মননশীলতার রূপকল্প


মননশীলতার রূপকল্প

বিগত শতাব্দীর শেষ দিকে ‘বদ্ধ মাতাল রোদে’র (১৯৮৭) তলায় কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন জাহাঙ্গীর ফিরোজ। সেই থেকে আজ পর্যন্ত নিরবচ্ছিনড়বভাবে কাব্যরচনায় ব্যাপৃত রয়েছেন এই কবি। প্রথম থেকেই কবিতার ভেতর-ভুবনে অভিনিবিশে জাহাঙ্গীর ফিরোজ তার সচেতন মনন-চৈতন্যের নিবিড় স্পর্শে এক নিজস্ব ভুবন তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন। তার কবিতার পংক্তি তারই নিজস্ব উচ্চারণ-ভঙ্গিতে সমৃদ্ধ। দীর্ঘদিন কবিতা-চর্চা করে জাহাঙ্গীর ফিরোজ অর্জন করেছেন এক পৃথক ভাষাভঙ্গি ও কণ্ঠভঙ্গি। এ অর্জন সামান্য নয়-অসামান্য। জাহাঙ্গীর ফিরোজের কবিতায় রূপায়িত হয়েছে তারই অবলোকিত বিশ্ব-স্বদেশ ও স্বসমাজের ভেতর-ভুবন। তিনি একালের এমন এক কবি, যিনি নিজের মনন- চৈতন্যের আলো ফেলে দেখে নেন সমকালীন স্বদেশ ও সমকালীন বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিত; মানুষের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা ও বেদনা বিষণ্নতা, সমকালীন মানুষের তুচ্ছতাবোধ ও অসহায়ত্ব; দেখে নেন সমকালীন আন্তর্জাতিক বিশ্বের আর্থ-রাজনৈতিক সংকট ও সংঘাত। এ সবের মধ্য দিয়েই তিনি কবিতার বিভা জ্বেলে দেন।

‘বদ্ধ মাতাল রোদে’র (১৯৮৭) প্রথম কবিতায়ই বর্তমান কবির হৃদয়ের বিশ্ববোধের প্রকাশ ঘটেছে। কোনো সংকীর্ণ এলাকার কবি নন তিনি-তিনি বিশ্বেরই অধিবাসী। কিন্তু জাতিতে জাতিতে বিভক্ত বিশ্ব, রাষ্ট্র নামক সীমানা নির্দেশক ভূখণ্ড এই কবিকে বেদনাতুর করে-

পৃথিবীর সহোদর আমি পৃথিবী আমার
কেন এই পাসপোর্ট পাসপোর্ট কাঁটাতার কাঁটাতার খেলা
পৃথিবী আমার আমি হেঁটে যাবো।
[হেঁটে যাবো…]

রাষ্ট্র যন্ত্রের নিষ্পেষণে এবং ভিন্ন রাষ্ট্রের সীমানার কাঁটাতারে ক্ষত-বিক্ষত মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা মার খায় বাস্তবে। নিজের অন্তর্ভুক্তিতে কবি শেষতক কুমারী জমিন খোঁজেন-কোথাও আর তা নেই। ক্ষুধাতুর এশিয়া-আফ্রিকার মানুষ সেই ভূমির অন্বেষণ করেন। যেখানে ফলবে ক্ষুধার ফসল : ‘এশিয়ার কান্না শোনো, ক্ষুধা জর্জর আফ্রিকা/ অনাবাদি ভূমি নেই, কুমারী জমিন?/ ব্রাজিলের কানাডার অস্ট্রেলিয়ার ঘাসবন/ স্বপ্নের গমক্ষেত হতে চেয়ে ডাকে আয় আয়/ কর্ষণে কর্ষণে কাম দাও ঘাম নূন জলে/ দু’হাতে ফসল নাও তুলে।’
[হেঁটে যাবো]।

এই একই ধরনের আবেগ থেকে জাহাঙ্গীর ফিরোজ আন্তর্জাতিক নদীর মৃত্যুযন্ত্রণায় দগ্ধ হন-জলহীন নদী তাকে বেদনায় দীর্ণ করে। তিনি লেখেন –

দুর্বা গজায় তোমার বুকে কষ্টে আছো নদী
বৃষ্টি তো নেই উঁচুতে মেঘ শ্বেতসিংহ পাড়ায়
ভালুক মেঘের জন্যে নদী খোয়াবে হাত বাড়ায়
হায়রে নদী তোমার উৎস
হৃদয়হীনা মাড়ায়
তবু এদেশ বর্ষাকলে আঙুলে মেঘ জড়ায়।
[আঙুলে মেঘ জড়ায়, বদ্ধমাতাল রোদে]

