ছাড়পত্রের কবি: অগ্নিযুগের অগ্নিশিশু সুকান্ত ভট্টাচার্য
যে কোনো জাতির সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটে, যাদের আয়ুষ্কাল সংক্ষিপ্ত হলেও তাদের বিচ্ছুরিত আলো যুগ যুগ ধরে পথের দিশা দেখায়। বাংলা সাহিত্যের বিংশ শতাব্দীর উত্তাল আকাশে তেমনই এক ধূমকেতুর নাম সুকান্ত ভট্টাচার্য। তিনি এসেছিলেন ঝড়ের মতো, লিখেছিলেন বিদ্যুতের গতিতে এবং মিলিয়ে গিয়েছিলেন এক অসমাপ্ত বিপ্লবের স্বপ্ন বুকে নিয়ে। যখন রবীন্দ্রনাথের শান্ত, সমাহিত বিশ্ববীক্ষা বাংলা সাহিত্যকে পরিপূর্ণতা দিয়েছে, নজরুলের বিদ্রোহী সুর ঔপনিবেশিকতার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে এবং জীবনানন্দের রূপসী বাংলা তার বিষণ্ণ মায়াজাল বিস্তার করেছে, ঠিক সেই ক্রান্তিকালে সুকান্ত এক নতুন, কঠোর এবং আপোষহীন বাস্তবতার কাব্যভাষা নির্মাণ করেছিলেন। তিনি সেই কবি, যিনি রোমান্টিকতার মোলায়েম আবরণ ছিঁড়ে ফেলে দ্বিধাহীন চিত্তে ঘোষণা করেছিলেন—
“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”
এই একটি পঙক্তিই বাংলা কবিতায় এক নতুন ধারার জন্ম দেয়, যেখানে জীবনের রূঢ় সত্য নান্দনিকতার চেয়ে অধিক মূল্যবান। সুকান্ত তাই কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি চেতনা, পরাধীনতার শৃঙ্খল, সামাজিক শোষণ আর শ্রেণি-বৈষম্যের বিরুদ্ধে তারুণ্যের এক চিরকালীন বিদ্রোহের নাম।
শৈশবের দহন এবং চেতনার উন্মেষ
১৯২৬ সালের ১৫ই আগস্ট, যে দিনটি পরবর্তীকালে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হবে, সেদিনই কলকাতার কালীঘাটে মাতুলালয়ে এক নিম্নবিত্ত পরিবারে সুকান্তের জন্ম। তাঁর পৈতৃক ভিটা ছিল তৎকালীন গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার ঊনশিয়া গ্রামে। পিতা নিবারণ ভট্টাচার্য এবং মাতা সুনীতি দেবীর সংসারে দারিদ্র্য ছিল এক নিত্যদিনের সঙ্গী। এই দারিদ্র্য কোনো আকস্মিক অভিশাপ ছিল না, বরং ছিল তাঁর বেড়ে ওঠার পরিবেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কলকাতার বেলেঘাটার ৩৪ হরমোহন ঘোষ লেনের বাড়িটি ছিল তাঁর জগৎ। এই দারিদ্র্যই হয়তো তাঁকে শৈশব থেকে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল, যা তাঁর সংবেদনশীল মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। তিনি চারপাশের পৃথিবীকে দেখেছিলেন কোনো রঙিন চশমার ভেতর দিয়ে নয়, বরং ক্ষুধার্ত শিশুর শূন্য দৃষ্টি দিয়ে।
প্রথাগত শিক্ষায় তিনি খুব বেশিদূর এগোতে পারেননি; ১৯৪৫ সালে বেলেঘাটা দেশবন্ধু স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে অকৃতকার্য হন। এই তথাকথিত ব্যর্থতা তাঁর জীবনের গতিপথকে রুদ্ধ করেনি, বরং এক নতুন খাতে প্রবাহিত করেছিল। তাঁর শিক্ষাঙ্গন আর চার দেওয়ালের শ্রেণিকক্ষ রইল না; তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠলো বৃহত্তর জগৎ—কলকাতার উত্তাল রাজপথ, কারখানার শ্রমিকের ঘর্মাক্ত শরীর, তেতাল্লিশের মন্বন্তরে রাস্তায় পড়ে থাকা famished দেহ এবং বামপন্থী রাজনীতির পাঠচক্র। তাঁর আসল শিক্ষা শুরু হয়েছিল সেখানেই, যেখানে পুঁথিগত বিদ্যার সমাপ্তি ঘটেছিল। ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে তাঁর কৈশোরের এই সংযোগ তাঁর বিশ্ববীক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।
