বিশ্বস্ত চাবিছড়ায় মরিচা


 

গুচ্ছ কবিতা : ফারুক সুমন

 প্রতীতির প্রজাপতি

বিশ্বস্ত চাবিছড়ায় মরিচা পড়ায়
খোলে না সেই মৃতকুঠুরী
মাছিগুলো মৃত ভেবে
চেটেপুটে খায়, জীবন্ত আমায়
অথচ আমি মরিনি।

মরেছি এই ভেবে
উল্লাস করে ঘুরে ঘুরে
আমার বিশ্বস্ত সব কুকুর কুকুরী।

অবচেতনে চেয়ে দেখি
পরিকীর্ণ পরিবেশে পরিত্যক্ত পড়ে আছি
প্রতীতির প্রজাপতি পাখা ভেঙে
পড়ে গেছে জলে।

ভালোবাসা বলি দিয়ে হাত দেয় অনলে
মুখ দেয় গরলে।

 

কবিদের অভিমান

প্রতীক্ষায় রেখে
যে তুমি চলে যাও বাহানার মোড়ে
কবিও কম নয়; মুখ ফিরিয়ে চুরুট ধরায় বৈশাখী ঝড়ে।

কবিদের অভিমান রক্তলাল কোকিলের চোখ;
কেন তাকে দিতে চাও গোপন পীড়ন? অরাজক অনুভূতির বিদীর্ণ বুক!
ঘৃণা নয়; তাকে দাও অকৃত্রিম দরদ ভালোবাসায় গলে যাক ঘৃণার পারদ।

  

তালি দেয়া পালে বিমূর্ত মিনার

তরণী ভাসছে
তালি দেয়া পালে
ধীরলয়ে জেগে ওঠে বিমূর্ত মিনার চৈতন্যগ্রন্থি ছিঁড়ে
ছিটকে পড়ে অজস্র অবাক ফুল
হায়, কীভাবে তদবির চলে
জলে তেলে মিশে গিয়ে।

রিফিউজি লতাগুলো অতি আদরে গড়ায়-জড়ায় দেহ-তরুর পথে পথে
ঘুমন্ত শিশুও হাসে ঘুমের আবেশে
কি তার মর্মার্থ ব্যাখ্যা-অনুমান?
ফেরেশতার হাসি অভিধায়
কেউ কেউ অর্থ খোঁজে।

অচঞ্চল জলের ভিতর নিরাকার বসে
প্রভু তুমি দেখে যাও একা ভালোবেসে।

 

আয়নাময় উত্তরীয়

 আয়নাময় উত্তরীয় ছিল তোমার গায়ে বিম্বিত আলো ঠিকরে পড়তো অলক্ষে
অথচ দৃষ্টিহীন দূরত্বে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারিনি
আমি পলাতক মৌমাছি
উবু হয়ে পড়েছিলাম অন্য অলিন্দে
কৃত্রিম টবে।

তোমার প্রস্থানের বহুদিন পর
ঈষদুষ্ণ হৃৎপিণ্ড কেঁপে ওঠে
যেন প্রবল ঝড়ের রাতে নিভু নিভু বাতি হয়ে আমার আরতি এই বলে
এখানে আসো যদি ফিরে
তোমার কবিপ্রাণ ভরে দেবো
হাজার ফুল আর পাখিবৎ শিশুদের কলরোলে।

তুমি নেই বলে
এখন এখানে ধাতব সন্ধ্যা নামে
রোবটিক বাতাসে ভারী হয় বুক
উৎকণ্ঠিত প্রতিটি মুখে শুধু
দুঃস্বপ্নের কানামাছি ওড়াউড়ি করে।
হতাশা নিয়ে ফিরে যায় সবে
‘ঘরহীন কোনো ঘরে’।

এখন এখানে নেই সরব উন্মোচন
নীব বৃক্ষ হয়ে চেয়ে থাকে প্রকাশের মন
অথচ, ভাষার বধিরতা বড় ভয়ানক
কে জানে, আর কোনো দিন
ফিরবে কি তুমি আচানক?

 

 কোন বিষ বুকে নিয়ে

কোন বিষ বুকে নিয়ে
দিন-রাত তুমি কাতরাও?
অপরিচ্ছন্ন বসনে কেবলই সাঁতরাও
তোমার নখে এতো ময়লা কেন?
অথচ অপসৃয়মান চোখে জল নেই
মৃত মানুষের নিঃসাড়তা
কফিনে মোড়া নিথরতা
ক্রমশ গ্রাস করছে
যেন সাপের খোলসের ভেতর;
বিষভারে তুমি নড়ে ওঠো।

খোলসের ভেতর কত শতাব্দী ধরে তুমি কাঁদছো?
কতশত রক্তস্রোত তরঙ্গ তুলে ভেঙেছে তোমার তীর
অনির্ণীত কত রাতে তৃষ্ণার্ত বাঘিনী তুমি; মরুভূমি বুক নিয়ে মুখ দিয়েছো শূন্য কলসিতে।

