চার সোয়া পাঁচ পর্ব-২
ওর বড় দুইভাই কানাডায় সেটেল্ড। দেশের সাথে তেমন যোগাযোগ নেই। বাথরুমে কাপড় বদল করে শিউলির অনুরোধে ড্রইং রুমে বসেন খান।
ভাইজান, দই-মিষ্টি আনি আন্নের লাই?
কৌতুহল, মিটাতে খানের প্রশ্ন, ওরাতো থাকে না, এ ঘর দেখা শুনা করে কে?
শিউলি একটু হেসে বলে, জ্বে আঁই। ডেইলি হরিষ্কার না কইল্লে আর গা ঘিন ঘিন করে। কাইল আন্নে আইবেন হুনি মানিকরে কই উপরের হানির ট্যাঙ্কি হরিষ্কার করাই মটর ছাড়ি হানি উডাই রাখছি।
ওর বাচন-বর্ণনা খানের মনকে পরিপাটি করে দেয়। আবারও খানের ভাবনায় আসে এই শিউলি কে? নিশ্চয় কাছের কেউ হয়ে থাকবে, এখনও চিনে উঠতে পারেননি অথচ ও খানের রুচি ধরে বসে আছে।
হেইবার চাচি মরণের হর স্বপন ভাই আঁর কাছে ঘরের চাবি দি কই গেছে; শিউলি, ঘরতো কইল্লাম মা’র লাই। মা তো চলি গেলো। ঘর আন হরিষ্কার করার দায়িত্ব তুই নে। আঁই কথা বুঝি হালাইছি। কইলাম ঠিক আছে, আন্নের ঘর হরিষ্কার রাখনের দায়িত্ব নিলাম।
ওর চোখে তাকিয়ে খানের জিজ্ঞাসা, টাকা পয়সা পাঠায়? শিউলি মাথা নিচুু করে, কিছুটা আহত যেন! একটা দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে বলে, আঁর স্বামী মরি গেছে, এক মাইয়া বিয়া দিছি। কোনমতে চলি যায় দিন। হেতন ছয়মাস ঠিক মতনই টেঁয়া হইসা হাডাইতো….।
মেয়েটা চুপসে গেল। জানালা দিয়ে দৃষ্টি গলিয়ে নিজের দুঃখবোআঁকে যেন বের করে দিল। প্রসঙ্গ পাল্টে বললো ভাইজান, আন্নে কইছেন দই-মিষ্টি হরে খাইবেন, আইন্তামনি? মেয়েটি ছুটে গেল।
খান ভাবছেন। ওখানে কেউ ছবি তুলে দিলে ডলার দিতে হয়। প্রেমিক-প্রেমিকা একসাথে দিন কাটিয়ে খাবার সময় হিজ্ হিজ্, হুজ ্হুজ্।
অবলা এক গ্রাম্য নারীকে এক কথায় দায়িত্ব চাপিয়ে পারিশ্রমিক ছাড়া করে রেখেছ স্বপন। কত বছর কত দিন!
শিউলি এক প্লেট দই-মিষ্টি এনে সামনে টেবিলে ঢেকে রাখে। সময় মতন খাইয়েন, আঙ্গো খিলপাড়ার কদমার দোকানের দই, টক দই, ভালা লাগবো।
এ মেয়েতো খানের রুচির কথা জানে। টক দইতো ডাক্তারের পরামর্শে নিত্যদিনের খাবার।
ও ছুটে গেল বাথরুমে। খানের অনুমান মিথ্যে নয়। খানের ঝুটা পাঞ্জাবি, পায়জামা ধুঁয়ে ছাদে গেল রোদ ধরাতে। ফিরে এসে বললো, পাতলাতো অল্প রইদে হুুয়াই যাইবো। আবুল ভাইর ঘরে ইস্তারি আছে, ডলি দিউম হরে।
স্বপনের ঘরের পাশ ঘেঁষে পশ্চিমে রাস্তা। আবুলের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। নিজেকে পলাতক মনে হচ্ছে খানের। মেহমানের সাথে বসে একসাথে খাবার ইচ্ছে ছিল।
গ্রামে বিয়ের চলনে দেরি করাটা সাধারণ ব্যাপার। আত্মীয়-স্বজনের হাতে পায়ে ধরে রাজি করাতে হয়। বিশেষ ব্যক্তিদের এ ধরণের মান অভিমান একটু বেশিই হয়। বর পক্ষের মেহমানদের আসতে দেরি হবে খবর পেয়ে আবুল খানকে অনেকটা জোরাজুরি করে ঘরে বসে খাইয়ে দেয়। বিষয়টা খানের মনপুতঃ হয়নি।
এতদিন পর গ্রাম্য পরিবেশে ভিন্নরকম পরিস্থিতিতে নিজেকে যুক্ত করার ইচ্ছাটা মাটি হয়ে গেল। আবুলের যুক্তিটাও যুক্তিযুক্ত। ওর কথা আন্নে শহরের মানুষ-টাইম মতন খান, ঘুমান। এককানা বেশকম অইলে অসুবিধা অইতে হারে। আন্নের অসুবিধা অইলে আঙ্গো বেকের অসুবিধা। আঙ্গো বিয়ানের নাশ্তা খাইতে এগারোটা, দুপুরের খানা বিয়ালে, রাইতের তো কথাই নাই।
