সালিম সাবরিন-এর ইলিশ সিরিজের পাঁচটি সনেট


সালিম সাবরিন-এর ইলিশ সিরিজের পাঁচটি সনেট

এক.
রূপালি উজান

অতল সাগরান্ধ্র অন্ধকার ছিঁড়ে দিয়ে
জাগে রৌপ্য তরবারি; পদ্মার উত্তাল স্রোতে
উজান বায়ুর বেগে ধেয়ে চলে জলচর-
তাতে ক’রে আকুতি কি?কোন সে আদিম ডাক
টানিছে তাহারে দূর প্রমত্ত পদ্মার বুকে?
শ্রাবণের ঘনমেঘ ডাকে, ফেনিল জলধি রোষে,
তবু না থামায় গতি; অঙ্গে জ্বলে রূপালি
প্রলয়-অগ্নিময় তেজ, সৃষ্টির ঝঞ্ঝার টানে!

তরঙ্গ সংগ্রাম শেষে সঁপিয়া দেহখানি
নদীগর্ভের সৃষ্টি-যজ্ঞে; মৃত্যুর গহন ছায়ে
ফোটায় নতুন প্রাণ, জীবন-অমৃত ঢালি।
ও তেজস্বী ইলিশ! জীবনের মহাকাব্য
লেখা আছে রৌপ্য অঙ্গে, এই যে উজানযাত্রা,
সে তো এক বিজয়ের শাশ্বত মহাগীতি।

 

দুই.
ইলশেজলের টান

অন্ধকার ভোরে একা দাঁড়াইয়া আমি
পদ্মার স্রোতে, হাতে নাইলনের সুতো;
জলের অতলে তুমি রূপালি ছন্দেতে
কাটো পথ একা; ওই পদ্মা অদম্য ইলিশ!
তোমার উজানে ছোটো, মিতালি জোয়ারে,
লবণসমুদ্র ছেড়ে মিস্টি টানে ঘর
বাঁধার আকুতি-সব চিনি মনে মনে।
আমার এ সুতো নয় কোনো ফাঁদ,

এ তো এক দীর্ঘশ্বাসের সেতুবন্ধন;
তোমারে ছুঁইতে চাই-রূপালি ডানায়
জীবিকার টানে আর প্রজনন নেশায়
জড়িয়ে রয়েছে এই জীবনের স্রোত।
নদীর তীরেতে বসি ভাবি আনমনে-
এ লড়াইতে জয় কার? নদী না সময়?

 

তিন.
ইলিশ মোহনা

তরুণ শরীরে মত্ত ইলিশ ঝাঁক, রূপালী শরীর ফেরে
পদ্মার উজান স্রোতে। চাঁদপুরের জলপ্রপাত,
মৎস্যপূর্ণ ঘোলানদী, অবিরাম দিন রাত
যা কিছু জন্মায়, বাড়ে, আর মরে-সব গান গায়
বর্ষার ঐশ্বর্যে।অনাদি প্রাণের মায়ায়
বিভোর সকাল। ওরা সমুদ্রের নোনাস্বাদ
ছেড়ে দিয়ে ছুটে আসে মিস্টি জলের আহ্বান।
আমি এসেছি তাই, ছেড়ে অস্তে যাওয়া প্রাণ,

ঐশ্বর্যময়ী রূপোর সন্ধানে। আমায় লও তোমার ধারায়।
জড় করে নাও ঐ ঝাঁকের মাঝখানে, যেন
আমারও ধমনিতে বয় পদ্মা মেঘনার গান।
গড়ে তোলো এক নতুন কারুকাজ
নশ্বর ইলিশের মতো, চঞ্চল, উজ্জ্বল আজ
যে কোনো দিন পাড়ি দেবে মৃত্যুর ঐপারে,
আর কখনো ফিরব না নোনা জলের গভীরে।

 

চার.
রূপালি ইলিশ

পদ্মার নীল বুক চিরে মিঠে জল
ঠেলি উজানে ধায় যে তারা জীবনের টানে,
অফুরান প্রাণশক্তি রূপোর প্রস্রবণ –
পদ্মা ও মেঘনার বুকে খেলিবার ছলে
স্রোতের বিপরীতে চলে সচল যৌবন।
মাতৃভূমির টানে ফিরে আসে শতদল
হাজার বছর ধরি জ্বলে বক্ষ তারা।
জেলেদের জালে বাজে রূপালি কিশলয়-
মেঘনাও ডাকাতিয়া জলজঘূর্ণিতে
ঝলমলে রৌদ্রছায়া প্রাতে ও প্রয়াণে,
মাছরাঙা চিল কাঁদে ওই মোহনাতে;
প্রকৃতির রূপ লেখা বাংলার গানে।
জীবন সংগ্রামে তারা অমর অভিযাত্রী
পদ্মার বুক জুড়ে রূপালি ইলশে রাত্রী।

 

পাঁচ.
অবিনশ্বর দীর্ঘশ্বাস

গভীর জলের গভীরেও যে একটি মায়া জাগে-
তার দেখা পাওয়া ভার; হঠাৎ চোখের কোণে ভাসে
চকিত দ্যুতিময় আলো, যেনো কোনো হারানো বার্তা
বয়ে আনে নিঃশব্দে। কে ভেবেছিল এমন ক্ষণে
দেখা হবে তার সাথে! প্রমত্ত পদ্মার কুলে বসে
চেয়ে থাকা শুধু এক প্রতীক্ষা; মেঘের গুঞ্জরণে
কেঁপে ওঠে জলের আয়না। সে কী তবে ফেরে
অতল সাগরের টানে, নাকি পলিমাটি তীরে

অন্য কোনো ঠিকানায়? জীবনের এই তো নিয়ম,
স্রোতের বিপরীতে ভেসে আসা যাওয়া আর আসা পথ।
তার প্রতিটি স্কেলে লেখা থাকে কোনো দীর্ঘ প্রবাসের গান।
ওহ্ শুভ্রাবতী অতিথি! তোমার ওই হঠাৎ দর্শনে
জেগে ওঠে পুরনো বেদনা; নিখাঁদ জলের গভীরে-
রেখে যাও মায়ার শরীর, আর এক অবিনশ্বর দীর্ঘশ্বাস।