পাগলীকন্যা


পাগলীকন্যা

তোমার মা ছিলেন এক পাগলী। আর তোমার বাবা কে- তা কেউ জানে না।
বিয়ের দিনে এতদিন ধরে যাদেরকে আমি আমার বাবা-মা বলে জেনে এসেছি, স্বয়ং তাদের মুখে এই কথা শুনে মনে হলো- আমার মাথায় বুঝি বাজ পড়েছে!
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার বিয়ের যাবতীয় কার্যক্রম শুরু হতে চলেছে। ওসব শেষেই একজন মেয়ের সেই বহুল আকাক্সিক্ষত সময়- বাসর রাত! কত কত স্বপ্নের বুনন সেই রাতকে ঘিরে।

আবিরের সাথে আজকে আমার বিয়ে হবার তারিখ নির্ধারিত হলেও, ওর সাথে সম্পর্কটা সেই কলেজ জীবন থেকেই। তারপর দু’জনে একই ভার্সিটিতে ভিন্ন ভিন্ন সাবজেক্ট নিয়ে পড়েছি। ভার্সিটি লাইফে দু’জনে চুটিয়ে প্রেম করেছি। আবির সবসময়ই বলত- এখন আমরা পরস্পরকে এক সাগর সমান ভালোবাসলেও বাসর রাতের জন্য পাঁচ মহাসগরের থেকেও বেশি ভালোবাসা জমা করে রাখব। আমি আবদার করে বলেছিলাম- আমাদের বিয়েটা হবে আমার জন্মদিনের দিনে। আমার জন্মদিন আর বিবাহ বার্ষিক একই দিনে ঘটা করে পালন করতে চাই। আবিরও সায় দিয়েছিল তাতে। অথচ, সেই বাসর রাতটা… খোদ বিয়েটাই ভেস্তে যাবার জোগাড় আজ।

কিছুক্ষণ আগের কথা। নিচে পাত্র পক্ষ এসে উপস্থিত হয়েছে। আমি দোতলার ঘর থেকে উঁকি মেরে দেখেছি তাদের। বরের সাজে আবিরকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। ভাবছি- বিয়ের পর মাঝেসাজে ওকে বরের সাজ নিতে বলব! ওরা আসার কিছুক্ষণের মধ্যে কাজী সাহেবও এসে হাজির। সেই বিকেলে থেকেই একদল তরুণি আমাকে সাজুগুজু করাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। কনে সাজানো শেষে ওরা সবাই আমাকে এখানে একলা রেখে আবারও যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই রুমটাতে আমি অনেকক্ষণ একা একা বসে ছিলাম। তবে কান খাড়া করে রেখেছিলাম। নিচে কে কী বলছে, প্রতিটা কথা শুনতে উদগ্রীব হয়ে ছিলাম। যখন বাবা-মা দু’জনে মিলে আমার রুমের দিকে আসছিলেন, তখন ভাবলাম- তারা বুঝি আমাকে নিচে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসছেন। শেষে কি-না শোনালেন এমন এক অদ্ভুতুড়ে কথা।

প্রথমে অবশ্য তাদের কথাকে ফান হিসেবেই ধরে নিয়েছিলাম। আজ আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কনে বিদায়ের রাত। অনেক কান্নাকাটি হবে। সেজন্য বোধহয়, কনে বিদায়ের আগে একটু মজা করতেই… কিন্তু তাদের চেহারা দেখে দমে গেলাম আমি। না, তারা মোটেও মজা করছেন না। উল্টো এক পাহাড় পরিমাণ উৎকণ্ঠা আর কষ্ট যেন তাদের মনটাকে কব্জা করে নিয়েছে!
আবির জানে? কোনো রকমে কথাটা বললাম আমি।
হ্যাঁ। ওকে সবকিছুই জানানো হয়েছে।
কী বলল?

তেমন কিছু না। আমরা চাই- অন্যের মুখ থেকে উল্টা-পাল্টা কিছু শোনার আগে তুমি অন্তত সত্যিটা জানো।
তার আগে তোমরা আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও। এসব কথা এতদিন বলোনি কেন?
বলার প্রয়োজন মনে করিনি।
তাহলে আজ কেন?
একটু আগে একজন অদ্ভুত কিসিমের লোক এসে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি বললেন-
কী বললেন?
তিনি নাকি তোমার বাবা!

