জলছবি ঈদ সংখ্যা
রূপবানের মাঝি
প্রতিবার মেকআপ শেষে নিজেকে অন্য রকম লাগে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যাকে দেখতে পাই সে যেন আমি নয়, ভিন্ন কেউ। এতো ন্যাচারাল আর এতো গ্লোয়িং লুক! ঠোঁটের কোণে অহংকারী একটা হাসি ফুটে ওঠে। যত্ন করে সেই হাসি লুকিয়ে রাখি।মনে মনে বলি- আহা, লিজা, তুমি এই পঞ্চাশ বছর বয়সেও ত্রিশ বছরের সুন্দরী হয়ে আছো!এখনো ভেরি ইয়াং দেখায়।তখনি মন পাখিটা গুনগুন করে ওঠে-
আজ রঙে রঙে রঙিন হবো
রঙের হাওয়ায় ভেসে যাবো, রঙের দুনিয়ায়
ভালোবাসায় দুটি প্রাণে রঙ ছড়াবো স্বপ্ন গানে
রঙের ছোঁয়ায় হারিয়ে যাবো-
আজ শুটিং হচ্ছে জিন্দা পার্কের স্কুল মাঠে। সবুজ মাঠের ভেতরে নীল শাড়ী পরে দাঁড়িয়ে আছি।উৎসাহী দর্শকেরা তাকিয়ে রয়েছেন। তাদের চোখের ভাষা বলে দিচ্ছে, আমাকে অনিন্দ্য সুন্দরি লাগছে।হঠাৎ এক জোড়া চোখ দেখে আঁতকে উঠি।চেনা চেনা লাগছে। কোথায় দেখেছি মনে করতে পারছি না। কয়েক মূহুর্তের জন্য থমকে গেলাম।
চেনা চেনা মনে হয়
তবু যেন চেনা নয়
চোখ বুঁজে ভাবছি, কে?কবে?কোথায় দেখেছি?
এমন সময় পরিচালক নীলয় বাবু তুড়ি বাজিয়ে আওয়াজ দিলেন। চোখ খুলে গেল।আমার দৃষ্টি ভিড় ঠেলে ফের চলে গেল সেই দিকেই।ভদ্র লোকের পাশের মহিলাকেও তো পরিচিত মনে হচ্ছে! ইউরেকা! ইনি তো ডাঃ সেলিম। আমার বরের বন্ধু। আহা, কেমন বুড়ো হয়ে গেছেন! চুল দাঁড়ি সব ধবধবে সাদা! তিনিও নিশ্চয়ই আমাকে চিনতে পারেন নাই। কিভাবে চিনবেন?আমি তো এখন চকচকে, ঝকঝকে। মিসেস সেলিম মানে রিমি ভাবি কেমন মুটিয়ে গেছেন। মহিলারা বালকি হয়ে গেলে একদম ভালো লাগে না। কেমন বয়স্কঢ দেখায়!খুব ইচ্ছে করছে দৌড়ে কাছে যাই।গা ছুঁয়ে বলি, কেমন আছেন ভাবি?ইশ রে কতো বছর পরে দেখা হলো!কিন্তু কথা হবে না।আজ ভীষণ কাজের চাপ। পরিচালকের মাথা গরম হয়ে আছে।
সত্যি, ওদের দেখে পুরনো দিনের কথা মনে পড়ছে।চোখে ভেসে বেড়াচ্ছে অতীতের স্মৃতি। আহা, ফেলে আসা অতীত! সাথে সাথেই ব্রায়ান্ট এইচ ম্যাকগিলের কথা স্মরণে আসে।ম্যাকগিল মনে করেন-নিজের বেদনাদায়ক অতীতকে যেতে দেয়া হলো নিজের চমৎকার ভবিষ্যতের দ্বার উন্মুক্ত করা।
আমি আমার অতীতকে ভুলে গেছি। তবুও হুট করে আজ মনটা হু হু করে বদলে যাচ্ছে। কথায় আছে, অতীতের নাকি অমরত্ব আছে।ঠিক। আমরা কখনোই নিজের অতীতকে ভুলে যেতে পারি না। আচ্ছা, পলাশ, তুমিও কি এমন বুড়ো হয়ে গেছো?দশ বছর আগের তোমাকে এখন আর মনে পড়ে না।যে মুখ দেখলে হৃদয়টা শান্তি পেত সেই মুখ এখন আর মনে করতে চাই না। মানুষ কতটা বদলে যায়, তাই না?