তাঁর সাহিত্য প্রতিভার স্ফুরণ ঘটেছিল অত্যন্ত অল্প বয়সে। আট-নয় বছর বয়সেই স্কুলের হাতে লেখা পত্রিকা ‘সঞ্চয়ে’ একটি হাসির গল্প লিখে তাঁর আত্মপ্রকাশ। মাত্র এগারো বছর বয়সে তিনি রচনা করেন ‘রাখাল ছেলে’ নামক একটি গীতিনাট্য। বাল্যবন্ধু অরুণাচল বসুর সঙ্গে মিলে সম্পাদনা করতেন হাতে লেখা পত্রিকা ‘সপ্তমিকা’। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, তাঁর ভেতরে এক জন্মগত শিল্পীসত্তা বাস করত। কিন্তু যে বিষয়টি সুকান্তকে তাঁর সমসাময়িক কিশোরদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দিয়েছিল, তা হলো তাঁর ইস্পাতকঠিন রাজনৈতিক চেতনা এবং প্রখর সামাজিক দায়বদ্ধতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশের মন্বন্তর (পঞ্চাশের মন্বন্তর), ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতো ঐতিহাসিক বিপর্যয় তিনি কেবল দূর থেকে দেখেননি, তিনি এর অংশ হয়ে উঠেছিলেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর কলমকে নিছক বিনোদনের উপকরণ থেকে এক ধারালো অস্ত্রে পরিণত করে।
কলম যখন তলোয়ার: আদর্শ ও সাহিত্য
সুকান্তের সাহিত্য প্রতিভার স্ফুরণ ঘটেছিল অত্যন্ত অল্প বয়সে। আট-নয় বছরেই স্কুলের হাতে লেখা পত্রিকা ‘সঞ্চয়ে’ গল্প লিখে আত্মপ্রকাশ। মাত্র এগারো বছর বয়সে তিনি রচনা করেন ‘রাখাল ছেলে’ নামক গীতিনাট্য। কিন্তু যে বিষয়টি সুকান্তকে তাঁর সমসাময়িকদের থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছিল, তা হলো তাঁর ইস্পাতকঠিন রাজনৈতিক চেতনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশের মন্বন্তর, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতো ঐতিহাসিক বিপর্যয় তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন ক্ষুধার্ত মানুষের মৃত্যু, অসহায় কৃষকের হাহাকার আর সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বীভৎস রূপ। এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাঁর কলমকে তলোয়ারের চেয়েও ধারালো করে তোলে। তিনি বুঝেছিলেন, পরিবর্তন আনতে হলে লড়তে হবে, আর সেই লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো চেতনা। তাই তিনি ডাক দিয়েছিলেন,
“হে মহামানব, একবার এসো ফিরে,
শুধু একবার চোখ মেলো এই ভিড়ে।”
১৯৪৪ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ সুকান্তের জীবনের এক সন্ধিক্ষণ। এরপর থেকে তাঁর জীবন ও সাহিত্যচর্চা পার্টির আদর্শের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। তিনি হয়ে ওঠেন পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী, একজন বিপ্লবী সৈনিক, যাঁর একমাত্র অস্ত্র ছিল তাঁর কলম। তাঁর সম্পাদিত ‘আকাল’ (১৯৪৪) কাব্যগ্রন্থটি ছিল সেই সময়ের দুর্ভিক্ষের এক জীবন্ত শৈল্পিক দলিল, যা কেবল হাহাকার নয়, প্রতিবাদের আগুনকেও ধারণ করেছিল। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন।
সুকান্তের কবিতা ছিল তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসের শৈল্পিক ইশতেহার। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য জীবনের প্রতিচ্ছবি নয়, সাহিত্য জীবন পরিবর্তনের হাতিয়ার। তাই তাঁর কবিতায় ফুল, পাখি বা প্রকৃতির রোমান্টিক বর্ণনা প্রায় অনুপস্থিত। তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু ছিল চারপাশের কঠোর বাস্তবতা—বাড়ির ভাঙা সিঁড়ি, একটি দেশলাই কাঠি, ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না, কারখানার চিমনি আর কৃষকের লাঙল। তিনি দেখিয়েছেন, মহৎ কবিতা রচনার জন্য মহাকাব্যিক বিষয়ের প্রয়োজন হয় না; সাধারণ, উপেক্ষিত জীবনের মধ্যেও মহত্ত্ব লুকিয়ে থাকে। ‘সিঁড়ি’ কবিতায় তিনি লেখেন:
“আমাদের মেরুদণ্ড বেঁকে গেছে—
তোমাদের মেরুদণ্ড কই?