নাক-মুখ চেপে বসে পড়লাম আমি। এই মুহূর্তে আমার সামনে দণ্ডায়মান এই দম্পতিকে আমার জীবন চলচ্চিত্রের খলনায়ক হিসেবে গণ্য করতে ইচ্ছে করছে। এনাদের একজন দেশের নামকরা এক জাজ। অথচ তার কিনা এমন বিচার! আমাকে আমার বাবা-মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে রাখা হলো? কেন? যাক, এতদিন বাদে হলেও আমার বাবা আমাকে খুঁজে পেয়েছেন। আমার মা কোথায়? তিনিও কি বাবার সাথেই থাকেন? তিনি কেন এলেন না?

দুই.
আবির আর আমি- দু’জনে এক রুমে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে বসে আছি। আমাদের বিয়েটা হয়নি এখনো। ইতোমধ্যে অনেক অতিথিই বিদায় নিয়েছেন। কাজী সাহেবও ‘আরেকটা বিয়ে করিয়ে ফের আসছি’ বলে চলে গেলেন। সবাই ধরে নিলেন, তিনি আর আসবেন না। আমি অবশ্য অতোটা হতাশ নই। নকল বাবা-মায়ের কাছে বড় হলেও, আমার যে আসল বাবা-মা আছেন, সেটাই তো আমার আসল গর্বের জায়গা। কেবল একজনের বদলে আরেকজনকে কন্যাদান করতে হবে- এই যা!

আবিরের মুখখানা দেখে অবশ্য মনে কুডাক দিয়ে উঠলো। আবির কি তবে বিচারক পরিবার দেখে আমার সাথে সম্পর্ক করেছে? কিন্তু, তাই বা হয় কী করে? কলেজে খুব কম মানুষই আমার বাবার পেশা সম্পর্কে জানতো। আবিরের তো জানারই কথা না। সদা চুপচাপ ছেলেটিকে প্রথমে আমারই মনে ধরে। পরে ওর সাথে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, সেই বন্ধুত্বই ধীরে ধীরে রূপ নেয় প্রণয়ে…। এতদিনের সম্পর্কেও তবে কেন দ্বিধা আবিরের!
পূর্ণতা! অনেকক্ষণ নীরব থাকার পর আবির মুখ খুলল।
আমি ওর দিকে সরাসরি মুখ তুলে তাকালাম।
নিচের ওই অদ্ভুতুড়ে লোকটাকে দেখেছো?

হ্যাঁ। জবাব দিলাম আমি। মনে মনে বললাম, ইচ্ছে করছে এখুনি দৌড়ে নিচে গিয়ে তার কোলে ঝাপিয়ে পড়ি।
ওই লোকটা একটা লম্পট। ঘৃণ্য এক ধর্ষক!
৫০০০ ওয়াটের ইলেক্ট্রিক শক দিলো যেন কেউ আমাকে! এ কী বলেছে আবির। নিশ্চয়ই মিথ্যে বলছে ও। কেন বলেছে এমন জঘন্য সব মিথ্যা? ও কি তবে সেই বিচারক দম্পতির দলে নাম লিখিয়েছে?
ও কী করেছে জানো?
আবিরের প্রশ্নে বাস্তবতায় ফিরে এলাম। ইচ্ছে না করলেও জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম ওর দিকে।
বলতে দ্বিধা করছে…। তবুও অপ্রিয় সত্য কথা স্পষ্টত বলা ভালো… ও তোমার মাকে ধর্ষণ করেছে।
আমার মাকে!

