তুমি জাগলেই জাগবে বাংলাদেশ


কবি জাকির আবু জাফরের জন্মদিনে গুচ্ছ কবিতা

তুমি জাগলেই জাগবে বাংলাদেশ

আফসোস করে ছেড়ে দাও কেনো সব
প্রতিবাদ আজ কেনো এত দুর্লভ!

চারিদিকে লুট, লুণ্ঠন মহামারি
বেদনা ক্লিষ্ট মানুষের আহাজারি!
সম্বলহীন, জীবনের নেই সুখ
ঘাটে ঘাটে ফেও দুর্জন দুর্মুখ!

অত্যাচারীর নিপীড়ন অহরহ
পৃথিবীতে আজ জীবন দুর্বিষহ!
মানুষের প্রতি এ কেমন পরিহাস
দিকে দিকে দেখো উঠছে নাভিশ্বাস!

ভীরুতা কেবল জোগায় দুঃখ গ্লানি
বিবেক তবুও কেনো নয় সাবধানী!
না সরাও যদি লেজুড়বৃত্তি রোগ
ঘুচবে না কভু এ জাতির দুর্ভোগ।

উদ্যত করো মহা বিপ্লবী হাত
এ মাটি তোমার তুমি চির অভিজাত
বুকে রাখো তুমি তোমার মাটির ঘাম
বহাও বন্যা রক্তের উদ্যাম।

নিজস্বতায় ধারবে না কারো ধার
নিঃশ্বাসে তলো বজ্রের হুংকার!
নিঃশেষ করো ষড়যন্ত্রের বুক
তোমার আশায় মজলুম উন্মুখ!

জাগ্রত করো নব সূর্যের রেষ
তুমি জাগলেই জাগবে বাংলাদেশ।

চিরন্তন

নতুন দিনের উত্থান যদি বোঝো
স্বাধীন জাতির মর্যাদা তবে খোঁজো।
মাটির গন্ধে বুকে লেখো তার নাম
রক্তের চেয়ে আরও বেশি তার দাম।

সাহস জ্বালিয়ে স্মরণীয় কত বীর
ইতিহাস খ্যাত নেসার আলী তিতুমীর।
সংগ্রামী যারা চিনেছে অগ্নিপথ
বাহাদুর এক সেই হাজী শরীয়ত।

মানুষের পথ এখনও রক্তে লাল
কেনো নেই তবু তেমন শাহজালাল
দুঃখ যাতনা এতো অশ্রুর বান
কোথায় খালিদ কোথায় খান জাহান!

সব অচেতন সকলের চোখে ঘুম
আসবে না বুঝি আর শাহ্ মাখদুম।
লুট হয়ে গেছে মানুষের অধিকার
তবু কেনো আর আসে না বখতিয়ার!

হয় তো আঁধার দীর্ঘ একথা ঠিক
সকল আঁধার পৃথিবীতে সাময়িক।
তারেক মুসারা হয় না কখনো শেষ
ঘটবে নতুন সূর্যের উন্মেষ।

বখতে নসরের চোখ

ক্ষুধার্ত সিংহটি দানিয়েলের দৃষ্টির গন্ধ শুঁকছিলো
গুহার দেয়ালে গর্জনের চিহ্ন তখনও জ্বলজ্বলে
গুহাটি এখন অলৌকিক জ্যোতির জংশন!

কেননা গুহায় অদৃশ্যের ঘ্রাণ মাখা দানিয়েল
তার মুখ জোছনা ছাড়িয়ে আরও উজ্জ্বল
চোখ দুটি অনন্তের পবিত্র শিখা
ফলে সিংহের তীব্র হিংস্রতা এখন বিগলিত
শ্রদ্ধার গোলাপ

দানিয়েলের পায়ের কাছে সমর্পিত সিংহটি
দৃশ্যটি দুলিয়ে দিলো বখতে নসরের পৃথিবী
মৃত্যুর জিহবা যেনো নসরের দিকে লকলকে
এখনই বুঝি গলিয়ে দেবে রাজমুকুট
সীমাহীন ক্ষমতার আঙ্গুল কী অসহায়, ভাষাহীন
যার পায়ে সিংহ লুটায় তার নিঃশ্বাস
নিভিয়ে দেয়া এতই সহজ!

