চলচ্চিত্র: সমালোচনা প্রসঙ্গে


চলচ্চিত্র: সমালোচনা প্রসঙ্গে

ভূমিকা

কাব্য, সংগীত, নৃত্য, স্থাপত্য, ভাস্কর্য এবং চিত্র-এই ছ’টি সুকুমার কলা নামে পরিচিত। আর চলচ্চিত্র হলো সপ্তকলা। প্রতিটি কলারই উদ্দেশ্য হচ্ছে আত্মপ্রকাশ, আনন্দদান ও সৌন্দর্য সৃষ্টি। চলচ্চিত্র বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ফল এবং প্রযুক্তি নির্ভর মাধ্যম ও কলা। ঊনিশ শতকের শেষ দিকে চলচ্চিত্রের আবির্ভাব আর এর বিকাশ, উন্নয়ন, বিবর্তন চলছে এখনও নানা প্রক্রিয়ায়। চলচ্চিত্র একটি যৌগিক শিল্প মাধ্যম। এর যেমন সম্পর্ক রয়েছে সাহিত্যে, কবিতা, নাটক, সংগীত, নৃত্য, অংকন, ভাস্কর্য, স্থাপত্য ও আলোকচিত্রের সঙ্গে তেমন সম্পর্ক রয়েছে ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, পরিবেশ, গণসংযোগ, দর্শন, মনস্তত্ত্ব ইত্যাদির সঙ্গেও। চলচ্চিত্র প্রযুক্তি নির্ভর মাধ্যম। বহু জনের সম্মিলিত শ্রম, মেধা ও প্রচেষ্টার ফলে চলচ্চিত্র নির্মিত হয় পরিচালকের নির্দেশনায়। এর নির্মাণ পদ্ধতি প্রযুক্তি নির্ভর, ব্যয়বহুল, কয়েকটি স্তর ভিত্তিক এবং জটিলও। এসব জটিল শিল্প মাধ্যমের আলোচনা-সমালোচনাও জটিল। তবে চলচ্চিত্র সমালোচনা অসম্ভব এবং বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়, অন্যান্য শিল্প কলার মতো চলচ্চিত্রেরও সমালোচনা হয়ে থাকে।

সমালোচনার সংজ্ঞা সাধারণ পদ্ধতি

চলচ্চিত্র সমালোচনা প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে দেখা যাক ‘সমালোচনা’ কাকে বলে, এর স্বরূপ ও পদ্ধতি এবং অন্যান্য মাধ্যম বিশেষভাবে সাহিত্য ও নাট্য সমালোচনা কিভাবে হয়।
মানুষ জন্ম মুহূর্ত থেকেই বস্তুময় দৃশ্যজগতকে ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করেছে। মানুষের মনে এই দৃশ্যজগত নানাভাবে ছায়া ফেলেছে। মানুষের সৃজনধর্মী শিল্পী মানস বস্তু উপলব্ধিকে নব নব ভাবে সাহিত্যে চিত্রলিপিতে স্থাপত্যে ভাস্কর্যে প্রকাশ করেছে। তখন সে কবি, চিত্রকর, স্থপতি, ভাস্কর।
সব শিল্পী-সাহিত্যেকেরই লক্ষ্য সুন্দরের প্রকাশ। মানুষ সৌন্দর্যকে আপনার করে পেতে চায়। সে বাতাসের মর্মর ধ্বনিকে, সাগরের কল্লোলকে, বিহঙ্গের কলরবকে, আকাশের নীলিমাকে নিজের মতো করে পেতে চায়, রূপ দিতে চায়। আর এভাবেই সব শিল্পের প্রাথমিক জন্ম ঘটে স্রষ্টার মনোজগতে, পরে তা বিকশিত হয়, বাহ্যিক আঙ্গিক পায় সাধরণে প্রকাশিত হয়, এর সার্থকতা-অসার্থকতা নিরূপিত হয়। আর এভাবেই জন্ম হয়েছে সমালোচনার। কোনো কিছুর উৎকর্ষ বা অপকর্ষ বিচারমূলক সম্যক আলোচনাকে সাধারণভাবে ‘সমালোচনা’ বলা হয়। সম্যক আলোচনা বলতে বিষয়টির ভাব, বস্তু, রীতি, অলংকার ও স্রষ্টার বিশিষ্ট মানস-দৃষ্টি প্রভৃতির সামগ্রিক আলোচনাকে বুঝায়।

