জলে ভাসা পদ্ম


জলে ভাসা পদ্ম

তুতুল, এ্যাই তুতুল। ওঠ, দেখ তোর ঈদের নতুন জামা। ঘড়িতে রাত সাড়ে বারোটা। বিদ্যুৎ বিহীন একটা গ্রামে রাত সাড়ে বারোটা মানে মধ্যরাত। ৬-৭ বছরের বাচ্চা মেয়েটা নতুন জামার কথা শুনে চোখ কচলে বিছানায় উঠে বসে। ফোলা ফোলা চোখ। গালে তখনও কান্নার দাগ। নতুন জামা হাতে নিয়ে মেয়েটা যে অপার্থিব হাসি দিল সেটার কোন তুলনা হয় না।

তুতুলের জন্মের পাঁচ মাস আগে তার বাবা মারা যায়। যথারীতি তার জন্ম হয় নানার বাড়িতে। নানার চার মেয়ে দুই ছেলের মধ্যে তুতুলের মা-ই সবার বড়। পরিবারের ক্ষুদে সদস্য হিসেবে আদর যত্নের কোন ঘাটতি নেই। নানা নানু আর মামা খালাদের কোলে পিঠে বড় হওয়া তুতুলকে দুধ খাওয়ানোর জন্য খুঁজে আনতে হয়। দিন গড়ায়। নানা সিদ্ধান্ত নেয় বড় মেয়েকে আবার বিয়ে দিবেন। অল্প বয়সী বিধবা মেয়েকে তো আর এভাবে ফেলে রাখা যায় না। তুতুল কিছু বুঝতে পারলো না। তার তিন বছর বয়সে মায়ের আবার বিয়ে হয়ে গেল। কয়েক বছরের মধ্যে মামা খালাদেরও অনেকের বিয়ে হয়ে গেছে।

বাড়ির সামনে বড় একটা গরু বাঁধা আছে। আগামীকাল ঈদ। এই গরু দিয়ে কুরবানী হবে। সন্ধ্যা থেকে সবাই গরু নিয়ে ব্যাস্ত। তুতুলও গরুকে কাঁঠাল পাতা খাওয়ালো। রাতে যখন তুতুলের ফুফাজি বাড়ি ফিরে আসেন তখনই তুতুল কান্না শুরু করে। কারণ সে ধরেই নিয়েছিল ফুফাজি বাড়ি ফেরার সময় তার জন্য নতুন জামা আনবেন। কিন্তু ফুফাজি তো খালি হাতে ফিরেছেন। রোজার ঈদ হোক আর কুরবানীর ঈদ হোক তার তো নতুন জামা চাই ই চাই। কিন্তু কুরবানীর ঈদে আমরা তো নতুন জামা নিই না। রোজার ঈদেরটাই পরি। কুরবানীর ঈদে আমাদের আনন্দ পুরোটাই থাকে গরু নিয়ে। এখন কি করা যায়? বাড়ি আর বাজারের দূরত্ব প্রায় দু’মাইল। তাছাড়া গ্রামের বাজার এত রাতে দোকান খোলা থাকবে কিনা সেটাও অনিশ্চিত।

তুতুল আমার মামাতো বোন। ওর যখন ছয় সাত মাস বয়স তখন মামী আমাদের বাড়িতে এসে অনেক দিন থাকেন। এবারই প্রথম তুতুল তার মাকে ছাড়া আমাদের বাড়ি আসে। আমার আব্বাও তাকে খুব আদর করতেন। যে মেয়ে জন্মের আগে বাবাকে হারিয়েছে তার জন্য তো আদর থাকা স্বাভাবিক। তার কান্না দেখে এত রাতে আব্বা পায়ে হেঁটে বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। অবশেষে সুন্দর একটা গোলাপী রঙের জামা এনে তুতুলকে ঘুম থেকে তুলে পরিয়ে দিলেন। মেয়েটা নতুন জামার জন্য কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমরা তো অবাক এত রাতে জামা কিভাবে পাওয়া গেল !

বাবা মারা যাওয়ার পর মায়ের যখন অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যায় তখন সন্তান হয়ে যায় শেকড় ছাড়া। তুতুলও অনেকটা সেরকম। ক’দিন নানা নানুর কাছে ক’দিন মায়ের কাছে আবার ক’দিন আমাদের বাড়িতে। আমার আব্বা তাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। কিন্তু তার মা তাকে ছেড়ে থাকতে পারেন না। বোনের কান্না কাটিতে অস্থির হয়ে গিয়ে তুতুলের খালারা এসে একপ্রকার জোর করেই নিয়ে যায়। বারবার স্কুল বদলানোতে পড়াশোনাতেও পিছিয়ে গেল। আমাদের বাড়িতে শেষ বার আসার পর ক্লাস নাইনে ভর্তি করা হয়। এর কিছুদিন পর আবার তার খালারা এসে তাকে নিয়ে যায়। নানান টানাপোড়েনে একসময় সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।

অনেক দিন পর হঠাৎ করে আমার মামী আসলেন আমাদের বাড়িতে। সাথে পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের একটা ছেলে। সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন ছেলেটাকে তুতুলের বর বলে। আমার আম্মা তো রেগে মেগে আগুন। আমাদেরকে না জানিয়ে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিল বলে। যাই হোক সবাই খুশি হলো শেকড় বিহীন তুতুল এবার বুঝি স্বামীর সংসারে থিতু হবে। কিন্তু কথায় আছে, “অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকিয়ে যায়।”

তুতুলের বিয়ের পর কয়েক মাস তার সাথে আমাদের যোগাযোগ ছিল না। তখন কেবল গুটিকয়েক লোকের কাছে মোবাইল ফোন দেখা যাচ্ছিল। হঠাৎ একদিন খবর আসে তুতুল আর নেই।

মেয়ের জন্মের নয় দিন পর তুতুল মারা যায়। সে নিজে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই বাবাকে হারিয়েছে আর তার মেয়ে পৃথিবীতে আসার ক’দিন পরই মা কে হারালো ! কিছুদিন পর বাবা আবার বিয়ে করলো। প্রকৃতির খেয়ালে নিষ্পাপ বাচ্চাটা মা বাবা দু’জনের আদরই হারালো। জুনিয়র তুতুলের ঠাঁই হলো নানির কোলে। নানিকেই সে মা বলে জানে এবং মা বলে ডাকে।

আজও চাঁদরাতে আমার মনে পড়ে ঈদের নতুন জামা হাতে নিয়ে শিশু তুতুলের কান্না ভেজা চোখের নিষ্পাপ হাসি।

জানি না দূর আকাশের তারা হয়ে থাকা শেকড়হীন তুতুল আরেকটা শেকড় ছাড়া তুতুলের ঈদের নতুন জামার জন্য কান্না করে কি না।

জলছবি/মেজবাহ মুকুল