রাসেল আবদুর রহমান-এর গুচ্ছ কবিতা


রাসেল আবদুর রহমান-এর গুচ্ছ কবিতা

আমাদের ডাস্টবিন নেই

মা রাঁধেন আর বাবা বসে চোখের পৃথিবীতে আঁকেন চৈত্রের জমিন
আমি বৈশাখীচোখে চষে চলছি সমস্ত উঠান
আগাছাদের প্রাণের মতো বাড়ছে আমার স্বপন।

আমাদের ডাস্টবিন নেই, তাই কিছু স্বপ্ন রেখে দেই উঠানের কোণে
আর কিছু জ্বালাই মায়ের রান্নার উনুনে!

 

বেদনার শহরে

বেদনার শহরে শরীর ফেরি করে রাষ্ট্রচিন্তা
দারুণ আনন্দবার্তা
যুবতীরা বন্ধ্যা হলে জরায়ুর দাম বাড়ে!

অনিয়মের শরমে পৃথিবীর বাতাস হচ্ছে গরম
গলছে বরফ, বিবেক-বোধ; বিশৃঙ্খলা উত্তেজনায় চরম।

 

ব্যথার শহরে

…এরকম একদিন ভেঙে যাবে সাঁকো খুলে যাবে গিরা দেয়া সুতো
পা তখন মনের অজান্তে ভুল পথের ধূলো উড়াবে আরো কত কত
পোষা সুখ বুনো হয়ে ভয়ে ভয়ে ছুটবে অন্ধকার পাতার আড়ালে
কত হারালে কত বাতাসে উড়বে, মন সে কথার বিয়োগে অস্থির
চারদিকে পাপের দাপট সত্যের বিচার থিরথির!
ঢেড় দুঃখে সুখ বেচি আহা চোখের আহার রঙধনুর বাহার
সে কথায় চোখ নাচে বোধের বাড়ি রূপের দেয়াল করে সব ছারখার
এসো না এমন সময়ে মনের গল্প করি, চাঁদে কিছু জমি কিনি
রূপকথার উঠোন জুড়ে ইচ্ছাফুলের বাগান গড়ি
কেউ করো নই, সেই ফলের বৃক্ষ রোপণ করে দেই পাড়ি সময়নদী।

ভুল করে গোপনে কিছুটা প্রেম রেখে যাই স্মৃতি করে
ব্যথার শহরে— নাকফুলে অথবা সিঁথির সিঁদুরে।

চোখজল

জল নেবে?
একঘটি চোখজল!
স্ফটিকের মতো যার ভিতর তোমর প্রতিবিম্ব!

তোমার চোখের কার্নিশে ঝুলছে সে মুহূর্তগুলো, হয়তো সময়ের ছত্রাকে বির্বণ
স্মৃতির ডায়েরি খুলে দেখ আমার প্রেমের নামে ফোটা গোলাপগুলোর খসেনি পাপড়ি
নতুনের ভারে চাপা পড়ে কিছুটা ধূসর হয়ে রোদেলা রাখে তোমার মনবাড়ি।

আয়না দেখ অতীতের চোখে
দেখ রেটিনায় কার মুখ আলো হয়ে দোলে—
লেকপাড়, কপিশপ, হুট তোলা রিক্সায় দখিনা বাতাসের ঢেউয়ে কার চুল ওড়ে!
বলো; জল নেবে?
একঘটি চোখজল!
অবথা কিছুটা জল দাও ঝর্ণা হয়ে যাই
প্রেমর নামে নদী সাজাই
নদী আর প্রেম ভাঙা-গড়া খেলা খেলে তালে তালে বয়ে চলে পহাড় তো হয় না।
বলো; জল দেবে?
আমার প্রেমের নামে যে জল ঝরে তোমার চোখে!

 

!

