কবি মনিরুজ্জামান রোহানের ‘আমরা মানুষ’ কবিতায় শিল্প ও সত্তার অনুসন্ধান
‘প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুর উৎসব নিয়ে খেলা করি/ আমরা মানুষ, আমরা তসবি জপি/ আর পরনিন্দায় ব্যস্ত আমাদের ইস্পাতমন/ যা পারি না, সেটাই করতে উদ্যত হই;/ যখন তখন মদের মটকা থেকে/ এক পেয়ালা পানীয় নিতে সংকোচ করি না,/ অন্যের হক কেড়ে নেওয়াই যেন অভ্যাস/ আমরা মানুষ, আমরা নিতান্তই মানুষ;/ মরণজ্বরে উৎসারিত হয় গায়ের তাপমাত্রা/ ডালিমের চোয়ালে জন্মদাগ মনে করিয়ে দেয়/ আমরা কতটুকু নিচে নামতে পারি,/ নলকূপ থেকে গড়িয়ে পড়া টিপটিপ পানি/ কিংবা ভূপৃষ্ঠের কোনো পাতালপুরী/ সবখানে সেরা হওয়ার লড়াইয়ে নিচে নামতে পারি,/ আমরা মানুষ, আমরা এতটাই নৃশংস হতে পারি/ যেখানে মানুষ হয় মানুষের খাবার;/ রক্ত দিয়ে রোজ খেলা করি হোলি উৎসব,/ মেতে উঠি পরশ্রীকাতরতার মহানন্দে/ আমরা মানুষ, ভ্রূণ থেকে নির্গমন নোংরা পানির সংমিশ্রণে/ প্রসব হওয়া, একটু একটু করে বেড়ে-ওঠা সৃষ্টির সেরা/ আমরা মানুষ, কতটা হতে পারি আমরা সৃষ্টির সেরা!/ যখন অনাথ শিশুর ক্রন্দনে ভেসে যায় গাজা!/ যখন নারী-শিশু নির্যাতনে বলাৎকার পায় ছাড়া!/ যখন অনাহারে পথশিশুরা হারায় তার সীমা!/ যখন যুদ্ধের ডামাডোলে এদেশ ওদেশকে করে কুক্ষিগত/, তখন মানুষ হয় বঞ্চিত আর জীবন হয় অগ্নিকুণ্ড;/ স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্বকে লুটিয়ে দেয় পায়ের নিচে/ তখন কোথায় থাকে সৃষ্টির সেরা তকমা পাওয়া মানুষ!/ সৃষ্টির সেরা জীব আমরা মানুষ!’
শব্দচয়নের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সরলতা, সংক্ষেপ, দৈনন্দিনতার স্বচ্ছতা। কোনো অংশই পাঠকের ওপর বাড়তি চাপ ফেলে না, ভাবকে অযথা অস্পষ্টও করে না। অল্প শব্দেই গভীর ইঙ্গিত, এটাই আজকের কবিতার শক্তি। জটিল সিম্বল কম ব্যবহার হওয়ায় এটিও তরুণদের আরও সাহস দেবে।
কবিতাটি মানুষের বহুরূপী পরিচয় ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করতে চায়। মানুষ যে ঈশ্বরমগ্ন, আবার সেই মানুষই পরনিন্দায় ইস্পাতকঠিন এই দ্বৈততা কাঠামোবাদী পাঠে বাইনারি সম্পর্ক সৃষ্টি করে: মানুষ/ অমানুষ, সৃষ্টি/ ধ্বংস, নৈতিকতা/ অনৈতিকতা। এই টানাপোড়েনেই অর্থ বিলম্বিত হয়ে নতুন অর্থ নির্মাণ করে।
মানুষকে বিশ্লেষণ করে ‘আমরা মানুষ কবিতা’ আত্মপরিচয়কে ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করতে চায়। এখানে যে মানুষ তসবির দানায় ঈশ্বরমগ্ন, আবার সেই মানুষই পরনিন্দার ইস্পাত কঠোরতায় অন্যকে বিদ্ধ করে। এই দ্বৈত চরিত্রচিত্র কাঠামোবাদী পাঠে মানব-অস্তিত্বের মূল বাইনারিগুলো দ্বারা অর্থকে বিলম্বিত করে এবং পাঠকের চিন্তাকে উন্মুক্ত করে নতুন অর্থ নির্মানে সহযোগীতা দেয়। এখানে বাইনারিগুলো এরকম: মানুষ/ অমানুষ, সৃষ্টি/ ধ্বংস, নৈতিকতা/ অনৈতিকতা-এই টানাপোড়েনেই অর্থ বিনির্মিত হয়। কবির ভাষা এই বিপরীত শক্তিগুলোকেই পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দেখায় মানুষ নামের সত্তাটি একমুখি নয়; বহুমুখী, বিস্তৃতি এবং নিবিড়। কবিতায় মানবসভ্যতার যে নগ্ন রূপ, তা কোনো প্রচলিত নৈতিক ছকে আটকানো নয়; বরং এটি এক অনবরত গলে যাওয়া, ভেঙে পড়া, আবার নতুন অর্থে গড়ে ওঠা মানব-অস্তিত্বের চলমান ছবি।
