সমাজ বদলে গেছে কথটা মূল অর্থে সত্য নয়। সমাজ জীব-জড় কোনোটাই নয়। তাহলে বদলে যাওয়া শব্দটি কেন ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি কি তাহলে ভুল? ভুল বা সঠিক এই তর্ক সমাধান যোগ্য করতে হলে সমাজের পরিবর্তন যোগ্য উপাদান চিহ্নিত করে তা বিশ্লেষণ করতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো সমাজের এমন উপাদানটি কী যার জন্য জীব বা জড় না হয়েও সমাজ বদলে যায়। কোনো একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে মানুষ না থাকলে সেটিকে সমাজ বলা হয় না। এ তথ্যের বদৌলতে বলা যায় মানুষ হলো সমাজের অপরিহার্য উপাদান যার উপর সমাজ নামের কাঠামোর সব কিছু নির্ভর করে।
এতো গেল সামাজতাত্ত্বিক কথা। কিন্তু এর বাইরে আর একটা কিন্তু আছে। এই কিন্তুই হলো আসল। আর সেটা হলো সমাজবদ্ধ মানুষের সংস্কৃতি। সংস্কৃতি বদলায় বোধের জন্য। বোধের বদল নির্ভর করে জ্ঞান আহরণের উপর। জ্ঞান আহরণ শিক্ষার সাথে জড়িত। শিক্ষার দুটি হাত একটি কর্মমুখী (গৌণ) আর অপরটি ভৌত (মূখ্য)। আর ভৌত শিক্ষার মস্তিষ্ক হলো সাহিত্য। মোট কথা হলো কোনো সমাজ বদলানোর কারণ হলো সে সমাজের সাহিত্য। সাহিত্য যেমন হবে সমাজের বদল তেমন হবে।
মানুষ প্রতিটি মূহুর্ত সাহিত্যের মাধ্যমে কাটায়। এ কথা শুনে কেউ কেউ আবার চোখ বড় করে কপালের চামড়া কুঞ্চিত করতে পারেন। সেটা একান্ত ব্যাক্তিগত সমস্যা। আসল হলো এটাই সত্যি। আপনি শত চাইলেও বিজ্ঞান ও সাহিত্য বাদ দিয়ে ন্যানো মূহুর্তও পার করতে পারবেন না। কেননা আমরা যা করি তা হলো বিজ্ঞান। আর এর প্রকাশ ভঙ্গি হলো সাহিত্য। এবার হয়তো আপনি আমার কথার যন্ত্রণা হতে রেহাই পেলেন। মস্তিষ্কের এ বিষয়ক চাপ দূর হলো। কিন্তু এই যুক্তিতে সবার কপালের চামড়ার ভাঁজ দূর হবে না বা মস্তিষ্কের চাপও কমবে না। এতে দোষের কিছু নেই। এটা স্বাভাবিক। খুব সহজে সবকিছু মেনে নেয়া মানুষের সংখ্যা যত কমবে সে সমাজের চেহারা ততো সুন্দর ও মমতাময়ী হয়ে উঠবে। যারা উরোক্ত যুক্তিতে একমত পোষণ করতে পারেন নি তাদের নিয়ে দিনের অন্তিম বেলায় একটু ঘুরতে বের হতে চাই। আশা করি এই অন্তিম বেলাকে সূর্যাস্তের পূর্বক্ষণে সীমাবদ্ধ রাখবেন না।
আপনারা তিন বন্ধু ঘুরতে বের হলেন। গন্তব্য শহরের শেষ মাথায়। এর আগে কখনো ওখানে যাননি। যেতে যেতে বেশ ক্লান্ত ও ঘর্মাক্ত হলেন। একটা বেশ পুরানো বাড়ি দেখতে পেলেন। বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন। কোথাও কাউকে দেখতে পেলেন না। বাড়িটি পরিত্যাক্ত। তিনজন পাশাপাশি বসলেন। সামনে একটা পানির টেপ দেখতে পেলেন। ইচ্ছে হলো হাত-মুখ ধুয়ে নিতে। উঠে গিয়ে পানির টেপ ছাড়লেন। দেখলেন যে পানির টেপ ছাড়লে পানির পরিবর্তে রক্ত পড়ছে। আর তিন বন্ধু মিলে ভয়ে দৌড়ে পালালেন। বাইরে এসে এই খবর ছড়িয়ে দিলেন। মানুষের মুখে মুখে আপনাদের বলা ঘটনা বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়ল। বড়িটির নতুন পরিচয় বা নাম হলোÑ ‘ভূতের বাড়ি’। যে বাড়ির পানির টেপ দিয়ে রক্ত পড়ে।
