কালপেঁচার ডাক
আকাশে রূপালি থালার মতো পূর্ণিমার চাঁদ ভেসে আছে। সেই চাঁদের আলো বাবলাগাছের ডাল-পাতার ফাঁক গলে উপচে পড়ে ছায়া ছায়া মায়াময় এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে ঘর-দোর, বারান্দা ও নিকানো উঠোনজুড়ে। শোবার ঘরের সামনে, উঠোনের দক্ষিণ কোণে থামের মতো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকা নারিকেল গাছের চিরল পাতার ফাঁকে দেখা গেল এক চিলতে চাঁদের ঝিলিক।
মরচেপড়া পুরনো টিনের একটি ঘর। চারপাশে বাঁশ আর পাট কাঠির বেড়া। কয়েক জায়গায় পাটকাঠির বেড়া ভেঙে ফুটো হয়ে আছে। সেই ফুটো দিয়ে চাঁদের আলো হুমড়ি খেয়ে পড়ে ঘরের ভেতরে।
মাটির মেঝেতে খড় বিছিয়ে তালি দেওয়া ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে আছে রাবেয়া ও তার একমাত্র মেয়ে শারমিন। শারমিন গভীর ঘুমে নিমগ্ন এখন। রাবেয়ার চোখে ঘুম নেই। ঘুম ঘুম ভাব হলেও ঘুমায় না সে। নির্ঘুম চোখে ন্যাতার মতো পড়ে থাকে বিছানায়। তার দৃষ্টি এখন বেড়ার ফাঁকে, যেখানে চাঁদের অবারিত আলো উপচে পড়ে একটু একটু আলোয় ভরে রেখেছে ঘরের ভেতরটা। চাঁদের আলোয় ঘর-দোর, উঠোন বারান্দা কিংবা চরাচর আলোকিত হয়েছে বটে; কিন্তু রাবেয়ার মনের ঘরে অন্ধকার। সেখানে কোনও চাঁদের আলো পড়ে না। কারণ তার জীবন-আকাশ এখন চাঁদ-সূর্যহীন আর সে যেন ডুবে আছে নিঃসীম আঁধারে, অনাদরে ও অবহেলায় কাটছে দিন ও রাত।
রাবেয়ার নির্ঘুম চোখ ঘরের ভেতরের গহন আঁধারে নিবদ্ধ। ঘরজুড়ে অটুট এক নির্জনতা নেমে এসে একটি পুরু চাদর হয়ে তাকে গ্রাস করে রাখে। সময় গড়িয়ে চলে শব্দহীন বলের মতো, রাতও বাড়ে। হারিকেনের তেল ফুরিয়ে যায়, পুড়ে যায় সলতেটাও। সলতের পোড়া গন্ধ পুরো ঘরটায় ছোটাছুিট করে, যার মদির মাদকতায় তন্দ্রাভাব নেমে আসে তার চোখে। সব যাতনা ও গ্লানি মন থেকে ঝেড়ে ফেলে অন্তত একটু সময় ঘুমোতে দুচোখের পাতা বন্ধ করে সে। চোখে ঘুম নেমে আসে যখন ঠিক তখনই রাতের নিঝুম-স্তব্ধতাকে আচমকা ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে, সেই ভয়ংকর ডাকটা ভেসে এলো। নিঝুম রাত যেন আরও নিঝুম হয়ে উঠল। ঘুমের ঘোরে মনে হয়েছিল ডাকটা সত্যি নয়, স্বপ্ন। কিন্তু ঘুম ভাঙার পরেও যখন উঠোনের উত্তর দিক থেকে ডাকটা অবিরাম ভেসে আসতে থাকে তখন রাবেয়া নিশ্চিত হয়Ñ সত্যিই পাখিটা ডাকছে।