মেহমানদের কেউ কেউ খাবার শেষে স্বপনের খোলা দরজায় উঁকি মেরে খানকে একনজর দেখে ফিরে। একঘর আড়ালে বাবুলের কথা শোনা যায়।
আঙ্গো বড্ডাভাই অন রেস্টে আছেন। সরকারের কত্তোবড় অফিসার আন্দাজ কইত্তেন হাইত্তেন্ন। সরকারের রাষ্ট্রের দূত। দেশ-বিদেশে চাকরি। হারা দুনিয়া গুরা শেষ করি অন বড় কর্পোরেশনের ডাইরেক্টর। কত্ত ব্যস্ত মানুষ! গাড়ি আছে হেতনের তিন চাইর খান। কাচারির সামনে একখান দেখছেন তো! খুব দামি। গাড়ি চালাই দিলে ড্রাইভারের সামনের আয়নায় নানান কিসিমের রঙ খেলি যায়। গরমের সময় আরামের ঠাণ্ডা। আঁই হেতনের লগে গাড়িতে চড়ছি কয়বার। দাম কত আইবো জানেন? একটু থেমে বলে আঁইও আন্দাজ কইত্তে হাইত্তামনো। অফিসথুন দিছে আরো দুইখান পাজেরো গাড়ি। কত সুযোগ সুবিধা। ঢাকায় সাত তলা দালান। দুই ছেলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার। বিদেশথুন লেহা হড়া কইচ্ছে। দুই মাইয়াও বড় শিক্ষিত। জামাইর লগে আমেরিকায় থায়। একটু থেমে বলে, আপন রক্ত বলিইতো আঁর মাইয়ার বিয়াত আইছে। নইলে কী আনন যায়, ভাঙ্গা রাস্তা, এসি নাই ঘরে, কত ছিদ্দত গেরামে। কেন্নে আয় যায়। শোকর আল্লার কাছে। হেতন আই আঙ্গো ইজ্জত বাড়াইছে।
শিউলি খোলা দরজায় নক করে ঘরে ঢুকে। খান ভাবেন, মেয়েটি আদব-কায়দা সবই জানে। একটু দূরে থাকতেই বলে, ভাইজান, একখান আবদার।
খান ভাবছেন, হয়তো বলবে ঘরের টিন নাই, ছেলের চাকরি দিতে হবে; নয়তো টাকা দেন ছেলেরে দুবাই হাডাইয়্যুম। একটা দুর্ভাবনার বেড়াজালে আঁকে থাকেন। শিউলি মুখের পান লুকিয়ে ফেলে আঁচল দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে দরজায় দাঁড়িয়ে বলে, আন্নে আঙ্গো আপনজন। বাড়িত একখান দালান বানাইলে আঙ্গো ইজ্জত বাড়তো। ভিটায়তো কিছু নাই, এতে হেতে কদুগাছ লাগায়, দুই গাছের মুড়া করে। বৃষ্টি-বাদলে মাডি ধুই চলি যায়। বড় কষ্ট লাগে। ওর গলা যেন ভিজে আসছে। আবুলের কথা ছিটিয়ে আসে। না না হেতনের ম্যালা জমিন। বাড়িত ঘর ভিটা, নিচে ধানি জমিন, বাগান, কিচ্ছুর অভাব নাই। বেকগিন আঁই চাই রাখি। এবার ভাইজানরে কইছ্যুম একখান দালান উডাইতে। বড্ডা করি। সুন্দর করি। গেরামে তিনতালার বেশি দরকার নাই। আঁর কথা বড্ডাভাই হালাইতে হাইত্তো’ন। শিউলি খানের দিকে তাকিয়ে একটা কিছু শুনতে চায়।
বাবুলের কথার প্রতিক্রিয়া মনকে অশান্ত করে। ভাবেন, গাড়িতো একটাই ঋণে ক্রয় করা। কর্পোরেশনের পরিচালক হিসেবে পাক্ষিক মিটিংয়ের জন্য একটা বরাদ্দ থাকে। স্ত্রী সামাজিক যোগাযোগের জন্য স্বামীর অপ-ক্ষমতায় অফিস থেকে আরেকটা কার চেয়ে নিয়েছে। কাজ না থাকলেও গ্যারেজে অপেক্ষায় থাকে গাড়ি আর ড্রাইভার। পৈত্রিক জমিতো প্রায় সবটুকু বিক্রি হয়ে গেছে। বাকি থাকলো ভিটে আর এক চিল্তে বাগান। স্ত্রীর পরামর্শ বেঁচে দাও। কয়টা নারকেল সুপারি পেয়েছ এ জীবনে?