অধিকাংশ ভদ্র বা সভ্য নামের মানুষ আপনাদের কথা বিশ্বাস করে ভয়ে ওদিকে যাওয়া বন্ধ করে দিলো। সেই সুযোগে একদল লোক ঐ বাড়িটি অপরাধের অভয়ারণ্য করে তুললো। কেননা ভূক্তভোগী জানে ওখানে ভূত আছে। যা করেছে ভূতে করেছে। এই হলো বিজ্ঞান ছাড়া সাহিত্য। আপনরা বিজ্ঞানকে আলাদা না করলে বলতেন- পানির টেপ অনেক দিন ব্যাবহার না করায় লোহার পাইপে মরিচা ধরায় এমন লালচে পানি বের হচ্ছে। এবার তো পরিস্কার হলো বিষয়টি।
সাহিত্যকে বিজ্ঞান থেকে আলাদা করলে তা হয় কুসংস্কার। যা মানুষের ভিতরে মরিচা ধরায়। সমাজের অবনমন ঘটায়। সাহিত্যের মেরুদণ্ড হতে হবে বিজ্ঞান। যা মানুষকে আলোকিত করে। সমাজ আলোকিত হয়। আনন্দের আলোয় ভরে উঠবে মানুষের মন। মানুষ একমাত্র প্রাণী যারা কোনো একটি বিষয়ে বা ব্যাবস্থায় নিরবিছিন্নভাবে থাকতে পারে না। যেমন ধরুন একজন মানুষ সম্পত্তিতে অভাবহীন আছেন তিনি কিন্তু মনের দিকে অভাবী থাকবেন। আর একটু পরিস্কার করে বললে এভাবে বলা যায়-টাকা-পয়সা, বাড়ি-গাড়ি ইত্যাদিতে যদি কারো অভাব না থাকে তবে তার প্রেমে অভাব থাকবে। আবার কারো প্রেমে অভাব নেই কিন্তু অর্থ-সম্পত্তিতে সে অভাবী।
আর এমন অবস্থার প্রতিফলন শুধু সাহিত্যে ফলানো যায়। একই সাথে পূর্ণতা ও অপূর্ণতা, সুখ ও দুঃখ। তাই সাহিত্যই মানুষের মননকে পরিপূর্ণভাবে ছুঁতে পারে, আলোরিত করতে পারে। এ জন্যই মানব জীবনে সাহিত্যের গুরুত্ব অপরিসীম। সমাজে সাহিত্যের প্রভাব অতুলনীয়। সাহিত্য উজ্বল না হলে সমাজ আলোকিত হয় না। মানুষের বোধ শাণিত হয় না। সভ্যতা নামের বিপ্লব বয়ে আনেনা। প্রেমের মমতাফুল ফোটায় না। বদলের স্লোগান হয় বিপরীতগামী। অসুন্দেরের পোশাকের ভিতর লুকিয়ে পড়ে সুন্দর। অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মতো গাড়াগড়ি দিয়ে মুখ থুবরে পড়ে অন্ধকার নামের কূপে।

সাহিত্য হতে হবে বাস্তব ও হৃদয়স্পর্শী। ইচ্ছের কোনো খেলা সাহিত্য হতে পারে না। কল্পনার আল্পনা পরাবাস্তব হতে পারে কিন্তু অবাস্তব হতে পারে না। কেননা, অবাস্তব সাহিত্য মানুষের ভিতরকে অসহিষ্ণু করে তোলে। সীমারেখাকে অলীক ও সীমাবদ্ধ বলে আখ্যায়িত করে অনাসৃষ্টি সৃষ্টি করে। আলোর দিকের পরিবর্তে অন্ধকারের দিকে সাঁকো তৈরি করে। দুঃখকে সুখ নামে ডাকে। কষ্টকে শান্তি বলে আখ্যায়িত করে।
