গুচ্ছ কবিতা
নদীর নিখোঁজ-সংবাদ
জীবন গিয়েছে চলে জীবনের কুড়ি কুড়ি জোড়া-কুড়ি বছরের পার
তখন আমার মানুষ-জীবন ছিলো, মনুষ্য-শোভন জীবন অপার।
তখন কিশোরকাল, জীবনানন্দ-নন্দিত ছিলো প্রতিদিনকার ভোর
সজনে ফুলের সফেদ চিবুকে কাঁচা রোদ বার্তা দিতো অসীম আলোর।
তখন জীবনে হৃদয়খেলার ভীরু হাতছানি
ভালোলাগা শিহরণ, অচেনা নাম-না-জানা অনুভবে কেঁপে ওঠা
তখন বকুলবেলা, লুকানো আয়না ভাঁজ খুললেই
কার যেন আবছায়া মুখ, চকিত বিদ্যুৎ বুঝি-
বিকেলের সহজ খেলার সাথী, তবু দিনমান আড়ালে আড়ালে
টনটনে ব্যথায় উতল ক্ষণে ক্ষণে অনামা শিহর।
তখন বিস্ময়-ভরা জাদুকাল-
যুবতী ধানের ঘ্রাণ, তার নীরব গোপন গাঢ় গর্ভদুধ,
সদ্য-হেমন্তের মাঠভরা মায়া, কচি ভোর- আমার রঙিন পাঠশালা।
ধান কাটা হয়ে গেলে হু’ হু’ শূন্যতায় খোলাবুক রিক্ত জমি
গোছা গোছা শুষ্ক রুক্ষ মুথা, অগভীর ধানের শেকড়-
সে-ও কিন্তু জীবনের অনুষঙ্গ, শীত-তাড়ানিয়া সুলভ জ্বালানি।
আলপথে দূর্বাঘাস তখনো সবুজ, অমেয় প্রাণের দুরন্ত প্রতীক
ততদিনে চষাক্ষেতে রাইশস্য মেলেছে সবুজ ডানা
তিল তিসি মসুরের ডাল, খেসারির চিরল সবুজ পাতা,
সর্ষেফুল- দিগন্তে হলুদ ঢেউ, সোনা সোনা কাঁচা সোনা ঢেউ।
তখন আমার কিশোর প্রণয়-
বুকের ভেতর ধড়ফড়-করা কচিপাতা ভয়ের বাতাসে কাঁপে
পায়ে পায়ে শাসনের বেড়ি, বাৎসল্যে উদ্বিগ্ন স্বজন
তবু হৃদ-জলে নিবিড় গোপন তার মুখ, তার মুখ, তার মুখ … …
মন-যমুনার দু’কূল ভাসিয়ে তরঙ্গ উছল, জলে ভাসে নবীন দু’চোখ
তখন আমার নামায়নহীন কৈশোরিক প্রেম, নিকষিত হেম।
আহা! তখন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ আয়ু- আশাদীপ্ত মানুষ-জীবন,
শালিক চড়ুই টিয়া ফিঙেদের চপল ডানায় উড়ে চলে
তন্ময় মন্ময় আমার প্রতিটা দিন, মানুষ-জীবন।
আহা মানুষ-জীবন ! স্বপ্ন আর সম্ভাবনা। বিকাশের পরিপূর্ণ নাম।
আজ এই কুড়ি কুড়ি দুইকুড়ি বছর পেরিয়ে এসে
জরাজীর্ণ মরা শীতে বেঁচে-থাকা লড়াকু পাতার উদ্গ্রীব চোখ
এক সুদূরকালের পলাতক কিশোরের খোঁজে
নিষ্কলুষ হেম-প্রেম, ভরা জোয়ারের নদীটির খোঁজে
তোলপাড় করে ফেলে মাটির পৃথিবী-
দূরে গির্জায়, মন্দিরে সন্ধ্যারতির ঘণ্টায়, আযান-ধ্বনিতে
উচ্ছল সময়-নদীর নিখোঁজ-সংবাদ সোচ্চার ধ্বনিত হতে থাকে।
দূরত্ব
তখন বিকেল । রোদেরা ফেরেনি তবু ঘরে ।
রোদেরা তখনো ডানা মেলে আছে জনপদে
মানুষের চোখে , বুকে, কাঁচে ও কার্পেটে,
সড়কের পিচে, সবুজের শীর্ষে
দাহ হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে যাবতীয় স্নিগ্ধতায় ।
তাতানো রোদের নিচে একটি শ্যামল মেয়ে ।
মেয়েটি হাঁটছে দ্রুত । মেয়েটি পুড়ছে ।
মেয়েটি ভীষণ একা । মেয়েটি পুড়ছে ।
পুড়তে পুড়তে পৌঁছে যেতে চাচ্ছে
একটি গন্তব্যে ।
মেয়েটি ছুটছে ।
ছেলেটি ঘরে নেই । ছেলেটি ফেরেনি ।
দরোজার সন্ধিস্থলে জড়িয়ে রয়েছে শীতল ধাতব ।
ছেলেটি ফেরেনি ।
খরাপোড়া নগরীর বিশাল জান্তব পেটে
ছেলেটি একটি বিন্দুর আকারে মিশে গেছে ।
মিশে আছে ব্যস্ততায় । মানুষের ভিড়ে, কোলাহলে ।
ছেলেটি ফিরবে । সময় তখন বেপথু হারিয়ে যাবে
প্রতিকূল সময়ের জলে । সময় হবে না ।
ছেলেটি ফিরবে । তখনি ফিরবে, অসময়ে ।
ঘর তাকে একবার টেনে আনবেই ছাদটির নিচে-
‘ঘর তাকে ঘরে আনবে তো ? ঘরের মায়াতে ?’
