‘জেগে ওঠো’ কাব্যগ্রন্থ জীবনবোধের সহজ উচ্চারণ
প্রথম কাব্যগ্রন্থ একজন লেখকের আত্মপ্রকাশের দলিল। সেখানে যেমন থাকে অদম্য আবেগ, তেমনি থাকে ভাষা ও শিল্পকে আয়ত্ত করার আন্তরিক চেষ্টা। কবি মোহাম্মদ সামসুজ্জামান সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে আশ্রয় নিয়েছেন মানুষের জীবন, সমাজ, প্রকৃতি, পরিবার, প্রেম, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিক চেতনার। ফলে তার কবিতায় ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক দায়বোধ পাশাপাশি স্থান পেয়েছে।
কবি তার শিরোনাম কবিতায় মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন-
“আজ তোমাকে জাগতেই হবে / গাইতেই হবে গান / মানুষের তরে মানুষ মোরা / স্রষ্টা করেছে মহান।”
এই উচ্চারণে মানবতাবাদী চেতনা স্পষ্ট। এতে সমাজমনস্ক একজন মানুষের বক্তব্য উঠে এসেছে। বিশেষ করে মানুষ কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি লেখকের ভাবনার পরিচয় বহন করে-
“মানুষের মতো চেহারা হলেই কি / শ্রেষ্ঠ হওয়া যাবে?…
ব্যথিত মনের কষ্টযাতনা / যে বুঝিবে আগে / সেই তো শ্রেষ্ঠ, সৃষ্টির সেরা / মানুষ হবে আগে।”
এখানে কবি মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে মানবিক গুণকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ভাবগত দিক থেকে এই বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ।
নিজ গ্রামের প্রতি কবির গভীর মমত্ব ‘সট্টি আমার গ্রাম’ কবিতায় বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছে। গ্রামীণ জীবনের সরলতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং শৈশবস্মৃতির প্রতি তার অনুরাগ কবিতাটিকে আত্মজৈবনিক মাত্রা দিয়েছে। একইভাবে ‘পদ্মাপাড়’ কবিতায় পদ্মা নদীর ভাঙনকে কেন্দ্র করে মানুষের বাস্তুচ্যুতি ও স্মৃতিবেদনার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
গ্রন্থটির সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী কবিতাগুলোর একটি ভ্রাতৃবিয়োগ। অকালে ছোট ভাইকে হারানোর বেদনা কবি দীর্ঘ আবেগঘন বয়ানে প্রকাশ করেছেন। ব্যক্তিগত শোক, পারিবারিক স্মৃতি এবং মৃত্যুচেতনা কবিতাটিকে আন্তরিক করেছে। একইভাবে বাবা, মা, বন্ধু মামুন প্রভৃতি কবিতায় পারিবারিক সম্পর্ক ও মানবিক বন্ধনের প্রতি লেখকের গভীর শ্রদ্ধাবোধ প্রকাশ পেয়েছে। এখানে অলংকারের চেয়ে অনুভূতির সত্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রেমের কবিতাগুলোর মধ্যে অব্যক্ত ভালোবাসা তুলনামূলকভাবে বেশি পরিণত। এই কবিতায় গদ্যছন্দের প্রবণতা, আত্মকথন এবং সামাজিক বাস্তবতার সংযোগ বইটির অন্য অনেক কবিতার তুলনায় কিছুটা ভিন্ন মাত্রা সৃষ্টি করেছে। যেমন-
“আমি যে নিচু জাতের সন্তান / তাই বলে কি আমার ভালোবাসার অধিকার নেই? / আমিও তো তোমার মতো রক্তমাংসে গড়া মানুষ।”
এই অংশে প্রেম ব্যক্তিগত অনুভূতির গণ্ডি ছাড়িয়ে সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্নে পৌঁছে গেছে। যদিও আরও সংযমী ভাষা ও অধিক প্রতীকী প্রকাশ কবিতাটিকে শিল্পগুণে সমৃদ্ধ করতে পারত।