দার্শনিক পাঠে এখানে সার্ত্রের অস্তিত্ববাদ স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। মানুষ তার কর্মের মধ্য দিয়ে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করে। কবির কাছে তাই মানুষ কোনো পূর্বনির্ধারিত ‘সৃষ্টির সেরা জীব’ নয়; বরং প্রতিটি নিষ্ঠুরতা, প্রতিটি রক্তমাখা হোলি, প্রতিটি অনাথ শিশুর কান্না মানুষের পরিচয়কে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। ফ্রয়েডের ‘ডেথ ড্রাইভ’ এর মতোই কবি দেখান মানুষের ভিতর লুকিয়ে থাকা স্ব-ধ্বংসী প্রবণতা তাকে সভ্যতার কেন্দ্র থেকে ঠেলে দেয় অন্ধকারে। মানুষের নিচে নামার এই অক্ষমতা কেবল নৈতিক নয়, মনস্তাত্ত্বিকও? লোভ, কুৎসা, পশুত্ব যেন অবচেতনের গোপন কক্ষে জমে থাকে, সুযোগ পেলেই বেরিয়ে আসে।
যখন গাজায় অনাথ শিশুর ক্রন্দন পৃথিবীর কান্নায় পরিণত হয়, তখন ফ্রাঞ্জ ফানোর ঔপনিবেশিক সহিংসতার বিশ্লেষণ নতুন করে ফিরে আসে মানুষের হাতে, মানুষই পরিণত হয় ভক্ষ্য দেহে, ক্ষমতার লোভ মানুষকে নামিয়ে আনে নরকের স্তরে। কবি তখন জিজ্ঞেস করেন: সৃষ্টির সেরা জীব যদি এটাই হয়, তবে সৃষ্টির অবমাননা আর কোথায়? এই প্রশ্নই কবিতাটির কাঠামো তার কেন্দ্র, তার নৈতিক প্রতিধ্বনি। কবিতার প্রতিটি চিত্র যেন লেভি-স্ট্রসের মত অনুযায়ী মিথের মতোই মানুষের সত্য ও মিথ্যের ভেতরকার অদৃশ্য সম্পর্ক খুঁজে ফিরছে। যে মানুষ ঈশ্বরকে স্মরণ করে, সে-ই আবার ক্ষমতার লোভে অন্যের হক ছিনিয়ে নেয়। এখানেই অর্থের জন্ম দ্বন্দ্ব থেকেই সৃষ্ট হয় মানবপরিচয়ের ভাষা।
দার্শনিক আলোকে এখানে একটি গভীর অস্তিত্ববাদী শোকাতুরতা রয়েছে। সার্ত্র যেমন বলেন: মানুষই নিজেকে বানায়, কবি দেখান, মানুষই নিজেকে ভাঙে। এই ভাঙন কেবল নৈতিক নয় এটি মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক, নৃতাত্ত্বিক, এমনকি মহাজাগতিকও। মানুষ যখন রক্তকে খেলায় পরিণত করে, যখন অনাথের কান্না বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যায়, তখন ফ্রয়েডীয় ‘ডেথ ইনেস্টিংকট’ মানুষের মধ্যে নিজস্ব অঞ্চল তৈরি করে। মৃত্যু শুধু শরীরের নয় মৃত্যু মানবিকতারও।
ফানোর ঔপনিবেশিক সহিংসতার ধারণা এখানে ভয়ালভাবে সত্য হয় মানুষ হয়ে ওঠে অন্য মানুষের ওপর ক্ষমতার জুলুম-যন্ত্র। গাজার ক্রন্দন আমাদের শেখায় মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের দাবিগুলো আসলে ভঙ্গুর দেয়াল, যার নিচে চাপা পড়ে থাকে ইতিহাসের রক্ত, অনাহারের ছায়া, যুদ্ধের বিধ্বংস। শেষ পর্যন্ত কবি যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন? ‘মানুষ সত্যিই কি সৃষ্টির সেরা?’ সামাজিক দার্শনিকতা হিসেবে ফ্রয়েডের ‘ ডেথ ড্রাইভ’ এর প্রতিধ্বনি রয়েছে যেখানে সভ্যতার ভিতরে লুকিয়ে থাকা এক ধরনের স্ব-ধ্বংসী প্রবণতা বারবার সামনে আসে। কবি দেখিয়েছেন যে আধুনিক মানুষ ‘হোলি’ খেলে রক্ত দিয়ে, আনন্দ পায় অন্যের ক্ষত-ব্যথায়, যুদ্ধ দেখে উৎসবের মতো। মানুষ মানুষকে খাবার বানানো একটি প্রতীকী ডি হিউম্যানাজাইশন যাকে ফানোন বলেন- শোষকের প্রথম কাজ হলো মানুষকে অমানুষে নামিয়ে আনা।
জলছবি/মেজবাহ মুকুল