সমালোচনা বিভিন্ন পদ্ধতিতে হয়। একই বিষয় সম্বন্ধে বিভিন্ন জনের মতানৈক্যও হয়। সমালোচনার ক্ষেত্রে এই মত বিরোধের কারণ বোধ হয় এই যে, সমালোচক শিক্ষা, দীক্ষা ও জ্ঞান গরিমায় একই তুল্য হলেও রুচি ও অনুভবে এক রকম নয়। তাদের কল্পনা-শক্তি, দৃষ্টিভঙ্গী, হৃদয়তা, উদারতা ও ভিন্ন ভিন্ন রকম হয়ে থাকে। সমালোচনা হচ্ছে মূল্য বিচার। শিল্পের যত রকম শাখা, জাতি ও প্রজাতি রয়েছে তেমন সমালোচনারও রয়েছে তত রকম বিভাগ ও পদ্ধতি। যেমন- সাহিত্য সমালোচনা, নাট্য সমালোচনা, চিত্রকলা সমালোচনা, সংগীত সমালোচনা, বেতার-টিভি সমালোনা, চলচ্চিত্রে সমালোচনা ইত্যাদি। যে বিষয়ে সমালোচনা করা হয়, সমালোচককে সে বিষয় সম্পর্কে এর মূল প্রতিপাদ্য, ভাব, লক্ষণ, আঙ্গিক, রূপায়ণ, শৈলী, পটভূমি, নান্দনিকতা এবং সংশ্লিষ্ট মাধ্যম সম্পর্কেও ভালভাবে জানতে হয়। সমালোচনা হতে পারে তত্ত্বীয় এবং ব্যবহারিক বা প্রয়োগীয়। সমালোচনা পদ্ধতি বা রীতিকে নিম্নোক্তভাবে ভাগ করা যায়।

১. অনুকারী সমালোচনা: এ ধরণের সমালোচনায় সৃষ্টিকর্মকে জগত ও জীবনের অনুসরণ বা প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়। প্ল্যাটো, এরিস্টটল থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত এই রীতি চলতে পারে।
২. বাস্তবধর্মী সমালোচনা: এ ধরনের সমালোচনা ভোক্তাকে নির্মল আনন্দ, দীক্ষা নির্দেশনা দেবার লক্ষ্য নির্ভর হয়ে থাকে।
৩. অভিব্যক্তিমূলক সমালোচনা: স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে সৃষ্টিকর্মের বিচার করা হয় এই পদ্ধতিতে। এতে রচয়িতাকে তার সৃষ্টিকর্মের ভেতর থেকে খটুজে বের করা হয়।
৪. বিষয়গত সমালোচনা: এ ধরনের সমালোচনায় সৃষ্টিকর্মকে স্বয়ং সম্পূর্ণ ও স্বায়ত্ত্বশাসিত হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
৫. গ্রন্থিক সমালোচনা: এ ধরনের সমালোচনার লক্ষ্য হলো রচয়িতা বা স্রষ্টা বাস্তবিক অর্থে কী তুলে ধরতে চেয়েছেন তা প্রতিষ্ঠ করা। এখানে টেক্সটই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বস্তু এবং সমালোচকের মনোযোগ থাকে সৃষ্টিকর্মের প্রতি।

সময়ের অগ্রগতি , নিত্য-নতুন ধ্যান-জ্ঞান ধারণার উপৎপত্তির সঙ্গে সমালোচনার রীতি বা পদ্ধতিও রূপান্তরিত হচ্ছে, নির্মিত হচ্ছে নানা ঘরানা। সমালোচনার ধারা পরিবর্তন হলেও মূল ঠিক থাকছে। যেমন শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’ এর সমালোচনা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন লেখকেরা বিভিন্নভাবে করলেও এর মূল টেক্সট কিন্তু ঠিকই থাকছে, একটি শব্দ বা বাক্যও পরিবর্তন হচ্ছে না।
সমালোচনার সবচেয়ে সরব, উর্বর এবং অপেক্ষাকৃত পুরানো ক্ষেত্র হচ্ছে সাহিত্য (উপন্যাস, ছোট গল্প, কবিতা ইত্যাদি)। সাহিত্য বিষয়ে সমালোচনা করতে হলে সমালোচককে সাহিত্য কী, সাহিত্যেও স্বরূপ, শ্রেণি বিভাগ, আঙ্গিক, শৈলী, রস ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে হবে। শ্রীশচন্দ্র দাশ সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে কয়েকটি পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন।