আমরা তো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারি না,
তোমরাও পারবে না।”
এখানে সিঁড়ি কেবল একটি স্থাপত্যের অংশ নয়, তা হয়ে ওঠে শ্রেণি-বিভক্ত সমাজের প্রতীক, যেখানে একদল আরেক দলের কাঁধে পা দিয়ে উপরে ওঠে।
তাঁর কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো তাঁর শ্রেণি-সচেতনতা। তিনি ছিলেন সর্বহারা, মজুর, কৃষক তথা গণমানুষের কবি। তাঁর কাছে পৃথিবী ছিল শোষক আর শোষিতের দুটি শিবিরে বিভক্ত, এবং তিনি দ্বিধাহীনভাবে শোষিতের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর কবিতায় ধনী মহাজন ও অত্যাচারী প্রভুদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ‘কৃষকের গান’-এ তিনি শ্রমজীবী মানুষের হাতিয়ারকেই শক্তির উৎস হিসেবে বন্দনা করেছেন। তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে সেই শ্রমজীবী মানুষের প্রত্যয়ী ঘোষণা:
“হে কাস্তে, তোমাকে দিলাম ধার,
হে হাতুড়ি, তোমাকে দিলাম বল।”
‘ছাড়পত্র’ এবং অমর সৃষ্টিদের ব্যবচ্ছেদ
সুকান্তের মৃত্যুর পর প্রকাশিত তাঁর প্রথম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ ‘ছাড়পত্র’ (১৯৪৭) বাংলা সাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এই গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা যেন এক একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতায় তিনি তারুণ্যের অদম্য শক্তি, সাহস আর বিদ্রোহের যে বন্দনা করেছেন, তা আজ প্রবাদে পরিণত। এই বয়স যে কেবল দুঃসাহসের নয়, বরং আত্মত্যাগের মহিমায় ভাস্বর, তা তিনি তুলে ধরেছেন অবলীলায়:
“আঠারো বছর বয়সের নেই ভয়
পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,
এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়—
আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা।”
এই কবিতাটি নিছক বয়সের বন্দনা নয়, এটি তারুণ্যের বিপ্লবী সম্ভাবনার এক চিরকালীন স্তোত্র।
‘ছাড়পত্র’ নামক কবিতায় তিনি যেন সমগ্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এক দায়বদ্ধতা ঘোষণা করেন। তাঁর অঙ্গীকার ছিল স্পষ্ট—এই জীর্ণ, পুরাতন, শোষণভিত্তিক পৃথিবীকে ভেঙে নতুন করে গড়তে হবে। তাই তিনি দৃঢ় কণ্ঠে পৃথিবীকে প্রস্তুত হতে বলেন, কারণ
“এসেছে নতুন শিশু,তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে
চলে যেতে হবে আমাদের।
চলে যাব—তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”
এই অঙ্গীকার কেবল একজন কবির ব্যক্তিগত প্রতিজ্ঞা নয়, এটি একটি প্রজন্মের সম্মিলিত শপথ।
‘রানার’ কবিতায় তিনি এক প্রান্তিক পেশার মানুষকে মহাকাব্যিক মর্যাদা দিয়েছেন। রানারের ছুটে চলা কেবল তার ব্যক্তিগত জীবিকার সংগ্রাম নয়, তা যেন সভ্যতার অগ্রগতির এক অবিচ্ছেদ্য চালিকাশক্তি। অথচ সেই সভ্যতার ভার যে বহন করে, সে-ই থেকে যায় উপেক্ষিত। রানারের জীবনের ট্র্যাজেডিকে তিনি সার্বজনীন করে তুলেছেন:
“রানার! রানার!