রিশিতার মা
দ্যাখো দ্যাখো আমাদের লাল-সবুজের পতাকার লালবৃত্তটা ক্রমাগত বেড়ে চলছে
সমস্ত সবুজ… দ্যাখো দ্যাখো তরতর করে কাঁপছে
না, না দৃষ্টিভ্রম হচ্ছে না!
আরে… তোমাকে তো ঠিকই দেখতে পাচ্ছি
ঐ যে তোমার ব্লাউজের লালবোতাম
আঁচলে আঙিনার ধূলো, কপালের ঘাম, হাতে কাটা তরকারির কষ
কই কোন সমস্যা হচ্ছে না তো?
তুমিও একটু ভালো করে চেয়ে দ্যাখো তো
লালবৃত্তের দিকে… দ্যাখো দ্যাখো বেড়েই চলেছে
সমস্ত সবুজ মুছে যাবে না তো!
কি যে বলো… আমি পাগল হয়ে গেছি
আরে না— তোমাকে দেখলে সোহাগের ইচ্ছা জাগে
ক্ষুধা ও কামের ঘ্রাণ বুঝতে পারছি। পাগলের এসব বোধ থাকে না।
আচ্ছা শোন, রিশিতা কী স্কুল থেকে ফিরছে?
… খুব ভয় হয়। কখন যে কার রক্ত গিয়ে লালবৃত্তে যোগ হয় কিছু বোঝা যাচ্ছে না!

 

জন্মপাপ

তোমার আমার দাদার ভিটার বিভাজন রেখা স্পষ্টত আলাদা
অথচ এ জমির ভিতর কোন বিভাজন রেখা ছিলো না একদিন
কোন ভেদ ছিলো না—স্ফীতস্তনের মতো গর্ভবতী ধানগাছে, সবুজের সমারোহ ছিলো।
এসো একটা চুলের গোড়ার জিনোম মিলিয়ে দেখি
অথবা সহজে নিতে পার মিলিয়ে ভেদ-বিবাদ রক্তের রঙের দামে
অথবা আদমে। হাওয়ার স্তনে ছিলো না ভেদ।
এসো বাতাসের বুকে এঁকে দেই বিভাজন রেখা অথবা মানচিত্র দাগ
বদলে দেই মানুষের অপারগতার ইতিহাস। বেড়ায় থামিয়ে দেই ভেসে চলা মেঘ,
সূর্যের আলোক ঝাঁক। ঘুরিয়ে দেই প্রেমর ভাব, কামের রঙ, জঙ্গার কারুকাজ।
ভাষা ঘুরিয়েছি, মত, পথ অথচ ঘুরাতে পারিনি মৃত্যুর রূপ,
দৃষ্টির অপূর্ণ অসুখে অসুর হয়ে তবে কেন এতো দাঙ্গা? মানুষ— সংঘাত কী তোমার জন্ম পাপ?

 

আমাদের গল্প

ভাঁটায় কতটা জল নেমে গেলে নদী কেঁদে ওঠে সেই হিসেব রাখার কেউ কী আছেন? সংসার বড়ই আপন কেন্দ্রিক। তাই তো গল্প আপন গতিতে চলে না— ঘামের দামে নামে না নতুনের ইতিহাস! কার্তিকের মাঠে কেউ খোঁজে না আষাঢ় কিংবা ভাদ্রের সংগ্রাম।

নদীর কথায় আসি— জল নেমে গেলে হাহাকার, জলে দুই কূল ভাঙ্গলে হাহাকার, জল উগরে দিলে হাহাকার। নদীর কতোই দোষ!

