অন্তর্লীন অগ্নিদাহ


অন্তর্লীন অগ্নিদাহ

রোদটা অস্বাভাবিক রকম তীব্র ছিল সেদিন। যেন আকাশ নিজেই কাউকে শাস্তি দিতে চায়। সেই রোদের মধ্যেই দ্রুত পা ফেলে হাঁটছিল শিহাব। ডান হাতে মোবাইল, বাম হাতে মোটরসাইকেলের চাবি—মাথার ভেতর অস্থির ঢেউয়ের মতো তোলপাড় চলছে। শুধু একটি বাক্য তার কানে গেঁথে আছে—
‘আমিই চাকরিটা নেবোই। তোমার অনুমতি লাগবে কেন?’
ঝুমা শেষ রাতে এই কথাটুকু বলেছিল। তারপর দীর্ঘ নীরবতা। আর সেই নীরবতাই যেন শিহাবের ভেতরের সমস্ত ক্ষোভ, অভিমান আর অস্থিরতা একসঙ্গে জাগিয়ে তুলেছিল।
শিহাব ভাবছিল, এতদিন তো সব ঠিকঠাকই ছিল। অথচ এখন যেন প্রতিটি কথাই ঝগড়ায় গড়ায়। মনে হয় দু’জন দুই গ্রহের মানুষ—কেউ কারো কথা বোঝাতে পারে না। আর বাড়ির লোকজন? তারাও সুযোগ পেলেই পাহাড় বানিয়ে ফেলে ইটখণ্ড থেকে।
আজ সকালে শিহাবের মা রাাবেয়া আক্তার রাবু হুট করে ফোন করে বললেন—
‘বাবা, একটু আসো তো। জরুরি দরকার।’
মায়ের কণ্ঠে জরুরি মানে সাধারণত খারাপ কিছুই।
শিহাব দোতলার উঠোনে ঢুকতেই দেখতে পেলেন—মামা, অর্থাৎ অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মাসুক মমিন মামা বসে আছেন। মাসুক মামা চিরকুমার সভার অন্যতম সদস্য। এখন মামার চোখে সেই নরম স্পর্শ, সেই দায়বদ্ধতা, সেই স্নেহ।
‘আসো, বসো শিহাব।’
মামার কণ্ঠে অদ্ভুত কোমলতা।
শিহাব কিছু বলার আগেই মামা ধীরে বললেন—
‘মানুষের চিন্তার জগৎটা যে কত বড়, কত বৈচিত্র্যময়—এটা আমরা ভুলে যাই। দুইজন মানুষ সব বিষয়ে একই ভাবে ভেবে উঠে, এমন তো হয় না। তোমার ভাবনা তোমার, ঝুমার ভাবনা তার। অমিল তো থাকবেই। অমিল মানেই বিচ্ছেদ নয়।’
কথাগুলো এত সহজ, অথচ এত কঠিন। শিহাবের বুকের ভেতর যেন কিছু নড়ে উঠল। কিন্তু মনে মনে সে বলল—
‘যিনি সংসার করেননি, তিনি কী বুঝবেন?’
মামা যেন তার মনের কথাই শুনে ফেললেন। হাসলেন মৃদু।
‘মনে কষ্ট থাকলে, রাগ থাকলে, কারো কথা ভালো লাগে না—যতই সত্য হোক। তুমি এখন অনেক চাপের ভেতর আছো, আমি বুঝি।’
অথচ শিহাব কিছু বলল না।
মামা আরো বললেন—
‘নিরুকে নিয়ে ভাবো। ওর বয়স মাত্র পাঁচ। ওর ছোট্ট ভবিষ্যৎ তোমাদের উভয়ের সিদ্ধান্তে বাঁধা। তুমি যদি একগুঁয়েমির দেয়াল তোলো, আর ঝুমার স্বাধীনতাকে শত্রু ভাবো—নিরু মাঝখানে পিষে যাবে।’
শিহাব মাথা নুইয়ে রাখল। সত্য কথা গুলো কাঁটার মতো বিঁধছে।
কিন্তু সে কেন বুঝছে না—ঝুমা বদলে গেছে? ঝুমার মনে কি আর আগের মতো তার জন্য জায়গা নেই?

