মালতীনগর


গুচ্ছ কবিতা

মালতীনগর- ০১ 

উপরে তাকালে একটা আকাশ দেখি
কখনো নীল কখনো গোলাপি
কতটুকু দেখি ঐ আকাশ
এই যে নীচে বয়ে যায় কৈশোরের করতোয়া
ঢেউগুলো গুণে রেখে দিয়েছি নীল পানজাবির পকেটে
যে বটগাছটা হুড়মুড় করে করতোয়ার পাড় থেকে
একদিন শিকড় ছিঁড়ে আছড়ে পড়লো জমিনে
অবাক হয়ে দেখেছি তার বিলয়
কতো পাখির বাসা সেদিন হয়েছে বিলীন
চাঁনমারী ঘাট আর লালো মাঝি হয়ে যায়
স্মৃতির হার্ডডিস্কে লুকিয়ে থাকা সোনালী অতীত
মহিষের ঘাস খাওয়ার সেই বালকবেলা
বারবার ফিরে আসে স্মৃতির পালকি চেপে
করতোয়ার পাশে কদম গাছের নীচে বসে
আজো কি বাঁশি বাজায় আমাদের পাড়ার শাজাহান
এখনো কি সাইকেলের টায়ার চালিয়ে
কেউ চিৎকার করে বলে ‘লই নিবেন লই’
বড়ো শুনতে ইচ্ছে করে
স্মৃতির আয়নায় ভেসে ওঠে
চুড়ি ফিতা লিপস্টিক বহন করা কানু কাকার
চলমান মার্কেট ‘ লাগবে চুড়ি ফিতা দুল’
নিজের স্মৃতির ঝাঁপি খুলে নিজেই
নতজানু হই

আহা! মালতীনগরে কৈশোরের ঘুড়ি ওড়ানো
গোলাপি বিকেলগুলো বারবার হাতছানি দেয়।

 

মালতীনগর- ০২

ভোরের রোদ গায়ে মেখে
দৌড়াই স্কুলের পথে
প্রথম বেঞ্চে বসার ঘোরে
সারারাত ছটফট করতাম
একটা সকালের জন্য
মায়ের হাতে ভাত সম্ভারার স্বাদ
জিহবায় নিয়ে বই হাতে দৌড়াতাম
শেফালী ফুলের ঘ্রাণে সকালের রাস্তা খলখলিয়ে হাসে
জীবনের সিঁড়ি পথে প্রতিদিন
শেফালী ফুল কুড়াতাম
দৌড়াতে দৌড়াতে একদিন
নতুন খাতায় নাম লেখালাম
কোমল জ্যোৎস্না সাঁতরে শিশির ভেজা সকাল
হারিয়ে, মালতীনগরের বুকে এঁকে দিলাম
নতুন পদচিহ্ন। প্রখর রোদের তেজে এখন যেখানে
পড়তে যাই, মুরুব্বীরা বলেন,
চৌধুরী সাহেবের ছেলে হাইস্কুলে পড়ে।

 

মালতীনগর-০৩

যে পথ মাড়িয়ে স্কুলে যেতাম
কালো সানগ্লাসে একদিন ঢেকে গেলো সে পথ
সুপারি কাটার শরতায় রাস্তাটা ভাগ হয়ে গেলো
লাল পতাকায় মানুষ মানুষ বলে আওয়াজ হলো
কৃষ্ণচূড়া ফুলের শরীরে সরিষার তেলের
ঝাঁঝালো গন্ধে মালতীনগরের বাতাসে
আছড়ে পড়লো নতুন পারফিউমের ওম
ধানী জমিগুলো কাগজী লেবুর লোভ জাগালো
হায়দার চাচার কৃষক পরিবার
অনুগত ছাত্রের মতো
জাবেদা খাতায় অংক কষা শুরু করলেন