মেয়েটি ভাবলো । একলক্ষ পাখি তার
বুকের ভেতর পাখা ঝাপটালো , উদ্বেগে আকুল
সহসা উঠলো কেঁদে অযুত আহত কবুতর ।
নিরেট দেয়ালে আর বদ্ধ দরোজায় বিষণ্ণ আর্তিতে
আছড়ে পড়লো একাকী বাতাস ।
মেয়েটি আশ্রয়হীন মুখ ফেরালো আবার পথে ।
মেয়েটি ফিরছে । ফিরে যাচ্ছে একা ।
চোখ তার ম্লান, তবু চোখ তার উৎসুক ।
ঘরমুখো প্রতিটি মানুষ ছেলেটির মুখ
ধরে আছে প্রতিটি আলাদা মুখে ।
ফুরিয়ে আসছে ফিরবার পথ । দূরত্ব বাড়ছে ।
দূরত্ব বাড়ছেই ।
ছেলেটি জানে না, মেয়েটি সে দাহের বিকেলে
ভালোবেসে বড়ো বেশি নারী হয়েছিলো ।
মেয়েটি ফিরছে । শ্রাবণের মেয়ে । একা … …।
দু’চোখে প্লাবন, ভালোবাসা ফিরে যাচ্ছে একা ।
উদ্যত তোমার সঙ্গিনেরা
আমাকে হত্যার জন্য উদ্যত করেছো যে মারণযন্ত্র
একদিন সে নির্ভুল ঘুরে যাবে তোমার দিকেই
তোমার হাতের টিপ চিনে রেখে খুঁজে নেবে তোমার ঠিকানা
আমি নির্যাতিত মানবতা, দয়া করো, আমাকে রেহাই দাও।
আমি কৃষ্ণ আফ্রিকান, ঈশ্বরের দলিত সৃজন
আমি ফিলিস্তিনের সন্তান, স্বাধীনতা-পিপাসায় আর্ত যুদ্ধরত
জন্ম-মুহূর্তেই মৃত্যুর সাথে মিতালি আমার
আমি সিরিয়ার রক্তক্ষয়ী রণে ক্লান্ত বিধ্বস্ত বিপন্ন মানবতা
মৃত্যু-উপত্যকা আমার বসতভূমি- আমাকে বাঁচাও।
ইরাকে মরেছি আমি অজস্র সহস্রবার
ইরানে খড়গ-তলে মাথা পেতে আত্মাহুতি দিয়েছি অযুত
যুক্তরাষ্ট্রে ঘাতকের হাতে ম’রে যেতে যেতে
জেনেছি জন্মের পাপ- ধর্ম আর বর্ণই আমার অপরাধ।
আমি নির্যাতিত মানবতা, দয়া করো, আমাকে রেহাই দাও।
আমি বাংলার দাঙ্গায় নিহত নিরপরাধ, গৃহহীন স্বজন সুজনহীন
ভিটেমাটি স্বদেশ-হারানো অগণ্য রুদ্ধ প্রাণের অপচয়।
আমি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতাকামী যুবা
তিরিশ লক্ষ অমর শহীদ-
বুলেটে ঝাঁঝরা বুক, বেয়োনেটের খোঁচায় বিক্ষত শরীর,
শরীরের নিচে কালোপানা-লাল বাসি রক্তের নহর।
অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর ধর্ষিতা গর্ভিণী আমি
আমার যোনীতে পশুর দলনে ছিন্নভিন্ন ক্লান্ত রক্তজবা।
আমার যোনীতে পশুর দলনে ছিন্নভিন্ন ক্লান্ত রক্তজবা।
আমি রাতারাতি রাজাসন থেকে ধুলায় লুটিয়ে-পড়া পরাস্ত ভুস্বামী,
যুদ্ধ-বিপর্যয়ে ম্লানমুখ বাংলায় সোমত্ত কন্যার ভয়ার্ত জনক-