রাবেয়া বিছানা ছেড়ে দরোজার পাশে এসে দাঁড়ায়। বাইরে আবছা অন্ধকার, একটু আগেও আকাশে চাঁদ ছিল, এখন নেই। হঠাৎ কোথা থেকে যেন একফালি কালো মেঘ এসে ঢেকে ফেলেছে চাঁদটাকে। সঙ্গে সঙ্গে মেঘের কালো ছায়ায় ছেয়ে গেছে আকাশ ও চরাচর। রাবেয়া দরোজার পাশে একাকী দাঁড়িয়ে থেকে ভয়ে কাতর হয়ে পড়ে। সে একাকীত্ব কিংবা ভয় কাটাতে কারও সাচর্য খোঁজে। তা না পেয়ে শারমিনের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকায়। মেয়ের অমন নিষ্করুণ, মায়াবি মুখটা দেখে তার বুকের ভেতরে অফুরান মায়া অনুভূত হয়Ñ আর এই মায়া-মমতার মাঝেই তার মনে পড়ে বহুদিন আগের এক দুপুরবেলার কথা। সময়টা ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল। শারমিনের বাবা কর্মক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে বারান্দায় মাদুর পেতে গা এলিয়ে শুয়েছিল জিরিয়ে নিতে। অনুরোধ বা আবদার নয়, কিছুটা বিনয় করে তখন শারমিন বাবাকে বলেছিল, ‘আব্বা, এবার ঈদে আমারে একটা লাল ফ্রক কিইন্না দিবেন? অরুণ কাকা তার মাইয়া পারভিনরে একটা লাল ফ্রক কিইন্না দিছে, যা সুন্দর! হেইরকম একটা ফ্রক কিইন্না দিবেন আমারে?’
‘হ, কিইন্না দিমু। এইবার ঢাহারথন আইবার সময় তর লাইগা ঐরকম একটা লাল ফ্রক আনুম।’
বাবা কথাটি বলে গেছে এক মাস আগে। এতটা দিন আঙ্গুলের কড়ে গুনে দিনযাপন করেছে শারমিন। একটা দিন গেলে হিসেব রেখেছে আর মাত্র ঊনত্রিশ দিন। এভাবে ঊনত্রিশটা দিন পেরিয়ে এলো; কিন্তু আজকের রাতটা যেন আর পার হতে চায় না। রাত পোহালেই বাবা আসবে লাল ফ্রক নিয়ে, সেটি গায়ে দিয়ে সারা গ্রামে ঘুরে বেড়াবেÑ এ কথাটি রাবেয়াকে অন্তত কয়েকশো বার বলে অবশেষে ঘুমিয়ে পড়েছে শারমিন।
পাখিটা এত রাতে ডাকছে কেন? ভয় ও আশংকার কালো মেঘ জাপটে আছে রাবেয়ার মনজুড়ে। ছোটবেলা থেকেই দাদি-নানিদের মুখে শুনে এসেছে, রাত-বিরোতে ওসব পাখি ডাকলে নাকি সংসারের অমঙ্গল হয়। তবে এসব কথা সত্যি কিনা জানে না সে। কাল শারমিনের বাবা বাড়ি আসার কথা। তাহলে কি তার কোনও বিপদের আগাম বার্তা বয়ে নিয়ে এসেছে পাখিটা…? না, রাবেয়া আর ভাবতে পারে না। তার মনের মাঝে ভয়টা আরও গভীর হয়। মনকে প্রবোধ মানাতেই কিনা সে মনে মনে বলে, ‘পাখি ডাকলেই অমঙ্গল হবে কেন? সৃষ্টিকর্তা আছে কী জন্যে? ওসব আগেকার দিনের মূর্খ মানুষের সৃষ্টি করা উদ্ভট কুসংস্কার ছাড়া কিছুই না।’
কিন্তু রাবেয়ার অবোধ মন প্রবোধ মানে না, মানাতে পারে না। তার বুকের ভেতর থেকে কান্না আসে বারবার। কান্নার দৃশ্যমান রূপ চোখের জল ভোরের শিশিরবিন্দুর মতো রাবেয়ার গাল বেয়ে কোলের কাছে ঘুমিয়ে থাকা শারমিনের মুখের ওপরে পড়তেই সে জেগে ওঠে। এত রাতে মাকে না ঘুমিয়ে বিছানায় বসে কাঁদতে দেখে শারমিন তার কাছে ওঠে আসে। তখনও বাইরে অবিরাম ডেকে চলেছে পাখিটা। শারমিন কিছু বুঝে না বুঝেই মাকে বলে, ‘আম্মা! এত রাইতে কী পইখ ডাকে, পেচা না?’