একটি চমৎকার কবিতা ‘দুই বৃত্তের মানুষ’। উনিশ শ’  ছাব্বিশের জন্ম এক পুরোনো দিনের মানুষকে বৃটিশ ভারতের মহারাণীর ছবি-আঁকা এক অচল আধুলিররূপকে রূপায়িত করেছেন কবি। উনিশ ‘শ’ আশির এক মানব তাকে অবলোকন করছে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে –

ভেবে ভেবে ম্লান একটি আধুলি ডুবে যায়
ত্যাড়াবাঁকা গুল্ম ও স্বপেড়বর কোটাল নগরে
সে ডুবে থাকতে চায়, যেহেতু এখন সে অচল উনিশ শ’ ছাব্বিশে তার জন্ম।
এখনো সে মহারানীর কথা বলে
দু’চোখে ছানি, আলো দেখে না
তবু প্রতিদিন স্বপ্ন দেখে, দুঃস্বপ্ন
স্বপ্নের ঠিক ঠিক অর্থ বলা খুবই কঠিন।
জলে বাঘ ডাঙায় কুমির
এ রকম বিষম চিন্তায়
ভেবে ভেবে ম্লান আধুলিটি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে
[দুই বৃত্তের মানুষ, ব.মা.রো]

একালের আধুনিক কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ সঙ্গতভাবেই যুদ্ধবিরোধী মনোভাবের পরিপোষক। পৃথিবীর তাবৎ শান্তিপ্রিয় মানুষের অবস্থানও যুদ্ধের বিপরীতে। কোটি কোটি লোক যোগ দেয় শান্তি মিছিলে। কিন্তু শক্তিমান রাষ্ট্র চিরকালই যুদ্ধের ছুতো খুঁজে। জাহাঙ্গীর ফিরোজ লেখেন: ‘ওদিকে এখন চাও/ কালো আফ্রিকা মধ্য’ মেরিকা এশিয়ার দাউ দাউ/ ড্রাগনের দাঁত ইউরেশিয়া ও ‘মেরিকা আজ বুনো/ দুইটি দাঁতাল বিভীষিকা গেছে বয়ে/ হিরোশিমা আর নাগাসাকি কুঁজো বুড়ো।’ [যুদ্ধের বিপরীতে, ব.মা.রো]

জাহাঙ্গীর ফিরোজ তার প্রথম কাব্যগ্রন্থেই আমাদের উপহার দিয়েছেন চমৎকার কাব্যফসল। প্রায় প্রতিটি কবিতায় তার বক্তব্য সুমিতভাবে প্রকাশ করেছেন এই কবি। শব্দপ্রয়োগের দিক থেকে তিনি কোমল শব্দের প্রতি বেশি আকৃষ্ট-কিন্তু বক্তব্য প্রকাশের ক্ষেত্রে অনিবার্য শব্দকেই বেছে নিয়েছেন। নিজের মনোভাব প্রকাশে তার পারঙ্গমতা প্রথম কাব্যগ্রন্থেই প্রায় অসাধারণ।

ফিরোজের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘চাকরিজীবীদের কোন স্পার্টাকাস নেই’। কাব্যগ্রন্থের নাম থেকেই বুঝা যাবে একালের রাষ্ট্র ও সমাজে যদিও ক্রীতদাস নেই। তবু গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে রয়েছে সাধারণ মানুষের উপর শক্তিমান ও অর্থশালীর প্রচণ্ড শোষণ-নিপীড়ন। সমাজদেহে দুষ্ট ক্ষতের মতো প্রতিটি নিষ্পিষ্ট মানুষের বুকে দগদগে ক্ষত। ব্যক্তি এখন নিষ্পিষ্ট রাষ্ট্র, সমাজ ও শক্তিমান মানুষের শোষণ-বঞ্চনায়। আর এই শোষণ-বঞ্চনা-নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার মতো একালে কোনো প্রতিবাদী স্পার্টাকাস নেই-মধ্যযুগের রোমে যে ক্রীতদাস স্পার্টাকাস ক্রীতদাসের মুক্তির জন্যে বিশাল বিপ্লব ও যুদ্ধের সূচনা করেছিলো সেই স্পার্টাকাসের মতো কোনো সাহসী মানুষ একালে নেই। তিনি লিখেছেন-

