কোনো কোনো কবিতা


গুচ্ছ কবিতা

কোনো কোনো কবিতা

কোনো কোনো কবিতায় অন্তর অবয়বে রক্ত ঝরায় অবিরাম
কোনো কোনো কবিতা হৃদয়ের তন্রীতে সুর বাজে আয়াত আলী খাঁন

কোনো কোনো কবিতা তখতে তাউস যেন তাসের ঘরের মতো উড়ে যায়
ক্ষমতার মদমত্তে অহংকারের পাহাড় যেন রোজ ধ্বসে হায়!

কোনো কোনো কবিতা শান্তির বার্তা হয়ে রোজ বাঁধে জনে জনে ঘর
দ্রোহের আগুন জ্বালায় প্রতিবাদে, প্রতিরোধ এ জীবন ভর।

কোনো কোনো কবিতা শুধু মধুময় কৃষকের ধান কাটা সুখ
তুমুল কোলাহল, শান্তির সুবাতাস আউশের মুখ!

কোনো কোনো কবিতা শুধু জীবনানন্দ, সুনীলের নীল
গ্রীষ্মের বৃষ্টি হয়ে হৃদয়ের বাঁশি বাজে সূর অনাবিল।

শোকের প্রবাহ থাকে, জীবন আনন্দ বেগবান
সুচারু, পরিচ্ছন্ন, অর্থপূর্ণ, নিঃসীম কবিতা ধাবমান।

কোনো কোনো কবিতা যেন কবরে খচিত এপিটাফ
বেদনার স্মৃতি হয়ে প্রশমিত করে মনোতাপ।

কোনো কোনো কবিতায় বিলাপ, ক্রন্দন, থাকে হাহাকার,
প্রেমিকের গন্ধথাকে, ছাতিম সুবাস মাখা অনুভব তার।

কোনো কোনো কবিতা শুধু ফুল পাখি ছাড়িয়ে চিরকাল
দেশ, কাল, জাতি এক কবিতাফুল হয়ে ফোটে মহাকাল।

 

শিরোনামহীন

তুমি আমার হার্টবিট বোঝো কিভাবে?
কখন সে দু’সেকেন্ড পজ দেয়-
কখন সে দু’ সেকেন্ড লাফিয়ে চলে-
কখন বা স্বাভাবিক চলাচল গতি থাকে তার!
যেমন করে আমি বুঝি তোমার কন্ঠের উষ্মা
প্রেম, অস্থিরতা, রাগ-অভিমান কিংবা মাদকতা?

জানি যেমন করে চাঁদ বোঝে তার অমাবস্যার কাল
সূর্য বোঝে তার সূর্য গ্রহণ
মেঘ বোঝে তার বৃষ্টির আভাস
জীবন বোঝে তার হাসি, আনন্দ, কান্না, গল্প
এবং বেদনার গান!
তাহলে আমরা কী এখন
পৃথিবী আর সূর্যের মতো
অনিবার্য হয়ে গেলাম?

পাহাড় জানে না তার পাথর কুঁচির সঠিক হিসাব-
সমুদ্রের জানা নাই স্রোতের ধারণা-
আকাশ বোঝে না তার অনন্ত ঠিকানা!
আসলে আমরাও কখন যেন
পাহাড়, সমুদ্র আর আকাশ হয়ে যাই।
বুঝতে পারি না তাই কাহাকেও কেউ …

 

অতঃপর একদিন যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি

তখন নীরব, নিঃশব্দে, শুনশান নীরবতায়
গভীর অপেক্ষায় কাঁপছিলো মাঠ, সবুজ লন
পুকুরের জল, অফিসরুমের যত কার্যক্রম।

অতঃপর ধীরগতিতে একটুকরো বাংলাদেশ
এসে থেমে গেলো প্রথম ফটকে।
তারপর থিরথির করে জেগে উঠলো প্রান্তর
মানুষের মন, ইনস্টিটিউটের প্রথম ইতিহাস
জেগে উঠলো সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উত্তাল।
ছুটোছুটি, লুটোপুটি, হরিতকি বৃক্ষের উচ্ছ্বাস
প্রায় দুইশত বছরের নিরিবিলি ঘুমিয়ে থাকা
বইয়ের পৃষ্ঠা ধীরে ধীরে চোখ মেললো।
জেগে উঠলো নতুন কাঁপনে।
কার পদধূলি পড়লো গভীর আশ্বাসে
কার পদধ্বনি শুনি আহ্লাদে, আনন্দে!

