জীবন বড়োই অদ্ভুত
হাত ভরা চুড়ি, বৃষ্টি হয়ে যখন নামে
আমি আর তুই ভিজি নিত্যনৈমিত্তিক ঘামে
এক টুকরো মেঘ! ধাঁধায় পড়ে এলোমেলো
বেয়ারা হওয়া মুহূর্ত কোথায় হারিয়ে গেলো—
.
কাঠগোলাপের ঠোঁটে বসন্তের খেলাপি চুম্বন
রোদে মাখামাখি লাবণ্যই একমাত্র অবলম্বন
সন্ধ্যাতারা দিশেহারা ব্যথার আলোয় পুড়ে
চাঁদটা আজ বসে আছে ক্ষতবিক্ষত বুক খুঁড়ে।
.
ঝিঁঝি পোকা আলোহীন, দেহ জাগবে তাই
আজ মধুচন্দ্রিমা! নেই গোলাপের রোশনাই
পৌরাণিক ঘরে নিঃসঙ্গ, কামার্ত রমণীর মূর্তি
বিছানায় গ্রীষ্ম-বর্ষা! প্রকৃতির নয়, ইচ্ছের পূর্তি।
বীভৎস চিৎকারে ভেঙে গেল ঘুম! পাশের ঘরে ভূত
আমি ঝরাপাতা গাছ! জীবন বড়োই অদ্ভুত।
প্রেম কোথায়?
কথা অনেক জমা
যেন অ্যাটম বোমা
হয়নি বলা হৃদয় মেলে
বলবো কথা মন খুলে
অশ্রুভেজা সময় ভুলে
দূরে ঢেলে, কী-বা পেলে?
কিংবা
কুয়াশা ঢাকা সাতসকালে
কীসের তাপে দেহ কাঁপে?
রোদহীন সম্পর্ক! কীসের উত্তাপ?
নদী জুড়ে শিশিরের তীব্রতা
ছুঁতে গেলে লাজুকলতা
যাচ্ছে ধুয়ে প্রেমের সব সংলাপ।
তাহলে বলো প্রেম কোথায়?
ভাঙতে ভাঙতে যেদিন মানুষ হবো
দেখে নিও
সেদিন কড়া নাড়বে দরজায়।
বহুরূপী খল
গেঁথে বুকে, বিক্ষুব্ধ মানুষের সংকল্প
দাঁড়িয়ে রুখে, মেনেছি শাসকের বিকল্প।
হুকুম জারির ঐ শুয়োরের খোঁয়াড়
ভেঙেছে মিছিল, তারুণ্যের জোয়ার।
ভেঙেছে কারাগার, ভেঙেছে শৃঙ্খল
যে ছিল নায়ক, সে এখন বহুরূপী খল।
পেয়ো না ভয়, হইয়ো না হতবিহ্বল
জীবন, কোন্দল নয়, নয় মিথ্যে ভাষণ
এ শুধু জয়-পরাজয়ের ফলাফল।
স্লোগান তো নয়, লবণ ভরা নদী, আছড়ে পড়ে ঢেউ
ভেঙে যায় সুখ, কেনো কাঁপে বুক জানে কি তা কেউ।
দিনগুলো ছিল মিছিলের, বিজয়ের মঞ্চ
মালঞ্চের ঘ্রাণ ঝাঁঝালো গ্রেনেড সব দেখা ক্রৌঞ্চ!
যারা ভাবো, বিজয় আকস্মিক! সাধারণ
তাদের বিরুদ্ধেই চলবে যুদ্ধ আমরণ!
যে গেছে সব ছেড়ে, আসবে না ফিরে
দিবস আসে, দিবস যায়, মানুষের ভিড়ে।
অতিথি
দিনশেষে পা-দু’টো ফেরে কোমল ভাঁজে
প্রশ্রয় পেয়ে দেহের সিঁড়ি বেয়ে স্বর্গে পৌঁছে।
মুছে ফেলে পৌরুষের ক্লান্তির দাগ
কারণ প্রতিটি রমনি বিশ্রামের আঁধার।
সৌন্দর্যের আলো শুধুই কি উপভোগের?