দুই.
অন্যদিকে, একই সময়ে ঝুমা নিজের মায়ের বাড়ির বারান্দায় বসে। মুখে চাপা বিষণ্নতা। পাশের ঘরে নিরু খেলছে ছোট ছোট ব্লক নিয়ে। মাঝে মাঝে তাকিয়ে প্রশ্ন করে—
‘মা, আমরা কখন বাসায় ফিরবো?’
ঝুমা উত্তর দিতে পারে না।
ওর মা সাবেরা মাহমুদের কণ্ঠে খচখচে বিরক্তি—
‘তোমাদের আর ওই বাসায় ফেরা হবে না…’
ঝুমা চুপ। মা বোঝেন না—তার সমস্যা জেদ নয়, তার সমস্যা শ্বাসরুদ্ধ অনুভূতি।
ঝুমা বহুদিন ধরেই নিজের জন্য কিছু করতে চাইছিল। সবসময় মনে হতো—তারও একটা অস্তিত্ব আছে, একটা নিজস্বতা আছে। শিহাবের প্রতি তার অভিযোগও খুব বড় কিছু নয়—শুধু স্বীকৃতি, সম্মান। সে চাকরি করতে চায়, একটু স্বাধীনতা চায়—এটাই কি এত বড় অপরাধ?
কিন্তু সমস্যা চাকরির নয়। সমস্যা ছিল আচরণে—তার চাওয়াটা শুনতে চায়নি কেউ। যেন সে কোনো ভুল করছে।
ঝুমা মনেই মনে বলল—
‘আমি কী ভুল করেছি? নিজের জন্য বাঁচতে চেয়েছি এতটুকু?’
ওর ভেতরটা হাহাকার করে উঠল।
মা কঠিন গলায় বললেন—
‘চাইলে আমরা কোর্টে গিয়ে মামলা করে দিতাম। তোর কষ্ট দেখলে আমার মাথা গরম হয়।’
ঝুমা একদম কাঁপা গলায় বলল—
‘মা, এসব বলো না। বিচ্ছেদ… আমি চাই না।’
‘চাস না? তাহলে ফিরছো কবে ওই গোঁয়ারের ঘরে?’
মায়ের গলায় আবার রাগ।
ঝুমা চুপ। সে হয়তো ফিরতে চায়—তবু ভয় পায়। ফিরে গেলে যদি আবার একই সমস্যা হয়? যদি আবার কেউ তাকে শুনতে না চায়?

তিন.
মাসুক মমিন মামার কথা শেষ হওয়ার পর শিহাব বাসার গেস্টরুমে একাকী বসে রইল। মাথায় ঘুরতে লাগল—অহংকার? অভিমান? নাকি পুরুষতান্ত্রিক শেখানো ধারণা?
সব মিলিয়ে একটা জট পাকানো অন্ধকার। সে নিজের ভেতর ঢুকতে চাইল। কিন্তু ভয় লাগছে।
হঠাৎ তার শৈশবের একটা কথা মনে পড়ল—
বাবা সবসময় বলতেন, ‘স্ত্রীকে শাসনে রাখলেই ঘর টেকে।’
আর মা কখনো কিছু বলতেন না।
আজ বুঝছে, সেই ভুল ধারণাই হয়তো তাকে অভ্যস্ত করে দিয়েছে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়ার প্রবণতায়।
কিন্তু ঝুমা কি আসলে ভুল করেছে?
মামার শেষ কথাটা তার মাথায় খোঁচা দিচ্ছিল—
‘নেতিবাচক চিন্তা শয়তানের কাজ। সে কখনো বন্ধুর রূপে, কখনো স্বজনের রূপে আসে।’
হঠাৎ মনে পড়ল—গত রাতে তার বন্ধু রুহান তাকে ফোন করে বলেছিল—
‘দেখ, মেয়েদের বেশি স্বাধীনতা দিতে নেই! আজকে চাকরি করবে, কালকে মাথায় উঠবে!’
শিহাব কী পাগলের মতো সেটাই বিশ্বাস করেছিল!
হঠাৎ মনে হলো—তার সিদ্ধান্তগুলো আসলে সে নিজের নয়, বরং অন্যের ভয় থেকে ধার করছে।