কত গুঞ্জন কত কলহাস্য
কত কথা, কত ইতিহাস
কত নতুনের উল্লাস
তরঙ্গধ্বনির মতো কেঁপে ওঠে কিছুটা সময়।

ক্যামেরার কত ক্লিক, কত অচঞ্চল
পোজ দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা
কত ছবি, কত হাসি, আন্তরিক করমর্দন
কত মানুষের কত কলরব।
ঠা ঠা গরমে শীতল নরম ঠাণ্ডা
স্বচ্ছ কাঁচের গ্লাসে ডাবের পানি!

আসলে জীবন তো এমনি
রেললাইন, রেলস্টেশন, রেলগাড়ির মতো।
দিনরাত শুনশান নীরবতা, তারপর
মানুষের পদভারে প্রকম্পিত ধ্বনি
বাতাসের তীব্র ঝাপটায়, দূরে বহুদূরে মিশে যাওয়া।

অতঃপর আবারও নতুন দিনের আগমনধ্বনির
শত অপেক্ষায় চুপচাপ নিজেদের গুটিয়ে নেয়া
নীরবে, নিভৃতে ঘুমিয়ে যাওয়া।
আহা! জীবন এত মধুর কেনে?

 

কবিতা বলতে বুঝি

কবিতা বলতে বুঝি-
সরল-সাবলীল চাওয়া-না পাওয়ার ছবি
প্রেম-আনন্দ, দুঃখ-দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছবি;
কেউ আবার কবিতা বলতে বুঝি ছন্দ
কবিতার নামে হেলে- দুলে, এঁকেবেঁকে
ছন্দহীন অন্তমিল লেখেন অবিরাম নিরানন্দ।

কবিতা বলতে বুঝি-
টাইম ট্রাভল মেশিনের আদি উৎপত্তি
এক কোষী অ্যামিবা ও জীবন সৃষ্টি
বির্বতন- বিভাজন- অভিযোজনের আজ
ত্র্যালুমিনিয়াম, স্টিম, সভ্যতার বুৎপত্তি,
জেনেটিক মানচিত্রের যথাযথ কোডিং কৃষ্টি।

কবিতা বলতে বুঝি-
জীবনের ভূগোলপাঠ আত্মস্থময়
পৃথিবীর ধুলো- বালি আর্টিফ্যাক্ট ধেয়ে
নীরব নিপাট সরল চিত্র এক
কেউ আবার কবিতা বলতে বোঝেন
নিউরন, প্রোটন, জটিল মিল্কিওয়ে।

কবিতা বলতে বুঝি-
সৃষ্টির অতীত- বর্তমান- ভবিষ্যতের আগাম ভাষ্য
উপলব্ধির অনুরণন, নৈসর্গিক সৌন্দর্য,
ঝরে যাওয়া ফুলগুলোর তাবৎ পাপড়ি;
মরা ফুলের শূন্য-বেলায় ফের
অনাদি জীবনের অনাবিল পথের অক্লান্ত জের।

 

গন্তব্য

আমরা আসলে এ পৃথিবীতে বেড়াতে এসেছি
আমরা প্রত্যেকেই একটি চলন্ত ট্রেনে চেপে বসেছি, কিন্তু গন্তব্য জানি না, কেউ কারো।

ট্রেন চলতে চলতেই আমরা
কোনো কোনো স্টেশনে কিছুটা সময় কাটাচ্ছি, থামছি, নামছি, চা, কফি, বারবিকিউ খাচ্ছি।