লোকচক্ষুর আড়ালে তাই কি ছুটে আসে?
ক্ষুধার্ত অতিথি! সব রং নেয় লুটে
দেহের প্রশান্তি কেনে, বাঁধে না বাহুডোরে।
রমণীর চোখে কালো মেঘের ছুটোছুটি
ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টিতে, সোনালি রোদ নেই।
বাঁধ ভাঙা জোছনায় ঘরে ঝলমলে ঢেউ
এখানে সাঁতার কাটে সবাই, থাকে না কেউ।
বিরোধ
কুয়াশার ভিড়ে হতে চাই লোমশ চাদর
শিশির ভেজা ভোরে সূর্য নয়, উষ্ণ আদর
সিক্ত ঘাসে রিক্ত পা রাখলেই, জ্বলে উঠ
নরম কাপে ঠোঁট রাখতেই বলো, ‘ফুটো’।
.
কি আর করা! হয়ে গেলাম মধ্যাহ্নের রোদ
ঠিক তখন থেকে শুরু আমাদের বিরোধ
তোমার হাতে ছাতি, ঠেকাও রঞ্জন রশ্মি
ভাবটা! লাইলি নও, মর্জিনার মতো দস্যি!
.
এলোমেলো এই আমি, ভয় পেলেই থামি
যতই রেগে উঠো, ততই আমি শান্তিকামী
কবিতা নয় গল্প হব, অল্প কথার একাঙ্কিকা
নতুন করে সাজাবো রক্তে কেনা এই মৃত্তিকা।
প্রেমের নথ পরিয়ে বানাবো গল্পের নায়িকা…
হতে চাই
আমাদের শীত-গ্রীষ্ম নেই, পতনের শক্তি নেই
সুখের ঢেউয়ে বিদ্রুপের বুদ্বুদ ছাড়া কিছু নেই।
আহ্! উহ্! করার অধিকার! সমালোচকের হাতে জব্দ
স্মৃতির ধুলায় মহাকালে তাই গোধূলি পতনের শব্দ।
বসুন্ধরার এই নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে কোনো আক্ষেপ নেই
যাদের কাছে অসহ্য প্রাণী, তাঁরা শোনেন
করুণা করে হলেও আমায় ভুলে যাবেন
গ্রহণ বা প্রদান করার যার সক্ষমতা নেই—
অবহেলা-লাঞ্ছনার খুনসুটি তার চলবেই।
গ্লানির ক্লান্তি থেকে টেনে তুলবেন না
ভ্রান্তির আগুন আর নেভাবেন না
নত হতে হতে আমি কুঁজো হয়ে গেছি
আর কত নত হলে বলবেন, ‘মানুষ হয়েছি’
তবুও আমি মানুষ হতে চাই! মানুষ হতে চাই
মানুষ হতে না পারলে, কবি হওয়ার চেষ্টা বৃথাই।
কে দায়ী
তুমি শূন্য আমি, জীবন্ত ফসিল
খুঁজি না আর সম্পর্কের গরমিল
বৈরী বাতাস কেটে ডুবি কুয়াশায়
প্রেমের দীর্ঘশ্বাসে অস্তিত্ব উড়ে যায়।
.
নিয়েছে কী কেউ কোনোদিন খোঁজ
সুখ কি করে হয়, প্রতিনায়কের ভোজ
কী করে বিবর্ণ হয়, আউশ ধানের জীবন
দাউদাউ করে জ্বলে খননকৃত বুকের দহন।
.
ঝরাপাতা প্রেম, শিউলির মতই ক্ষণস্থায়ী
মিতব্যয়ী বাতাসে সবুজ ঘাসে লুটায়—
এর জন্য কে দায়ী
.
প্রকৃতির চর্চা? না-কি জন্ম স্বভাব?
না-কি পোড়ার ক্ষতে জন্মানো গোলাপ?
