আয়না কী দরকার


আয়না কী দরকার

চোখের ভেতর মুখ দেখেছি
আয়না কী দরকার?
পৃথিবীতে স্বচ্ছতম আয়না পাওয়াই ভার,
পারদ তো নয় কাচের নিচে গভীর অন্ধকার।

চোখের ভেতর মুখ দেখেছি
আয়না কী দরকার?
পথের কাছে পথ পেয়েছি
ভয় কী হারাবার?

গতির ভেতর আলোক আছে বিরোধী জোছনার,
হাত বাড়ালে যায় না পাওয়া সাজানো সংসার।
চোখের ভেতর মুখ দেখেছি
আয়না কী দরকার?

জলের কাছে আগুন পেলাম
পাথর কী দরকার?
সব পাথরেই আগুন থাকে এমনতো নয় আর,

বুকের আগুন খুঁচিয়ে তোলে মূর্খরা বারবার;
চোখের ভেতর মুখ দেখেছি
আয়না কী দরকার?

 

কবি ও সম্রাট

হতাশাগ্রন্থ সম্রাটকে শ্লোক শোনাতে
সমবেত হলেন দেশের প্রখ্যাত কবিগণ
স্বর্ণবোতাম খচিত কেতাদুরস্ত কণ্ঠস্বর-
জাঁহাপনা আমি রচনা করেছি আপনার
পূর্বপুরুষের শৌর্যবীর্য গৌরবগাথা
আপনি ফিরে পাবেন হৃত মনোবল
আর দৃঢ়চিত্তে শাসন করবেন ভারতবর্ষ
বিপুল করতালি ও হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ল রাজদরবার
সহস্র স্বর্ণ মুদ্রা প্রাপ্য হলো তার

এগিয়ে এলেন মখমলের টুপি আর
জরিদার পাঞ্জাবি শোভিত বাবরি দোলানো কবি
হে মহাত্মন পুজনীয় ভারতেশ্বর
আমি লিখেছি আশ্চর্য সব চরণ
প্রতি পাঠে অনুভব করবেন আক্রোশ
হতাশাকে হত্যা করে জাগিয়ে তুলবে জিঘাংসা
করতালিতে কেঁপে উঠল দরবার কক্ষ
দুই সহস্র স্বর্ণমুদ্রা এনাম মিলল তাঁর

সিল্কের শেরোয়ানি আর মূল্যবান পাথর পরানো টুপি
চোখে সুরমা পায়ে হরিণচর্মের নাগরাই হাতে ঘণ্টি
হেলে দুলে এলেন কবি-
আলমপনা হে সূর্যাধিপতি
আমি আপনার জন্যে পঙ্ক্তিবদ্ধ করেছি
এমন আশ্চর্য পদ যা আপনার যুদ্ধযাত্রার
দামামাকে করে তুলবে ক্লান্তিহীন ও উদ্দীপ্ত
আর আপনি থাকবেন আজীবন অপরাজিত
মুহুর্মুহু করতালি আর কানফাটা উল্লাসধ্বনি
তিন সহস্র স্বর্ণমুদ্রায় ডুবে গেল কবির করতল
সবশেষে এলেন ধীরপায়ে বিনম্রবসন সাদা পাগড়িশোভিত
শাশ্রুমণ্ডিত এক আয়ত চোখের কবি-
মহামান্য সম্রাট আমি রাতের পর রাত বিনিদ্র থেকেছি
কিন্তু আপনার তুষ্টির জন্য কোনো শ্লোক রচনা করতে পারিনি
বারবার ব্যর্থ হয়েছি আমি- ক্ষমা করবেন জাঁহাপনা

ভয়ঙ্কর নীরবতায় ভরে গেল সভাকক্ষ
সম্রাট বাহাদুরও বাকরুদ্ধ হতবিহ্বল

বহুকাল পর লোকে জেনেছিল
কবির নাম মীর্জা গালিব

 

ভবিষ্যৎ ডটকম

সময়ের সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে পৃথিবী
কম্পিউটার কেড়ে নিচ্ছে হাতের কলম
প্রিয়জনের প্রতীক্ষাকে গভীর করত যে দূরত্ব
মোবাইল উপড়ে ফেলেছে সেই অদৃশ্য শেকড়
আদি সব প্রতীক ও প্রকরণ বদলে যাচ্ছে
গণতন্ত্রের জন্যে অনিবার্য যে নির্বাচন
সেখানেও যুগোপযোগী প্রতীকের বদল দরকার
কারণ আগামী প্রজন্ম পৃথিবীতে
সামরিক সরঞ্জাম ছাড়া কিছুই চিনবে না
ফলে বদলে দিতে হবে নির্বাচনের প্রিয় প্রতীকসমূহ
ধরা যাক নৌকার বদলে সাবমেরিন
ধানশীষের বদলে ক্রুসমিসাইল
মশালের স্থলে বোমারু বিমান
লাঙলের বদলে ট্যাংক
দাঁড়িপাল্লার জায়গায় এ কে ফরটিসেভেন
ছাতার বদলে হেলমেট
চেয়ারের বদলে বাঙ্কার
এইভাবে আমাদের নিত্য ব্যবহার্য গার্হস্থ্য
শব্দগুলো হয়ে উঠবে ভিন্ন ধ্বনিময়
ধরুন ভাতকে বলব বুলেট
ব্যঞ্জনকে বারুদ পা
নিকে পরমাণু এবং
পোশাককে বর্ম
অন্যদিকে হৃদয়কে ইমেইল
প্রেমকে ডটকম
আর বাড়িকে ইন্টারনেট

