এই শীত-রাত আমাকে উষ্ণতা দেবে না


 

জীবন

এই শীত-রাত আমাকে উষ্ণতা দেবে না, জানি
ক্ষয়িষ্ণু চাঁদও দেবে না আলো
দূর নক্ষত্রেরাও সখ্য গড়ে তুলবে না আমার সাথে;
সেই দূর শৈশবে নড়বড়ে সাঁকোর ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে
কেউ যেন বলেছিল, এটাই জীবনে চলার পথ—
তারপর কত লক্ষ চাঁদের আলো ঝরে পড়েছে পৃথিবীতে
কত অযুত নক্ষত্র আকাশকে সজ্জিত করে রেখেছে
শুধু শৈশবের নড়বড়ে সাঁকোটি নির্বিকার দাঁড়িয়ে থেকেছে
আমাকে নিয়ে,
স্হির জলে কোনো কম্পন ছিল না,
বাতাসেও কোনো অস্থিরতা ছিল না,
সময়ের জল গড়িয়ে গড়িয়ে
একটি বর্তমান তৈরি করেছে,
তবু আমি বর্তমানে নেই,
জীবনের পথে হাঁটবো বলে
নড়বড়ে সাঁকোর ওপর দাঁড়িয়ে আছি অতীত হয়ে।

 

আকাশন্যা

খণ্ড খণ্ড কালো কাজলগুলো গলে গলে ঝরে পড়ছে
আকাশ কাঁদছে বলে—
সারি সরি বৃক্ষ অণ্জলি পেতে দাঁড়িয়ে আছে
সে অর্ঘ্য নেবার জন্য,
বৃক্ষের পাতায় পাতায় নিবিড় আকুলতা
শাখারা ধূসর ইশারায় জ্বালাতে চায় আলো,
তবু আরণ্যক অন্ধকার ওত পেতে থাকে;
ব্যথার মর্ম বোঝে না বালিকারা
অশ্রুর জলক্রীড়ায় উল্লাসে মেতে ওঠে
ওরা তো তোমারই মতো—
তুমি কেন ভুলে গেলে জীবনের ধারাপাত
পুতুলের সংসার ভেঙে
তুমি আকাশ হতে চেয়েছিলে মেয়ে।

 

আলপনা

অন্ধ বিকেল তোমাকে পায় না
আমি পাই—
দেখি নিস্তব্ধতার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছো অস্পষ্ট তুমি
রং-তুলি হাতে গোধূলির আকাশে আলপনা আঁকার প্রতীক্ষায়,
নিবিড় অবলোকনে যতটুকু তোমাকে দেখি
তার চেয়ে বেশি দেখি কল্পনায়,
অথচ শব্দের রুমালে ফোটাতে পারি না সেই কারুকাজ;
মৃত্তিক স্পর্শ করে না তোমার শরীর—
দূর গোধূলির আকাশে তুমি নিজেই আলপনা হয়ে যাও,
নদীও পায় না তোমাকে—
অথচ জলের আরশিতে প্রতিবিম্বিত তুমিময় গোধূলির আকাশ।

 

একটি শব্দ

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখি
একটি শব্দ পেন্ডুলামের মতো দুলছে—
অথচ শব্দটিকে আমি সারাদিন খুঁজে পাইনি,
সারা বিকেল প্রতীক্ষায় ছিলাম শব্দটির,
সন্ধ্যার মায়াবী হাওয়ায় শব্দটির প্রতিধ্বনি  শুনতে চেয়েছিলাম;
শব্দটি অধরাই থেকে গেছে—
অথচ এখন গভীর অন্ধকারে শব্দটি জ্বলজ্বল করছে,
ইচ্ছে করলেই আমি তাকে স্পর্শ করতে পারি,
ইচ্ছে করলেই শব্দটিকে এনে বসিয়ে দিতে পারি
আমার অসমাপ্ত কবিতায়,
অথবা অনুভবের কারাগারে বন্দি করতে পারি;
অথচ এসবের কিছুই হবে না—
শব্দটির স্বাধীনতা হরণ করতে চাই না আমি,
শব্দটি কোনো কয়েদি নয় যে
তাকে কারাগারে যেতে হবে !
বরং শব্দটি তার মুক্ত জীবন নিয়ে
দুলতে দুলতে চলে যাক অন্য কোনো গন্তব্যে।

 

চিলেকোঠায় এক সন্ধ্যা

নাগরিক কোলাহল থেকে দূরে
এই চিলেকোঠাটিকে নির্জন দ্বীপের মতো মনে হয়,
সন্ধ্যা এখনও অনাগত—
গোধূলির গোলাপি গণ্ডের আভাকে
প্রতীক্ষার রং বলে মনে হয়,
বাতাসের কামার্ত আলিঙ্গন
আমার গুচ্ছ গুচ্ছ চুল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে যেন—
সেই চুল সামলাতে সামলাতে প্রতীক্ষ করি,
ভেতরে জ্বলতে থাকা উত্তেজনার আগুন নিয়ে প্রতীক্ষ করি,
বাইরে কপালের ভাঁজে সংশয়ের চিহ্ন নিয়ে প্রতীক্ষ করি;
গোধূলি স্বল্পায়ু বলে
অচিরেই সন্ধ্যা সমাগত—
বাইরে চারদিকে কৃত্রিম আলো জ্বলে উঠলে
প্রতীক্ষার রং ফ্যাকাশে হয়ে যায়;
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কারো পদশব্দ শুনতে না পেয়ে
চিলেকোঠা থেকে নেমে আসি—
না, কথা দিয়ে কথা রাখেনি সে।