চার.
সন্ধ্যায় মা বললেন—
‘বাবা শিহাব, নিরুকে ছাড়া থাকতে তোমার কষ্ট হয় না?’
শিহাব চুপ। চোখ ভিজে উঠল।
মা নরম করে বললেন—
‘শোন, সংসার মানে শত্রুতা নয়। কেউ ভুল করতেই পারে। সেও মানুষ, তুমিও মানুষ। ক্ষমা করতে শেখো।’
শিহাব এবার মায়ের হাতটা ধরে ফেলল।
‘মা, আমি কি তাহলে সত্যিই… অহংকারী হয়ে গেছি?’
মা মৃদু হাসলেন—
‘অহংকার নয়, তুমি শুধু মিছে ভয় পাচ্ছ। ভয়—তোমার কর্তৃত্বের জায়গা হারাবে। ভয়—সে তোমাকে প্রয়োজন মনে করবে না। ভয়—তুমি কম গুরুত্ব পাবে। কিন্তু এই ভয়টাই তোমার সম্পর্কটাকে খাচ্ছে।’
শিহাব গভীর শ্বাস নিল—যেন প্রথমবার কিছু বুঝতে পারল।

পাঁচ.
দু’দিন পর সকালে মামা আবার বাসায় এলেন। এবার তার সঙ্গে ছিল একটি ছোট খাম। খুলে দেখালেন—
ভেতরে একটি ছোট কাগজে লেখা—
‘শক্ত মানুষ সে নয়, যে নিজের নিয়মে সবাইকে চালায়;
শক্ত মানুষ সে—যে নিজের ভুল বুঝে ক্ষমা চাইতে জানে।’
মামা বললেন—
‘যা হোক, সিদ্ধান্ত তোমার। কিন্তু মনে রেখো—একটা পরিবার ভাঙলে শুধু দুইজন মানুষ ভাঙে না, ভাঙে পুরো প্রজন্মের মানসিকতা।’
শিহাবের বুকের ভেতর আবার কিছু নড়ে উঠল।