১. অলংকারিক পদ্ধতি- শব্দ ও অর্থালংকার নির্ভর।
২. ঐতিহাসিক পদ্ধতি- যুগচিত্ত, পারিপাশ্বিক ও গ্রন্থকারের ব্যক্তি মানস নির্ভর।
৩. সনাতন বিধি সম্মত পদ্ধতি- সনাতন ও প্রাচীন নিয়মাবলী নির্ভর।
৪. মনস্তত্ত্বমূলক পদ্ধতি- লেখকের ব্যক্তি জীবন, মানসিকতা নির্ভর।
৫. ব্যক্তিগত পদ্ধতি- সমালোচকের ব্যক্তিগত ভালো লাগা না লাগা নির্ভর।
৬. তত্ত্বসন্ধানী পদ্ধতি- সত্য, সৌন্দর্য, রস কল্যাণ নির্ভর।
৭. তুলনামূলক পদ্ধতি- বিভিন্ন লেখকের সঙ্গে সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা নির্ভর।
৮. পরিসংখ্যান নির্ভর- লেখকের শব্দ সম্পদ, ভাবকল্পের ব্যবহার ইত্যাদির রেখাচিত্র ও পরিসংখ্যান নির্ভর।
৯. বস্তুনিষ্ঠ পদ্ধতি- লেখকের শিল্প মানস, বিষয়বস্তু, ভাব, বাণীভঙ্গী এবং সত্য সুন্দর নির্ভর।

চলচ্চিত্র সমালোচনা: সংজ্ঞা ও পদ্ধতি
সাধারণতঃ কোনো সৃষ্টিকর্মের উৎকর্ষ বা অপকর্ষ বিচারমূলক আলোচনাকে সমালোচনা বলা হয়। চলচ্চিত্র সমালোচনা বলতে কোনো চলচ্চিত্রের নান্দনিক মূল্যায়নকে বুঝায়। এই মূল্যায়নমূলক আলোচনার মধ্যে থাকে একটি চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু (কাহিনী), চিত্রনাট্য, চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা, শব্দ, শিল্পসজ্জা, সংগীত, গান, অভিনয়, আঙ্গিক, শৈলী, প্রতীক, দৃষ্টিভংগী ইত্যাদির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। সমালোচনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন দিকের ভালো-মন্দের মূল্যায়ন হয়, নতুন দিক উন্মোচিত হয়; এতে নির্মাতারা ভুল-ত্রুটি সম্পর্কে অবহিত হয়, দর্শকরা জানতে পারে অনেক কিছু।

চলচ্চিত্র সমালোচনার ধারা ও ধরণ সম্পর্কে গাস্তঁ রোবের্জ তাঁর ‘সিনেমার কথা’ বইয়ে বলেছেন, ‘ছবি বিশেষের রিভিউ, ছবি উপভোগ ও চলচ্চিত্র সমালোচনা- এই তিনের পারস্পরিক সম্পর্ক চলচ্চিত্র সমালোচনা বিষয়ক যেকোনো আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। ফিল্ম বিশেষের রিভিউ আসলে ছবির প্রচারের একটি বাহন, ছবিটি সম্পর্কে তথা পরিবেশন। ছবির রিভিউতে পাওয়া যায় ছবিটির বিষয় এবং ছবিটি ভাল না খারাপ। ছবি উপভোগ কোনো ব্যক্তি বিশেষের ছবি দেখার প্রতিক্রিয়া। চলচ্চিত্র দেখে ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়ার বিশ্লেষণ। ছবির রিভিউ আয়তনে যেমন ছোট হয়, তেমনি লেখাও হয় তাড়াহুড়োর মধ্যে। এগুলি প্রায়ই বড় অগভীর। কোনো কোনো অভিজ্ঞ পেশাদার সমালোচক রিভিউ লিখতে বসে কোনো ছবির বিষয়ে যুক্তি সমৃদ্ধ ও জ্ঞানদীপ্ত মতামত ব্যক্ত করলেও স্থানাভাবে তিনি বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ পান না। অন্যদিকে চলচ্চিত্র সমালোচনা একটি পেশাদার কর্ম, সমালোচকের দায়িত্ব, ছবি বিচার করা। সেই বিচারে তিনি ঔদ্ধত্যের বশবর্তী হবেন না, বরং একজন রসাভিজ্ঞের স্বাভাবিক দক্ষতা নিয়েই তার দায়িত্ব সম্পন্ন করবেন।

