গুচ্ছ কবিতা
সমর্পিত এই আমি
পৃথিবী এতো সুন্দর এতো দীপ্তময় তোমার মহিমায়
চাঁদ জোছনা, সূর্যালোক, বনবৃক্ষ, জোয়ার ভাটা,
নদ – নদী, সাগর, পাহাড় – পর্বত, রঙধনু , ঝর্ণায়
তোমার সুনিপুণ কারুকাজে শৃঙ্খলা দেখে মুগ্ধ আমি।
এই মায়াময় পৃথিবীতে তুমিই এনেছো আমাকে
তোমার ইচ্ছেতেই আমি নিরুদ্দেশ হব একদিন
এমন কোনো ঐশ্বর্য নেই আমার বসুন্ধরার কোথাও
যার গৌরবে বাড়াতে পারি একতিল ঝরাপাতার সৌরভ।
বিভ্রম পথে হাঁটা আমি এক আপনভোলা যাযাবর,
কারো সাধ্য নেই ক্ষণকাল আমাকে বাঁচায়
তুমি অনন্ত অপার, সমর্পিত আমি তোমার কাছেই
ক্ষমা কর প্রভু , আমাকে নিও না বিচারের এজলাসে।
আমার দুঃখগুলো
পাখি যখন সঙ্গী হারাবার দুঃখভারে নতজানু
বৃক্ষের ডালে বসে কাঁদে, হয়তো একাই কেঁদে প্রশান্ত ,
কেউ সান্ত্বনা দিয়ে উড়ে আসেনা সান্নিধ্যে
বেলাশেষে নীরব হয়ে যায়, ঘুমায় পাতার কুটিরে।
মানুষও বিচিত্র দুঃখভারে নুইয়ে পড়ে
একান্ত সেই দুঃখের কথা অন্য জানে না।
আপনজন হারাবার দুঃখ, প্রত্যাশিত বৃক্ষে ফুল না দুঃখ,
দু চোখ উপচে জল গড়ায়, কপোল ভিজে যায় অলখে।
আমি যখন অসামান্য দুঃখে হারাই পথচলার ছন্দ
কেউকে জানিয়ে ভারমুক্ত হব ভুলব অতীত
এমন একজন বন্ধুও ছুটে আসেনে হৃদয় সরোবরে
তখন কবিতারাই আমার একমাত্র নিঃস্বার্থ সঙ্গী।
চোখের জল শব্দে রূপান্তরিত করে কুড়াই বাঁচার স্বপ্ন
চোখ মেলে পুনর্বার নির্মাণ করি স্বপ্নের বীজতলা
কবিতাগুলো হয়ে যায় অন্যজনের মৌন আনন্দবিহার।
খেলাসমগ্র
দুশো বছর চলছিল ব্রিটিশদের মনোপলি খেলা
তারপর শুরু হল দ্বিজাতিতত্ত্বের আপোসরফার খেলা
পেলাম পূর্ব- পশ্চিম দু ভূখণ্ডের যৌথ খামার।
আবার শুরু হল বাইশ পরিবারের তাঁবেদারী খেলা
আমজনতার কোনো ভাগ্যের উন্নয়ন হলো না
মাতৃভাষা উজ্জ্বল্য বিনষ্টের খেলায় ঝরলো
পূর্ববাংলার রফিক শফিক সালাম বরকতের প্রাণ।
খেলা চলছে , স্বাধীকার খেলা
উনসত্তরের খেলায় উড়লল আসাদের মাথার খুলি,
অতঃপর জনতার পূর্ণ সমর্থনে আমরা পেলাম
ক্ষমতা পালাবদলের সুন্দর সকাল,
সকালের সূর্য প্রস্ফুটিত না হতেই আকাশে কালো মেঘ।
শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধে খেলা, ঝরল রক্তকরবী
হারালাম আপনজন!পেলাম সবুজে বেষ্টিত মানচিত্র।
দেখলাম, লালসবুজ পতাকায় স্বদেশী শকুনের থাবা
স্বজনপ্রীতির ধুলিঝড় খেলায় লণ্ডভণ্ড স্বাধীনতা ।
খেলা চলছেই জলের সঙ্গে পাথরের খেলা,
ফুলের সঙ্গে কীটপতঙ্গের খেলা
নব্য কাদের বাহিনীর সঙ্গে ছাত্রজনতা চূড়ান্ত খেলা
এ খেলায় পরাজিত লক্ষণসেনের সব উত্তরসূরী,
ঝাঁপ দিল নিঃশব্দ অমা অন্ধকারে।
প্রভু, আর কত খেলা দেখতে হবে আমাদের!