বদলে যায় পৃথিবী
বদলে যায় মানুষ
আসলে বদলে যেতে হয়।
অনেক বেশি বদলে গেছি।তোমরা বদলে যেতে বাধ্য করেছো, পলাশ।কতো কতো অপমান সহ্য করেছি দিনের পর দিন, বছরের পর বছর।শুধুমাত্র ছেলেদের কথা ভেবে।বাড়ি, গাড়ি কিচ্ছু চাইনি।এমনকি ঈদে একটা ড্রেস পযর্ন্ত চাইনি।আঠারো বছর সংসার করেছি, এই আঠারো বছরে ঈদে নতুন একটা ড্রেস কিনে দাওনি আমাকে।অথচ বাড়ীর কাজের বুয়ারা পর্যন্ত নতুন পোশাক পেতো, এটা কি অপমান নাকি অবহেলা ছিলো?তোমার মা-বোনেরা সারাক্ষণ আমাকে হুকুম করতো, এটা করো, ওটা করো।বুয়ার মতো করে সারাদিন খাটতে হতো।আর গালিগালাজ শুনতে হতো।সকালের নাস্তা খেতাম দুপুরে, দুপুরের খাবার খেতাম সন্ধ্যায়।বাড়ীর সবাই কথায় কথায় অপমান করতো। তবুও সব মেনে নিয়েছিলাম।ভেবেছিলাম, ছেলেরা অন্তত বাবার আদর সোহাগে বড় হোক। জন্ম দিলেই যে বাবা হওয়া যায় না, সেটা এখন খুব বুঝতে পারছি। তুমি কোনোদিনও ছেলেদের কোলে নাওনি।বলতে, ছেলেদের কোলে নিলে তোমার বোনেরা মনে কষ্ট পাবে।কারণ তুমি ভাগ্নে ভাগ্নীদের কোলেপিঠে করে মানুষ করেছো, এখন নিজের ছেলেদের কোলে নিলে তোমার বোনেরা মনে মনে খুবই কষ্ট পাবে। তারা বলবে, ভাইয়া বদলে গেছে।
আহা, হতভাগা পিতা তুমি!ধিক তোমাকে ধিক।ভাগ্নে-ভাগ্নীদের জন্য এতো দরদ!এতো ভালোবাসা! তাহলে বিয়ে করেছিলে কেন?কেনই বা ছেলেদের জন্ম দিলে?
প্রতিদিন, প্রতিমূহুর্তে, প্রতিপলে তোমরা সবাই মিলে আমাকে কষ্ট দিতে।কাঁদতে কাঁদতে আমার চোখের জল শুকিয়ে গেছে। একদিন তুমি ভোরে কুমিল্লায় চলে গেলে।অবশ্য প্রতিদিন খুব ভোরে বাসা থেকে বের হতে ফিরতে গভীর রাতে।বিয়ের প্রথম দিকে তো মাঝেমধ্যেই রাতে ফিরতে না।দুই তিনদিন পরে বাসায় আসতে।তবুও সন্দেহ করিনি।কি বোকা ছিলাম! যেটা বলেছো সেটাই বিশ্বাস করেছি।তুমি পাক্কা মিথ্যুক এটা বুঝেছি বিয়ের আট বছর পরে। ততদিনে দুই ছেলের মা হয়েছি।যাহোক, যেদিন কুমিল্লায় চলে গেলে সেদিন দুপুরে ছেলেকে মাছ দিয়ে ভাত খেতে দিবো। আমাদের প্রথম সন্তান জুবায়ের তখন কেবল মাছ-ভাত খেতে শিখেছে।মাছের বাটি থেকে এক টুকরো মাছ নিতে গিয়েছি আর তখনি শাশুড়ীমা হাত থেকে চামচ কেড়ে নিলেন। কড়া গলায় বললেন, মাছ কি করবা?