বিশ্লেষণাত্মক সমালোচনার জন্য চাই প্রশিক্ষণ ও সংস্কৃতি। কোনো ছবি সম্বন্ধে নিজের মনোভাব বিন্যস্ত করার সময় কয়েকটি প্রশ্ন মাথায় রাখা যেতে পারে ঃ ক) ছবিটি কী নিয়ে অর্থাৎ ছবিটির তাৎপর্য বিষয়ে, খ) ফিল্ম এর বিভিন্ন অংশের মধ্যে সঙ্গতি- ছবির বিভিন্ন অংশগুলি কিভাবে সমগ্র ছবিটির সঙ্গে সমন্বিত, গ) অন্যান্য সমধর্মী- একই বক্তব্যবাহী বা একই রীতিতে তৈরি- ছবির সঙ্গে তুলনায় এই ছবিটির স্থান কোথায়? সমালোচনার দৃষ্টিকোণ ও সমালোচকের দায়িত্ববোধের কথাও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করার মতো। দৃষ্টিকোণগত নানা পদ্ধতি চলচ্চিত্র সমালোচনার ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হয়েছেঃ নৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক, সমাজতাত্ত্বিক, রূপরীতিগত এবং পুারণ নির্ভর। চলচ্চিত্র সমালোচনায় নানা পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটায় অনেকের ধারণা হয়েছে যে এই সমালোচনা এতই বিষয়ীগত বা সাবজেকটিভ যে একে বিশেষ মর্যাদা দেবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু বাস্তবে অবস্থা তেমন শোচনীয় নয়।’

অনেকটা এই ধরনের কথা আছে ধীমান দাশগুপ্তের ‘চলচ্চিত্রের অভিধান’-এ: ‘প্রথম শ্রেণির একজন ক্রিটিক আগে রসিক, পরে বিচারক। যখন তিনি বিচারক তখন তার ক্রিটিসিজমে বিশ্লেষণ করে দেখবেন, তেমনি বিশিষ্ট উপাদানগুলিকে সংশ্লেষণ করে ছবিটিকে রিডিফাইন-ও করবেন। রিডিফাইন করা এক ধরনের রিক্রিয়েট করাই। চলচ্চিত্রের সমালোচনার ইতিহাসে, চলচ্চিত্রকে একটি নান্দনিক ভিত্তিভূমি দিতে সচেষ্ট হয়েছিলেন বালাজ। চলচ্চিত্রের আলোচনায় দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সমাতাত্ত্বিক প্রসঙ্গকে মেলাতে চেয়েছিলেন বাজাঁ। আবেগ নয়, মনন; নাটকীয়তা নয়, সচেতনতা; বলেছিলেন ব্রেখট। বাজাঁর ভাবধারাকে প্রসারিত করে কাইয়ে দ্যু সিনেমা পত্রিকার চিত্রসমালোচক গোষ্ঠী নিজেদের অট্যর থিয়োরিকে রূপ দিয়েছিলেন, যা ছবির বিবিধ উপাদানের ও মাধ্যটির উপর সম্পূর্ণ দখল থাকা চিত্রনির্মাতাদের জাত স্রষ্টা আখ্যা দিয়েছিল। চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সঙ্গে আসছিল তার শিল্পরূপের কথা, শিল্পরূপের পথে বিভিন্ন তাত্ত্বিক প্রস্তাবের উপস্থাপন।