হ্যাঁ। তখন তোমার মা ছিলেন একজন মানসিক ভারসাম্যহীন তরুণি। পথে পথে ঘুরে বেড়াতেন। কেউ তাকে চিনত না। হয়তো তার কোনো পরিবার ছিল না। হয়তো অনেক কিছুই ছিল। যেসব আজ অতীতেরও অতীত। মিস্ট্রি হয়েই থাকবে…। যাইহোক, পথে পথে ঘুরে বেড়ানো সেই পাগলীটি পথের ধারেই একদিন ফুটফুটে এক কন্যা শিশুর জন্ম দেন। নবজাতক মেয়েটি অনাহারে মরতে বসেছিল প্রায়। তার মায়ের অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না তখন। এলাকার কিছু হৃদয়বান তরুণ তখন তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। মা-বেটিকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করান। এক নিঃসন্তান বিচারক দম্পতি সেই ছোট্ট শিশুটির দত্তক নেন। পুরো এলাকায় তখন সেটিই ছিল টক অব দ্য টাউন, অর্থাৎ বহুল আলোচিত ঘটনা। কারো বুঝতে বাকি রইল না- মানসিক ভারসাম্যহীন তরুণিটি কোনো এক মনুষ্যত্বহীন লোকের দ্বারা নিগৃহীত হয়েছেন…। ছিঃ ছিঃ রব ওঠে সেই অজ্ঞাতনামা ধর্ষকের বিরুদ্ধে। ওদিকে বিচারক দম্পতি মেয়েটিকে নিজেদের পরিচয়ে বড় করে তুলতে সেখান থেকে অনেক দূরে চলে আসেন। আপাতত, এই বাড়িটাই তাদের ঠিকানা…

আবির থামল। আমি নির্বাক। দু’হাতে মুখ চেপে ধরলাম। ভীষণ লজ্জা লাগছে। ভাবতে অবাক লাগে- আমাকে, তাও আবার আমার বিয়ের রাতে নিজের বাপ-মা, নিজ পরিচয় সম্পর্কে এমন অপ্রিয় অপ্রিয় সব কথা শুনতে হলো! চারপাশের সবাইকে শত্রু হিসেবে মনে হতে লাগল। নিচের ওই অদ্ভুত লোকটাকে, আমার পালক পিতা-মাতা, এমনকি সামনে নিশ্চুপ বসে থাকা আবির নামধারী ছেলেটিকেও! মনে হলো- এই বুঝি ও আমার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। নিজের হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করবে। সবকিছু হারিয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় আমি পথে পথে ঘুরে বেড়াব। ডাস্টবিনের বাসি-পঁচা খাবার খাব। মানুষর লাথি-গুঁতা খেয়েও ঘুমিয়ে থাকব রাস্তার পাশে! ক’দিন পরে আমার শরীরে আরেকজনের অস্তিত্ব টের পাবো। সত্যিই কি টের পাবো? মানসিক ভারসাম্যহীন হলে কি সে বোধ থাকবে? জানি না। ক্রমান্বয়ে আমার তলপেটটা ভারি হয়ে উঠবে। ব্যথায় কুকড়ে যাব, কিংবা আমার সে ব্যথার অনুভূতিই হয়তো থাকবে না। একদিন পেটের সন্তানটি নিষ্ঠুর এই পৃথিবীর আলো দেখবে। গায়ে মাখবে এই ভূ-ধরের বিষাক্ত বাতাস! আমার কি তখন সেই বুঝ থাকবে? যার নিজেরই কোনো হুঁশ নেই, সে কী করে আরেকজনকে পেলে-পুষে বড় করবে? হয়ত আমি বুজবই না-সন্তান কী! কিংবা, হয়তো বুজব রক্তের সম্পর্কের মর্ম…

দু’চোখ বেড়ে অবিরাম অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। আমি একজন পাগলীর সন্তান। আমি একজন পিতৃহীন মানুষ। এমন কারো এই পৃথিবীতে কীরূপ অবস্থান হতে পারে? তবুও তো এই দম্পতি আমাকে নিজেদের মেয়ে হিসেবে সমাজে পরিচয় দিয়েছেন। ভালোবেসেছেন তাদের মেয়ের মতো করেই।
হঠাৎ মনটা অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। আজ এতদিন বাদে কেন সেই বর্বর লোকটা এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে? কী চায় সে? আমার জন্মদাত্রী কোথায়? আবির কি আমাকে বিয়ে করবে? ওকে যে অনেক ভালোবাসি আমি…।
বিচ্ছেদের হাহাকার মনে প্রবল হয়ে উঠলো। ওদিকে, আবির আর কোনো কথা না বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
আমাকে একা রেখে ও কেন চলে গেল? তবে কি আবির আমাকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে? এখন এই পুরো সমাজ ঘৃণা করবে আমাকে? যাক, আবির গিয়ে বরং একদিক থেকে ভালোই করেছে। আমাকে লজ্জা থেকে বাঁচিয়েছে।