বেগানা
আমি চলে যাইনি, বাধ্য হয়েছিলাম।
আমি বিহীন থাকতে চেয়ে ছিলে
জোছনাস্নানে হাসতে চেয়েছিলে
দূরের আলিঙ্গনে ডুবতে চেয়েছিলে—
ভালোবাসা ছাড়া সবটুকু দিয়ে
অবশেষ! হলাম নিরুদ্দেশ।
দূরত্বের সমীকরণে আমি ভাসমান মেঘ
বন্ধন ছিঁড়ে বাতাসের উজানে ভাসি
বজ্রপাতে পুড়ি, ঝড়ে উড়ি
বিরহের মিছিলে আমি ম্রিয়মাণ স্লোগান
এই নিয়ে আছি বেশ।
রঙিন চোখে বৃথাই বোজো
মুখোশ খোলো শীৎকারে
দুই ঠোঁটে নিঃসঙ্গতা চেপে
কেন খোঁজো আমায়
তার কিচ্ছু জানি না
কারণ, আমি এখন বেগানা।
ভাসানী’র বড়ো প্রয়োজন
কেন মিথ্যের আয়োজন
কী লাভ দখল নিয়ে?
কী হলো ঝড়ের মুখে বুক পেতে
দেশপ্রেমহীন পথে রক্ত দিয়ে।
আজ, একজন
মওলানা ভাসানী’র বড়ো প্রয়োজন।
সন্দেহের রাজনীতি, অশ্রদ্ধার রাজনীতি
মনগড়া মতামত, ধর্মের নামে নষ্ট পথ।
লাভের লোভে
দেখে না কেউ, কার কতটুকু দোষ
কে আছেন
আঙুল উঁচিয়ে বলবেন, ‘খামোশ’।
উত্তাল সময়! অবিশ্বাসের ঢেউ
কখন ঘূর্ণিঝড় হবে
জানে কি তা কেউ
কে আছেন, ঝরিয়ে রক্তঘাম
বলতে পারবেন ওয়ালাইকুম আসসালাম।
প্রাপ্তির যোগবিয়োগ বন্ধ হবে না যতক্ষণ
ততক্ষণ, একজন ভাসানী’র বড়ো প্রয়োজন।
ফুল সূর্যমুখী
কে তুমি, কে তুমি? যাচ্ছ হেঁটে
লেফট রাইট লেফট রাইট—
শস্যের স্বাধীনতা উন্মুক্ত করতে
নভেম্বরের উষালগ্নে, সৌহার্দ্যের বিপ্লবে
ওভার নাইট চলেছিল ফাইট।
ধান শালিকের হলুদ ঠোঁটে
ফসলের ভাণ্ডার নিলো কারা লুটে
পতাকা থেকে কত নদী র**ক্ত ঝরে?
আর কত থাকব দম্ভের রোষানলে?
কে নওজোয়ান, ধরবে হাল, এসো ছুটে।
বর্গি তাড়াতে, গণতন্ত্রের ক্ষতে
তুমি ফুল সূর্যমুখী! স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতিতে
সেই ফুল, স্তূপীকৃত ভুল মুছে
শ্রদ্ধার শীর্ষে গেছ পৌঁছে
রেখেছিলে পরম স্বস্তিতে।
পেটুক
গোলাভরা ধান পুকুরভরা মাছ
এখন দূরের কোনো গান! আষাঢ়ে গল্প!
আমাদের আছে শুধু ঐতিহ্যের বটগাছ
দশ টাকায় বাজার! দশ পয়সায় লেবুনচুস
শৈশবের সেই বিলাসী জীবন! এখন কল্পকাহিনি
হজমি, আচার, কটকটি, মুড়িমুড়কি
সোনায় মোড়ানো স্মৃতির ঝাঁপিতে কেউ রাখিনি।
শিল্পকলার দোতারায় বাজছিল
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম
আমি পথের দূরত্ব না মেপে সময়যন্ত্রে চেপে
এক শতাব্দী পেছনে গেলাম
শৈশব আমাকে বলেছে, যায় দিন গেছে
তাকে নয়, আগামীকে নাও বেছে’
হঠাৎ করেই হাঙর হয়ে উঠছে সর্বভুক
দাঁতাল রাজনীতিতে আমরা হিংস্র পেটুক!