সিনেমা নিয়ে সাধারণ উপন্যাস রচনার পরিবর্তে আলোচনা ক্রমেই হয়ে উঠলো ব্যক্তিগত জটিল ও পরীক্ষামূলক। আলোচনায় মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রাধান্য বাড়লো, কাইয়ে গোষ্ঠী ভাববাদী নন্দ থেকে মার্কসবাদী বিচার পদ্ধতিতে চলে আসার মধ্য দিয়ে পাশ্চাত্য এই প্রবণতার ব্যাপক সূচনা। এখন সিনেমার স্ট্রাকচারালিজম নিয়ে লেখা হচ্ছে, চলচ্চিত্রের বিভিন্ন প্রতীকীর বিশ্লেষণ ভাষাতাত্ত্বিক মডেলকে কাজে লাগানো হচ্ছে, তাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা চলছে গণিত ও জ্যামিতি দিয়ে। এসব কিছুর প্রভাব পড়েছে চলচ্চিত্র সমালোচনার ওপর।

যিনি চলচ্চিত্র নিয়ে সমালোচনা করেন তিনিই চলচ্চিত্র সমালোচক। সেবব্রত গুপ্তের মতে, ‘চলচ্চিত্রে যেমন বিবর্তন আছে, তেমনি সমালোচকদের চলচ্চিত্র ভাবনাতেও ক্রমবিকাশ রয়েছে। এককালে যে ছবি তারা খারিজ করে দিয়েছেন পরবর্তীকালে সে ছবিই নতুন নিরিখে নতুন অর্থ নিয়ে তাদের কাছে উপস্থিত হয়েছে। দর্শকদের সঙ্গে সঙ্গে সমালোচকদেরও ফিল্ম এ্যাপ্রিয়েশনের পাঠ নেয়া দরকার।
প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক চলচ্চিত্র সমালোচনাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, সমালোচক হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা আর দর্শকের মাঝখানের সেতু।১০

বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার-শিক্ষক-সমালোচক আলমগীর কবির গঠনমূলক সমালোচনার ক্ষেত্রে সময় ও পরিবেশের উপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। সমালোচক তার শিক্ষা, জ্ঞান, মেধা, অভিজ্ঞতা, রুচি অনুযায়ী সমালোচনা করে থাকেন। একটি প্রকৃত শিল্পকর্ম একজন সমালোচকের প্রজ্ঞাগত বোধের ক্ষেত্রে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। এটি তার জ্ঞান, তথ্য ভাণ্ডার এবং সর্বোপরি বুদ্ধিজীবিগত সামর্থ্যরে ভিতকে নাড়িয়ে দেয়।

আলমগীর কবিরের মতে, একজন চলচ্চিত্রকার ও একজন চলচ্চিত্র সমালোচকের মূল লক্ষ্য একটি সৎ চলচ্চিত্র নির্মাণ। চলচ্চিত্র একদিকে যেমন আকর্ষণীয় অন্যদিকে তেমন গোলমেলেও। এমতবস্থায় বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে সঠিক উপাদান বের করা খুব কঠিন। সমালোচকের এই দায়িত্বটুকু পালন করতে হবে। সমালোচক আগাছা পূর্ণ জংগল থেকে সত্য সুন্দর কল্যাণের প্রতীক গোলাপকে চিহ্নিত করবেন। তিনি নিরপেক্ষভাবে বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি চলচ্চিত্রের ভালোমন্দ চিহ্নিত করবেন এবং তার মন্তব্য পেশ করবেন। তার মন্তব্য/মতামত একদিকে প্রভাবিত করবে দর্শক ভোক্তাদের, অন্যদিকে ছবির নির্মাতা-তারকা-কুশলীদেরকে। এ ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ‘হাইফেন’ এর মতো।১১

তিনি আরো লিখেছেন:
‘একটি ছবি একজন সমালোচকের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। সমালোচক তার বুদ্ধিমত্তা প্রশিক্ষণের নিরীখে একটি ছবিকে সম্পূর্ণ নিরর্থ বলে প্রমাণ করতে পারেন। আবার একটি প্রতিভা এবং অভিজ্ঞতাদীপ্ত ছবি একজন সমালোচকের বিদ্যাবুদ্ধির গোড়া ধরে টান দিতে পারে। আমাদের দেশে স্বভাবতই সমালোচনার মান এদেশের অধিকাংশ বায়োস্কোপের মতোই নিম্ন। এর অন্যতম কারণ পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব। সবচেয়ে বড় কারণ বিচার বুদ্ধিতে ভারসাম্যের অভাব। খুবই কমসংখ্যক সমালোচক আছেন যারা নিতান্তই ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, দ্বেষ, হিংসা-বিদ্বেষের উপরে উঠতে পারেন। ফলে সমালোচনা হয় ভারসম্যহীন এবং সমালোচনা মূল্য উদ্দেশ্য থেকে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।