তিন.
আবির চলে যাবার একটুক্ষণ পর আমার পালক পিতা-মাতা এসে রুমে ঢুকলেন। ইতস্তত বললেন- তিনি নিচে দাঁড়িয়ে আছেন।
ইতোমধ্যে আমি উপর থেকে উকি মেরে সেই জঘন্য লোকটার চেহারাখানা দেখে নিয়েছি। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে নীচ লোকটা নিচে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়ের বিপরীতে পিতৃত্বের দাবি নিয়ে এলেও, তাকে দেখে মনে হলো- মেয়ের বিয়ে ভাঙতে পেরেই বেশি খুশী সে। তীব্র ঘৃণা জন্মাল তার প্রতি। বাবা-মায়ের কথার প্রত্যুত্তরে বললাম- আমি ওর সাথে কথা বলতে চাই না। ওকে চলে যেতে বলো।
তিনি তোমার বাবা-

ও আমার কেউ না। চেঁচিয়ে উঠলাম। বদমাশ লোকটাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দাও।
আমার পালক বাবা-মা বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলে, আমি জানতে চাইলাম- ওই লোকটা এখানে কেন এসেছে?
তার মেয়েকে ফিরিয়ে নিতে।
মেয়ে! ওকে বলো এখানে ওর কোনো মেয়ে থাকে না।
আচ্ছা।
আর একটা কথা-
বলো।
আমার সেই ‘পাগলী মা’ কোথায়?
তিনি কয়েক দিন আগে মারা গেছেন।

দু’ ফোটা অশ্রু গড়িতে পড়ল আমার চোখ বেয়ে। আমার পালক মা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। দৌড়ে এসে আমাকে তার বুকে জড়িয়ে নিলেন। বাবা এসে মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন। তিনি বিড়বিড় করে বললেন- আবির চায়, আজকেই তোমাদের বিয়েটা হয়ে যাক। আজ তো তোমার জন্মদিন। তুমি না ফি বছর জন্মদিনেই বিবাহ বার্ষিক উৎযাপন করতে চেয়েছিলে?
আমি মুখ হা করে রইলাম। মায়ের বুকে নিজেকে ভালো করে চেপে ধরলাম। হাত বাড়িয়ে বাবাকেও আগলে ধরলাম। দরজায় দেখা গেল আবিরের হাসি হাসি মুখ। আমার নাম পূর্ণতা। মনে হলো- এতদিনে বুঝি এই পাগলীকন্যাটি জীবনে সত্যিকার অর্থে পূর্ণতা পেল!

চার.
এখানেই আমার লেখা শেষ করতে পারতাম। কিন্তু দুটো বিষয় উল্লেখ করতে মন বেশ আনচান করছিল।
আবিরের সাথে আমার বিয়ের এক বছরের মাথায় এক ফুটফুটে কন্যা সন্তানের মা হই আমি। আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের পাশাপাশি কয়েকজন অপরিচিত মধ্যবয়সী লোকও আসে আমার মেয়েকে দেখতে। পরে বাবা জানান, ওই লোকগুলোই একদা আমাকে আর আমার গর্ভধারিণীকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে সেবা-শুশ্রƒষার ব্যবস্থা করান। আগে তারা এসে আমাকে দূর থেকে দেখে যেতেন। এতদিন বাদে আমার মেয়েকে দেখতে আমার সামনে এসে উপস্থিত হয়েছেন। বহু বছর ধরে তারা আমার মায়ের সেবা যত্ন করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো- তাকে সুস্থ করে তোলা যায়নি। কঠিন একটা রোগে ভুগছিলেন মা। তাই তাদের মতো কিছু ভালো মানুষকে পাশে পেলেও বেশি দিন বাঁচতে পারেননি। আমার দুর্ভাগ্য- মায়ের মুখখানা দেখার সৌভাগ্য হলো না। তবে, তারা জানান- আমার মেয়ে নাকি ঠিক আমার মায়ের মতোই হয়েছে। তা শুনে আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে গেল আমার।