নদী কার? এই প্রশ্নে আসি; কেউ নদীর পিতার হতে রাজি নই। আমাদের চোখ অগ্রহায়ণে, হৃদয়ে অগ্রহায়ণের মাঠ। আমরা বুঝি না, খুঁজি না ইতিহাস। কপালে চার আঙুল ঠেকিয়ে বলি রাজা না হওয়ার অমিত গল্প! আমাদের মন জরায়ু বোঝে না তাই যোনির স্বাদের ইতিহাস লিখি অথবা শিশ্ন না থাকার শোকগাথায় বিভোর।

 

ছবি

মেঘ হলেই ছবির মতো এঁকে ফেলি
আমাদের ঘর
আমাদের বাড়ি
আমাদের পাড়া
আমাদের গ্রাম
আর আঁকি একটা নদী— যাকে কোনদিন বুঝিনি এ আমি।
তাই আনমনে নদীটাকে মানুষের আকৃতি দেই
স্বপ্নের গরম কথা বলি
আনন্দের হাসি দিয়ে ভরি
দুঃখের গান শোনাই
অতঃপর কাঁদতে থাকি— তারপর চেয়ে থাকি অপলক!
নদীর শরীর ছুঁয়ে কতকিছু ভাবি…

পাখি উড়ে যায়
বাতাস মাতাল হয়
জলের বুকে কাঁপন ধরে
যেই চোখের অক্ষরে তাকাই নদীর দিকে
নদী পাল্টে যায়…
তখন বুঝতে আর বাকি থাকে না আমি আর নদী, আসলে কেউ কারো না!

 

এখন

আমাদের সময় এখন দারুণ! আহত পাখির যেমন ডানা
উড়াতে শূন্যের বুকে নেমে আসে ব্যথার শীৎকার
আমাদের আকাশ আমাদের শহর ব্যথার আধার
এখানে এখন খুনি করে খুনের বিচার, চোরে বন্দী করে চোর
নরম চেখের ঘাসেরা বিদ্রুপ নামে ছড়া লিখে
প্রতিবাদ তুলে দেয় ডোমেদের হাতে
অধিকার ছিনতাইকারী মিছিল নামায় অধিকারের ইরশাদে!

আমাদের এখানে এখন, দারুণ ধাঁধা প্রতারণার ফুটন্ত গোলাপ
যে জানে না মিথ্যার মিছিল সে বড় অভাগা
বদলে গেছে রমণ ও রমণী ইথারে আবেগের ঘর
রাস্তায় অচেনা সব, সকলে-ই সকলের পর!
বদলে গেছে নদী, বদলে গেছে চর
বদলে গেছে মানুষী স্বভাব, বদলে গেছে অভাবী পৃথিবী ও অভাব!
এখানে এখন শান্তির নামে যুদ্ধ নামে
এখানে এখন পতিতা পতিতাকে পতিতা বলে গালি দেয়
যুদ্ধবাজ দখলদার গলা উঁচিয়ে যুদ্ধের বিরুদ্ধে চেঁচায়!
এখানে এখন জটিল যুক্তির ধাঁধা
এখানে এখন কেউ কারো না!

 

পরকীয়া

এক গ্লাস জল দেবে
শরীরটা যেন কেমন করছে
শুতে পারলে হয়তো ভালো লাগত।

এতো ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলার কী আছে
কাছে আসতে চাচ্ছ, সেটা সরাসরি বললেই তো হয়।
আচ্ছা, আমার সাথে প্রেম করবে?
না।
কেন?
শুধু কি শরীর?
হয়তো!
বলো তো প্রেম করতে চাও না কেন?
তুমি ভেবে নাও…
মনেও ভাগ বসাব তাই।
না।
বউয়ের সাথে ঝামেলা হবে? যখন তখন মনে পড়ব?
না।
কাঁধে আমার দ্বায়িত্ব উঠবে!
না।
তাহলে কী?
তুমি শরীরে বেঁধে রাখার জন্য প্রেমের অভিনয় করবে আর আমি তোমার অভিনয় বিশ্বাস করে ছলনাকে ভালোবেসে নিজেকে হারাব। ছলনায় প্রেম হয় না, নেমে আসে কষ্ট ও অন্ধকার। কারো সন্তানের মা হয়ে অন্য পুরুষকে কখনো প্রেম দেয়া যায় না আর।

জলছবি/মেজবাহ মুকুল