বাবুকে দিবো।(মাথা নিচু করে মিনমিন সুরে জবাব দিলাম।)
এক বছরের বাচ্চাকে কেউ মাছ দেয়! ওরে মাছ খাওয়ালে প্রস্রাব পায়খানা থেকে আঁশটে গন্ধ বের হবে।কিছুই তো শেখো নাই।
মনে মনে বললাম, গু থেকে গু গু গন্ধ বের হয়-এইটা শিখেছি। মুখে তো আর সব কথা বলা যায় না। তোমার মায়ের কথা শুনে আমি হতবাক।জানি, মূর্খের সাথে তর্ক করে লাভ নেই। তাই একদম কথা বলতে ইচ্ছে করতো না কিন্তু চোখ তো অবুঝ। সে অঝোরে কাঁদতে লাগলো। তোমার কেনা মাছ আর আমার কষ্টের রান্না।অথচ আমাদের ছেলেকে একটুকরো মাছ দিতে পারিনি।সারাদিন দুচোখে বন্যা বয়ে গেল।মধ্যরাতে তুমি কুমিল্লা থেকে ফিরে এলে।”কুমিল্লা খাদি বস্ত্রালয় “-থেকে সুন্দর সুন্দর ড্রেস কিনেছিলে সব ভাগ্নে ভাগ্নীদের জন্য। নিজের ছেলে আর বউয়ের জন্য এনেছিলে ঘোড়ার ডিম। সারারাত ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদলাম। তুমি ফিরেও তাকালে না।একবার জানতেও চাওনি কেন এতো কাঁদছি।কেমন নির্দয় আর নিষ্ঠুর স্বামী! পৃথিবীর সব দুঃখীর জন্য তোমার মায়া উপচে পড়ে অথচ আমার কান্না তোমাকে বিন্দু পরিমাণ স্পর্শ করে না।কি অদ্ভুত!! দিন দিন তোমার অবহেলা বাড়তে লাগলো।তোমার পরিবারের সবার অত্যাচার এমন পর্যায়ে চলে গেল যে, জায়নামাজে বসেও কেঁদেছি।বাথরুমে লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছি।
মানুষ বউকে আদর করে মিষ্টি নামে ডাকে। সুন্দর সুন্দর কথা বলে। সোনাবউ, ময়নাপাখি, টিয়াপাখি, জানপাখি, কতো সুন্দর করে ডাকে।আর তুমি ডাকতে “শিক্ষিত বুয়া'”।আহা কি জীবন কেটেছে! তবু তোমাদের মন পাইনি। তোমার মা-বোনেরা সবার কাছে আমার নামে মিথ্যা বদনাম করতো।সব সময় বলতো, এ বাড়ীর বউ হবার যোগ্যতা নেই আমার। তাদেরকে ধন্যবাদ। তাদের অবহেলা, অপমান আর মিথ্যা বদনামের জন্যই আল্লাহ এতো সম্মানের ব্যবস্হা করে দিয়েছেন।সমাজে আজ অযোগ্য নই, বরং গুণীজন, সফল নারী, গর্বিত জননী।পলাশ, তোমাকেও ধন্যবাদ। মিথ্যা কলংক দিয়ে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিয়েছো বলেই নিজেকে তৈরি করার সুযোগ পেয়েছি। নইলে ওই আগুনের সংসারে সারা জীবন কলুর বলদ হয়ে খাটতে হতো।ওই সব মিথ্যা কলংকই আমাকে সত্য পথে নিয়ে এসেছে এবং আলোকিত হতে সাহায্য করেছে।তোমার শিক্ষিত বুয়া, বাড়ীর অযোগ্য বউ আজ সারাদেশে আলো ছড়াচ্ছে। জায়গা করে নিয়েছে লাখ লাখ মানুষের হৃদয় মাঝে।
মনে আছে তোমার, অনেক বছর আগে সেলিম ভাইয়ের পরিবারের সাথে ঘুরতে এসেছিলাম এই জিন্দা পার্কে?গাড়ীর ভেতরে সারা রাস্তা খুব হৈচৈ করেছিলো বাচ্চারা? মনে পড়ে?? সেদিন আনন্দ করতে করতে চলে এসেছিলাম পার্কের গেটে।গাড়ি থেকে নেমে তুমি দুই ছেলেকে কড়া গলায় বললে, এখানে যতক্ষণ থাকবে ততক্ষণ আমাকে বাবা বলে ডাকবে না।বুঝেছো জুবায়ের? বুঝেছো জুনায়েদ?