সহসা আকাশে উড়লো নসরের চোখ, দেখলো-
উড়ন্ত মেঘের দল যেনো ফেরেশতাদের ডানা
গোটা আকাশ যেনো মিকাঈলের মুখ!
যেনো ঘাড়ে আছড়ে পড়া জিব্রাইলের শ্বাস
নীলাম্বর মৃত্যুর রঙে জ্বলছে!

মাঝে মাঝে ডাকাত পড়ে মানব জাতির মহলে
ইতিহাসের ছাতার নীচে এরাই হাঙর, দানব,
দৈত্য ও ঐতিহ্যের চোরাকারবারি

সভ্যতার গালে থাপ্পড় চড়ায়
পৃথিবীর সকল স্বৈরাচার!

দীপ্ত বাংলাদেশ

স্বৈরাচারীর জগদ্দল আজ শেষ
নতুন স্বপ্নে হাসছে বাংলাদেশ।

সংকট আর সংগ্রামে দৃঢ় বল
অনড় অটল বিশ্বাসে উচ্ছ্বল।
আত্মগর্বা উচ্চকণ্ঠ-রব
মানেনি কখনো, মানবে না পরাভব।
বীর-বীরত্বে বিস্ময় অনিঃশেষ
হাজার যুগের মুক্ত বাংলাদেশ।

স্বৈরতন্ত্র কার্টু অথবা ক্যু
দলে যায় সব দুর্দম লড়াকু!
উদার চিত্ত দৃষ্টিতে ক্ষুরধার
প্রতিবাদী মন জ্বলন্ত অঙ্গার!
রক্তে বারুদ চক্ষে অগ্নিরেষ
এইতো স্বদেশ এইতো বাংলাদেশ।

বুলেটের মুখে বুক করে টানটান
এমন সিংহ বাংলার সন্তান
জীবন বিলিয়ে স্বাধীনতা আনে তারা
তাদের কণ্ঠ রোধ করে বলো কারা!
বুকে জাগ্রত সত্যের উদ্দেশ
নতুন মন্ত্রে দীপ্ত বাংলাদেশ।

মৃত্যুকে যারা ছাপিয়ে ছুটতে জানে
তারাই কেবল বিজয় পতাকা আনে।
আজ দিকে দিকে সেই বিজয়ের রেষ
প্রাণ খুলে আজ হাসছে বাংলাদেশ।।

এমনই আত্মঘাতি

নদীকেই যদি শেকল পরাতে চাও
সেকি আর নদী থাকে!
তরঙ্গ কিগো পকেট বন্দি হয়
বুকে তার দ্রোহ ভাঙনের সুর ডাকে।

তুমি কি পড়োনি সাগরের সেই বুক
সম্মিলিত মোহনা-গ্রন্থখানি
জীবনের সব গভীর গল্প লেখা
জলের গন্ধে চিরদিন সম্মানী।

পাহাড়কে তুমি পাহাড়ের কাছে রাখো
মেঘেদের দিকে শূন্যতাটুকু থাক
ফসলের মাঠ ফসলের হয়ে হয়ে
ফুলের গন্ধ হৃদয়ের দিকে যাক।

সূর্যের মুখ লুকিয়ে রাখা কি যায়
হৃদয়ে আগুন তাওকি তোমরা বোঝো না
বৃক্ষের শুধু পল্লব চেয়ে দেখো
বুকের ভেতর ছায়াটুকু আর খোঁজো না।

আকাশ যখন দেখতে তুমিও চাও?
খোলা মাঠে তবে আসো
জানালায় বসে নীলান্ত দেখে দেখে
কী করে বলছো উদারতা ভালোবাসো!

তুমি কি দেখোনা পাখিদের খোলা ডানা
সুদূর বিশারী প্রেরণার সেকি সাধ
কে করে হরণ স্বাধীনতা তার বলো
ঝর্ণা কি মানে তার বুকে কোনো বাঁধ!

সারাটা পৃথিবী হাতছাড়া তবু তুষ্ট
আহারে অবোধ জাতি
নিজের ছোরায় নিজেদের বুক ফাঁড়ে
এ জাতি আমার এমনই আত্মঘাতি।

কবির ‘মন এখন বিপ্লবের নদী’ কাব্যগ্রন্থ থেকে সংগৃহীত
জলছবি/মেজবাহ মুকুল