অপরিপূর্ণতা সাহিত্যের কোনো বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। কেননা মানুষ ও মানুষের জীবন অপরিপূর্ণ নয়। মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন সম্পূর্ণ তেমন সাহিত্যের প্রতিটি শাখাও পরিপূর্ণ হওয়া চাই। বাতাসমুখী কোনো লেখা সাহিত্য হতে পারে না। ব্যক্তির মনোরঞ্জণ সাহিত্যধর্ম বর্হিঃভুক্ত। সাহিত্য হলো আলো। সাহিত্য সবার। সবাইকে ছুঁয়ে দেয়াই হলো সাহিত্যের ধর্ম।
জীবনের সমান্তরাল সাহিত্য হলো মেরুদণ্ডী সাহিত্য। যা দাঁড়াতে জানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। মিছিল হয় মানুষের ভিতরে ও বাহিরে। আপন শক্তিতে জ্বলতে থাকে এবং জ্বালায় মানব মস্তিস্ক। মানব অন্তরকে করে প্রেমবাতি আর সমাজকে করে প্রেমঘর। সাহিত্য হলো অন্তর আত্মার খাদ্য। এই খাদ্য সুষম না হলে অন্তর আত্মা রুগ্ন হয়ে পড়বে। আর রুগ্ন অন্তর সহজ চিন্তা করতে পারবে না। চিন্তা শক্তি বলিষ্ঠ ও সুস্থ না হলে সমাজ সুন্দর হওয়ার প্রশ্নই আসে না।
বাংলা সাহিত্য অন্ধকার যুগ পার করে আলোর মুখ দেখার কথা ছিলো। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের ভাগ্যে সেটা জুটল কোথায়! এখন তো বাংলা সাহিত্য বন্ধ্যা যুগ পার করছে। সামাজে, রাষ্ট্রে, ঘরে, বাইরে, মনে ও মননে দৃষ্টি দিলে সকালের টকটকে লাল সূর্যের মতো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এর কারণ মেরুদণ্ডী সাহিত্যের অপ্রতুলতা। কেন এমন হচ্ছে? কারণগুলো বের করে সাহিত্যকে বলিষ্ঠ করতে হবে। এখনই এর উপযুক্ত সময়। অন্যের সাহিত্যের অনুকরণ ও অনুসরণ বন্ধ করে নিজস্ব চিন্তার বিকাশ ঘটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। আনন্দের স্রোত তৈরি করে দুঃখকে ঢেউ করে দিতে হবে। যা সমাজের মূল উপাদানকে বদলে দিবে প্রত্যাশিত স্বপ্নের দিকে। সাহিত্যিকরা কোনো ভাবেই এই দায় এড়াতে পারে না। নিজের মেরুদণ্ডের দিকে তাকিয়ে তাকেও রচনা করতে হবে মেরুদণ্ডী সাহিত্য। এটা এখন সময়ের দাবি। সমাজের প্রত্যাশা। সাহিত্য জরায়ুর কান্না।
সুন্দর সাহিত্য মানে বাস্তব সাহিত্য। হৃদয়ের আয়না। সমাজের প্রাণ। আনন্দের রাজা। তাই সহিত্য রচনার প্রতি সর্বোচ্চ সচেতনতা অবলম্বণ করা আবশ্যক। ইচ্ছে বা মনের খায়েশকে প্রধান্য করে সাহিত্য রচনা করার কোনো অবকাশ নেই। সাহিত্যের শরীরজুড়ে থাকা চাই নন্দনতত্ত্ব। নান্দনিক সাহিত্য হৃদয়ের চোখকে তেজি করে তোলে। হৃদয়ের পৃথিবীকে পরম করে তোলে। সুন্দর স্রোতে ভাসিয়ে স্বপ্নকে নিয়ে যায় আগামীর জঠরে। জন্ম দেয় অনিন্দ্য বাস্তবতা। অমোঘ সত্যের কুসুম হাসি। চারদিকে ছড়িয়ে দেয় আনন্দের বিচ্ছুরণ।