জানা-অজানার
বোঝা আজ তার কাঁধে,
বোঝাই জাহাজ রানার চলেছে চিঠি আর সংবাদে।”
সুকান্তের অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ—‘ঘুম নেই’, ‘পূর্বাভাস’, ‘মিঠেকড়া’, ‘অভিযান’—সবই তাঁর বিপ্লবী চেতনার একেকটি ভিন্ন প্রকাশ। ‘মিঠেকড়া’র ছড়াগুলোতে তিনি সহজ ভাষায় কঠিন সামাজিক সত্যকে তুলে ধরেছেন, যা ছোটদের জন্যও ছিল এক রাজনৈতিক পাঠ। ‘পূর্বাভাস’ কাব্যগ্রন্থে তিনি যেন আসন্ন পরিবর্তনের পদধ্বনি শুনতে পেয়েছিলেন। তাঁর কবিতায় বারবার ধ্বনিত হয়েছে বিপ্লবের আহ্বান, পরিবর্তনের ডাক। ‘লেনিন’ কবিতায় তিনি রুশ বিপ্লবের মহানায়ককে স্মরণ করে ভারতবর্ষের মাটিতেও অনুরূপ মুক্তির স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে লেনিনের মতো এক কাণ্ডারি এসে হাল ধরবে।
একুশ বছরের জীবন: এক অসমাপ্ত বিপ্লব
পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে সংগঠনের কাজে নিজেকে তিনি এতটাই নিয়োজিত করেছিলেন যে নিজের শরীরের প্রতি অবহেলা ছিল চরমে। একদিকে আদর্শের জন্য কঠোর পরিশ্রম, অন্যদিকে দারিদ্র্য ও অপর্যাপ্ত পুষ্টি—এই দুইয়ের সাঁড়াশি আক্রমণে প্রথমে ম্যালেরিয়া এবং পরে দুরারোগ্য যক্ষ্মা তাঁর তরুণ শরীরে বাসা বাঁধে। রোগের যন্ত্রণা সহ্য করেও তিনি লিখে গেছেন, সংগঠনের কাজ করে গেছেন। কিন্তু শরীর আর সায় দেয়নি। অবশেষে, ১৯৪৭ সালের ১৩ই মে, ভারতের বহু কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা লাভের মাত্র তিন মাস আগে, কলকাতার ১১৯ লাউডন স্ট্রিটের রেড এড কিওর হোমে মাত্র ২১ বছর বয়সে এই অগ্নিশিশু চিরনিদ্রায় শায়িত হন। এক অসীম সম্ভাবনাময় জীবনের দীপশিখা নিভে যায় অকালে। তাঁর মৃত্যু ছিল এক অসমাপ্ত বিপ্লবের প্রতীক। তিনি যে শোষণমুক্ত, শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্ন দেখতেন, তা দেখে যেতে পারেননি।
উপসংহার: কালোত্তীর্ণ সুকান্ত
সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবন ছিল মাত্র ২১ বছরের, আর তাঁর সাহিত্যচর্চার ব্যাপ্তি মাত্র ছয়-সাত বছর। কিন্তু এই স্বল্প সময়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে যে স্থায়ী ও গভীর ছাপ রেখে গেছেন, তা বিস্ময়কর। তিনি বয়সের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেছিলেন তাঁর পরিণত চিন্তা ও গভীর জীবনবোধ দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের মতো মহীরুহদের ভিড়ে তিনি হারিয়ে যাননি, বরং নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়ে আজও ভাস্বর।
তিনি শিখিয়েছেন, সাহিত্য কেবল নান্দনিক বিনোদনের জন্য নয়, তা সমাজ পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে ব্যক্তিগত যন্ত্রণা ও সামাজিক সংকটকে শিল্পের মাধ্যমে সার্বজনীন করে তোলা যায়। যতদিন পৃথিবীতে ক্ষুধা, বঞ্চনা, শোষণ আর শ্রেণিবৈষম্য থাকবে, ততদিন সুকান্তের কবিতা প্রাসঙ্গিক থাকবে। তাঁর কবিতা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামীদের সাহস জোগায়, তরুণ প্রজন্মকে শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখায়। বাংলার অপরাজেয় চেতনাকে অভিবাদন জানিয়ে তিনি যেমন লিখেছিলেন:
“সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী
অবাক তাকিয়ে রয়:
জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়,”
তেমনি তাঁর নিজের জীবন ও সাহিত্যও সেই অপরাজেয় চেতনারই প্রতীক। সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা সাহিত্যাকাশে এক অকালে নিভে যাওয়া নক্ষত্র বটে, কিন্তু তাঁর আলো আজও লক্ষ কোটি সংগ্রামীর পথ দেখায়। তিনি অমর, তাঁর সৃষ্টির মাঝে, তাঁর আপোষহীন আদর্শের মাঝে। তিনি সেই ‘অগ্নি বিদ্রোহী’—যার রেখে যাওয়া ‘ছাড়পত্র’ হাতে নিয়ে নতুন প্রজন্ম এগিয়ে যাবে এক সুন্দর, সাম্যের পৃথিবী গড়ার অনন্ত সংগ্রামে।
লেখক : কবি, কথাসাহিত্যিক ও সম্পাদক