শীতের বিকেলকে ডেকে নিয়ে যাই
উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরির বারান্দায়
আম্মার কুরুশ-কাঁটায় বোনা সোয়েটার
পথ রুদ্ধ করে কুয়াশার চুম্বন
খেজুরের রসে জানলাম
সমাজতন্ত্রে সূর্য কিভাবে উদিত হয়

মালতীনগর থেকে মিছিল যায় সাতমাথায়।

 

মালতীনগর-০৪

[উৎসর্গঃ কবির, লেলিন, রানা, রূপম, নিপু আমার বালকবেলার সাথীরা। যাঁরা সকলেই টারজান]

বেড়ে ওঠা বৃক্ষগুলো
বালকবেলার আমকুড়ানি জ্যেষ্ঠ বাতাস
রবিবার ঈদের খুশি সাদাকালো টিভিতে টারজান
বিকেলেই সূর্য ডুবিয়ে দিতাম পুকুরের জলে
শুক্রবারে ইটসুড়কি বিছানো পথে কাফেলা
মালতীনগর দক্ষিণে মাটির মসজিদে
পাঁচ বছরের কৌতূহলী হৃদয় জানেনা
সিজদার আভিধানিক অর্থ
তবুও প্রতিটি জুমার নামাজে
দুপুরের সূর্যটাকে মাথার উপর বসিয়ে
শিমুল গাছটার নিচ দিয়ে মাটির মসজিদে যাওয়া
দুহাত তুলে ‘ আমীন আমীন ‘ মোনাজাত
আনন্দে দাঁড়াতাম আলিফের মতো
স্বপ্ন কুড়াতাম জুমার নামাজ শেষে
পৌঁছাতাম শ্মশানের কাছাকাছি ফিসারিজ অফিসে
পোনা মাছের উপর বিজ্ঞান নড়াচড়া করে
এ মাছ বড়ো হয় কিভাবে
সেই দুপুর- বিকেলগুলো
হৃদয়ের আনাচে-কানাচে ঘুরঘুর করে আজো
হারুনের দোকানে কি এখনো
সবরি কলা বিক্রি হয় পঁচিশ পয়সায়?
এখনো কি গুলাল হাতে ঘুঘু পাখির নেশায়
বাঁশঝাড়ে ঢুকে পড়ে নতুন কোনো কৌতূহলী চোখ?
টিভিতে টারজান দেখার সন্ধ্যা
রাতজাগা শিশুর মতো আজো জেগে আছে হৃদয়ে
মাগরেবের আজান শুরু হলে
জোনাক পোকারা জেগে ওঠে বাঁশঝাড়ে
ঘরে ফেরা পাখির মতো আমরাও বাড়ির আঙিনায়
নামিয়ে আনি উড়তে থাকা আমাদের ক্লান্ত দুটি পা
আম্মা বলতেন, সন্ধ্যা হয়ে গেছে দুধ খেয়ে পড়তে বস

মমতার আঁচলে কতোদিন মুখ মুছিনা।

মালতীনগর- ০৫

[উৎসর্গঃ কবি তৃষ্ণা বসাক, বন্ধুভাজনেষু]

কৈশোরে আব্বার হাত ধরে বকশি বাজার যাই
সাজিয়ে রাখা সবজি মাছ মাংস, খাঁচায় মুরগী আর সরল মানুষগুলোর কেনাবেচায় মুগ্ধ হয় চোখ
আশিস কাকার হোটেলে চেয়ারে বসে
পরোটা সবজি মিষ্টি দুধ চা খেতে খেতে
কখনো জানাই হয়নি
আব্বার পকেটের আবহাওয়া সংবাদ
খেয়েই গেছি কৈশোরের ডাংগুলি খেলার মতো,
জেনেছি কাঁচা ছানা মানেই আশিস কাকা,
বৃষ্টির দিনে ছাতা মাথায় বাজারে যেতাম,
মনে হতো অনেক হাতির কান বাজারে ঘুরছে,
লাল মিয়া চাচার দোকানে বসিয়ে রেখে আব্বাও
হাতির কান লাগিয়ে মিশে যেতেন ভিড়ে,
আব্বাকে খুঁজতাম, কিন্তু পেতাম না তখন
শীতে বকশি বাজারে দেখেছি যুবতী সবজিবাহার
লাউশাক বাঁধাকপি ফুলকপি টমেটো সীম গাজরের
জৌলুশে মনে হতো মাদলায় নানী বাড়ির উঠোনে