রাবেয়া তৎক্ষণাৎ শারমিনের মুখ চেপে ধরে ফিস্ফিস্ করে বলে, ‘চুপ! ঐডার নাম মুখে আনবি না। ঐডা অইল কালপেঁচা!’
শারমিন অকস্মাৎ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চুপ করে থাকে। কালপেঁচা ডাকলে কী হয় জানে না সে। রাবেয়া আর বসে থাকে না। মেয়েকে নিয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। চোখের পাতা বন্ধ করতেই আবার ডাকটা ভেসে আসে। প্রথমবার ডাকটা শোনার পরেই রাবেয়ার মনে যে ভয় ও আশংকা উদয় হয়েছে, তা এখনও কাটেনি। হয়তো এ আশংকার প্রভাবে তার চোখে আর ঘুম আসবেই না। সেও চেষ্টা করে না ঘুমোতে। মাঝরাতের গুমোট আঁধারে কালপেঁচার ডাকে অজানা কোনও বিপদের আশংকায় ভীষণ দুর্দশাগ্রস্থ হয়ে থাকে সে।
অদৃষ্টের প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস আছে রাবেয়ার। অশিক্ষিত হলেও সম্র¢ান্ত এক রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে সে। তার দাদা কামেল পাস আলেম ছিলেন। বাবা পড়িয়েছেন পাড়ার মুক্তবে এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের ইমামতি করেছেন। তিনি মারা গেছেন দুই বছর হলো। বাপ-দাদার কাছে পরিপূর্ণ ধর্মীয় শিক্ষা না পেলেও সৃষ্টিকতার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস আছে রাবেয়ার। পাখি ডাকলে অমঙ্গল হবে কেন? সেটা কালপেঁচাই হোক আর অন্য কোনও পাখিই হোক। ওসব আসলেই কুসংস্কার।
ব্যাপারটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে চায় সে। তবে তার সরল মন কেমন জানি করে। সেটা কালপেঁচার ডাকের জন্য নয়, শারমিনের বাপের জন্য। সে থাকে শহরে। সেখানে লোকটা কী কাজ করে তা জানে না রাবেয়া। তবে শুনেছে, রিকশা চালায়। পশ্চিমপাড়ার আলাউদ্দিনও সেখানে রিকশা চালায়। সে একবার বাড়ি এসে রায়েযাকে জানিয়ে গেছে স্বামীর রিকশা চালানোর কথা। নিজের বসবাসের ভিটেমাটি ছাড়া আর এক খণ্ড জমি নেই। অন্যে খেতে-খামারে কামলা খেটে স্ত্রীর ও সন্তানের জন্য দুবেলা দুমুঠো খাবার যোগাড় করতে রীতিমতো কষ্ট হয় বলে ঢাকায় চলে গেছে জীবিকার সন্ধানে। কিন্তু সেখানে গিয়ে রিকশা চালিয়ে যা রোজগার হয় নিজের থাকা-খাওয়ার খরচ বাদ দিয়ে বাড়িতে পাঠানোর মতো তেমন টাকা থাকে না।
এদিকে রাবেয়া পরের বাড়িতে কাজ করে যা রোজগার করতে পারে তাতে মেয়েটাকে খাওয়ায়ে নিজে কোনও দিন আধা পেটে, কোনও দিন না খেয়ে কাটিয়ে দেয়। মাঝেমধ্যে নিরুপায় হয়ে প্রতিবেশী সালেহা ভাবীর কাছ থেকে ধারকর্য করে এক সের, দুই সের চাল এনে রেঁধে শারমিনকে খেতে দেয়। নিজে থাকে না খেয়ে। এভাবে ধারকর্য করে করে প্রায় নয় সের চাল এনে ফেলেছে সালেহা ভাবীর কাছ থেকে। সে আর ধার দিতে চায় না। ধার চাইতে গেলেই বলে, ‘এত গুলান চাইল নিয়া ফালাইছ, ফেরত দিবা ক্যামনে? তোমার স্বামী তো টেহা-পইসা কিছুই দেয় না!’