বিকল্প অভিধান

ঈ-কার দেব- বাড়ী লিখতে
কারণ আমি চাই আমার- বাড়ীটি
শক্তপোক্ত হোক

ই-কার নদির বেলায়
বাধাহীন ছুটতে এরকম আদলই মানায়
এবং ই-কার থাক পাখির ডানায়
দিগন্তে অবাধ উড়াল চায় তার
সাম্য দিতে হলে ই-কার
লিখতে হবে- নারি ও রমণি
ঈ-কার দিয়ে কঠিন করব না
পৃথিবীর- পরিক্ষাসমূহ
ঘোমটা খুলে চন্দ্রবিন্দুহীন হোক- চাদ
অপূর্ব লাগবে
আর য-ফলা সমৃদ্ধ সূর্য্য আরো দীপ্তিমান
এবং চন্দ্রবিন্দুর বোঝা ঝেড়েঝুড়ে মাথা- উচু
অসীম আকাশ দেখব
ঈ-কার দেব- নীচু শব্দে
যেন ইতরবিশেষ ঈ-কারের মাহাত্ম্য
সম্যক বুঝতে পারে মানব জীবন
সহজে মেলে না বলে দীর্ঘকার দেব- মুক্তিতে

এইভাবে তৎসম তুলে দেব
বদলে দেব ধাতু ও প্রত্যয়

এমনকী আরো দৃঢ় করে দিতে
স্বাধীনতা সম
ঈ-কার দিয়ে লিখব- সংবীধান

হেমন্তের অসমাপ্ত প্রকল্প

বহুদিন মনোভূমি খসড়া পড়ে আছে
হেমন্তের অসমাপ্ত জলরং প্রকৃতি অবধি
রাত্রির গর্ভে গুনগুনিয়ে ওঠে সেই শব্দ ও দৃশ্যকল্প
বহুদিন রোবটচন্দ্র হাঁটছে
অসীম নৈঃশব্দ কাঁধে ভোরের পেছনে
পরিত্যক্ত জলাভূমি জিভ দিয়ে চেটে নিচ্ছে
ঘাসদের গোপন শিশির
শুয়ে আছে শান্তশুদ্ধ নক্সীনদী বাঁধের শাসনে
অ্যালুমিনিয়ামে ধোয়া তার পবিত্র শরীর
দূরে তন্দ্রাচ্ছন্ন নৌকার গলুইয়ে বাঁধা
জেলেদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাড়ি
সবুজ পোশাক পরা বৃক্ষসেনাদের ব্রেকফাস্ট শেষে
ফেলে যাওয়া টিস্যুপত্র
কুড়িয়ে নিচ্ছে পাতাকুড়ানি ওয়েটার
আর অর্ধেক কুয়াশাশিশু ঘরে ফিরছে
নার্স মায়ের পেছনে পেছনে
বাকিরা গ্রামাঞ্চলে উড়ন্ত সসার

মনোভূমি জুড়ে এইসব খসড়া ঘোরে ফেরে
হতাশার-স্মৃতির
ক্রোধ ও ক্লান্তির
বিষাদেরও কিছু
একত্রে গুছিয়ে তোলা দুঃসাধ্য দূরূহ

যেখানে যেভাবে আছে অসমাপ্ত প্রকল্প হয়ে থাক

নিষিদ্ধ পণ্য

বাংলাদেশে বরফ নেই
আগুন নাকি আছে,
কিনতে গেলাম সন্ধ্যেবেলা
দোকানিদের কাছে।

শপিংমলে পণ্য অনেক
আগুন কোথায় পাই,
র‍্যাকগুলো খুব চমকে ওঠে-
না না ওসব নাই।

আগুন সে তো অদৃশ্য নীল
বিক্রি কেন হবে,
আতশবাজি কিনতে পারেন
বিবাহ উৎসবে।

ভুল শুনেছেন বরফ আছে
মৃত মাছের চোখে,
বলল তরুণ ফিসফিসিয়ে
চুমুক দিয়ে কোকে।

এক দোকানি ভীষণ চালাক-
আপনি কী ভাই কানা,
আগুন আছে বুকের মধ্যে
বিক্রি করতে মানা।

প্রতিধ্বনির পথ

কোথাও থামার সুযোগ নেই
মানুষ নামের অর্থ-বহুদূর
শুধু স্রষ্টার আলো পড়ে জীবনজয়ী মানুষের ওপর
যারা পার হয় প্রতিধ্বনির পথ

