সানাউল্লার মৃত্যু সংবাদ
আমি লোকটিকে সানাউল্ল্যাহ মাস্টার নামেই চিনি। সানাউল্লাহ সাহেব দেখতে বেটে-খাটো ধরনের মানুষ। গায়ের রঙ ধবধবে ফরসা। মাথায় চুল একেবারেই নেই বললে চলে। কিছুটা টেকো মাথার লোকও বলা চলে। কথাবার্তায় বেশ ধীরস্থির। তবে বেশ আন্তরিকতাপূর্ণ বলা যায়। কলেজে ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে বা সহকর্মীদের সাথে কেমন সম্পর্ক জানি না, তবে আমার সাথে সামান্য ব্যবসায়িক পরিচয়ে দেখলাম লোকটির আচরণ ও আলাপে বেশ আন্তরিকতা রয়েছে।
ও হ্যাঁ, ওনার মাস্টার পরিচয়ের বাহিরেও আরেকটা পরিচয় রয়েছে। উনি একজন লেখক, বেশকিছু ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক, গল্প, উপন্যাস লিখেছেন। তবে তা আজো বই আকারে প্রকাশিত হয়নি। এছাড়াও ধর্মীয় অনেক বিষয় নিয়েও লিখে থাকেন। তবে এলাকার লোকজন ওনার এই পরিচয় সম্পর্কে তেমন একটা জানে না। উনি বই না ছাপালেও বই বিক্রি করে থাকেন সবসময়।
কলেজ ছুটির পর বিকেল থেকে রাত অবধি স্থানীয় জয়পুর হাট থানার কালাই বাজারে ইউনিক লাইব্রেরি নামে একটি বইয়ের দোকান চালু করেন অনেকটা শখের বশেই। তবে শখের বশে হলেও বর্তমানে দোকানটা বেশ চালু হয়ে গেছে। গল্প উপন্যাসের বই ছাড়াও স্কুল কলেজের পাঠ্য বই, খাতা, কাগজ, কলম, স্টেশনারী পণ্য বিক্রি করে থাকেন। ক্রেতা সাধারণও বেশ ভালোই আসে মাস্টারের দোকানে।
আমার সাথে সানাউল্লাহ সাহেবের পরিচয় এই বই বিক্রির সুবাদেই। আমার লেখক পরিচিতি কম থাকলেও প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা একেবারেই কম নয়। গল্প উপন্যাস, ছোটদের গল্প, কবিতা, আত্মোন্নয়ন মিলে দশটি বই প্রকাশিত হয়েছে। আর এই বইগুলো আমি বিক্রির জন্য দেশের আনাচে কানাচের বেশকিছু লাইব্রেরিতে দিয়ে থাকি। সানাউল্লাহ সাহেবের লাইব্রেরিতেও আমি বেশকিছু বই দিয়ে থাকি বিক্রির জন্য। ২০১৫ সালে প্রথম কিছু বই দিয়ে চলে আসি ঢাকায়। দীর্ঘ ১ বছরে আর কালাই যাওয়া হয়নি।
২০১৫ ফেব্রুয়ারির পরে নতুন বই নিয়ে যাই কালাইতে। সানাউল্লাহ মাস্টার সবসময় আমায় পেলে খুশি হতেন। অনেকটা বলা যায় বেচা কেনা বন্ধ রেখেও নানা গল্পে মেতে উঠতেন। চলতো কথার মাঝে চা নাস্তা পর্বও। বছরের বই বিক্রির হিসেবও এর মাঝে চুকিয়ে দিতেন। হিসেবের খাতায় জমা হতো নতুন বছরের নতুন বইয়ের তালিকা ও নাম।
এই তো মনে পড়ছে, গত বছর ওনার সাথে দেখা হলে হেসে বলেছিলেন, আরে, আসেন আসেন ইমন সাহেব, আমি মনে মনে কামনা করছিলাম আপনাকে। ভেবেছি ফোন করবো, তবু নিজ থেকে যেহেতু চলেই এলেন, ভালো হলো।
আমি আমার ২টি বই লেখার কাজ সমাপ্ত করেছি। পাণ্ডুলিপিগুলো পুরোপুরি ছাপানোর জন্য প্রস্তুত করেছি। এবার আপনাকে দায়িত্ব নিতে হবে এগুলো ঢাকার কোনো প্রকাশনা থেকে ছেপে দেয়ার। বিক্রি নিয়ে ভাববেন না। আমার নিজ লাইব্রেরি আছে, ক্রেতা হিসেবে আছে আমার কলেজের স্টুডেন্টরা। বই বিক্রি হয়ে যাবে।