সৃজনশীল সমালোচনার কোনো বাধা-ধারা আঙ্গিক নেই। কখনো একটা প্রবন্ধের আকার ধারণ করতে পারে, কখনো বা গল্পের কখনো বা কবিতার। তবুও ভাষা যেমন ব্যাকরণকে ছেড়ে চলতে পারে না তেমনি সমালোচনাও কতগুলো মৌলিক রীতিনীতি ব্যতিরেকে এগুতে পারে না। এখানে দেখা যায় একটি চলচ্চিত্রের সমালোচনায় শতকরা ৮০/৯০ ভাগ ব্যয়িত হয় চলচ্চিত্রে গল্প বর্ণনায় যেটা পাঠকের জন্য একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। কারণ সে ছবিটি দেখতে গেলে গল্পটিতো জেনেই ফেলে। অথচ ছবির শৈল্পিক এবং কারিগরি দিক নিয়ে পুংখানুপুংখ আলোচনা প্রায়শই বাদ পড়ে। আর একটি দুর্বলতা সচরাচর লক্ষ্য করা যায় একজন সমালোচকের বিচারের মাপকাঠির অস্পষ্টতা। যে মাপকাঠির মাধ্যমে একটি বায়োস্কোপের মান নিরূপণ অসম্ভব। কিন্তু সেই প্রচেষ্টাই দেখা যায়। আর একটি সমস্যা হচ্ছে ভাষার প্রয়োগ। বেশ কিছু সমালোচক আছেন যারা একটি বায়োস্কোপ দেখে ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে অভিধানের বাছা বাছা শব্দগুলো চয়ন করে একটি প্রশস্তি লিখে ফেলেন। এই সমালোচকই যখন একটি সফল জীবনধর্মী চলচ্চিত্র দেখবেন তখন তার জন্য কিন্তু আর কোনো ভাষা পড়ে নেই অর্থাৎ সমালোচকের ভাষা ব্যবহার ভারসাম্যের অভাব।১২

সাংবাদিক ফরিদউদ্দিন নীরদের মতেঃ
‘চলচ্চিত্র সৃষ্টি অধিকতর জটিল ব্যয়সাধ্য। কিন্তু সে জন্য চলচ্চিত্র সমালোচকের দায়িত্ব কিছু কমেনি এবং চলচ্চিত্র শিল্প এই জটিলতা সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গীর স্বচ্ছতা ও মত প্রকাশের বলিষ্ঠতা অধিকতরভাবে দাবি করে। ব্যবসায়ী সাফল্যের মাপকাঠিতে ছবির মূল্য নির্ণয় করেন চিত্র ব্যবসায়ী। শিল্পকর্ম হিসাবে ছবির মান নির্ণয় করেন সমালোচক।’

চলচ্চিত্র শিল্প এখন আর শিশু অবস্থায় নেই। একে পরিণত ভাবতে দেওয়া এবং কোনো অপকীর্তি না করা হয়,তাকে চোখে চোখে রাখাই হচ্ছে চিত্র সমালোচকের দর্শন। এই প্রেক্ষিতে চলচ্চিত্র সমালোচকের দর্শনকে শাণিত করে নিতে হবে, দৃষ্টিকোণ বেছে নিতে হবে এবং শিল্প প্রয়াসের বা পরিমিতির হাতিয়ারগুলি তৈরি করে নিতে হবে। সঠিক মূল্য নির্ণয়ের জন্য ছবির বিচার দুই স্তরে হওয়া উচিত। প্রথমতঃ সামগ্রিক বিচার; একটি ছবির গ্রহণযোগ্য কিংবা বর্জনীয়। দ্বিতীয়তঃ খণ্ড বিশ্লেষণ।