অনিবার্য বাস্তুচ্যুতি, অনিশ্চিতি, অন্ন ফেলে পলায়ন, লাঞ্ছনাতিলক
আমার নিয়তি।
আমি নির্যাতিত মানবতা, দয়া করো, আমাকে রেহাই দাও।
আমি ধর্ষিতা রোহিঙ্গা নারী
গণধর্ষণে অলক্ষ্যে খ’সে গেছে অমূল্য প্রাণের বীজ
আমি অসহায় পিতা
নামশূন্য হাজারো সন্তানের খণ্ডিত লাশ পাহারায়
আমি বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলে ভাসমান
প্রাণভয়ে পলায়নরত আরাকান-বাসী, আমাকে বাঁচাও-
নিজের ভূভাগ থেকে, জন্মের মৃত্তিকা থেকে উৎখাত
আমি লক্ষ লক্ষ নিরন্ন উদ্বাস্তু। আমাকে বাঁচাও।
আমি নির্যাতিত মানবতা, দয়া করো, আমাকে রেহাই দাও।
আমি নাইজেরিয়ার শত শত ক্ষুধার্ত কংকালপ্রায় শিশু
আমার প্রাণ-বাঁচানো অন্নের গায়ে ধর্মের পোশাক পরিয়ো না
আমাকে দিয়ো না কোনো সম্প্রদায়-আবরণ
বিপন্নতাই চূড়ান্ত লেবাস আমার- আমাকে বাঁচাও !
অন্যথায় তোমার প্রশিক্ষিত প্রাণঘাতী মারণ-দানব
অতর্কিতে একদিন পাল্টে দেবে নিজেদের গতি
আমার রক্তের ধারা বেয়ে বেয়ে ছুটে আসবেই
অদম্য ঘাতক রক্তবীজ, তোমার বিনাশ-
উদ্যত তোমার সঙ্গিনেরা ঘুরে যাবে তোমাকে নিশানা করে।
আমি যুগে যুগে ধর্মান্ধের পাশবিক হত্যাযজ্ঞে
অসহায় নরবলি- ক্ষমা করো, আমাকে রেহাই দাও
আমি নির্যাতিত মানবতা, দয়া করো, আমাকে রেহাই দাও।
পেছনে ডেকো না
হারিয়ে যেয়ো না মিঠাজল, প্রিয়পাতা, সবুজ সুহৃদ
হারিয়ে যেয়ো না মুখচম্পা, কৈশোরিক চাঁদ-ছোঁয়া নিদ
হারিয়ে যেয়ো না প্রিয়পদ্ম, বর্ষালক্ষ্মী- শৈশবের মুখ
হারিয়ে যেয়ো না জোনাকিরা, রাত ভালোবেসে খোঁজো সুখ।
আড়ালে থেকো না প্রিয় কুঁড়ি, ফুটে ওঠো রোদের সোহাগে
আড়ালে থেকো না কাশবন, ঢেউ তোলো- ধু ধু চর জাগে
আড়ালে থেকো না রাতচরা, এ প্রহর তোমার একার
আড়ালে থেকো না শ্রুতি-চোখ, এই লগ্ন প্রবাহ দেখার।
আমাকে ডেকো না জলগন্ধী নিরালোকে গাঙুরের ঘাট
আমাকে ডেকো না রাইশস্য, বারোয়ারি পণ্য ভরা হাট
আমাকে ডেকো না সুখনিদ্রা, অনায়াস-ভাগ্যে-জেতা হীরা
আমাকে ডেকো না প্রিয় ভোর, স্থলপদ্ম- পীড়িত অধীরা।
ছড়িয়ে দিয়ো না স্মৃতিজল, সিন্ধুকের লুকানো আতর
ছড়িয়ে দিয়ো না গ্লানিময় পরাজিত হৃদয় কাতর
ছড়িয়ে দিয়ো না বৃন্তচ্যুত পাতাদের গোপন কাহন
ছড়িয়ে দিয়ো না গুপ্ততথ্য- ছদ্মযুদ্ধে কে কার বাহন !
