রাধার জবানবন্দি


হাসান হাফিজের কবিতাগুচ্ছ

 

রাধার জবানবন্দি

 

চিরশত্রু কানু তুমি

তোমার মতন চোরা ত্রিভুবনে নাই

দাগা দাও ফিরে আসো

চলতে থাকে অম্লতা মধুতা

                     নিরন্তর আসক্তি ও

                            অন্ধ আশনাই।

কুলমান লজ্জাভয়

কীভাবে যে করি জয়

     অন্য কারও জানা নাই সে তেতো বয়ান

নিয়ত মরণ চাই

বিচ্ছেদে পোড়ানো ছাই

              দাও মুক্তি অন্তিম শয়ান।

যা-ই পাবো স্বর্গ ভেবে

উজাড় উপুড় দেবো

                    কানু হে নাগর,

জন্মেছি তোমারই জন্য

সৃষ্টিছাড়া আর বন্য

আরাধ্য একক তুমি

দ্যাখো রাধা উন্মাদিনী

                     কামার্ত ডাগর।

 

দূরত্বই জয়ী হয়

 

কেউ কাউকে গ্রহণের ঝুঁকি নেয় না

                                দূরত্বের বর্ম গায়ে এঁটে

                                দূর থেকে মজা দেখে

কুপ্রবৃত্তি এতে হয়তো চরিতার্থ হয়

                                একজনের বিপদে অপরে

                                পাশে এসে দাঁড়ানোর

                                তাগিদ করে না বোধ

ভাবে এতে ছোট ও নিন্দিত হতে হবে

                                মানবসভ্যতা থেকে

                                সাহসের ইতিহাস

                                ত্যাগের অহং

                                মিলে মিশে থাকার মহত্ত্ব

উবে গেছে জন্মশোধ অধরা সে দূরের সাকিনে…

                                সৃজনের দায়বোধ

                                এক কালে মানুষেরও ছিল

                                কিন্তু দ্রুত অবলুপ্ত

                                নিঃশেষ হয়েছে…

 

থাকো দৃঢ় অপেক্ষায়

 

বিহ্বলতা ভুল করে

পাশে এসে বসে

অগোছালো চুল, আনত চিবুক

গ্রীবাদেশে স্পর্শের আকুতি

বিহ্বলতা, কেন তুমি

এত এত পিপাসার্ত, একা?

একজন্ম আছো অপেক্ষায়

কবে মিলবে দয়িতের দেখা?

এই প্রশ্ন নিজেকেই কোরো

হাওয়ামেঘ মৃদু কিংবা ঝোড়ো

ছোঁবে তোমাকেই, নিঃস্বতাও দেবে

পাওনাগন্ডা ঠিকঠাক জেনে বুঝে নেবে

জাগতিক এমনই নিয়ম

থাকো অপেক্ষায়, ধরে রাখো দম

 

প্রতিটিই এক পঙ্ক্তি

 

০১.

জীয়ন্তে হয়েছি মড়া, পুনর্বার প্রাণরস শক্তিমত্তা দাও

০২.

‘পিপাসা’ শব্দের মধ্যে লুক্কায়িত জলেরই মূর্ছনা

০৩.

বিরহ-মিলনে কোনো দ্বন্দ্ব নেই, আত্মীয়তা আছে

০৪.

ভালোবাসলে মূর্ত পাপ, অমূর্ত কি বেদনা-বিচ্ছেদ?

০৫.

সৃষ্টির আনন্দযজ্ঞে মৃত্যুভয়ই নিশ্চিন্ত লুকোনো

০৬.

ভরাগাঙ-মরাগাঙ প্রভেদ বুঝতে ব্যয় একটি জীবন

০৭.

মৃগনাভি, তোমার আহত ক্ষতে আমিই তো শুদ্ধতা মলম

০৮.

আবেগ বহতা নদী, কলসি কাঁখে ডুবে মরবে, এসো…

০৯.