ছবির প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে তার বক্তব্য, ট্রিটমেন্ট ও শৈল্পিক মান। ভালো ছবি নিশ্চিতই কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বক্তব্য বহন করবে। সকল ক্ষেত্রে অত্যন্ত পরিস্ফুট হতে হবে এমন কথা নেই। শুধুমাত্র ইঙ্গিতই যথেষ্ট বলিষ্ঠভাবে বক্তব্য হিসেবে দেখা দিতে পারে। কোনো ক্ষেত্রে একটি প্রশ্নই অত্যন্ত তীব্রভাবে ছবিতে তুলে ধরা যেতে পারে যে প্রশ্ন দর্শক মনে একটি বক্তব্য সৃষ্টি করে নেবে। বক্তব্যহীন ভালো ছবি সম্ভব কিনা এ প্রশ্নও উঠেছে। ছবি তৈরির নতুন পরীক্ষায় এমন ছবি তৈরির চেষ্টা হয়েছে যাতে কোনো নির্দিষ্ট বক্তব্য হয়তো থাকবে না- থাকবে শুধু সমগ্র পারিপার্শি¦কতার পরিপ্রেক্ষিতে মানব জীবনের কোনো মুহূর্তের খণ্ডিত প্রকাশ। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও বক্তব্যবে অস্বীকার করার মধ্যেই নতুন বক্তব্য সৃষ্টি হয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই অপরূপ প্রকাশভঙ্গীই এক ভাষাহীন চিরন্তন বক্তব্য সৃষ্টি করে। মোট কথা বক্তব্যের উপলদ্ধির সকল ভালো ছবিতে থাকছেই।

ভালো ছবির দ্বিতীয় লক্ষণ রূপায়ণ পদ্ধতিতে চলচ্চিত্র মাধ্যমের পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার যার ছবিতে থাকা একান্ত বাঞ্চনীয়। সিনেমাটিক ট্রিটমেন্ট সম্বন্ধে আমাদের ধারণার পরিধি দিন দিন বাড়ছে। চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং চলচ্চিত্র সমালোচকদের দৃষ্টি এদিকটিতে ক্রমাগত স্বচ্ছ হয়ে আসছে।

চলচ্চিত্র নির্মাণের হাতিয়ার ও সৃষ্টিশীল শিল্পী মনের সমঝোতার এই ‘সিনেমাটিক ট্রিটমেন্ট’ এর উদ্ভব। ভালো ছবির আরও একটি গুণ হচ্ছে শিল্পোত্তর্ঢু হওয়া। এই গুণটি অবশ্য সকল শিল্পের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য।
ভালো ছবির শেষ বা আদিকথা হচ্ছে ‘লজিক’। ছবির দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে যাওয়ার কার্যকারণ সম্বন্ধে থাকতে হবে। কিংবা কতগুলো বিক্ষিপ্ত দৃশ্যও যদি উপস্থাপিত করা হয় তবে সেগুলিকে অবশ্যই শেষ পর্যন্ত একটি কার্যকারণ সম্বন্ধ উদঘাটন করতে হবে। অর্থাৎ একটি ভালো ছবি যা হওয়া উচিত তা হচ্ছে-
১. থেমেটিক
২. সিনেমাটিক
৩. আর্টিস্টিক
৪. রিয়ালিস্টিক
এবং ভালো ছবির আদি বা শেষ ‘লজিক’!

এ ধরনের বিশ্লেষণের বাহিরে সরাসরি বিচারের জন্য ভালো ছবির দু্িট লক্ষণ উন্মুক্ত থাকে সে হচ্ছে এর স্বকীয়তা ও তাৎপর্য। ভালো ছবির একটি স্বাধীন শিল্প সৃষ্টি সে কারও অনুলিপি বা প্রতিলিপি নয়।
গ্রহণযোগ্য ছবির লক্ষণ বিশ্লেষণ নির্ভর করে চলচ্চিত্রের সমালোচকের উপর। যে ছবির পয়সা দেয় না, চিত্র ব্যবসায়ীর খাতায় সে ছবি বাতিল। চিন্তাশীল দর্শক ও সমালোচকের যে ছবি গ্রহণযোগ্য নয় সে ছবি সরাসরি বাতিল বলে ঘোষিত হবে। সমালোচকের সুচিন্তা আলোচনা, স্বীকৃতি ও প্রচার নতুন দর্শক সমাজ তৈরি করতে সাহায্য করে। সমালোচকই দর্শকদের স্ট্যান্ডার্ডে নিয়ে যায় এবং ভালো ছবি তৈরির পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করে।’১৩
সমালোচকদের যোগ্যতা