গোপনে রেখো না কৈশোরিক সরলতা, মোহের ম্যাজিক
গোপনে রেখো না জালকাটা পাখিটির প্রেম সামাজিক
গোপনে রেখো না বাজিকর, বৈদ্যনারী, সাপের চালান-
গোপনে রেখো না ইবাদত, জপমালা, ঠাকুর দালান।
কখনো ভুলো না জোড়া দীঘি, আম নিম হিজলের ছায়া
কখনো ভুলো না আলপথ, পাকা ধান, ছিপঝাড়- মায়া,
কখনো ভুলো না ভরা বর্ষা, উজানের রুপালি মাছেরা
কখনো ভুলো না- খরাকালে কেঁদেছিলো মুমূর্ষু গাছেরা।
পেছনে ডেকো না কালো দিন, গুম-খুন, বিশ্বাসহীনতা
পেছনে ডেকো না জরাজীর্ণ মৃত সাধ, অপার দীনতা
পেছনে ডেকো না অপবাদী নিন্দুকের ক্রোধের করাত
পেছনে ডেকো না সূর্যালোকে নেমে আসা দুর্যোগের রাত।।
লগ্নভ্রষ্ট
কার মুখ চেয়ে সাজিয়ে রাখছো রুদ্ধ পুষ্পবাণ
কার কাছে চাও শর্তমুক্ত ঠাই-
সব জেনো মিছে, যদি জেনে থাকো
শূন্য অভ্র, চারিপাশ ফাঁকা, প্রিয়জন পাশে নাই।
কার বিপরীতে শাণিয়ে রাখছো ক্রুদ্ধ অগ্নিবাণ
কার মুখে চাও কম্প্র নম্র চোখে-
সব স’য়ে যাবে ঝড়-জল-খরা
স্বর্ণকুম্ভ মাটি হয়ে যাবে, নিয়তি যদি না-রোখে।
কার স্মৃতি পুষে বাসনা ভুলেছো, পূর্ণ অধিষ্ঠান
কার হাতে চাও দিব্য মুক্তি পেতে-
সে-ই হবে দেখো অজেয় শেকল
পূর্ণস্থিতি কোথাও পাবে না, কোথাও পাবে না যেতে।
কার হাত ছুঁয়ে উড়বে আকাশে স্বপ্নঋদ্ধ প্রাণ
কোন ঘাটে যাবে লগ্নভ্রষ্ট তরী-
বলবে না কেউ, চাঁদ ডুবে যাবে,
স্বপ্নচ্যুত আহা ভুল বিভাবরী! আহা, ভুল বিভাবরী!
উপাসনা-৭
আবার খোয়াব দেখে ঝিলমিল করে কার্তিকের মাটি।
চিত্রময় ধূসর কুয়াশা থেকে আমি তুলি ফলবান আশা-
অনাবাদী মানবজমিনে ফের সুবাতাস বয়ে যাবে,
আন্দোলিত সুখে হাসবে আবার শস্যময় প্রগাঢ় সবুজ
চাষবাস, হেমন্তের গার্হস্থ্য সুদিন, আগামীর শিশু
যেন ফের সত্যিই সেসব হবে সত্য- স্বপ্ন দেখি।
বৈরি জলধারা সবলে সরিয়ে পলিময় চর জেগে উঠবার
দূরাশায় মরা কার্তিকেও জমা রাখি বীজধান-
পরিচর্যা করি তার,
ওমের আশায় যত্ন করে তুলে রাখি অনন্য সীবন।
একদিন আমরা যুগল শয্যা পেতে আকাশ-গঙ্গায়
তরল চাঁদিনী-ছোঁয়া তরুণ রাতের গর্ভে
জমা করে দেবো বিস্ময়ে নীরব লগ্ন
জমা করে দেবো খণ্ড মহাকাল,
যেন ফের সত্যিই তেমন হবে সব- স্বপ্ন দেখি।
নিরুদ্বিগ্ন ঘুম হবে একদিন- দূরাশায় থিতু রাখি মন
আশ্বিনের শেষ ভোরে
নগ্ন পায়ে হেঁটে যাবো ঘাসমোড়া সরু আলপথে।
সহস্র বরষা পার হয়ে আমি তো এসেছি ফিরে
শস্যঋদ্ধ হেমন্তের নিবিড় দুয়ারে
আমি স্বপ্ন, আমি ফলবতী আশা, মেঘ আমি সুদূরের