তোমার কথা শুনে আমি আর রিমি ভাবি হতভম্ব হয়ে গেলাম।ভাবি, আমার চোখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন।তার চোখে এমন প্রশ্নবোধক অনুভূতি ! আজো ভুলতে পারিনি।ছেলেদের বলেই ক্ষান্ত হওনি, আমার দিকে তাকিয়ে বললে, সাবধান, কেউ যেন বুঝতে না পারে, তুমি আমার বউ।
আমার কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমি তোমার বউ -এটা বললে সমস্যা কোথায়? তীব্র অপমানে মরে যেতে ইচ্ছে করছিলো।মনের মধ্যে কতগুলো প্রশ্ন জেগে ওঠে। আমি কি এতোটাই অযোগ্য? এতোটাই অসুন্দর যে, বউ বলে পরিচয় দিতে লজ্জা পাও? ছেলেরা বাবা বলে ডাকলে কি ক্ষতি?
রিমি ভাবি তো বলেই ফেললেন, ভাই তো অস্বাভাবিক মানুষ! নিজের বউ বাচ্চার পরিচয় দিতে চায় না। এ কেমন কথা! এটা তো ভালো লক্ষণ নয়।বিষ্ময়ভরা দৃষ্টি দিয়ে আমাকে দেখলেন তিনি।তারপর করুন গলায় বললেন, আপনি এ সব সহ্য করেন কিভাবে? আমি হলে এ সব সহ্য করতাম না।ওর গলায় চাকু ঢুকিয়ে দিতাম, ওর টুটি ছিড়ে ফেলতাম।সত্যি বলছি।
বুকের দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে রেখে হাসিমুখে বললাম, ও সব সময় এমন।
না।না আপনি এ সব সহ্য করবেন না ভাবি।নিজের অধিকার, নিজের মর্যাদা, আদায় করে নিবেন।পুরুষদের বিশ্বাস নেই। বুঝেছেন লিজা ভাবি?
হুম, বুঝেছি।
সত্যি বলতে কি, তুমি যে আমার নও এটা সব সময় টের পাই।তবুও সংসারের মায়া নাকি অন্য কোনো কারণে সব অপমান হজম করতে হয়েছে।মেয়েদের আসলে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়।কিন্তু সেটা মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে মরে যেতে হয়।আমিও মরেছি বহুবার।মরতে মরতে বেঁচে যাই।সব মা’কে বেঁচে থাকতে হয় সন্তানদের জন্য।
প্রায় দশ বছর পরে আজ রিমি ভাবিকে দেখছি।খুব ইচ্ছে করছে কাছে যেয়ে কথা বলতে কিন্তু ক্যামেরার সামনে কাজ করতে গেলে জীবনের অনেক ইচ্ছে ই পূরণ করা যায় না। তবুও এ জীবন ভালো লাগে।এক ধরনের আনন্দ হয়।এ আনন্দ জনপ্রিয়তার আনন্দ। ভালোবাসা পাওয়ার আনন্দ। তুমি ভালোবাসোনি তাতে কি?দেশের লাখ লাখ মানুষ আমাকে ভালোবাসে।এক নজর দেখার জন্য অস্হির হয়ে থাকে। অপরিচিত মানুষের চোখে নিজেকে দেখার সে কি অপার আনন্দ! সবার ভালোবাসা পাওয়ার সৌভাগ্য কয়জনের হয়?আজ, সবার ভালেবাসায় ধন্য। তবুও ভুলতে পারি না সেই সব স্মৃতি।এতো বছর পরেও যখন মনে পড়ে তখন অস্থিরতায় ডুবে যাই।নিজেকে পাগল পাগল লাগে।অসহায় লাগে।তুমি অনেক বড় হতে চেয়েছিলে, ধনী হতে চেয়েছিলে, চেয়েছিলে সামনে এগিয়ে যেতে।আর তাই আমাদের ছেড়ে চলে গেলে।ছেলেদের জীবন থেকে হারিয়ে গেলে চিরতরে। কতো প্লান করে কলংক দিলে, নাটক সাজালে, কাহিনি বানালে, মিথ্যার চর্চা করলে, সে সব মনে পড়লে তোমার জন্য করুনা হয়।আফসোস, তুমি রূপবানের বোকা মাঝি! হীরা চিনলে না।কাঁচের টুকরো ভেবে দূরে ঠেলে দিলে।আজ খুব জানতে ইচ্ছে করে, কতোটা সামনে এগিয়েছো?কতোটা ধনী হয়েছো?আর সুখ পেয়েছো কতটা??
আমাকে কি মনে পড়ে? ছেলেদের কি মনে পড়ে? আমি জানি তো, -It moves, it moves not.It is far, it is near. It is within all this, and it is outside all this.
জলছবি/মেজবাহ মুকুল