ঋতু পরিবর্তনে গাছে নতুন পাতা
বকশি বাজার শেখায় জীবনের নামতা,
পকেটের নোটগুলো মনে হলো খলসে মাছ,
বাজারে এলোমেলো কদমে নামতা পড়ি
সবকিছু ঠিকঠাক অথচ কিছুই ঠিক নেই,
কৈশোরে আব্বার হাসিমাখা মুখের আড়ালে
বেদনার ঘামগুলো আমার কপাল বেয়ে
নিচে নামে, নিভিয়ে দেয় সদ্য জ্বলে ওঠা উনুন

বাবা মানেই পাঞ্জাবির পকেটে বেদনা লুকিয়ে রাখা
সেলাই করা চটি পায়ে একজন আলেকজান্ডার।

 

মালতীনগর- ০৬

বকশিবাজারের পূর্ব দিকের সড়কে হেঁটে যায় ভোর
পূজামন্ডবের পাশে মাটির দালানে
শত মানুষ জীর্ণ পাতা সতেজ করে প্রতিদিন
মনু ডাক্তার জিহবায় ঢেলে দেন
দু- ফোঁটা হ্যানিম্যান রেসিপি
রসায়নের জারন রসে পাতা সবুজ হয়ে যায়
করতোয়ার জলে আনন্দে নাচে পুঁটিমাছ
বসন্ত বাতাসে ওড়ে চানমারী ঘাটে বালুর ঢিবি
স্কুল বালক জানেনা
সূর্যগ্রহণের দিনে শন-পাপড়ি ফেরি করেনা
নাটাইপাড়ার অমল কাকা
তবুও লালোমাঝির নৌকার গলুইয়ে
একজন কিশোর যাঁর পকেটে পঞ্চাশ পয়সা
সন্ধ্যার আবছা আলোয়
আনসার ক্যাম্পের মাঠে কুশার চিবাতে চিবাতে
ঘরে ফেরার তাড়ায় গড়িয়ে পড়ে কুশার রস

বাঁশঝাড়ে নতুন পাখির কিচিরমিচির
নদীর ঐপাড় যেন জয়নুলের আঁকা ছবি
যেখানে কুপি জ্বালিয়ে বিদ্যার জাহাজে চেপে বসেছে মন্ডল ভিলার সবুজ সালোয়ার কামিজ

মালতীনগর-০৭

সাম্য ভালোবাসার অন্তরে অদৃশ্য গোলাপি রুমাল
প্রতি বিকেলে নতুন স্বপ্নের ফোয়ারা উসকে যেতো
আনসার ক্যাম্পের সবুজ ঘাসে
যেখানে ছড়িয়ে দিয়েছি
পুদিনার রসে এক চামিচ মধুর দ্রবণ
দিগন্তে দেখেছি কতো মহিষের দল
মনেতে কোনো সংকোচ না রেখেই
বালিকার হাত ধরে ঘুড়ি ওড়ানো শেখাই
আনন্দের আতিশয্যে বেলীফুলের সুবাসে
দু-বেণীর কিশোরী হাসি দেখে মনে হতো
এই বিকেল এসেছে বালিকার বেণী বেয়ে
স্কুলে ছুটির ঘন্টা মানেই মাগরিব পর্যন্ত
বেলীফুলের সৌরভে
আনসারক্যাম্পের মাঠে খুঁজতাম চাঁদের সিঁড়ি

সন্ধ্যার আগে করতোয়ার জল সাঁতরে ফিরে যায়
নাটাইপাড়ার কোনো গৃহস্তের হাঁস সমাজ
যেখানে পুঁজিবাজার অপেক্ষায় শীতঋতু