আবুল খানের ঢাকার বাসায় নারিকেল, সুপারি, কলার কঁাদি, চালের গুঁড়া নিয়ে মাঝে মাঝে যাওয়া আসা করে। স্ত্রীর কথায় ওসব ছুতো। চারটা-পাঁচটা নারিকেল নিয়ে আসলে ভাড়া দাও, এটা-ওটা দাও।
নিজেকে বড় অসহায় মনে হয় খানের। আয়নায় নিজেকে তাকিয়ে দেখেন তৃতীয় রূপ। খানের সেকেন্ড হোম সিঙ্গাপুর আবুল জানে না। জানলে নিশ্চয়ই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হতো। নিজেকে প্রশ্ন করেন খান। বহু দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন জীবনভর, চাকুরির সুবাদে সরকারি খরচে।
ভাবনায় হোঁচট খায় একজনকে বেয়াই সন্বোধন করে আবুল বলে, আঙ্গো এলাকায় কতজনকে চাকুরি দিছে। হেতনের কাছথুন কেউ হিরি আইয়ে’ন।
এ কথার সত্যতা খানের কাছে নেই। বড় অসহায় লাগছে। চাকরি জীবনে সততার দোহাই দিয়ে আত্মীয়-স্বজন কাউকে কাছে ভিড়তে দেননি। চাকুরি প্রার্থীদের ধম্কে দিয়েছেন, ভালো লেখাপড়া নেই বলে। স্বজনদের কাছে শামুকের কঠিন খোলসের রূপে আর্বিভূত হয়েছেন। খান স্মরণ করেন কর্পোরেশন পরিচালক হিসেবে মেয়াদ পূর্ণ হতে আর অল্প ক’দিন বাকি। তারপর স্বজনদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা থাকবে! শহরের প্রতিবেশিদের ক’জন তাকে জানে? ক’জন তাকে নিয়ে ভাবে। নিজের কর্মস্থলে হয়ে যাবেন অবাঞ্চিত।
অতীতে ফিরে যান খান। বাবা ছোটচাকুরি করেও দু’মাসে একবার গ্রামের বাড়ি যেতেন। গ্রামের লোকের ধারণা তিনি একজন ভালো মানুষ। বিশ-পঞ্চাশ বা শ’টাকা দিয়ে অনেককেই সহায়তা করেছেন, তাদের কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছেন। বিবাদ মিটিয়ে দিয়েছেন, কারো জমিনের সরল রেখা বের করে বৈরিতা মিটিয়ে দিয়েছেন। দু’চার জনের চাকুরি দিয়ে পরিবারের আয়ের সংস্থান করেছেন।
খানের দাদার ছিল ত্রিশ শতক ধানের জমিন আর দশ শতক ভিটা। ভিটায় মরিচ, ডাল, পেঁয়াজ, ধনেপাতা চাষ করতেন। একটা দুধেল গাভি পালন করতেন। দাদা প্রতিদিন একসের-সোয়াসের দুধ বিক্রি করতেন খিলপাড়া হাটে। আট-দশ আনা পেলে গামছার খুঁটে সদাইপাতি নিয়ে দাদির হাতে তুলে দিতেন। বাবা তখন তার সংসার নিয়ে শহরে থাকতেন। কাচারির সামনে দাঁড়িয়ে বড় নারিকেল গাছটার মাথা দেখছেন খান। প্রায় শতফুট উচ্চতায় শতবছর বয়েসি নারিকেল গাছটা। দাদার হাতের লাগানো! জীবন্ত স্মৃতি রক্ষায় ব্রত যেন গাছটা। এখনো মাথা ভরে আছে ডাব-নারিকেল। নারিকেলের পাতাগুলো দোল খাচ্ছে বাতাসে। ছোটবেলা দেখেছেন দাদা নিজেই ডাব-নারিকেল পাড়তেন। বর্ষাকালে হলদে সুপারি বিক্রি করতেন। ফেরার পথে মুড়ি-মোয়া নিয়ে আসতেন নাতিদের জন্য। দাদি নারিকেল কুরিয়ে এ্যালুমিনিয়ামের থালায় গুড় মিশিয়ে খেতে দিতেন।
-বড্ডাভাই, চা খাইবেন?