সেই পাষণ্ড লোকটির আর কোনো খোঁজ মেলেনি। সে নাকি সেই শুরুর দিন থেকেই সবার ‘তামাশা’ দেখে আসছিল! পাগলীর মেয়েকে কারা দত্তক নেয়, তাদেরও চিনে রাখে সে। পরবর্তীতে উপযুক্ত সময় বুঝে তাদেরকে ব্ল্যাকমেইল করে কয়েক কোটি টাকা চেয়ে বসে। তাতেও থেমে ছিল না সে। তাদেরকে হুমকি দেয়- তাদের বিরুদ্ধে ‘মেয়ে চুরির’ মামলা করবে। প্রয়োজনে ডিএনএন টেষ্ট করাবে। এসব শুনে আমার পালক বাবা-মা কিছুটা হতোদ্যম হয়ে পড়েন। বিষয়টি তারা আবিরের সাথে শেয়ার করেন। আবিরই সবকিছু আমাকে খুলে বলার পরামর্শ দেয়। বিয়ের সময় আগত অন্য কোনো অতিথি এসব কথা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেননি। আপাতত ‘বিয়ে বাতিলের’ যাবতীয় দায়ভার আবির অন্য একটা অজুহাত তুলে নিজের ঘাড়ে তুলে নেয় তখন। শেষমেশ হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হয় সেই নরপশুটিকে।

আমার সন্তান জন্ম হবার কয়েকদিন পরের ঘটনা। একদিন পারিবারিকভাবে আমার পূর্ব পরিচিত পুলিশের অপরাধ বিভাগের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এসে জানান- সেই লোকটা মারা গেছে। কে বা কারা জানি তাকে নৃশংসভাবে খুন করেছে।
কথাটা শুনে কেন জানি একটুও মন খারাপ হলো না। ভাবলাম- যাক, লোকটা তার পাপের শাস্তি এ পৃথিবীতেই পেয়ে গেল। তার অতি লোভের কারণেই আমরা মুখোশের আড়ালের মানুষটাকে চিনতে পারলাম। কিন্তু, তাকে কে খুন করল?

পুলিশ অফিসারটি জানালেন, আমি যখন জন্মগ্রহণ করি, তখন থেকেই নাকি তিনি এই লোকটিকে খুঁজছিলেন। শেষমেশ কেসটিকে অমীমাংসিত হিসেবেই ফেলে রাখতে হয় তাকে। এতদিন পরে কালপ্রিটের হদিস পেলেন তিনি। কিন্তু তাও মৃত! এর পেছনে কার হাত থাকতে পারে? এসব নিয়ে অবশ্য তিনি বেশি ভাবতে চান না। যত দ্রুত সম্ভব কেসটিকে চাপা দিয়ে দিতে চান। তবে, খুনী সম্পর্কে তার অনুমান- আমার পালক বাবা-মা, মায়ের সেই সেবাদানকারী লোকেরা, কিংবা আমার স্বামী আবির করে থাকবে কাজটা। শেষে রহস্য করে বললেন, এমনকি এই কাজে তিনি নিজেও জড়িত থাকতে পারেন!

তার কথা শুনে আমি মুখে কিছু না বলে শুধু মুচকি করে একটু হাসলাম। ছোট্ট মেয়েটি তখন আমার কোলেই ঘুমিয়ে ছিল। ওর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললাম- বাবু সোনা, একটু বড়ো হও। তোমাকে এক অদ্ভুত গল্প শোনাবো আমি। খুবই অদ্ভুত। কিছুটা পাগলাটেও বই কি! অন্যদের কাছে যা রহস্য, তুমি জানবে তার আসলটা।