তবুও-
স্বগতোক্তির করুণায় তুমি আজও আছ মেরিওলস্টোনক্রাফট তুমি আজও বাঁচ। 

 

বিদায়ের দিনে

দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে
প্রিয়জনকে বিদায় বলা কঠিন
যেতে হয়, তবু চলে যেতে হয়
নিয়মের সূত্রগুলো বড়ই নির্মম।

তুমি যাচ্ছ, বেদনাহত রোরুদ্যমান
আঙুলে পেঁচিয়েছ শাড়ির আঁচল
গলায় পুষ্পশোভিত বিদায়ী মালা
হাতে উপহার, স্মৃতির এলবাম।

স্মৃতিবন উজাড় করে
বহুদূরে ভেসে যায় ট্রেনের হুইসেল
কোথাও পাখা ঝাপটায়
ব্যথাহত নীলকণ্ঠ পাখি।

জীর্ণ দেয়াল থেকে
যেভাবে খসে পড়ে পলেস্তারা
জলশূন্য হলে পরে
যেমন জলপাত্রে
লেগে থাকে নিঃসীম শূন্যতা।

পথিক শূন্য হলে পরে
যেমন খাঁ খাঁ করে
মধ্যাহ্নের দীর্ঘপথ
দেখ তোমার বিদায় বেলায়
তেমন অনুভবে ছেয়ে গেছে
এই আঙিনা
থেমে গেছে এই মনোরথ।

বহুদিন কাছে থেকে
এই যে রেখে গেছ
সুরভিত পুষ্পবিতান।

বহুদিন ভালোবেসে
হার্দিক করতলে
বাজিয়েছ বিজয়ের গান।

বহুদিন কলম হাতে
কথার ভাঁজে ভাঁজে
উড়িয়েছ জ্ঞানের নিশান।

জেনে রেখ-
এসব দৃশ্যে তুমি ছিলে, থাকবে
প্রীতি ও প্রতীতির নিবিড় নৈকট্যে
যেভাবে দাঁড়িয়ে আছে জগৎসংসার।

 

যাব না ধীর পায়ে

পায়ে পায়ে প্রপঞ্চদের বিস্তীর্ণ জালে জড়ানো জলজ আমি
টগর পাতায় চড়ার ব্যর্থ প্রয়াস
হাবুডুবু খেলি ঢেউয়ে ঢেউয়ে।

কখনো কই মাছ কাঁকড়া হয়ে
আমরণ অনশন সংগ্রামে
জলজ আমি বুকে ভর দিয়ে
চলি শ্বাপদসঙ্কুলে।

 

বিদায় বিগলিত কোনো বরফের দ্বীপ

এইখানে একদিন পা ফেলে
উড়িয়েছি কল্পমুড়ি, দেখেছি সুদূর আকাশ
অথচ নিঃশ্বাসে আজ
কুয়াশার ছায়াছবির চিত্রল বিন্যাস।

বিদায় বললেই হৃদয় জ্বলে-পুড়ে গলে গলে যায়।
বিদায়। বিগলিত কোনো বরফের দ্বীপ যেখানে মুক্তি নেই কারো
আছে কেবল দীর্ঘশ্বাস
বিষণ্ন মন নিয়ে হাতড়িয়ে ফেরা স্মৃতির ক্যানভাস।

প্রিয় স্বজন। কীভাবে বিদায় দিই তোমায়? বিদায় জানানোর কোনো ভাষা নেই
আছে কেবল মৌন হাহাকার।

চেয়ে দেখো-তোমার বিদায় বেলায়
নিঃসঙ্গ কবরের মতো
কি করুণ নীরবতা চারিদিকে।
উথাল পাথাল কান্নার রোল বারবার
দৃষ্টিকে অতিক্রম করে ভিতরে ভিতরে।

আমরা ব্যথায় স্তম্ভিত
যেনো কোনো নিশ্চুপ-নিঃসঙ্গ মিনার ভাষাহীন ব্যাকুলতা নিয়ে দণ্ডায়মান। তোমার বিদায় বেলায়-
আমাদের মনের অন্দরে ডানা ঝাপ্টায় নিরন্তর আহত কোনো পাখি।

এই তো জীবন-
অন্তগামী অর্কের মতোন
ডুবে গেলেই মনে পড়ে
কতটা ঝড়ে, কতটুকু উঠেছিল ধূলিঝড়?
কয়টি পালক, উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে
বহুদূরে পড়ে আছে নিথর নীরব?
উত্তর মিলে না, নিরুত্তর।

অন্ধ যেমন অন্ধকার অতিক্রমের চেষ্টায় কাটিয়ে দেয় সারাটি জীবন
আমরা মানুষ তেমনই অসহায়
ছোট ছোট বিদায়ের মধ্য দিয়ে
ধাবিত হই চূড়ান্ত বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে।

শুধু মনে এইটুকু সান্তনা জাগে
অবশেষে সবই করে যায়
সময়ের হলুদ হাওয়ায়
স্মৃতি তবু লিখে রাখে নাম
যেখানে আমিও ছিলাম।