খানের ভাবনা হোঁচট খেল। খানের, কাছাকাছি দাঁড়িয়ে শিউলি।
মেহমানদের অনেকেই বিদেয় নিয়েছে। ওর চা শব্দটার মধ্যে একটা ধূমায়িত নেশায় গন্ধ অনুভূত হলো। ও কী করে জানে খানের এককাপ চায়ের এখন প্রয়োজন। সায় দিতেই বললো; আন্নে স্বপন ভাইর ঘরের দিকে যান; আঁই চা লই আই। ও ফিরে যেতেই খান ডেকে বলেন আমার ড্রাইভারকেও এককাপ দিও। আবার বললেন; চা এখানেই নিয়ে এসো।
ওম্মা কিয়া কন? ডেঙ্গার মধ্যে চা খাইবেন? আবুল ভাই হুইনলে আঁরে এক্কাই ছেঁচি হালাইবো। খান স্বপনের ঘরেই ফিরে আসেন। সিলিং ফ্যানের সুইচ অন করেন, কারেন্ট নাই। শিউলি জানালাগুলো আগেই খুলে রেখেছে। তেমন গরম অনুভূত হচ্ছে না। কে এই মেয়েটা! ও যে প্রশ্রয় দিচ্ছে, নিকটজন কেউ না হলে এমনতো হওয়ার কথা নয়। কাউকে জিজ্ঞেস করার ফুরসতও নেই খানের। জবাবটা যদি কারো কাছে এমন হয়, ওম্মা শিউলিরে আন্নে চিনেন না? হিগ্গাতো আন্নের অমুক-তমুক হয়। তাহলে লজ্জায় পড়তে হবে। স্বপনের সোফায় আয়েশ করে বসেন খান। শহরের আভিজাত এলাকার ফার্নিচার। ফিটিংস দেখে কৌতুহল হলো, রুচির পরিবর্তন না বিবর্তন।
দক্ষিণের দেয়ালের আয়নায় টাঙ্গানো আর্মি ড্রেস পরিহিত এক জোয়ানের ছবি। এগিয়ে যান খান। আলোর স্বল্পতা থাকলেও রঙচটা ছবিটা চিনেছেন। অবশ্য চিনতে পারার কারণ আগেই অনুমিত ছিল। স্বপনের দাদা মিলিটারি কাদের।
১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে লাহোর সেক্টরে শহিদ হন। বেঙ্গল রেজিমেন্টর জোয়ান। ভারত লাহোর সেক্টরে আক্রমণ করলে সুইসাইডাল স্কোয়াডের মিলিটারি কাদের বুকে বোমা বেঁধে আগত ভারতীয় ট্যাঙ্কের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বাঙালি রোজিমেন্টের অনেকেই শহিদ হয়ে প্রতিপক্ষের মিলিটারির অগ্রযাত্রা নসাৎ করে দেয়।
পাকিস্তান সরকার তাকে কী যেন খেতাব দিয়েছেন, মনে করতে পারেন না খান। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান তার বাবা-মার নামে টেলিগ্রাম পাঠান। যুদ্ধ শব্দের বিভীষিকা তখনকার পূর্ব পাকিস্তানেও ছড়িয়ে পড়ে। জেনারেলদের অহমিকায় প্রাণ যায় নিরীহ মানুষের।
খানের বাবার পোস্টিং তখন হবিগঞ্জ মহকুমায়। বাসার সামনের মাঠে ডব্লিউ, এম, এন, নকশায় ট্রেঞ্চ খোঁড়া হলো। হবিগঞ্জ শহর থেকে বার চৌদ্দ কিলোমিটার দূরে ভারতীয় সীমান্ত। দুইপক্ষেরই অস্ত্র শক্তির সমাবেশ জোরদার। রাতে সাইরেন বাজিয়ে নি®প্রদীপ মহড়া হতো।