স্পার্টাকাস, এ শতকে কোনো ক্রীতদাস নেই
সকলেই চাকরিজীবী
চাকরিজীবীদের কোনো স্পার্টাকাস নেই
চাকরিজীবীদের হাত ও কলমের মাঝে তৃতীয় পুরুষ
যখন আমার হাত ও কলমের মাঝে কোনো তৃতীয় পুরুষ থাকে না
তখন আমি কবি
[স্পার্টাকাস, চা. কো, স্পা, নে]

চাকরিজীবীদের হাত ও কলমের মাঝের এই অদৃশ্য তৃতীয় পুরুষই মূলত শক্তিমান শাসক-শোষক। রক্তচোষা বাদুড়ের মতো তারা ব্যক্তির শ্রমশক্তি শোষণ করে-বদলে যে টাকাটা শ্রমিকদের জন্য সে দেয় তা দিয়ে শুধু কষ্টে জীবন ধারণ করা যায়-অপুষ্টি ও অনাহারের শিকার হয়ে। এই ধনতান্ত্রিক প্রভুই অদৃশ্য তৃতীয় শক্তি। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী তাদেরই মাস মাইনের কেনা গোলাম। ‘আঁখির তারায় স্বাধীনতা’ কবিতায় জাহাঙ্গীর ফিরোজ লিখেছেন পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকদের বেদনার কথা-

ধনুকের মতো বেঁকে চুলঝাড়া
আধাবস্তির ঘরে আধেক শহুরে
পোশাক শিল্পের নাঙ্গা শোষণের ফিল অবয়বে;
দু’কশেই ঘা তনু রঙমাখা ঠোঁটে
অপুষ্টির দামে কেনা স্বাধীনতা।
[আঁখিতারায় স্বাধীনতা চা.কো.স্পা.নে]

চাকরিজীবীদের কোন ‘স্পার্টাকাস নেই’ কাব্যে যে কবি-ব্যক্তিত্ব প্রকাশ ঘটেছে তাকে বলা যায় সমাজ ও জীবনসচেতন ধারালো কবি ব্যক্তিত্ব। জীবনকে জাহাঙ্গীর ফিরোজ দেখেন নির্বিকার ও নিরাবেগ দৃষ্টিকোণ থেকেই। বর্তমান জীবন ও শহুরে মধ্যবিত্তের জীবনযাপন দেখে তাই সহস্র আলোকবর্ষ দূরের দিদিংচি গ্রহের এক বালক হেসে কুটিকুটি হয়। কারণ, এ শহরে বর্তমান মানুষের জীবন দেখে বন্য পশুরাও লজ্জা পায়-

শুধু আহার্য বাড়িভাড়া রিরংসার টানে
চাকরের গ্লানি ভুলে ধন্য
আরো বেশি অনুগত দাস হওয়ার দৌড়ে কে প্রথম হবে
এই নিয়ে সারাক্ষণ প্রতিযোগীতায় কাটে…
[প্রতিযোগীতা, চা.কো.স্পা.নে]

এ ধরনের মানুষে-ভরা এ কালের শহর-ফাঁপা, পুঁজ রক্ত সিফিলিসে ভরা টুসটুসে পেকে-ওঠা ফোঁড়ার মতন ভেতরে পুঁজ রক্ত নিয়ে ঘুরেফেরে জনমানুষের নেতা-এদের চেয়ে প্রখর রোদের নিচে জলে-রোদে ভিজে-পুড়ে বেড়ে-ওঠা শহুরে কাকের মতো কবিরা বরং অনেক ভালো। কারণ, কবি তাঁর নিরাবেগ চোখে সব অন্তঃসারশূন্য মানুষকেই দেখে নেয়-

এই সব দেখে শুনে কৌতুহলী কাকের মতন
কর্কশ ছন্দহীন ডেকে ওঠা যায়
কোকিলের কুহুতানে এসব মানায়?
কবিরা কোকিল নয়, এই ভেবে সুখ হয়
নেতা নয়, বুদ্ধিজীবী পরপুষ্ট কোকিলের মতো
কবি নয় সোনার খাঁচায় রাখা কাকাতুয়া পাখিটির মতো
[কবি ও কাক, চা.কো.স্পা.নে]

বর্তমান রাজনীতিকে জাহাঙ্গীর ফিরোজ গণমানুষকে মারার ফাঁদ হিসেবে দেখেছেন : ‘উহাদের ফাঁদে ফেলিয়াছি/ জল রেখে বালু করে দিয়ে/ বাঙালি স্বপ্ন চেলে ঘোর-ঘোতুলে ফেলিয়াছি/ উহাদের নিয়ে খেলিতেছি।/ মুক্তির আমলের রেখে দেয়া শুঁটকির টোপে/ রাজনীতি ধরিয়াছি/ উহাদের নিয়ে কানামাছি কানামাছি খেলিতেছি/ উহাদের ফাঁদে ফেলিয়াছি’। [দূরনিয়ন্ত্রক, চা.কো.স্পা.নে]।