যাওয়ার জন্যেই যদি এসেছিলে, কেন তবে এত পিছুটান

১০.

কাঁটাগুল্ম শুধুই যন্ত্রণা নয়, কিছুমিছু প্রশান্তিও দেয়

১১.

আঁধারিয়া আবদ্ধ গোলকধাঁধা, তাহলে কি তুমিই জীবন?

১২.

যতোই দূরত্ব থাক, আমি জানি এই বুকে নৈকট্যেই আছো

১৩.

সংশয়ের দুলুনিতে জেরবার, গোপন কথাটি বলা সেজন্য হলো না

১৪.

দ্বন্দ্বের ভিতরে ছন্দ খুঁজতে যেয়ে, কিছুতেই অন্ধতা এনো না

১৫.

আলো ভেবে আলেয়ার পিছু পিছু, পথভ্রান্তি একেই তো বলে

১৬.

অশ্রু যদি ফুল হতো, মালা গেঁথে উপহার তোমাকে দিতাম

১৭.

হাওর শুকিয়ে যায়, অন্তস্তলে ফল্গুধারা সুষুপ্ত কাঙাল

১৮.

মিলন তো এক প্রকার প্রলোভন, তুলনায় বিচ্ছেদই মহান

১৯.

সন্তরণ জানা নাই গো, সুতরাং ভরা নদী পেরোবো কীভাবে?

২০.

মেহেদি-রক্তিম হাত, আলগোছে এসে গেল উড়ন্ত আদর

 

 

ছেঁড়া টুকরো পঙ্ক্তিফুল

 

এক.

উৎসবের দিনে একা

নিঃসঙ্গতা বুনে বুনে

উদাসীন পাথর হয়েছি

 

দুই.

রইল জোনাকি মাঠ

শ্যাওলাধরা ইটের দেয়াল

খেয়াঘাট কোষা নাও

নিঃসীম প্রান্তর ধু ধু জোছনারাত

মৃত্যু এসে দাঁড়িয়েছে বিহ্বল চৌকাঠে

 

তিন.

কাঙালিয়া বিষণ্ন প্রহর

কাটে না দিবস রাত আত্মমুখী একা

অভিমানে দয়িতার দূরত্ব রচনা

ফণা তোলে যুক্তিহীন ক্রোধ

ঘনমেঘে বিষাদিত উড়াল আকাশ

সুস্থিতি কি কোনোদিন উদিত হবে না?

 

চার.

শব্দ তুমি অমৃতখনিজ

আহরণ করতে যেয়ে তুলে আনি

তাল তাল নৈঃশব্দ্যের অশরীরী ফেনা

এইভাবে বেড়ে যায় অনিচ্ছুক দেনা

এভাবেই হয়ে ওঠা ধূসর পরিখা

অতটা গভীরও নয়

যার মধ্যে নিমজ্জন কিছুটা সম্ভব!

 

পাঁচ.

হতে পারতে খরায় নিঝুম বৃষ্টি

পিপাসার নিবৃত্তি সুন্দর

পরিবর্তে হলে ছেঁড়া টুকরোমেঘ

নিরুদ্দেশে একা একা ছুটে যাচ্ছো

পিছুটান সদর্পে এড়িয়ে

নিদান কোথায় কিসে তালাশ করোনি!

 

ছয়.

কন্টকে ফোটায় ফুল

নৈরাশ্য আঁধারে আলোকণা

স্বচ্ছতোয়া ঝিরির সুপেয় জল

চৈত্রমেঘে উড়াল বৃষ্টির ঢেউ

নন্দিনীর খোলাচুলে লুকোনো মরণ

স্মৃতিসত্তা অহঙ্কার ও বিসর্জন

কার, কার? বলো দেখি কার?

ভালোবাসা, শুধুমাত্র একান্ত তোমার

জন্মসূত্রে পাওয়া সেই স্নিগ্ধ অধিকার।

 

জলছবি/মেজবাহ মুকুল