অলৌকিক বন্ধু কবি জাহিদুল হক
কাল দুপুর ছিল মেঘলা। মেঘলা দুপুর শীতার্ত হলে অকারণেই মন কেমন করে। ঝিমুনি আর বিচ্ছিন্নতা ছেঁকে ধরে। ঠিক সেই অবস্থায় ইত্তেফাক ও অনন্যা সম্পাদক তাসমিমা আপার ফোন এলো। আপার ফোন পেলে বরাবর উল্লসিত হই। প্রসন্ন মনে ফোন তুলতেই দ্রুত বললেন, ‘আফরোজ, জাহিদের কী হয়েছে, কবি জাহিদুল হক?’ হাত থেকে রিসিভার খসে পড়ছিল। সামলে বললাম, ‘জানি না তো আপা। জেনে জানাচ্ছি’।
জাহিদের ভাগনি মারিয়ার কাছ থেকে জানলাম শেষখবর। জাহিদ প্রথমে পিজি তারপর ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি ছিল। ২০ তারিখ সন্ধ্যায় আমার মেয়ের রিসেপশনে ওর আসার কথা ছিল। আসতে পারেনি। ১৮ তারিখে জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে বলেছিল, আসব। বারণ করেছিলাম। ওদিনই শেষ কথা ওর সাথে।
জাহিদ আমার বন্ধু। এদেশে পুরুষ নারীর বন্ধুত্ব প্রশ্নাতীত নয়। আমাদের বন্ধুত্বের বয়স পঁয়ত্রিশ বছর । সেকালে এই জাতীয় বন্ধুত্ব নিয়ে প্রশ্ন আরো বেশি ছিল। যারা নিজেদের প্রগতিশীল বলে চাউর করে তারাও আড়ালে ভ্রু কুঁচকাতে। ওসব তোয়াক্কা করিনি কখনই। জানতাম আমরা আসলেই বন্ধু। যে বন্ধুত্বে লিঙ্গ কোন ব্যাপার নয়। যে বন্ধুত্বে কোন আদান প্রদানের বিষয় ছিল না। বন্ধুত্ব নিয়ে আমরা কখনই উচ্চকিত ছিলাম না। হৃদয়ের নিভৃতে লালন করতাম। আমাদের দুটি পরিবার আর গুটিকয় মানুষ ছাড়া তেমন কেউ জানতো না, আমাদের বন্ধুত্ব কতটা গভীর।
আমরা দুজন দুজনের রিজার্ভ ব্যাংক ছিলাম। নিজেদের উজাড় করে সব বলতাম। কোন সীমারেখা, দ্বিধা, সংকোচ ছিল না। ভাল-মন্দ, বিচার-বিবেচনা, শ্লীল-অশ্লীল নিয়ে কোনদিন ভাবিনি। ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করেছি বছরের পর বছর। সে গল্পে সাহিত্য সংস্কৃতি রাজনীতি থেকে রোগ শোক সংসার খাওয়া দাওয়া কৌতুক গালিগালাজ সবই ছিল। জাহিদ বলত, ‘আমাদের বন্ধুত্ব অলৌকিক। তুমি আমার অলৌকিক বন্ধু।’ আমি বলতাম, অলৌকিক বন্ধু তো তুমি। অলৌকিকভাবে তোমাকে পেয়েছিলাম শাহবাগ বেতারকেন্দ্রে!’ আমাদের আলাপে অলৌকিক শব্দটা বারবার ফিরে ফিরে আসত।
জাহিদ স্বাস্থ্য সচেতন ছিল। কিডনি আর এলার্জি নিয়ে দুঃশ্চিন্তা ছিল। আমি কিডনির রোগি বলে মাঝে মাঝেই কী খাবে কী খাবে না প্রশ্ন করত। পপী শাক খাবো? একটু যদি লেবু খাই? ফজলী আম খেতে পারব? দিনে দশবারও ফোন করত। প্রশ্ন করার মানুষটা হারিয়ে গেল! হারিয়ে গেল ঝগড়া করার মানুষটা! কাকে বলব, ‘কতবড় ভিআইপি তুমি হলে যে ফোন ধরছ না’!