জগতে কী ঘটছে জানলে সহজ হয় নিজেকে জানাও
অসীম সমুদ্র কিংবা পর্বতে
আমরা আত্মার মুখোমুখি হই
আর অগস্ত্য যাত্রায় পাপ থেকে পরিত্রাণ পেতে
নিজেকে ক্ষমা করে পরিশুদ্ধ
পবিত্র বেদনায় ঝরে পড়া চোখের জলই তো আত্মার রক্ত

এগুবার পথ কোনো ফ্রেমবন্দি ফিতে নয়
সামনে পেছনে টানা যাবে
মহাবিশ্ব সমান্তরাল
দ্বিতীয় যাত্রায় কখনো এক থাকে না পথ
হেরাক্লিটাস জানে এক নদীর স্রোতে
দুবার স্নান অসম্ভব কেন

ভালো না বাসলে এগুনো কঠিন
বৃষ্টিকে ভালো না বাসলে কী করে পাব রঙধনুর স্বাদ
কোথাও থামার সুযোগ নেই
থামাতেই মহান হানিবলের ঘটেছিল পতন
আর মুছে গিয়েছিল কার্থেজ

দায়

যে ঘরে দরজা নেই
তার কী প্রয়োজন প্রহরীর
ভ্রূণ ধারণে অক্ষম যে গর্ভ
তার কেন প্রসব যন্ত্রণা
উড়তেই হবে কেন
যদি না থাকে ডানা তার
প্রবাহ পুতে রাখে যে স্রোত
তাকে স্রোতঃস্বিনী হতে কে দিব্যি দেয়
মৃত্যুকে ভয় পায় যে জীবন
তাকে বাঁচতে কে বলে

ফলহীন বৃক্ষ সেতো অগ্নিউপাসক

শেকলের শব্দে যে অভিভূত
তাকে মুক্তি দেবে কে

এবং মানুষ

নীরবতা নিয়ে স্মৃতিসত্তারা বাঁচে,
নিঃসঙ্গতা ভর দিয়ে আছে ক্রাচে।

সাথিদের মুখে অমঙ্গলের ক্ষরা,
সব প্রার্থনা সান্ত্বনা দিয়ে ভরা।

কে কোথায় মরে আজ তা মুখ্য নয়,
কাকে প্রয়োজন সেখানেই সংশয়।

অবিশ্বাসের কারাগারে ভালোবাসা,
শুধু দিন গোনে এমনই কীর্তিনাশা

এমনই কাতর কষ্টের দিনলিপি,
ভেতরে স্বপ্ন আটকে গিয়েছে ছিপি।

যুদ্ধ কেবল ক্ষমতার লেনদেন,
জ্বলছে রাশিয়া অসংখ্য ইউক্রেন।

ছিপিতো খোলে না স্বপ্নের চাওয়া ভুল-
প্রমাণ করতে দিগন্ত নির্মূল।

কোনো সূত্রেই মিলছে না মানবতা,
প্রেম ও শান্তি শুধুই কথার কথা।

অন্ধের কাছে দিন ও রাত্রি এক
বধিরের কাছে শব্দেরা নির্বাক।

তবুও জীবন স্বপ্নের সহগামী,
এবং মানুষ স্বপ্নের চেয়ে দামি

বৃষ্টিতত্ত্ব

এবং তোমার আত্মার কল্পনার আবেগদীপ্ত সঞ্চরণ
ধরা থাকে একটি প্রতিমায়, একটি নীতি গল্পে-গ্যোটে।

প্রথমে পরমাণু নিজবলে সংস্থিত হলেন শূন্যতায়,
অতঃপর সংগঠিত হলো অণু।
অণু কহিলেন : হও…
আর অনন্তর অণু বিস্তৃত হতে থাকল পরমাণুময়।
ছয় দিবসব্যাপী সৃষ্টি হলো স্বর্গ, মর্ত্য।

প্রথম দিবসে সূর্যের অনুবর্তী হলো দিন, চাঁদের রাত্রি।
অসীমকে গাঁথা হলো কোটি-কোটি নক্ষত্রের ক্রুশে।
দ্বিতীয় দিবসে বৃক্ষ পাখি বরাহ হরিণ ব্যাঘ্র নানা প্রাণী,
তৃতীয় দিবসে সর্প দেবদেবী পর্বত প্রণালি,
চতুর্থ দিবসে অগ্নি-জল-বায়ু নদ-নদী সমুদ্রসমূহ,
পঞ্চম দিবসে মেঘ বজ্র জিন ও মানুষ এবং
ষষ্ঠ দিবসে অণুর অধিষ্ঠানযোগ্য সিংহাসন

অতঃপর সত্তর সহস্র-দিবস তিনি ধ্যানস্থ হলেন সপ্তম আরশে।
এত দীর্ঘ সময় হাহাকার করে উঠল ধরিত্রীমাতা,
ক্ষুধা তৃষ্ণা মন্বন্তর ছুটে এল
মানুষের চিরশত্রু লানৎপুত্র।
অনন্তর ক্ষরা নামল, অগ্নিবানে ভেসে গেল অবশিষ্ট সবুজ;
ধরিত্রী আর্তনাদ করে উঠল দেবদেবী বিনিদ্র
অণুর ধ্যান ভঙ্গের জন্য প্রত্যেকেই প্রার্থনারত।