তবে সাহিত্যসমালোচনার দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে হয়, জেগে ওঠো গ্রন্থের অধিকাংশ রচনা প্রচলিত অর্থে পূর্ণাঙ্গ কবিতা হয়ে ওঠেনি; বরং ছন্দোবদ্ধ বক্তব্য, আবেগঘন বয়ান কিংবা নীতিকথাভিত্তিক পদ্যের কাছাকাছি অবস্থান করেছে। কবি বক্তব্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন; ফলে অনেক ক্ষেত্রে কাব্যিক ব্যঞ্জনা, চিত্রকল্প, রূপক, প্রতীক এবং ভাষার বহুস্তরীয় অর্থ নির্মিত হয়নি। পাঠককে অনুভবের ভেতর প্রবেশ করানোর পরিবর্তে কবি প্রায়ই বক্তব্য সরাসরি বলে দিয়েছেন।
অনেক কবিতায় পুনরুক্তি লক্ষ্যণীয়। বিশেষ করে প্রেম ও বিচ্ছেদভিত্তিক কবিতাগুলোর মধ্যে বিষয়গত ও ভাষাগত মিল এত বেশি যে পৃথক কবিতা হিসেবে তাদের স্বাতন্ত্র্য কিছুটা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। যেমন- “কী ভুল ছিল আমার, তুমিহীনা জীবন আমার, কাঁদব না আমি, মিছে মায়া, নীরব আমি” এসব কবিতায় আবেগ আন্তরিক হলেও ভাষা ও চিত্রকল্পে বৈচিত্র্যের অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে অনেক কবিতা প্রয়োজনের তুলনায় দীর্ঘ হওয়ায় তাদের কাব্যিক সংহতি দুর্বল হয়েছে।
ছন্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আরও সচেতনতা প্রয়োজন। কোথাও স্বরবৃত্ত, কোথাও মাত্রাবৃত্ত, কোথাও আবার গদ্যছন্দের প্রবণতা দেখা গেলেও সেগুলোর ব্যবহার সব সময় শিল্পসচেতন নয়। অন্ত্যমিলের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং সরাসরি বক্তব্য অনেক কবিতাকে বক্তৃতামূলক বা উপদেশধর্মী করে তুলেছে। ফলে কবিতার অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও গ্রন্থটির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি রয়েছে। লেখক কৃত্রিম দুর্বোধ্যতা বা ভাষাগত কৌশলের আশ্রয় নেননি। তিনি নিজের দেখা জীবন, নিজের গ্রাম, পরিবার, বিশ্বাস, প্রেম ও বেদনার কথাই অকপটে বলতে চেয়েছেন। এই সততা এবং মানবিক দায়বোধই বইটির প্রধান সম্পদ।
নতুন কবি হিসেবে মোহাম্মদ সামসুজ্জামানের সামনে যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে পরিণত শিল্পে রূপ দিতে হলে তাকে বাংলা কবিতার ধ্রুপদি ও সমকালীন ধারার আরও বিস্তৃত পাঠে মনোযোগী হতে হবে। ভাষাকে আরও সংহত ও ব্যঞ্জনাময় করা, পুনরাবৃত্তি কমানো, প্রতীক ও চিত্রকল্প নির্মাণে সচেতন হওয়া এবং প্রতিটি কবিতাকে একাধিকবার সম্পাদনার অভ্যাস গড়ে তোলা তার জন্য জরুরি। অনুভূতির আন্তরিকতা তার আছে; এখন প্রয়োজন সেই অনুভূতিকে শিল্পে রূপ দেওয়ার কৌশল আয়ত্ত করা।
সব মিলিয়ে জেগে ওঠো বাংলা কবিতায় নতুন কোনো নন্দনতাত্ত্বিক বাঁক সৃষ্টি না করলেও একজন নবীন কবির সংবেদনশীল মন, মানবিক বিশ্বাস এবং সমাজ-সচেতন জীবনদৃষ্টির আন্তরিক প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। শিল্পগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই কাব্যগ্রন্থে একজন সম্ভাবনাময় কবির আত্মপ্রকাশের আভাস রয়েছে। ধারাবাহিক পাঠ, আত্মসমালোচনা এবং কাব্যভাষার গভীর অনুশীলন অব্যাহত থাকলে মোহাম্মদ সামসুজ্জামান ভবিষ্যতে আরও পরিণত ও শিল্পসমৃদ্ধ কবিতা রচনা করবেন এমন প্রত্যাশা করাই যায়।
জলছবি/মেজবাহ মুকুল