নদীর সবটুকু জল
পাথরের পাহাড়গুলো চাঁদের রূপে মুগ্ধ,
বুকে জল ধারণ করার সক্ষমতা নেই বলে
অনন্ত শূন্যে দিকে চোখ রাখে, হাসে অভ্যন্তরীণ সুখে ।
পাদদেশে যারা অভাবের হাত ধরে হাঁটে
ঝরায় আঁখিলোর, থাকে অরক্ষিত নিখিল অরণ্যে
পাহাড়গুলো তাদের দিকে একবারও ফেরায় না চোখ।
আমাদের এই জন্মভূমি সমভূমির দেশে
ছোটবড় অসংখ্য পাহাড়,
বড় পাহাড়গুলো দেশের তরল- রসের হাঁড়ি নিয়ে
পাড়ি জমায় কৃত্রিম নগরে, ডলার পাউন্ডে লেনদেন করে।
ছোটখাটো পাহাড়গুলো দাঁড়ায় কূট ভাবনায়
উপোস থাকা অধীনস্থদের বুকের ওপর,
বৈষম্যের সিঁড়ি বেয়ে পান করে নদীর সবটুকু জল,
আর আমি জাগতিক বাউল হয়ে শরীর ঢাকি বিবর্ণ চাদরে।
এবং মানুষ
অধিকতর মানুষ যারা
বুঝতে পারে অন্য মানুষের সুখদুখ আনন্দ বেদনা
তারা কখনও সত্য সুন্দর ছেড়ে অন্ধকারে ঝাঁপ দেয়না।
মেধা মননের উৎকর্ষ সাধনে উজাড় করে আপন বৈভব
তারা দিজ ভুলের বিচার নিজেই করে
আত্মসমর্পণ করেনাা মানুষের গড়া কৃত্রিম আদালতে।
পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে দেখতে পায় চূড়ামণির ঐশ্বর্য।
একটি অদৃশ্য পৃথিবীতে গড়ে তোলে নিজস্ব আবাসন
কখনও নিরেট গদ্যের গহীন অরণ্যে হারায় না,
বাড়ায় না দুচোখ কুয়াশার ভেতর।
পৃথিবীর রূপ লাবণ্যে মুগ্ধ হয়ে স্রষ্টার মহিমা খোঁজে
এরা খোঁজে সৃষ্টির আদিগন্ত, শাশ্বত সরূপ।
পরিযায়ী পাখির মতো সমুদ্রের ওপর ডানা ভাসায়
নীল নীলিমা দেখে দেখে ফিরে যায় শেকড়ের কাছে।
সময়ের স্রোতে ভেসে
অযথাই মানুষ নিজকে খুন করে পার্থিব মোহে
নির্মাণের যথার্থ সময়কে মুল্য না দিয়ে
মরীচিকা – সন্যাসী সেজে হারায় শরীর লাবণ্য।
যখন বোধোদয় ঘটে
ডুবন্ত নৌকা ভাসানোর সময় জোটেনা কারো
অতীতের অনাবাদি দিনগুলি ভিড় করে চেতনায়।
আমরা যারা নিজের খেয়ে তাড়াই বনের মহিষ
ধুসর মোহে খুঁজে ফিরি পতিত জৌলুস
সবই নিরর্থক স্বপ্নের দোলা, অমাবস্যায় হরিণ শিকার ।
আয়নায় নিজের ছবি না দেখে অন্যের সাজ দেখি
সময়ের স্রোতে ভেসে ভেসে জীবন যায়
দাঁড়াবার সক্ষমতা ঝরে পড়ে অযত্নে অলখে
তারপর পর থাকেনা ,সময় আসে অন্ধকারে হারাবার।

