বই প্রজন্ম ও মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ । বইবিহীন কোনো রাষ্ট্র বা সমাজ ব্যবস্থা অনেকটাই প্রাণহীন এক ধূসর মরু। মানুষের ভাবনা, চিন্তা, দর্শন, মেধার বিকাশ, সংস্কৃতির জৌলুস, অর্থনীতির তলোয়ার, ধর্মের আনুগত্য সব কিছুর ভেতর বই এক মিশ্রিত ও অনস্বীকার্য অনুষঙ্গ, এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই । মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলি, ধর্মীয় অনুভূতি ও সম্প্রীতির স্তম্ভ এবং রাষ্ট্র বিনির্মাণ প্রতিষ্ঠায় বই তর্কাতীত এক অনস্বীকার্য উপাদান।
বিশ্বায়নজুড়ে কোথায় কী ঘটে চলেছে, রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রবাহ, কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রতিযোগিতা, বৈশ্বিক বর্তমান জলবায়ুর অবস্থা, বিশ্ব অর্থনীতির হালচাল, বৈশ্বিক শিল্প ও সংস্কৃতির গতি ধারা, যুদ্ধবিগ্রহ এসবের তথ্য ও উপাত্ত মেলে একমাত্র জাতীয় বই মেলার মহাসমাবেশে। স্টলে স্টলে প্রদর্শন হয় বিশ্বমণ্ডলের সামগ্রিক ও বহুমাত্রিক জ্ঞানের তথ্যভাণ্ডার। এতে করে পাঠকের জানার প্রবল আগ্রহ তৈরি করে ও অন্তরাত্মায় লালন করা ক্ষুধার পরিপূর্ণতা পায়। বলা চলে, বই মানুষের ব্যস্তময় জীবনের খানিক অবসরের এক টুকরো প্রশান্তির আয়েশি আমেজ ।
বাঙালির প্রাণের মেলা হলো বইমেলা। প্রতিটি প্রজন্মের সিনায় টগবগ করে বই এবং বইমেলার উপস্থিতি দর্শনলাভের তৃষ্ণা পাশাপাশি প্রজন্ম এবং পাঠকের মনে ঘটে তৃপ্তময় প্রাণস্পন্দন । প্রতি বছর লেখক, পাঠক ও প্রকাশক আগ্রহ নিয়ে জাতীয় গ্রন্থমেলার অপেক্ষায় থাকেন । লেখকগণ যেমন সৃষ্টির উল্লাসে চিন্তার চাষ করে যান পাঠকদের রুচি এবং চিন্তার অনুভূতিকে সওদা করে, পাঠকের ভাবনা মনন মানসিকতা কুড়িয়ে এনে একটি বই মোড়কে আবৃত করে ঢেলে দেন বইপ্রেমী তথা পাঠকের মহা সমাবেশে, তেমনি বইপ্রেমী পাঠকগণও অপেক্ষায় থাকেন তৃষিত চোখে ক্ষুধার্ত মননে একটি বই স্পর্শ করার প্রয়াসে, আর সেই ঐতিহাসিক শুভক্ষণ হলো জাতীয় বইমেলা ।
২৪ শে জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তীতে এই বছর একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল । এর মধ্যে অনেক জল্পনা-কল্পনা আর সহস্র সংশয়কে উপেক্ষা করে ভাষার মাসে গঠন হল একটি জাতীয় সরকার । জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বইমেলা আয়োজন নিয়েও ছিল বাপক সংশয় । একদিকে পবিত্র রমাদান মাস অন্যদিকে নয়া সরকার, প্রকাশকদের প্রবল অনীহা এই ত্রিমাত্রিক দরকষাকষির মধ্য দিয়ে অবশেষে বইমেলা তার সুরত মেখে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ২৫ শে ফেব্রুয়ারি -২০২৬ ইং । বিশেষ করে অধিকাংশ প্রকাশক সমাজ এখনো অতৃপ্তির ঢেকুর ফেলে চলেছেন, তাদের দাবি ও প্রত্যাশা ছিলো জাতীয় বইমেলা সংঘটিত হোক ঈদের পর। কিন্তু বাংলা একেডেমি এবং তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক সকল কিছু বিচার বিশ্লেষণ ও বিবেচনা করে চূড়ান্ত রামাদান মাসেই মেলা আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেন এবং সেটিই ঘটলো চূড়ান্তভাবে । এ জন্য বাংলা একাডেমি একটা কারণে ধন্যবাদ পেতেই পারে সেটি হলো প্রকাশকদের বেচাবিক্রি, পাঠক উপস্থিতি ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্টল ফ্রি করে দেয়া । এটি প্রশংসার দাবি রাখে ।
এইযাবত জাতীয় বইমেলা ঘুরে যেটি অনুধাবন হলো তা হল, প্রকৃত বইপ্রেমী ও পাঠক ঠিকই স্টলে স্টলে আনাগোনা করে চলেছেন এবং বই সওদা করে চলেছেন । এক্ষেত্রে রমাদান মাস বলে কিছুটা অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এটি সরল স্বীকারক্তি । আগের মত উৎসুক জনতার ভীড়, কচিকাঁচা শিশুদের হইচই, অভিভাবকদের স্বতঃস্ফুর্ত উপস্থিতি লক্ষণীয় নয় । সারাদিন সিয়াম রেখে বইমেলা এসে দীর্ঘ সময় বায় করে মেলায় অবস্থান করা অনেকটাই দুঃসাধ্য ব্যাপার বটে । তাছাড়া, সারাদিন সিয়াম সাদনা করে এদেশের মুসলমানরা তাদের রবের ইবাদতে সামিল হয়ে যায় আসরের পরবর্তী সময় থেকে রাতব্দি- এটিও একটি অনুল্লেখ্য কারণ । তারপরও বোধকরি সরকার বা মন্ত্রণালয় অনেককিছু বিবেচনা করে বইমেলাকে ভাষার মাসেই বেছে নিয়েছেন, অন্যথায় এপ্রিলে ঝড় বৃষ্টির আশংকা একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়াত । ইতোপূর্বে একটি বড়সড় ঝড়ও বয়ে গেছে মেলার উপর দিয়ে। এতে কিছু প্রকাশক ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে বলেও জানতে পারি।
সর্বোপরি বলব, সরকার আগামী বইমেলাকে লক্ষ্য করে যেন প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ ও বইপ্রেমীর মননে এর বার্তা ও উপস্থিতি পৌঁছাতে সচেষ্ট থাকেন সেই আয়োজনের যেন আগাম বন্দোবস্ত করেন সেই উদার্থ আহ্বান রেখে গেলাম । কারণ, জাতীয় বইমেলা হলো তরুণ পাঠক সমাজের একটি মহাসমাবেশ এবং পাঠচক্র অধিবেশনের অন্যতম কেন্দ্রস্থল। প্রজন্ম এবং তরুণরাই নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে এদেশ তথা বিশ্বপরিমণ্ডল, আগামীতেও দিয়ে যাবে । কারণ, এই তরুণদের হাতেই নির্মাণ হয় একটি সভ্যতা, সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও অর্থনীতির বিকাশ । তাই রাষ্ট্রের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে প্রজন্ম ও তরুণদের মননে সৃজনশীল ভাবনার উপাদান বণ্টন করা, আর সেই উপাদান ও একমাত্র অনুষঙ্গ হলো বই এবং এই বইমেলা ।
লেখক : কবি, শিশুসাহিত্যিক ও কলামিস্ট ।

