে।

আনিকা তার স্কুটি নিয়ে পত্রিকা অফিসে ফিরছিল। ‘ঢাকার ঈদ বাজারের গল্প’ শিরোনামে ধারাবাহিক রিপোর্ট যাচ্ছে তার। এ পর্যন্ত তিনটি পর্ব ছাপা হয়েছে। বাকি আছে দুটি পর্ব। মিরপুর ১০ নম্বর গোল চক্কর থেকে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে হঠাৎ ঝড় বৃষ্টির মধ্যে পড়ে গেছে সে। দ্রুত স্কুটি চালিয়ে কাজিপাড়ার একটি মার্কেটের নিচে গিয়ে কোনোভাবে আশ্রয় নিয়েছে সেও। স্কুটিটা একপাশে পার্ক করে সেটা থেকে নেমে দাঁড়ায়। এর মধ্যেই বৃষ্টির কারণে ভিজে গেছে সে অনেকটা। ব্যাগ থেকে ছোট্ট টাওয়েল রুমাল বের করে মাথা, মুখ, হাত মুছে নেয়। বেশিক্ষণ শরীর মাথা ভেজা থাকলে জ্বর সর্দি কাঁশি লাগতে পারে। মৌসুমের প্রথম বৃষ্টির পানি মাথায় পড়লে সাধারণত ঠাণ্ডা লেগে যায় অনেকেরই। আনিকাও তাদের দলে একজন।

ভার্সিটি থেকে জার্নালিজমে অনার্স, মাস্টার্স কমপ্লিট করার পর একটা টিভি চ্যানেলে রিপোর্টার হিসেবে জয়েন করেছিল আনিকা। এক বছর ভালোভাবে কাজ করলেও চ্যানেল কর্তৃপক্ষের হোমরা চোমড়া একজনের অশালীন আচরণে বিক্ষুদ্ধ হয়ে চাকরিটা ছেড়ে দেয়। এরপর দেশের একটি উল্লেখযোগ্য বিখ্যাত দৈনিকে ঢুকেছে। তার কাজে সন্তুষ্ট পত্রিকার সম্পাদক থেকে শুরু করে সবাই। এখানে একটি ভালো অবস্থান তৈরি করে নিতে পেরেছে সে মেধা, দক্ষতা ও পরিশ্রমের সুবাদে। একজন প্রতিশ্রুতিশীল রিপোর্টার হিসেবে তার নাম-ডাক ছড়িয়ে পড়েছে।

‘ঢাকার ঈদ বাজারের গল্প’ বিষয়টা সম্পাদক সাহেবই আনিকাকে ঠিক করে দিয়েছেন। বড় বড় শপিংমল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সুপার মার্কেট এবং সারা শহরের বিভিন্ন স্পটে ফুটপাতের ঈদের বাজার ঘুরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারী, পুরুষের কেনাকাটার গল্প তুলে আনাই উদ্দেশ্য এই অ্যাসাইনমেন্টের। আনিকা কাজটা চমৎকারভাবে করতে পারবে-তেমন কনফিডেন্স থেকেই কাজটা দিয়েছেন সম্পাদক আজমল ফারুক। ইতিমধ্যে যে তিনটি পর্ব পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, বেশ সাড়া জাগিয়েছে। অনেক পাঠক ফোন করে প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেছেন। ফেসবুকেও পজিটিভ রেসপন্স মিলেছে। মানবিক আবেদনপূর্ণ এমন সিরিজ রিপোর্টের জন্য