আনন্দ পাচ্ছি, কখনো বা
আকাঙ্ক্ষায় আহত হয়ে বেদনায় কাতর হচ্ছি। তারপর আবারও নির্ধারিত ট্রেনের সিটে যেয়ে বসছি।

আমাদের জানালা থেকে দৌঁড়ে দূরে সরে যাচ্ছে আমাদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, ফসলের মাঠ,
চলমান বৃক্ষ, সবুজ পাহাড়, গভীর সমুদ্র।

আমরা কখনো ভাবছি, কখনো দেখছি।
আবার কখনো ভাবছি না, দেখেও দেখছি না।
কিন্তু আমাদের ট্রেন চলছে। অনবরত গতি পাল্টাচ্ছে।
ছুটে যাচ্ছে অনন্তের দিকে।
আমরা সেখানে এই আছি, এই নাই।
এক মুহূর্ত আগেও আমরা জানতে পারবো না
আমাদের গন্তব্য কোথায়?
কে কোথায়, কখন নেমে যাবো নির্বিঘ্নে?
আবার সে ফাঁকা সীটে সযতনে অনা

 

সম্ভাবনার মানুষ

নির্জন নক্ষত্রে সুদীর্ঘ দ্রাঘ্রিমায় অতিক্রান্ত পথ
সুরমা কীর্তনখোলা মধুমতি ভৈরব পদ্মার পাড়
হাজার বছর ইতিহাসে টিকে আছি অনুপম দ্বৈরথ
সময়ের যাত্রাপথে মঙ্গোলীয় দ্রাবিড় আর্য অনার্য রাঢ়

ফিরিঙ্গি ইংরেজ পতুর্গীজ ফরাসি নাবিক
শুষে নিলে বাংলার সীমাহীন সময়ের শ্বাস
মাথা উঁচু দাঁড়িয়েছি শঙ্কাহীন প্রচণ্ড দ্রাবিক
হলদিঘাট পানিপথ বকসার পলাশীর ক্রাশ …

খেলাফত অসহযোগ কংগ্রেসী মুসলিম লীগ
অবশেষে সাতচল্লিশ সাগর পাহাড় উর্বর জমিন
আমাদের একাত্তর পেয়ে যাই ঠিকানার দিগ্…
দুর্বার দুরন্ত তটিনীর ঢেউ গায়ে মেখে লীন।

বায়ান্ন, ঊনসত্তর, একাত্তর সবশেষে নয়’এর পিলখানা
অগ্নি, রক্ত, মৃত্যু, লাশ সীমাহীন অবিশ্বাসের ঘোর
নতজানু হই নি তো কখনোই দৃঢ় বিশ্বাসে দেইনি তো হানা
হেঁটে যাচ্ছি তবু হেঁটে যাচ্ছি সময়ের ফেসিয়াল মেখে জোর।

 

সামীপ্য সুধা

হেমন্তের ম্লান নক্ষত্রের মতো শীঘ্রই ঝরে পড়বে সবাই।
কত মানুষের কত গুঞ্জন
কর্মব্যস্ততার কত আলোড়ন
সন্ধ্যার অন্ধকারের মতো স্তিমিত হয়ে যাবে সব।

ওয়ার্ডসওয়ার্থ, মিল্টন,
ব্রিকলেনের মনিকা আলী, ম্যাক্সিম’র- মা
থাকলেও কি, না থাকলেও বা
নির্ভেজাল দিনের পৃথিবী
সোনায় মোড়ানো রাত, সামারার বৈভব
ঝিরিঝিরি ঝরনার গান
ছলাৎ ছলাৎ তান
বাজে শোনে-খুলে দাও কান!

তবু আকাঙ্ক্ষায় থাকি, আশা বাঁধি রোজ
শুধু জীবিত নয়, যেন জীবন্ত থাকতে পারি
তোমার সামীপ্য সুধা লাভ করতে পারি আজীবন…

জলছবি/মেজবাহ মুকুল