রাবেয়া বিনয় করে বলে, ‘ভাবী, কাইল শারমিনের বাপ বাড়ি আইব। আপনের সব চাইল ফেরত দিয়া দিমু। কাইল থাইকা আমি না খাইয়া আছি, আইজও না খাইয়া থাকুম। শুধু মাইয়াডার লাইগা এক পট চাইল দেন।’
অনেক বলে-কয়ে এক পট চাল এনে চুলোতে হাঁড়ি বসায় রাবেয়া। সকালে চুলোয় হাঁড়ি চাপানোর দুটো চালও অবশিষ্ট থাকে না। শারমিনের বাবা এলেই সালেহা ভাবীর চাল ফেরত দেবে রাবেয়া। কিন্তু কাল যদি সে বাড়ি আসতে না পারে? তাই কালপেঁচার ডাক শুনে একটু হলেও ভয় পায় সে।
না, মধ্যরাতে কালপেঁচাটা অমন করে ডাকলেও কোনও অঘটন ঘটেনি। পরদিন ঠিকমতোই বাড়ি আসে শারমিনের বাবা। শারমিন দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘আব্বা, আমার লাইগা লাল ফ্রক আনছেন?’
‘হ, আনছি।’ বলেই বাবা ব্যাগ থেকে জামাটি বের করে দেয়।
শারমিন পছন্দের ফ্রক পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটে যায় তানিয়া, পারিভন, শেফালি আর রুমাদের দেখাতে। কতদিন কেটে গেছে প্রতীক্ষায়! অবশেষে আজ প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে তার। জীবনে কোনও দিন এত আনন্দ পায়নি সে। লাল ফ্রক পেয়ে শারমিন খুশি হলেও রাবেয়া খুশি হতে পারে না। তার স্বামী শুধু শারমিনের জামাটি ছাড়া আর কিছুই নিয়ে আসেনি। উপোস থেকে থেকে রাবেয়ার চোখের নিচে কালির দাগ পড়েছে, ছোট হয়ে কোটরের ভেতরে ঢুকে গেছে চোখ দুটো। ছোট হয়ে যাওয়া সেই করুন ও অসহায় চোখ দুটো মেলে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে রাবেয়া শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘চাইল আনছেন?’
তার স্বামী কোনও কথা বলে না। চুপ করে থাকে, যেন নির্বাক হয়ে গেছে। মুখে কোনও কথা জুটে না। এখন তার চোখের দৃষ্টি রাবেয়ার চেয়ে আরও করুন, আরও অসহায় লাগে। মুখের চামড়ায় ভাঁজ পড়ে গেছে। টান টান ভাব নেই আর শরীরজুড়ে। রোদে পুড়ে পুড়ে কালো হয়ে গেছে। স্বামীর শরীরের অমন পরিবর্তন দেখে একটু একটু মায়া হয় রাবেয়ার। তবে মায়া লুকিয়ে সে বেশ কর্কশ গলায় ফের জিজ্ঞেস করে, ‘কী অইল, কথা কন না ক্যান? চাইল আনছেন?
‘না, চাইল কিনতে পারি নাই।’ অসহায় ও শুকনো গলায় জবাব দেয়।
‘ক্যান?’