অনেক অনেক স্মৃতি । ঢাকার বাইরে কতবার বেড়াতে গিয়েছি । বলেছি অকারণ কথা, করেছি খুনসুটি। প্রাণখুলে হাসত জাহিদ। এক কথা বারবার বলত গুরুত্ব বোঝাতে। উপকার করার জন্য মুখিয়ে থাকত। বড় কবি কতজন হয়, বড় মানুষ হয় না। ও বড় মানুষ ছিল। ব্যক্তিত্ব ছিল প্রখর। মূল্যায়ন না হলে রেগে যেত। মর্যাদাটুকু আশা করত। সরাসরি প্রতিবাদ করত। বয়সে খানিকটা ছোট হয়েও ওকে তুমি করে বলতাম। হেসে বলত, ‘একমাত্র তুমিই পারলে’। ‘কেন পারলাম’? ‘কারণ তুমি আমাকে শ্রদ্ধা করো’। আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছিল অনন্য।
জাহিদের বাংলা একােেডমি পুরস্কার পাবার খবরটা আমি ওকে প্রথম জানিয়েছিলাম। একাডেমির গেট দিয়ে বেরিয়ে আসছিল ও। আমি ভিতরে ঢুকছিলাম। ওকে দেখে চেঁচিয়ে বললাম, জাহিদ, জাহিদ তুমি একাডেমি পুরস্কার পেয়েছ। তোমাকে খোঁজাখুঁজি চলছে। তাড়াতাড়ি যাও।’ জাহিদ তেড়ে এসে বলল, ‘ফাজলামি করো তাই না? পুরস্কার পাই না বলে মজা করো’। ‘বিশ্বাস করো, পেয়েছ । গালাগালি পরে করো, যাও’। জাহিদ বলল, ‘না পেলে তোমাকে আস্ত রাখব না’। এ গল্পটা জাহিদ বার বার করত।
আমার ছেলে পান্থ, মেয়ে পারিজাতকে ও নিজের ভাগনে ভাগনির মতোই জানত। ওর বনশ্রীর বাসায় মাস তিনেক আগে গিয়েছিলাম, পান্থ সাথে ছিল। ভাত না খেয়ে কিছুতেই আসতে দেবে না পান্থকে। রাস্তা পর্যন্ত নেমে এসে বার বার বলছিল , ‘মামা একদিন এসে খেয়ে যাবে কিন্তু। বলো আসবে তো?’
আমার স্বামী লতিফ যেদিন মারা যায়, আমার হাত ধরে চুপ করে বসেছিল । সান্ত্বনা দেয়নি এতটুকু। কিন্তু ওর মমতাভরা চোখ দুটি জানিয়েছিল পাশে আছি। পাশে ছিল আমৃত্যু। একাধিকবার লতিফের করব জিয়ারত করেছে জাহিদ। জানি এখনও পাশে আছে।
জাহিদ একজন আপাদমস্তক কবি। কবিতা ছিল ওর দেহমন জুড়ে। ওর কবিতায় প্রকৃতি এসেছে নিবিড়ভাবে। চাঁদ তারা বনানী নদী ফুল এসেছে । বড় বেশি জীবনবাদী ছিল । তাই কবিতার শরীর জুড়ে আছে সোঁদা মাটির গন্ধ, যার কেন্দ্রে মানুষ। কবিতাগুলোর গভীর মমার্থ আছে। সংবেদী কবিতাগুলো হৃদয় অতলে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। প্রতিবাদ আছে, আছে সংস্কারমুক্তির কথা। ‘পকেটভর্তি মেঘ’ থেকে শুরু করে ‘কবিতাসমগ্র’ বলে দেয় ও একজন মুক্তবুদ্ধির মানুষ। ছন্দে ছিল পটু। গদ্যও নির্মেদ । জাহিদের প্রিয় কবি গর্সিয়া লোরকা। লোরকাকে নিয়ে জাহিদের অনেক কবিতা আছে। আমিও লোরকা ভক্ত । ও ভীষণরকম নজরুলপ্রেমী। ঘন্টার পর ঘন্টা নজরুলগীতি শুনত। ওর লেখা কয়েকটা গান এদেশের মানুষের মুখে মুখে ফেরে। নজরুলকে প্রবলভাবে ভালোবেসে ও গান লিখতে শুরু করে। আমার লেখা গবেষণাধর্মী বই ‘কবি নজরুলের সারাজীবন’ নামটা জাহিদেরই দেয়া।
রবীন্দ্র সার্ধশতে মূর্ধণ্য প্রকাশনী রবীন্দ্রনাথের উপর সিরিজ প্রকাশ করে। সিরিজে ‘রবীন্দ্রনাথ গল্প-কবিতা’ নামে আমার একটা বই আছে। বইটা জাহিদকে উৎসর্গ করেছি। উৎসর্গপত্রে লেখা ‘প্রিয়বন্ধু কবি জাহিদুল হক’। প্রিয়বন্ধু শব্দটি নিয়ে মনজুরে মওলা স্যার জাহিদকে ঠাট্টা করতেন। বলতেন, কতটা প্রিয় হলে প্রিয়বন্ধু লেখা যায়। আসলেই জাহিদ আমার কতটা প্রিয় আমি নিজেও তা জানি না। শুধু জানি, নিজেকে অকপটে মেলে ধরার মতো আর কোন বন্ধু আমার অবশিষ্ট নেই, আর কোন বন্ধু নেই যার সাথে আমি নির্ভয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করতে পারি! জাহিদের সাথে সাথে রাত জেগে গল্প করার বন্ধু আমার শেষ হেয় গেল!
হাসপাতালে আমাদের শেষ দেখায় জাহিদ কথা বলতে পারেনি! ওর চোখ গলিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছিল। যে চোখ কোনদিনই পাথর ছিল না। বার বার ক্ষয়ে ক্ষয়ে যেত ভালবাসায়! সে চোখ ছিল মায়াবী, আবেগী, মরমী। আমি ওর হাত ধরে ছিলাম। সে হাত কাঁপছিল!
ভাগ্যিস সেদিন গিয়েছিলাম! আশাবাদি জাহিদের জীবন পুরোটাই সৃষ্টিমুখর। যে ক’দিন বেঁচেছে আনন্দে বেঁচেছে। ওপারে আনন্দে বাঁচবে এই প্রার্থনা!
লেখক: কথাশিল্পী ও গবেষক