ছয়.
অনেক হিসাব-নিকাশের পর শিহাব সিদ্ধান্ত নিল—আজই ঝুমার কাছে যাবে। নিরুকে নিয়ে আসবে। ঝুমার সঙ্গে কথা বলবে। সে এবার শুনতে চায়।
শুধু নিজের কথা নয়—ঝুমারও।
ঝুমার মায়ের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তার হাঁটু কাঁপছিল। দরজায় বেল দিতেও অদ্ভুত ভয়।
ঝুমা দরজা খুলে দাঁড়াতেই শিহাব হঠাৎ কথা হারিয়ে ফেলল।
এতদিন পর দেখা—কিন্তু দু’জনের মুখে কেবল ক্লান্তি।
ঝুমা চোখ নামিয়ে বলল—
‘এসেছো?’
‘হ্যাঁ… কথা বলতে চেয়েছি।’
দু’জনই বসলো। নিরু দৌড়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। সেই চাপা উষ্ণতাতে শিহাবের বুকটা কেঁপে উঠল। মনে হলো—এই ছোট্ট মানুষটাই তাদের ভাঙা সম্পর্কের শেষ সেতু।
শিহাব ধীরে বলল—
‘ঝুমা… আমি তোমাকে শুনিনি। তুমি যে চাকরিটা করতে চেয়েছিলে—তা নিয়ে আমি অভিমান করেছিলাম। হয়তো ভুল করেছি।’
ঝুমা চোখ তুলল। প্রথমবার।
‘তুমি ভুল করোনি। তোমার ভয় ছিল। আর আমিও নিজের কথা বোঝাতে পারিনি।’
শিহাব নিঃশ্বাস নিয়ে বলল—
‘আরেকবার চেষ্টা করতে পারি? দু’জনেই?’
ঝুমার গলা কেঁপে উঠল।
‘চাইলে তুমি তোমার মতো চাকরি করো। আর চাইলে আমাকে আবার শুরু করতে দাও। তোমাকে স্বাধীন মনে বাঁচতে দিতে পারি—এটা বুঝেছি।’
ঝুমা চুপচাপ তাকিয়ে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে বলল—
‘আমরা কি পারবো?’
‘হ্যাঁ… যদি দু’জনেই শুনতে শুনতে শিখি।’
ঝুমা হঠাৎ চোখের পানি মুছে বলল—
‘তাহলে চলো… নিরুকে নিয়ে বাসায় ফিরি।’
নিরু উল্লাসে চিৎকার করল—
‘আমরা বাসায় ফিরবো? একসাথে?’
দু’জনের অমিল থাকা সত্ত্বেও আজ যেন মনে হলো—অন্তরের অন্ধকার কিছুটা হলেও সরে গেছে।

সাত.
বাসায় ফিরতেই শিহাবের মা কাঁধে হাত রেখে বললেন—
‘আজকে তোমরা দু’জনই বড় হলে। নিজের স্বার্থের চেয়ে সম্পর্ককে বড় ভাবলে। এখান থেকেই সংসার শুরু হয়।’
মামা হেসে বললেন—
‘মানুষের ভেতরের অগ্নিদাহ নিভে যায় না কখনো, তবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আর নিয়ন্ত্রণ করতে হলে—সহনশীলতা আর শ্রবণশক্তি লাগে।’
শিহাব ও ঝুমা একে অপরের দিকে তাকালো। অদ্ভুত হাসি—বলছে, হ্যাঁ, চেষ্টা করা যায়।
রাতে বারান্দায় দু’জন বসে থাকল।
ঝুমা বলল—‘আমি চাকরি করবো, তবে পরিবারকে বুকে নিয়েই।’
শিহাব বলল—‘আর আমি শিখবো— তোমার সীমারেখা সম্মান করতে।’
হঠাৎ আকাশে হালকা হাওয়া বইল। মনে হলো—ঝড় শেষে শান্তি আসার পথেই হাঁটছে তারা।

আট.
প্রিয় পাঠক, এই গল্পে কোনো নায়ক-নায়িকা নেই। আছে কেবল ভুল বোঝাবুঝির পাহাড়, অহংকারের কাঁটা, ভয় আর সামাজিক চাপ। মানুষ সম্পর্ক ভাঙে না ইচ্ছে করে—ভাঙে শোনা না-শোনার কারণে, সামাজিক চাপের কারণে, অপরিচিত ভয় আর অন্যের পরামর্শে নিজের সিদ্ধান্ত হারানোর কারণে। কিন্তু একবার যদি দু’জন মানুষ একে অপরের কথার আড়ালের কথা শুনতে পারে—তবে সম্পর্ক টিকে যায়। শিহাব আর ঝুমা আজও হয়তো অন্যদিন ঝগড়া করবে, অমিল থাকবে— কিন্তু এবার তারা জানে— কোনো অমিলই সম্পর্কের চেয়ে বড় নয়। আর নিরু? সে বড় হয়ে শিখবে—ভালোবাসা মানে শুধু একসঙ্গে থাকা নয়, ভালোবাসা মানে একে অপরকে বুঝে বড় হওয়া।

জলছবি/এমএম