১. চলচ্চিত্র সমালোচকের প্রাথমিক যোগ্যতাও চলচ্চিত্র মাধ্যম সম্পর্কে জানা (যেমন- ইতিহাস, নির্মাণ পদ্ধতি, গুরুত্ব, কার্যক্রম, প্রভাব, ভাষা, অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা) এবং প্রাতিষ্ঠানিক/পদ্ধতিগত শিক্ষা শেষে নিয়মিতভাবে চলচ্চিত্র মাধ্যম নিয়ে ২/৩ বছর লেখাপড়া করা।
২. চলচ্চিত্রের ইতিহাস, তত্ত্ব, বিকাশ, নান্দনিকতা ও পরিভাষা সম্পর্কে যথেষ্ঠ জ্ঞান।
৩. সাহিত্য, নাটক, কবিতা, সংগীত, ছন্দ, নৃত্য, চিত্রকলা, অভিনয় প্রভৃতি সম্পর্কে ধারণা।
৪. সামাজিক চেতনা।
৫. বিষয় এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা অনুধাবন।
৬. আনুপাতিক জ্ঞান।

মার্কিন লেখক ডেভিড আহরেনস্টাইন চিত্র সমালোচককে বর্ণনা করেছেন শতকরা ১০ ভাগ লেখক, শতকরা ২০ ভাগ সাধারণ বক্তা, শতকরা ৫ ভাগ সমাজবিজ্ঞানী, শতকরা ১৫ ভাগ অন্দর সংবাদদাতা এবং পঞ্চাশ ভাগ হতাশাগ্রস্ত চিত্রপরিচালক হিসেবে।১৪

তানভীর মোকাম্মেল লিখেছেন যে, চলচ্চিত্র তথা যে কোনো শিল্পকর্মের সমালোচনা অবশ্যই হওয়া উচিৎ বিষয়গত (ঙনলবপঃরাব) বা নৈর্ব্যক্তিক। বিষয়গত সমালোচনা শিল্পকর্মটির দু’টি দিকের গুরুত্ব দেবে। ছবিটির আঙ্গিক (ঋড়ৎস) ও বিষয়বস্তু । বিষয়গত সমালোচনার দুটি রূপ। প্রথমটি হচ্ছে চলচ্চিত্রের আঙ্গিক নিয়ে এক ধরনের নান্দনিক সমালোচনা। যেমন- সুররিয়ালিস্ট বা অ্যাবসার্ডিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কোনো ছবির আলোচনা। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে- চলচ্চিত্রটির বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা। এক্ষেত্রে সমালোচকের নানান রকম দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে। যেমন- আর্থ-সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি।১৫

তিনি আরও লিখেছেন, ‘ভালো চলচ্চিত্র সমালোচনায় কেবল কাহিনীটিই প্রাধান্য পাবে না। ছবিটির চিত্রনাট্যের কাঠামো, চলচ্চিত্র গ্রহণের সৌন্দর্য, সম্পাদনার গতি, অভিনয়ের মান, আবহ সংগীতের নান্দনিকতা- এই সবগুলো দিকই আলোচনার গুরুত্ব নিয়ে আসা কাম্য। আর এ জন্য একজন চলচ্চিত্র সমালোচকের প্রয়োজন বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাস ও গতিধারা, স্বদেশের সংস্কৃতি ও ইতিহাস, সাহিত্য, সংগীত, নাটক, চিত্রকলা, অভিনয়সহ শিল্পের সকল শাখা ও ধারা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা ও পর্যাপ্ত জ্ঞান। আর তার জন্যেএকজন সমালোচকের প্রয়োজন চলচ্চিত্র বিষয়ের ব্যাপক ও সার্বক্ষণিক পঠন-পাঠন এবং দেশ-বিদেশের ধ্রপদ ছবি সমূহ নিয়মিত দেখা। একজন ভালো সমালোচক বিশ্বের সেরা পরিচালকদের সেরা ছবিগুলো বারবার দেখবার কোনো বিকল্প নেই।