হাত বাড়ালেই হাতে পাবে- আমি সেই মূর্ত বাস্তবতা,
অগ্নি-জল-মাটি ও বাতাসে আমি চিরন্তন বীজের ধারক।
আমি বারবার স্বপ্ন দেখি, বারবার স্বপ্ন ভেঙে যায়
বারবার সত্য হাতে পাই, বারবার সত্য সরে যায়।
আমি বারবার আলো জ্বালি, ধুলিঝড়ে আলো নিভে যায়
আমি বহুবার মাটি খুঁজে পাই, মত্তজলে মাটি ধু’য়ে যায়।
তবু আজো ধরিত্রী বলেই আমি বীজের সবল মহাজন
হাতখানা ধরেছো সত্যই যদি- পাথর সরাও, পথ হাঁটি।
ধূপের কথা
আমার চোখের জল মায়াময় মাটিতে পড়ুক
মাটি তো শান্ত সর্বংসহা-
আমার পীড়িত দিনে লাঞ্ছিত অশ্রুতে
তারো যদি কিছু ঘটে যায় চিত্তের বিকার
তারো যদি উপজিত হয় বুকচেরা দীর্ঘশ্বাস,
জেনো হে মানুষ, একদিন আমিও ছিলাম মাটি।
আমার হৃদয়-পোড়া গাঢ় ধূম বাতাসে উড়ুক
বাতাস তো দু’খ তাড়ানিয়া-
আমার দুর্গত আয়ু, রুদ্ধ হতাশ্বাসে
তারো যদি দম অতর্কিতে বন্ধ হয়ে আসে
তারো যদি শ্বাসকষ্ট হয় রুদ্ধ বেদনার ভারে,
জেনো হে মানুষ, একদিন আমিও ছিলাম বায়ু।
আমার দাহের শিখা পুড়ে দি’ক ধূপের শরীর
ধুপ তো নীরব আত্মাহুতি-
আমার ক্ষয়ের লগ্নে বঞ্চনা-অগ্নিতে
তারো যদি আর্তনাদ করে ওঠে প্রাণ
তারো যদি অসহ যন্ত্রণা হয় অবমাননায়
জেনো হে মানুষ, একদিন আমিও ছিলাম ধূপ,
একদিন আমিও নীরবে পুড়ে গেছি
একান্তে গন্ধবিধূর- অপরের প্রয়োজনে।
আমিও মায়ার্দ্র রোদে নিরাময় করতে চেয়েছি যত ক্ষত-
মানবতা সব জানে, সব মানে, করুণা ছিটাতে ভালোবাসে
মানবতা দুর্গতজনের সবল সাহসী স্বর আর
স্বাবলম্বী মেরুদণ্ড সহজেই সহ্য করে মানতে পারে না।
আদমসুরত
রাত্রি যখন ভোরের গর্ভে আড়মোড়া ভেঙে জাগছে
ঘুমভাঙা ভোর সুবেহ সাদেকে দ্যুতির নকশা আঁকছে,
বোজা পল্লবে চোখ দু’টি তবু ঘুম ঘুম গান গাইছে
শ্রান্ত শরীর রাত পেরিয়েও একটু আয়েশ চাইছে-
কুয়াশা-চাদরে মোড়া চারপাশ অচেনা অচেনা লাগছে
রাত-জেগে-থাকা প্রহরী পাখিরা শেষবার সুরে ডাকছে-
তখন কে যায় পথ ভুলে গিয়ে ভুলপথে ফের হাঁটতে !
টেনে ধরো তাকে, আঘাতে জাগাও অমানিশা-ঘোর কাটতে।
তখন কে আসে, সুরে ভ’রে দেয় জনপদ, ডাকে- ‘আয় রে!
চিতার আগুন জ্ব’লে নিভে গেছে, সুসময় বয়ে যায় রে !’
আগুনে বাতাসে মাটি আর জলে আদমসুরত হাঁকছে
তোমারি আকাশে উৎসব জুড়ে উদিত সূর্য ডাকছে।
পা্র হয়ে গেছে গ্রহণের কাল, এসো রোদ-মেশা আলোতে
নবান্ন করো- অঘনে জ্বালিয়ো দীপাবলী, ঘন কালোতে।
এই সুসময় চিনে নিতে হবে, বুনে দিতে হবে বীজকে
পলির আদরে পাতারা জাগবে, কুঁড়ি মেলে দেবে নিজকে।

