নিশিথের বাঁশি


মুজতাহিদ ফারুকীর পাঁচটি কবিতা

নিশিথের বাঁশি

যত নদী মরু পথে ঘুরে ঘুরে তরঙ্গ তুলেছে
যত পাখি ডালে বসে গান গেয়ে নীড়ে ফিরে গেছে
তাদের গানের কলি কিছু কিছু আজও মনে আছে
মরমের তারে তারা মরমিয়া পূরবী গেয়েছে।

যারা সরে গেছে দূরে ডানা ঝেড়ে ঘন সন্ধ্যা পাড়ে
তারা মুছে নিয়ে গেছে রাশি রাশি অকারণ হাসি
রঙিন পালক ফেলে গেছে মৌন ঘাটের কিনারে
ভালবাসি বিনির্জন সে গহীন নিশিথের বাঁশি।

 

তারাদের ধ্যানের ডিসকোতে

তাপদগ্ধ আত্মার কালো ঘাম ছেনে
ঔষধি সুগন্ধির লঘু গাঢ় যেটুকু নির্যাস
ফাঁটা ফোঁটা জমিয়েছি স্ফটিক বউলে
কোনও দিন যদি তার ক্ষীণ অবশেষ
কালক্রমে ঘ্রাণে ভেসে আসে-
যদি কোনও বন্ধুহীন বিষণ্ন সন্ধ্যায়
নিরিবিলি বারান্দার ঠান্ডা রেলিয়ে
নিঃসঙ্গ চায়ের উষ্ণ ধোঁয়ার আমেজে
অকস্মাৎ ডেকে ওঠে চনমনে ছোট্ট দোয়েল
তবে সেই ক্ষীণ ঘ্রাণ আর তুচ্ছ শিসের সঙ্গত
বিনম্র পাঁজরের মুগ্ধ তারে বেঁধে
বর্ষে দিও সে রাতের অগণিত তারার উদ্দশে

নির্ঘুম তারাদের ধ্যানের ডিসকোতে
ঘুরে ঘুরে আমিও নাচবো।

 

পকেটে জোনাকি পুষি

প্যাচপেচে পান্তার মত সকাল শুরু হলে
একদলা নুন, গোটাল পিঁয়াজ ছিলে নিই
সঙ্গে অনভ্যস্ত তবু, কচকচ চিবিয়ে ফেলি
গোটা দুই লম্বা চিকন কাঁচা বাঘা চাটমোহর
উহু, আহা, কী ঝাল, কী ঝাল! কান লাল
গাল বেয়ে বেশরম লোল ঝরে পড়ে!
চনমনে রোদ ওঠে নিত্যদিন জীর্ণ কুঁড়ে ঘরে।

তখন বড়ো ঝাঁঝ ছিল দিশি পিঁয়াজে
দাদির মেজাজেও
শুধু আম্মা একা, যাঁতি পেষা হাতের জাদুতে
কোত্থেকে কে জানে, সুকান্তের পূর্ণিমার
শুকনা রুটি পেড়ে
আমাদের পাতে পাতে বিছিয়ে দিতেন।
চাঁদ কিংবা জোছনার সাথে
সেই আমাদের প্রথমবার আশ্চর্য মোলাকাত!

সেই থেকে বুক পকেটে কাচপোকা, জুনি পুষছি
একটু একা হলে, বুড়ো শিমুলের মাথা থেকে
খাবলা খাবলা ছিঁড়ে ওদের জ্যোৎস্না খেতে দিই।

 

পাখি পুরান-১

রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি, থেকে গেছে অন্ধ মায়াবন
অচেনা ঘাসের বনে কী যেন কীসের শিহরণে
কে যেন বিরতিহীন গায়, কে দূরে বাজায় ভীরু বাঁশি
কোনও কি বেদনা তড়পায়!
ওই খাঁ খাঁ শূন্যের কোনও দীর্ণ তারে
ঝরে নাকি বিষাদের কোন নির্ঝর!
সে ব্যথার যাতনা বুঝিনি, শুধু দেখি, কী যেন কারণে
একা পাখি চিহ্নহীন আকাশের চোখে ঝাঁপ দেয়
পথের নিশানা চেনে দিবাশেষে তারার কম্পাসে

গড়ুর, ফিনিক্স, আবাবিল, নাম জানা, অজানা পাখিরা
ডানা মেলে মেঘেদের হাঁটা পথ চিনে
পাখিদের ডানার শাপট শেষ হলে
আকাশ ধরবে বলে সাড়ে তিন হাত দীর্ঘ মাটির পিঁজরে
শিস মারে মরমীয়া পরান পাখিটি
তাই লিখি নীল পটে অপরূপ সেই ক্লান্ত পাখির পুরান।

পাখি পুরান-২

যখন আলো ছিল না, সময় ছিল না, নিরালম্ব অন্ধকারে
সবটুকু অস্তিত্বহীনতা ঘিরে ঝুলছিল আদিম নাস্তি
তখন পাখির রূপে জন্ম নেন মহাশক্তিমান।
স্বয়ম্ভূত সে পাখির সুতীব্র ওঙ্কারে, চৌচির অন্ধ আকাশ
শূন্যের জরায়ু ফুঁড়ে অকস্মাৎ উদ্ভাসিত জগৎসমূহ
বুঝে নিই, আলোর অভাব ছিল জগতের প্রথম দারিদ্র্য।
একটি পাখির শিসে আলো হলো, কালের চাকা গড়ালো
দিকে দিকে ছড়ালো কল্পনার ডালপালা
সেইসাথে কুয়াশার অন্তহীন কুহেলি।

দিনে দিনে শষ্পে পর্ণে ভরে ওঠে বিরান পৃথিবী
নরম সাতটি সুর পুষ্পগন্ধে বেজে ওঠে দোয়েলের ঠোঁটে
দুরন্ত জলের ধারা শিখে নেয় আনন্দের গান
দুলে ওঠা ঘাসের হৃদয়ে ফোটে কমল সুগন্ধ।
ডানার পালক জলে ফেলে
সূর্য-করপুটে বসে রোদ মাখে বসন্তের পাখি
নাকি বিশ্বকর্মা নিজে, চোখ রেখে জ্বলন্ত আগুনে
উড়ে যায় চেতনার ধূসর কিনারে।