‘শারমিনের জামা কিনতেই সব টেহা শেষ অইয়া গেছে।’
‘জামাটা কিনার কী দরকার আছিল?’
‘মাইয়াডা খুব শখ করেছে।’
‘বউ-মাইয়ারে দুই বেলা ভাত খাওয়ানের যার মুরুদ নাই হের আবার শখ কিসের, হুনি? সালেহা ভাবীর কাছ থনে নয় সের চাইল ধার করে খাইছি, হের চাইল ফেরত দেওন লাগব। ঘরে একটাও চাইল নাই। আমি তো তিনদিন ধইরা না খাইয়া আছি, এহন আফনেরে খাইতে দিমু কী?’
তার স্বামী আর কোনও কথা বলে না। চুপ করে বসে থাকে মাথা নিচু করে। নিজেকে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ মনে হয় তার। দুচোখের কোণে অশ্রু জমে আছে। টলমল করছে গাছের বড় বড় পাতায় ঝমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটার মতো। ধীরে ধীরে গাল বেয়ে ঝরে পড়তে থাকে সেই অশ্রুর বিন্দু বিন্দু জল। ওদিকে প্রতিবেশী সব বান্ধবীকে নিজের জামাটা দেখিয়ে ঘরে আসে শারমিন। দরজায় দাঁড়িয়ে মা ও বাবার সব কথাবার্তা শুনে ফেলে। বাবার অসহায়ত্বের কথা ভেবে তার কচি মন কেঁদে ওঠে। দরজার আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে কিছুক্ষণ। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে যায় সে।
ঘরের ভেতরে চুপচাপ বসে থাকে রাবেয়ার স্বামী। নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ মনে করে এখন সে। ইচ্ছে করে ছোট্ট শিশুর মতো হাউ মাউ করে কাঁদতে; কিন্তু পারে না। কান্নাগুলো বুকের ভেতরে দলা পাকিয়ে থাকে। দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে আসে কখনও কখনও।
স্বামীর চুপ করে থাকাটা রাবেয়া সহ্য হয় না। অসহ্য লাগে। তাই আবার কর্কশ গলায় বলে, ‘হুনেন, আমি না হয় না খাইয়া থাকুম, আপনের শখের মাইয়া তো না খাইয়া থাকব না।’
‘চুপ করো। আমারে আর অপমান কইরো না।’
‘অপমান হওনের কী আছে?’
‘আমি পারি নাই তোমারে ভালা একটা কাপড় কিইন্না দিতে, পারি নাই তোমার কোন শখ মিটাইতে। এমন কি দুইবেলা দুইমুঠ ভাত যোগাড় করতেও পারি নাই ।’
দুজনের এ রকম সংলাপ চলছে যখন তখনই শারমিন আসে ঘরে। এসে মাকে বলে, ‘মা, আইজ ভাত রান্দ নাই?’
‘না?’
‘ক্যান?’
‘চাইল নাই ?’
‘এই নাও চাইল।’ বলেই শারমিন জামার কোচর থেকে কয়েক সের চাইল ঢেলে দেয় মায়ের শূন্য মাটির হাঁড়িতে।
‘তুই চাইল পাইলি কই?’
‘আমার জামাটা রতন কাকার মেয়ে রুমার কাছে বেচে এই চাইলগুলা আনছি।’
কথাটি শুনে রাবেয়া নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মেয়ের দিকে, যেন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে সে। শারমিনের বাবা বসা থেকে ওঠে ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে যায়। তার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘মারে! আমি তরে সুন্দর দেইখ্যা আরেকটা লাল জামা আইন্না দিমু।’
শারমিন জানে বাবা তাকে কোনও দিনই আর জামা কিনে দিতে পারবে না। তবু বাবাকে খুশি করতে মৃদু হেসে বলে, ‘আইচ্চা, দিয়েন।’
জলছব/ মেজেবাহ মুকুল