সবাই আনিকা তাবাসমুমের কৃতিত্বটা স্বীকার করছেন। আজও এ সিরিজ রিপোর্টের জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে মিরপুর গিয়েছিল সে। যেখানে আবদুল মজিদের সাথে তার দেখা হযেছে। গতকাল কাওরান বাজারে রহিমা, আঁখিসহ আরো কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়েছে। বসুন্ধরা, যমুনার মতো শপিং মলে ঢুঁ মেরেছে। সেখানকার বড় বড় ব্র্যান্ড শপগুলোতে আসা ক্রেতাদের সাথে আলাপ করেছে। গাউসিয়া, চাঁদনী চক, নিউ মার্কেট এলাকায় প্রচন্ড ভিড়েও ঘুরেছে সে। গত কয়েকদিনে ঢাকা শহরের ঈদ বাজার ঘুরে বিভিন্ন নারী পুরুষের সাথে কথা বলে উপলদ্ধি করেছে কোটি মানুষের এই শহরে মানুষগুলোর সাধ ও সাধ্যের মধ্যে কতো বড় ব্যবধান। মানুষের সক্ষমতা, সামর্থ্যরে মধ্যে কতো বৈষম্য।

এখানে লাখ লাখ টাকা নিয়ে ঈদ শপিং করতে যেমন এসেছে, আবার মাত্র দুই হাজার টাকা নিেেয় পুরো পরিবারের ঈদের কেনাকাটা করতে প্রাণপন চেষ্টা করছে। নিউ মার্কেটের সামনে মধ্যবয়সী কায়েস আহমেদের সাথে দেখা হয়েছিল। ফুটপাত থেকে ছেলের জন্য সাড়ে সাতশ টাকায় পাঞ্জাবি-পাজামা কিনেছেন। মেয়ের জন্য একটি ফ্রক কিনেছেন সাড়ে ছয়শত টাকায়। এরপর ছেলেমেয়ের জন্য জুতা কেনার জন্য ঘোরাঘুরি করছেন ভদ্রলোক। দুইশ থেকে তিনশ টাকার মধ্যে পছন্দের জুতা খুঁজছিলেন। নিজের জন্য এবং স্ত্রীর জন্য কি কিনবেন? জানতে চেয়েছিল আনিকা।

তার প্রশ্নের জবাবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কায়েস আহমেদ শুধু বলেছেন, ‘আর আমাদের ঈদ! ছেলে-মেয়ের জন্য জামা জুতা কিনতে কিনতে তো পকেট খালি। লিমিটেড ইনকামের মানুষদের ঈদ শপিং তো এমনই।’ এরপর মানুষটা নিউ মার্কেটের সামনে হাজার মানুষের ভিড়ে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। অনেক খুঁজেও তার আর দেখা পায়নি আনিকা। আবার ওদিকে ধনাঢ্য পরিবারের ভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ে সানজানাকে পেয়েছে চাঁদনী চক মার্কেটে। কয়েক সেট জামা-কাপড়, শাড়ি, দামি জুতা, কসমেটিক্স কেনার পর পোশাকের সাথে ম্যাচ করে নতুন ডিজাইনের গয়না কিনতে এসেছে সে।

বিভিন্ন শ্রেণির নানা পেশার মানুষগুলোর সখ, সামর্থ্য, রুচি, সক্ষমতার মধ্যে কত পার্থক্য!
অনেকের সাথে দাঁড়িয়ে আনিকাও অপেক্ষা করছে বৃষ্টি থামার। এখনও একই ধারায় অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে। অনেক দিন পর মৌসুমের প্রথম বৃষ্টি নেমেছে ঢাকা শহরে। বেশ ভালোই বৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তাঘাট, গাছপালা, বাড়িঘর সবই ভিজে একাকার। রাস্তায় অল্প পানি জমে উঠেছে এর মধ্যেই। অনেক দিনের জমে থাকা ধুলোবালি-ময়লা সবকিছু বৃষ্টির পানিতে ভেসে যাচ্ছে। আনিকা ভাবছে, হঠাৎ নামা এই বৃষ্টিতে যদি যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা, ধুলাবালির সাথে এই শহরের মানুষগুলোর মধ্যে যে ব্যবধান, বৈষম্য, পার্থক্য বাসা বেঁধে আছে সে সব যদি ধুয়ে মুছে দূর হয়ে যেত।

জলছবি/মেজবাহ মুকুল