বর্তমান রাজনীতির অন্তঃসারশূন্যতা এবং গণবিধ্বংসী চরিত্র এর চেয়ে চমৎকার ভাষায় আর বলা সম্ভব নয়। বর্তমান জীবনের পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে একটি চমৎকার প্রেমের কবিতা ‘তোমাকে ভাবার অবকাশ কোথায়’। ‘যে ছিল প্রাণের জরুরি’ কাব্যে রয়েছে অনেকগুলো চমৎকার প্রেমের কবিতা। এ কবিতাগুলোতে নানা পরিপ্রেক্ষিতে প্রেমকে দেখা হয়েছে। জাহাঙ্গীর ফিরোজের প্রেমিকা নারী অধরা দেহহীনা নয়-রীতিমতো রক্তমাংসের বাস্তব মানবী। কিন্তু প্রেমের কবিতার মধ্যে দেহের তাপ ও সান্নিধ্য অতিক্রম করে যে মানবিক হৃদয়াবেগ ও রহস্যময়তা পাওয়া যাবে দেহ সেখানে প্রায় কখনো প্রধান হয়ে উঠেনি। ছোট্ট একটি অংশ-

যে টুকু আকাশ ছিলো বুকে
তার সবটুকু জুড়ে লিখেছি তোমার নাম
যে টুকু বাতাস ধরে বুকে
তার সবটুকু জুড়ে নিয়েছি তোমার ঘ্রাণ
যা কিছু দেখেছে দুই চোখ
তার তিন ভাগ জুড়ে মুগ্ধ তোমার ছবি
[তোমার অধিকারে, যে.ছি.প্রা.জ]

বিশ শতকের মধ্যভাগ এবং বর্তমানের প্রেমের রূপরীতি নিয়ে লেখা একটি কবিতা পুরোটাই উদ্ধৃতিযোগ্য-

ষাট দশকের প্রেমিকারা মাধবী নামের মাঝে ফুটে আছে
তারও আগে প্রেম
সে তো রিপুর সুতোয় বোনা রিফু করা মর্জিনা ফুফুটির শাল;
‘যাও পাখি বলো তারে’, ‘ভুলো না আমায়, চুপিসারে
রুমালে খচিত কিশোরীর মন।
কুড়িতেই বুড়ি হয়ে যেতো যারা
খুন্তি ও কুশি ছেড়ে আজ তারা রাষ্ট্র চালায়
মানুষের রীতিনীতি গড়ে।
এই দেশে এখন পঁচিশে
রুমানার তারানার বিবাহ কুসুম ফোটে
অলি জোটে বারো তেরতেই, লুকোচুরি স্পর্শের সুখটুকু, চুম্বন-
কিশারীর কাছে প্রেম মনে হয়।
পালিয়ে বিবাহ করে ধরা পড়ে
শ্রীঘরেই ভালোলাগা ফিকে হয়ে যায়
আইনের দমকা বাতাসে মালা থেকে ফুল ঝরে পড়ে
আচ্ছন্নতা উবে গেলে প্রেম অতি সহজেই কাম হয়ে ওঠে
নির্বাচন তখন জরুরি মনে হয়।
[প্রেম ও নির্বাচন, যে.ছি.প্রা.জ]

কালের ব্যবধানে প্রেমের রীতি যে বদলে যায় জাহাঙ্গীর ফিরোজ উপর্যুক্ত কবিতায় সেই বিষয়টিকেই বিশদ করে তুলেছেন। তবে বলতেই হবে এই পরিবর্তনটুকু তিনি শিল্পিত করেই প্রকাশ করেছেন। একটি চমৎকার রূপক ব্যবহার করেছেন কবি—‘আইনের দমকা বাতাসে’। শহরের একটি ভোরবেলাকার চিত্র এ রকম।

