সুখনিদ্রা


সুখনিদ্রা

নাফিস অস্থির হয়ে বসে আছে ক্লাসে। বন্ধুরা সবাই বেরিয়ে হয়ে গেছে। মনে হয় সেতুর উপর বসে আনন্দ করছে। আনমনা হয়ে যায় সে। নাফিসের গ্রামে কোন স্কুল নেই। পড়ার জন্য তাকে পাশের গ্রামে যেতে হয়। পাশাপাশি গ্রাম হলেও তার গ্রাম অনেক কিছু নেই। তাতে একটুও মন খারাপ হয় না। তার গ্রামের মত সুন্দর গ্রাম কোথাও নেই সে এটা জানে। তাইতো নিজের গ্রাম নিয়ে গর্বের শেষ নেই। নিজের গ্রাম নিয়ে গর্ব হলেও পাশের গ্রামকে সে ভালোবাসে। এই গ্রামটিও সুন্দর। এখানে স্কুল আছে, মাদ্রাসা আছে, মসজিদ আছে, বাজার আছে, মেম্বার, চেয়ারম্যান সবই এই গ্রামের।

আশপাশের এলাকা থেকে নানাবিধ প্রয়োজনে মানুষ এখানে আসে। নাফিসও এই গ্রামের স্কুলে ভর্তি হয়েছে। স্কুলের কথা মনে হলেই নাফিসের মন ভালো হয়ে যায়। সকালে মায়ের হাতে বানানো গরম গরম খাবার খেয়ে বইখাতা ও কলম নিয়ে বাঁশের সাঁকো দিয়ে খাল পেড়িয়ে গ্রামের ভেতর  আঁকাবাকা কাঁদামাটির পথ ধরে স্কুলে আসে।

অনিন্দ্য সুন্দর স্কুল। চারপাশের সিগ্ধ মনোরম পরিবেশ স্কুলকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে। পিছনে সবুজ গাছগাছালিতে ভরা শান্ত, নিরব ও রহস্যময় করবস্থান।। পূর্বদিকে খাল। যে খাল পেড়িয়ে স্কুলে আসতে হয়েছে নাফিসকে। পশ্চিমে রাস্তা শেষে বিশাল পুকুর। সারাক্ষণ ছোট বড় মাছের লুটোপুটি লক্ষ্য করা যায়। সমানে মাঠ পেড়িয়ে পাকা সেতু। সেতুর নিচে আরেকটি খাল। সেতু পার হলে হিন্দু এলাকা। এই এলাকাকে নিজের এলাকা মনে করে নাফিস। বর্ষাকাল হওয়ায় পুকুর খাল বিল নদনদী পানিতে টুইটুম্বর।

ক্লাস শেষ হতেই একদৌড়ে নাফিস চলে আসে সেতুর উপর। এসে দেখে সুমন, চঞ্চল, রনি জম্মদিনের পোষাকে সেতু থেকে খালের চলন্ত পানিতে ঝাপ দিচ্ছে। শোভন ও মানিক পানি ভেতর থেকে ইশারায় তাকে ডাকছে। তর সয়ছে তার। বইখাতা রেখে পোষাক খুলে গাছের ডালে রেখে ঝাপিয়ে পড়ে পানিতে। আহা কি আনন্দ! স্কুলে পড়তে নয়। নাফিস আসে মূলত এই মুহূর্তটির জন্য। বন্ধুদের সাথে সেতু থেকে পানিতে  ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য।

মানিক কাছে এসে বলে, দেরি করলি। কখন থেকে অপেক্ষা করছি।

নাফিস পানির নিচে থেকে উঠে বলে, ছুটি না হলে আসব কিভাবে?

সবাই সেতুর এপাশ দিয়ে উঠে আবার ঝাঁপিয়ে  পরে। এভাবে চলতেই থাকে। জীবনের সব আনন্দ মনে হয় এখানেই।

চোখ লাল হয়ে উঠে। শ্যাওলা জমে শরীরে। কারো ভ্রক্ষেপ নেই। সেলিম স্যার আসে বেত নিয়ে। এই উঠ, উঠে আয় সবাই। স্যারকে দেখে নাফিসের বাড়ির কথা মনে হয়। চঞ্চলকে নিয়ে অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠে আসে সে।

বাড়ি ফিরতে হলে নাফিস ও চঞ্চলকে আবার পূর্বদিকের খাল পার হতে হবে। সেতুর নিচ দিয়ে খালের পানি বিলের উপর দিয়ে পুরাতন তিতাস নদীতে প্রবাহিত হয়েছে। তার আগে খালের ছোট একটি শাখা দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে হিন্দু পাড়া ঘেঁষে এঁকেবেঁকে খন্দকার পাড়া দিয়ে তিতাসে মিলিত হয়েছে। ফলে স্কুল কেন্দ্র করে খালের চর্তুমুখী সংযোগ ঘটেছে।

গায়ের কাপড় দিয়ে বইখাতা মুড়িয়ে চঞ্চল ও নাফিস প্রথমে হিন্দু পাড়া দিয়ে একহাতে বইখাতা অন্য হাতে সাতার কেটে খাল পেড়িয়ে পশ্চিম পাশের টিলায় পৌঁছে। পানির মাঝখানে জেগে থাকা টিলায় ভূতরে পরিবেশ। পুরাতন কবরস্থান ডুবে যাওয়ায় নতুন কবরস্থান হিসাবে এই টিলা ব্যবহৃত হয়। উপরের দিকে পড়ে আছে তাজিয়া মিছিল শেষে রেখে যাওয়া দুলদুল ঘোড়ার রঙিন কাপড় মোড়ানো কাঠামো। নাফিস ফিসফিস করে বলল, তাড়াতাড়ি চল চঞ্চল। আমার ভয় করছে। দু’জন দ্রুত টিলা পেরিয়ে পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে প্রবাহিত সরু খাল সাঁতরে পার হয়ে কাপড় পরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।

