জোহান ভোল্ফগাং ফন গ্যেটে-এর কবিতা


জোহান ভোল্ফগাং ফন গ্যেটে-এর কবিতা

সুন্দর রাত 

এখন আমি আমার প্রিয়তমের ছোট্ট কুটির
ছেড়ে চলে যাচ্ছি; অন্ধকারের মধ্য দিয়ে,
গোপনে, এক বিষণ্ণ নীরবতার মধ্যে,
গাছপালায় ঢাকা উদ্যানে ঘুরে বেড়াই ।
যদিও লুনা ঝোপঝাড় এবং ওক গাছের মধ্য দিয়ে উঁকি মেরে দেখছে,
মৃদুমন্দ বাতাস তার উপস্থিতি প্রকাশ করে;
ভূর্জবৃক্ষরা নতজানু হয়; তারা সুগন্ধ ছড়ায়
মধ্যরাতের বয়ে যাওয়া বাতাসে ।
এতো সমৃদ্ধ গ্রীষ্ম রাতের শীতলতায় কি আনন্দ!
কি নিস্তব্ধতা! অনুভূতির অন্তরাত্মা
অকথ্য আনন্দে মেতে ওঠে ।
পরমানন্দ আমি খুব কমই সামলাতে পারি,
নির্জনতায় জাগ্রত থাকার রাতগুলো,
তবুও আমি সেগুলো হাজার দিয়ে বিনিময় করবো,
তার সাথে এক রাতের জন্য ।

 

জলরাশির উপর আত্মার গান

মানুষের আত্মা পানির মতো:
এটি স্বর্গ থেকে আসে, এটি স্বর্গে উড়ে যায় ।
এবং তারপর আবার পৃথিবীতে নেমে আসে,
চিরকাল পরিবর্তনশীল ।
উঁচু পাথুরে প্রাচীর থেকে উজ্জ্বল প্লাবন নেমে আসে,
অতঃপর মসৃণ পাথরের উপর,
মেঘলা ঢেউয়ের মাঝে নম্রভাবে ছড়িয়ে পড়ে
এবং সাদরে স্বাগত হয় ।
অবগুণ্ঠন- উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ায়,
মৃদু গুঞ্জন অতল গহ্বরের দিকে টেনে নিয়ে যায় ।
খাড়া পাহাড়ের ঢালগুলো এর অগ্রগতির বিরোধিতা করে,
ক্রোধে ফেনিল হয়ে ধাপে ধাপে তলদেশে নেমে আসে ।
এখন এটি নিঃশব্দে তৃণভূমির মধ্য দিয়ে সমতল নহর
এবং নিকষিত হ্রদে,
প্রতিটি নক্ষত্রমণ্ডল আনন্দে উঁকি দেয় ।
বাতাস হচ্ছে জলের প্রেমময় প্রণয়ী;
উত্তাল ঢেউয়ের সমস্ত ফেনার সাথে বাতাস মিশে যায় ।
মানুষের আত্মা পানির মতো!
মানুষের ভাগ্য বাতাসের মতো!

 

দৃষ্টিপাত 

চোখ কখনো মিথ্যা বলে না ৷
হৃদয়েশ্বরী এতো প্রেমে পড়েছে—
আমি তার উল্লাস দেখেছি ৷
ঐ মেঠোপথে দুরন্তপনা ৷
অব্যক্ত কথাগুলোর জন্য তীব্র আকুতি ৷
কখনো দুঃসাহসিকতা ৷
অপলক চাহনির গহীনে সহস্রাব্দের নীরবতা ।
কি যেনো শত জিজ্ঞাসা?
বালুকাময় সমুদ্র সৈকতে অনুরাগ দেখেছি ৷
কখনো তার অপরূপ সৌন্দর্যের মহিমা ৷
জ্যোৎস্না রাতে পূর্ণিমা চাঁদের সাথে গোপন অভিসার ৷
বিরহের নৃশংস দাবানলে দগ্ধ হৃদয়ের হাহাকার ।
সভ্যতা নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা দেখেছি ৷
আবার কখনো স্পর্ধিত অহংকার ।
কিংবা পরাজয়ের গ্লানিকর মুখচ্ছবি ।
তবুও, তার অদম্য পথচলা ।
দূরে, বহুদূরে…
এক অজানা নৈঃশব্দের জগতে ।
তবে কি, সে অপরাজিতা?
প্রেয়সী’র নম্র স্পর্শে উষ্ণ রক্তে উত্তাল ঢেউ ওঠে ৷
তার প্রাণস্পন্দন আমার সত্তাকে নাড়া দেয় ।
এক স্বর্গীয় অনুভূতি ।
শাশ্বত ভালোবাসা ৷

 

প্রজাপতি 

রঙধনুর রঙে রঙিন প্রজাপতি ।
রূপ, লাবণ্য, গুণ ও গরিমায় অদ্বিতীয়া ।
শীতল রক্তের কারণে অনন্যা ।
এক ক্ষণস্থায়ী জীবনের অধিকারিণী ।
মায়াবী চোখে অনাবিল মুগ্ধতা ।
দুর্দান্ত চপলতায় ডানা মেলে পথচলে ।
ফুলের অমৃত সংগ্রহ ও পরাগায়ন করে ।
প্রজাপতি বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির অগ্রদূত ।
আমি তার অনুরাগে হারিয়ে যাই দূর নীলিমায় ।
এক অজানা নৈঃশব্দের জগতে ।
কোথায় সে?
তন্নতন্ন করে খুঁজি তাকে অনন্ত মহাবিশ্বের প্রান্তে ।
সেখানেও নেই ।
তবে কি, কল্পনায়?
প্রিয় প্রজাপতি, তুমি নিঃসন্দেহে হৃদয়স্পর্শী ।
তোমার ঐন্দ্রজালিক অনুভূতি আমার সত্তাকে নাড়া দেয় ।
হয়তো, ভালোবাসার নান্দনিক সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ ।
ও প্রজাপতি, তোমার হৃদয়ের গহীনে আমাকে ঠাঁই দেবে?

 

দিগন্ত

অপার নীল আকাশ ৷
সাদা মেঘগুলো নীলিমায় মিলিয়ে যায় ৷
পূর্ণিমার চাঁদ নেমে আসে সমুদ্রে স্নান করতে ৷
এদের মধ্যে কি যেনো নিবিড় আলাপন ৷
দূর দিগন্ত চেয়ে দেখে আর লাজুক হাসে ৷
জোয়ার-ভাটার শাশ্বত রূপ প্রকৃতিকে প্রাণসঞ্চার করে ৷
সমুদ্রকে ধারণ করা জমিনে তোলপাড় সৃষ্টি হয় ৷
মানুষের মনে রঙ, পরিবেশে পরিবর্তন এবং কতো কি…
কিন্তু আকাশ ও জমিনের মাঝে রয়েছে বিশাল পার্থক্য ৷
তবুও তারা দিগন্তে মিশে যায় ৷
প্রকৃতির এ এক অপরূপ সৌন্দর্য ও মুগ্ধতা ৷
তবে কি, আকাশ ও জমিন কখনো দিগন্তে মিলিত হয়?
হয়তো তাই মনে হয় ৷
অবশ্য না, এটি মানুষের ভুল ধারণা ৷
তারপরও, মানুষ এমন একটি ভুল বিশ্বাসকে ধারণ করে ৷
ছুটে বেরায় দিগন্তের পিছনে ৷