‘বনে, দূর গ্রামে মোরগের ডাকে ভোর হলো/ যৌবন পিছু ফেলে জীবনকে ধরে রাখার প্রয়াসে/ নগরীর ফুসফুসে প্রৌঢ় নারী, মধুমেহে আমলা ব্যাপারি/ বিদ্যামুখী শিশু ও কিশোর ভ্যানে রিকশায় বাসে কারে/ সেই সাথে কিছু কিছু বাণিজ্যিক অফিসের ছোটবাবু, এলডিসি/ ধীরপদে হাঁটাপায়-/ গ্রামের উজাড় করা সকিনা ও মালতীরা ঊর্ধ্বশ্বাসে দর্জিগারে/ এরই মাঝে হুড়মুড় করে নগরী জড়ায় জটিলে।/ আরশোলা, গিনিপিগ মায়াবী হরিণ আর বুনোমোষ/ লাল বাতি, রাখালের হাত ভুলে জড়ায় সকালে/ মোড়ে মোড়ে এইসব ঝামেলায়/ নগরীর ধুকিবুকি বুঝি থেমে যায়! [রমনা পার্কে, লালনের পাখি উড়ে যায়]

জাহাঙ্গীর ফিরোজের কবিতায় নাগরিক জীবন ও গ্রামজীবন প্রায় সমান প্রাধান্য পায়। তবে যে মানুষ গ্রাম-জীবন প্রত্যক্ষ করে এবং গ্রামীণ নিসর্গের ভেতর দিয়ে যাতায়াত করে তিনি নিজে নাগরিক। তাই তার কবিতায় গ্রামীণ জীবন ও গ্রামীণ নিসর্গের স্পর্শ থাকলেও তার মধ্যে থেকে যায় নাগরিক মনন সমৃদ্ধ দৃষ্টিকোণ। জাহাঙ্গীর ফিরোজের কবিতায় মননের তীক্ষ্ন-তীব্র ঝলকানি লক্ষ্য করা যাবে। ‘মৌরিবনের বাতাস’ কাব্যের ‘ভাঙনের মানে’ এবং ‘ভোর’ শীর্ষক কবিতা দুটির মূল লক্ষ্য/ আসলে উন্মুল মানুষের ভাঙা মন এবং ভোরের আলোয় কবির মধুর শৈশব-কৈশোর স্মৃতির রোমন্থন। প্রথম কবিতায় নদীর পাড় ভাঙা থেকে শুরু করে নানরকম ভাঙনের কথা বলতে বলতে কবি উন্মুল মানবসত্তার বেদনায় দীর্ণ হন-আমাদেরও মনন-চেতনায় সেই বেদনা রোপণ করেন তিনি। ‘ভোর’ একটি অপূর্ব চিত্রকল্প-সমৃদ্ধ কবিতা। কবি বাটলি হিলের মাথায় দাঁড়িয়ে তিনটি কিশোর ও একটি অপূর্ব ভোরবেলাকে নেমে আসতে দেখেছেন-

আজ ওই তিনটি কিশোর আর বাটলি হিলের ঢালে নেমে আসা অপূর্ব সকাল
চৈত্রী বাতাসে ফেলে আসা কৈশোরের স্বপ্ন নিয়ে আসে
বহুদিন পর এরকম একটি ভোরের বল্লম মনোবনভূমে
শিশু গাছে গেঁথে রইল;
আজ একটি ভোর হামাগুড়ি দিয়ে নেমেছে আমার চৈতন্যের
জামরুল বনে,
আজ বাটালি হিলের ঢাল বেয়ে অপূর্ব ভোরের সাথে
আমার শৈশব-কৈশোর হামাগুড়ি দিয়ে নেমে এসে দাঁড়িয়েছে
প্রান্তরের খোলা জানালায়
পাহাড়তলির নির্জনে।
[ভোর, মৌরিবনের বাতাস]

জাহাঙ্গীর ফিরোজের কবিতায় অনুভূত হবে বাঙালি ঐতিহ্য ও আবেগের প্রগাঢ় রূপকল্প। বাঙালির ঐতিহ্যগত আবেগ ও সংবেদন, প্রেম ও প্রজ্ঞা, বেদনা ও  তুচ্ছতাবোধ, নিসর্গ ও নগর, বোধ ও দার্শনিক প্রত্যয় বক্তব্যের সামগ্রিকতা নিয়ে রূপকল্পে ভাস্বর হয়ে উঠেছে তার কবিতায়। এই কবি কাব্যশিল্প নির্মাণ করতে গিয়ে প্রত্যক্ষ উপমা বেশি ব্যবহার করেননি-ব্যবহৃত হয়েছে কিছু পরোক্ষ উপমা এবং বেশকিছু চমৎকার রূপক। তার জীবন, সমাজ ও বিশ্ববীক্ষা তারই অভিজ্ঞতার আলোয় ভাস্বর। জাহাঙ্গীর ফিরোজের কবিতা মননশীলতার রূপকল্প।

জলছবি/মেজবাহ মুকুল