খানের বাবার চেয়ে মায়ের আতংক বেশি। মায়ের ছয় ছেলেমেয়েদের নির্দেশ দিতেন একজন একদিকে যাবি। এক জায়গায় বোমা পড়লে সবাই যাতে একসাথে বিপদগ্রস্ত না হয়। ক্লাস সিক্সের ছাত্র তখন খান। আতংকের চেয়ে জাগতিক উল্লাসই বেশি ছিল।
মার কাছে খবর এলো গ্রামে যুদ্ধ হবে না। মা সন্তানদের রক্ষা করতে গো ধরলেন গ্রামে যাবার। খানের বাবা উত্তর মেলাতে পারেন না। দাদার ছোট্ট ঘরে দাদি থাকেন ছোট চাচিকে নিয়ে। মায়ের ইচ্ছা দাদার পূবের ভিটায় বাবা নতুন ঘর করবেন। টিনের চৌচালা ঘরে তিনটি রুম হলেও চলবে। বাঁশের বেড়াতেও মায়ের আপত্তি নেই। বাবার বদলির চাকুরি। ছেলে-মেয়েদের বছরের মাঝামাঝি স্কুলে ভর্তি, স্কুল পাল্টানো, নতুন-নতুন জায়গায় বারবার সংসার গোছানো, আবার ভাঙ্গা মার জন্য কষ্টকর। মার দাবি বিবেচনার আগেই যুদ্ধ থেমে গেল। বাবা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। সেবার বেঙ্গল রেজিমেন্ট দেখিয়ে দিল বাঙলিরা যুদ্ধ করতে জানে। পাকিস্তানীদের একাত্তর সালে দেখিয়ে দিল এর পূর্ণাঙ্গ রূপ।
শিউলি খানের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য চায়ের কাপটা একটু শব্দ করেই টেবিলে রাখে। খান তখনো দক্ষিণের খোলা জানালা দিয়ে অতীত খুঁজে ফিরছেন। পৌষের ধান উঠে গেলে নাড়া ক্ষেতে ফুটবল খেলা হতো। এ বাড়ির ও বাড়ির ছেলেরা মিলে দল হতো। প্রথমে সুপারি পাতার খোল দিয়ে প্যাঁচানো বল। তারপর টোকানো সুপারি বেঁচে সবাই মিলে আঁটাকার তিননম্বর বল একটা কিনে ফেলে। সে কি আনন্দ যাত্রা। খেলোয়াড়রা খেলতে এসে প্রতিদিন একহালি করে সুপারি জমা করতো মুষ্টিচাল জমানোর মতো। ছোটদাদার ছেলে জসিম আলীর পাকা দালান সে ধান ক্ষেতে। দালানের চর্তুদিকে নানান ফলের বাগান। এখন আর দূরে দৃষ্টি মেলা যায় না। যে দিকে চোখ যায় দৃষ্টি আটকে যায়। বাড়ির চারপাশে ভিটে, লতা-পাতার বাগান বাড়ি। সবাই চায় আলাদা ঘরবাড়ি, আলাদা অস্তিত্বের বিকাশ। খানের ভাইবোন কেউ দেশে নেই। যার যার অবস্থানে সবাই কম বেশি স্বচ্ছল। গ্রামের বাড়ি তাদের কারো যাতায়াত নেই।
শিউলি গলা খাঁকার দিয়ে বলে, ভাইজান চা ঠাণ্ডা অই যায়। আগে ড্রাইভার ভাইরে দিছি। বড় ভালা পোলা, আঁরে কয় আন্টি। ওর ফিক্ শব্দে হাসির রেশ কানে বাজে। আন্নের ড্রাইভাররে জিজ্ঞাইলাম, দেশ কোনাই? কইলো, শরীয়তপুর। ভাইজান শরীয়তপুর কোন ডিস্ট্রিকের আন্ডারে; শব্দটা বিভাজিত হয়ে কানে বাজলো খানের। না ফিরেই খান বললেন, শরীয়তপুর একটা জেলা। আগের ফরিদপুর ভাগ হয়ে……।
[চলবে]