ওনার কথার সূত্র ধরে আমি বললাম, তা আমি জানি। বই বিক্রির জন্য আপনার লাইব্রেরির কাস্টমাররাই যথেষ্ট। আমি বই প্রকাশের ব্যবস্থা করবো নিশ্চয়ই। ২০১৭ সালের বইমেলা উপলক্ষে আপনার বই বের করে দেবো।
সানাউল্লাহ সাহেবের মুখ খুশিতে ভরে উঠতে দেখলাম আমার আশ্বাসে। সেবার আমায় একটু বেশিই যেন আদর আপ্যায়ন করলেন লোকটি।
এরপর আমি চলে আসি ঢাকায়। কথা ছিল উনি কাজ শেষে পাণ্ডুলিপিগুলো ডাকে পাঠিয়ে দেবেন আমার ঠিকানায়। কিন্তু ২০১৭-এর বইমেলা চলে এলেও উনার পাণ্ডুলিপি আর পেলাম না। ভেবেছি হয়তো তৈরি করে পাঠাতে পারেননি।
এর কিছুদিন পরই শুনলাম ভয়ানক দুঃসংবাদটি।
আমার এক নিকট আত্মীয় জানালো। সানাউল্লাহ মাস্টার সাহেব নাকি হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। সংবাদটি শুনে খুবই মর্মাহত হলাম। সারাদিন মনমরা হয়ে থাকলাম। বারবার চোখের পর্দায় সানাউল্লাহ মাস্টারের হাসিমাখা মুখখানা ভেসে উঠলো। ভেসে উঠলো পাণ্ডুলিপি বই আকারে প্রকাশ করার প্রতিশ্রুতি শুনে হাসি মুখের অভিব্যক্তির ছবিও।
এরপর সংসার জীবন ও কর্মময় জীবনের স্রোতে ভেসে ভেসে আমিও ভুলেই গেছি সানাউল্লাহ মাস্টারের কথা। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারির পরে নতুন বই নিয়ে আমারও আর যাওয়া হয়নি কালাইতে। মাস্টার সাহেব মৃত, ওনার লাইব্রেরি কে আর চালাবে? হয়তো তা বন্ধ হয়েও গেছে। এই ভেবে আমি আর কালাইতে যাইনি।
গতমাসে গেল রমজানের ঈদের বন্ধের লম্বা ছুটি। আমি ঈদ শেষে গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর থেকে লঞ্চযোগে ঢাকায় ফিরছি কর্মস্থলে। হঠাৎ একটি আননোন নাম্বার থেকে একটি কল এলো আমার মোবাইলে। আমি লঞ্চে বসে কল রিসিভ করতেই শুনলাম এক পরিচিত কণ্ঠস্বর।
তবুও জিজ্ঞেস করলাম, হ্যালো কে বলছেন আপনি? উত্তরে যা শুনলাম, তা আমাকে বেশ আশ্চর্য ও ভাবনায় ফেললো। অপর প্রান্তের লোকটি বললো,
আরে ভাই আমায় চিনলেন না, আমি কালাই থেকে সানাউল্লাহ মাস্টার বলছি। ভালো আছেন আপনি? গ্র্রামের মানুষ বলে আমাদের কথা এভাবে ভুলে গেছেন! এক বছর হলো, না একবার আসলেন বেড়াতে, আর না একবার খোঁজ নিলেন ফোনে? তো এবার ঈদে কালাইতে আসেননি বেড়াতে?
আমি আর কী জবাব দেবো বলুন! শুধু মোবাইল কানে ধরে রেখে ওনার কথাগুলো শুনেই যাচ্ছি। যেই মানুষকে ভেবেছি মৃত, সে মানুষ জীবিতই আছেন! আবার ফোনও করছেন! কণ্ঠস্বরও একই। অস্বীকার করি কি করে যে, উনি সানাউল্ল্যাহ মাষ্টার নয়? কণ্ঠে সেই আন্তরিকতাপূর্ণ উচ্চারণ!
আমার কণ্ঠস্বর থেকে যেন কোনো কথা বের হচ্ছে না। আমি নির্বাক হয়ে ভাবছি, তাহলে যে আমার নিকট আত্মীয় বললো, সানাউল্লাহ মাস্টার মারা গেছেন? তা কি ভুল ছিল? না আমি ভুল শুনেছি!
আমার মাথাটা কেমন যেন ঝিম ঝিম করে উঠলো।
আমি কোনোমতে উনাকে বললাম, আমি শীঘ্রই কালাই এসে আপনার সাথে দেখা করবো সানাউল্লাহ সাহেব। আপনি ভালো থাকুন। উত্তরে উনি খুশি হয়ে বললো, আসুন আসুন, আমি আপনার অপেক্ষায় থাকবো।
আমি মোবাইলের লাইন কেটে দিয়ে রহস্যের ঘোরে আবদ্ধ হয়ে রইলাম। আর ভাবছি, এই রহস্য আমাকে উন্মোচন করতেই হবে কালাই গিয়ে।