টানা বৃষ্টি আর ভরা বর্ষায় তিতাস নদী ফুলেফেঁপে উঠেছে। নদীর ঢেউ খালবিল ছাপিয়ে বাড়িঘর পর্যন্ত চলে আসছে। ঘরে ঘরে ডিঙ্গি নৌকা, গলুই নৌকা ও ছইওয়ালা নৌকার ব্যবহার শুরু হয়েছে। এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি যাওয়ার জন্য কেউ কেউ কলাগাছ কেটে ভেলা বানিয়েছে।

নাফিস নৌকায় করে স্কুলে যায়। অনেকেই ভেলায় চড়ে আসে। পানির অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় সে। বর্ষার এই সময়ে স্কুলের পরিবেশ যেন আরও নান্দনিক হয়ে ওঠে। শোভন বড়শি নিয়ে আসে। তারা মাঝে মাঝে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে মাছ ধরে। জগতের অনেক আনন্দের ভিড়ে মাছ ধরার আনন্দটাই যেন অনন্য। রঙিন চিকচিকে পুঁটিমাছ যখন বড়শিতে উঠে আসে তখন আনন্দের সীমা থাকে না। সময়ও যেন মাছের মতোই রঙিন হয়ে ওঠে। মাঝে মাঝে কই, শিং, খলসে মাছও পাওয়া যায়।

ছুটির শেষে স্কুলসংলগ্ন খালে সারি সারি নৌকা আর ভেলা ভিড়ে থাকে। যার যার বাহনে উঠে সবাই বাড়ির পথে যায়। অপার্থিব সেই দৃশ্যের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে নাফিস। সব নৌকা চলে গেলে খেয়াল করে তাকে নিতে কেউ আসেনি। চঞ্চলকে নিতে একটি ভেলা আসে। চঞ্চল তাকে বলে, “আমার সাথে ভেলায় উঠ, তোকে নামিয়ে দিয়ে আসব।”

ভেলা সাধারণত স্রোত এড়িয়ে চলে। তাদের ভেলাটা স্রোতে ভেসে চলল। অল্প সময়েই পশ্চিমমুখী খাল পেরিয়ে তিতাস নদীর পাশের বিলে চলে এল। নাফিস হাত-পা ছড়িয়ে ভেলার ওপর শুয়ে পড়ে। উপরে নীল আকাশ যেন সমগ্র পানি বহন করছে। নিচে অবিরাম জলধারা। তার মনে হয় অনন্তকাল ভেসেই চলছে।

হঠাৎ চঞ্চল পানি ছিটিয়ে তাকে ভিজিয়ে দিল। নাফিস উঠে বসে মৃদু হাসল। শুরু হলো খেলা। একে অপরকে লক্ষ্য করে পানি ছিটাতে লাগল। ভেলা এবার উত্তর দিকে ভেসে চলল। দূরে খালের ওপর তৈরি ডুবন্ত কাঠের সেতুটি চোখে পড়ল।

চঞ্চল লাফিয়ে পড়ল পানিতে। দেরি করল না নাফিসও। সাতার কেটে সেতুর উপর উঠে বসল।বইখাতা নিয়ে ভেলা ভেসে চলে গেল।

সেতু থেকে নেমে তারা ডুবে যাওয়া সড়ক পথে এগোয়। পাশের জমি থেকে শালুক তোলে। শালুক তোলা সহজ নয়। এগুলো পানির নিচে মাটিতে শিকড় গেঁড়ে শক্ত হয়ে আকড়ে থাকে। ভাসমান পাতা দেখে গাছ ধরে ডুব দিয়ে আঙুলের জোরে মাটি ভেদ করে শিকড় ছিঁড়তে হয়। এক ডুব দিয়ে একটি শালুকের বেশি তোলা যায় না। এভাবে বেশ কিছু শালুক তুলে সেতুতে ফিরে আসে। পরিষ্কার করে খেয়ে নেয়। শালুক খাওয়ার পর পানি খেতে মিষ্টি লাগে। দুজন হাতের অঞ্জলি ভরে পানি পান করল।

সেতুতে আরো কিছুক্ষণ পানির সাথে খেলা করে বাড়ির উদ্দেশ্যে সাতার কাটতে শুরু করে। এমন সময় বৃষ্টি শুরু হয়। মুষলধারে বৃষ্টি। তারা সেতুতে ফিরে আসে। সেতুর পিলার ধরে সামান্য পানির নিচে ভেসে ভেসে বৃষ্টি পড়ার  অলৌকিক শব্দ শোনে। বৃষ্টির ফোঁটা পানিতে অনাবিল সুর তোলে। সেই সুরে ভেসে যায় নাফিস ও চঞ্চল। এমন সময় পুঁটিমাছের ঝাঁক এসে পড়ে তাদের উপর। মাছের ছুটাছুটি দেখে মাছ ধরার ধরতে চেষ্টা করে। কিছু মাছ ধরে আবার পানিতে ভাসিয়ে দিয়ে খুশীতে হৈহৈ করে হেসে উঠে।

স্ত্রীর ধাক্কায় ঘুম ভেঙে যায় নাফিসের। সুখস্মৃতি নিয়ে আবারো নিদ্রায় ডুবে দেয় সে।