 

মালতীনগর-১০

জীবনের শ্লেটে পার্মানেন্ট মার্কার দিয়ে লেখা
মালতীনগরের রঙিন পথ
কুয়াশাগুলো পাতা বেয়ে নেমে আসে পথে
ফজরের আজানের সময়
আয়েশী ঘুমকে কম্বলের নিচে রেখে
সূর্য কে ডেকে আনতাম আনসার ক্যাম্পের মাঠে
সবুজ শিশির ভেজা মাঠে
শরীর বেয়ে দরদর করে ঝরে পড়ে পসিনার ঝরনা
করতোয়ার জল যেন প্রকৃতির জমানো বরফ
উনুনে লাকড়ি গুঁজা রসের পায়েস
মুড়ির কুড়মুড় আওয়াজ
শীতকালীন মহড়ায় যোগ দেয় সুসজ্জিত দাঁত

একটা সোয়েটার আর ভাল্লুক টুপি মাথায় গুঁজে
শীতকে প্রতিদিন রেখে আসি নদীর ঐপাড়
যে গ্রামে প্রতি বিকেল হেঁটে যাই
সূর্যকে নামিয়ে চাঁদ টাকে ঠিকঠাক তোলার জন্য
নাটাইপাড়ায় কামিনী ফুল সুবাস ছড়ায়
বাল্যপ্রেমের সরিষা ক্ষেত

যাঁর কাছে বিকেলটা আমানত রেখে এসেছি।

 

মালতীনগর-১১

পূজামন্ডবের উত্তরে বৈরাগীপট্টির গলি
চলে যায় করতোয়ার পাড়ে
সে পথে তেঁতুলপাতা পড়ে থাকে
পকেট ভর্তি মার্বেল নিয়ে গলিপথে হেঁটে যাই
শিকারের নেশায় বাটুল হাতে
বিকেলে জোড়া বেণী ঘুরে বেড়ায়
করতোয়ায় ঘাসের জাজিমে খালি পায়ে
আকাশ দেখে তাঁর কৌতূহলী চোখ
টিয়াপাখি কি বেহুলা হতে চেয়েছিল
হালিম চাচার নারকেলগাছগুলো বড়ো হতে গিয়ে
বিকেলের বাতাসে স্মৃতির হার্ডডিস্কে জমা হয়
স্কুল ফিরে আসা হলুদ পোশাকের প্রজাপতিরা
হৃদয়ে জানান দেয় সরষে বাগানের সৌন্দর্য
সাইকেল চালানো বিকেলগুলো বসে থাকে
আনসার ক্যাম্পের সবুজ ধনচে ক্ষেতে
আমাদের রঙিন ঘুড়িগুলো উড়তে উড়তে
কেন জানি হাত বদল হয়ে অন্যের দখলে চলে যায়
পরাজিত সৈনিকের মতো আত্মসমর্পণ করি
একটা সন্ধ্যা বাড়ির উঠোনে ফেলে জোৎস্নার আলো।

 

মালতীনগর-১২

একটি গাছের জন্ম স্কুল মাঠে
তারাবাতি জ্বলে মিছিলে
করুণার দানাগুলো করতোয়ার জলে মেশে
আলোর প্রাসাদে বিকেলের বাতাস আছড়ে পড়ে
প্রেমের মন্ত্রে ব্যাকুল আইএসসি পড়ুয়া মন
রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞানের শিং এ নাচে
আবহাওয়া পরিবর্তনের ইশতেহার
একটা পুকুর ভরাট হয়ে যায় নেকির আশায়
‘বায়তুর রেদোয়ান’ ঘোষণা দেয় শ্রেষ্ঠত্বের
কুয়াশা সরিয়ে শেফালী ফুল কুড়াই

চৌধুরী বাবা একজন আশেক ছিলেন
মওলার তালাশে তাঁর দু-চোখে দেখেছি
করতোয়ার বর্ষা প্লাবন।