অগ্রহায়ণ-১৯৭০


অগ্রহায়ণ-১৯৭০

হঠাৎ করেই পরিচিত জগৎ ছেড়ে প্রগাঢ় অন্ধকারের ভেতর গেঁথে গেলো সবাই। ঘরে-বাইরে সর্বত্র খান সেনাদের নৃশংসতার ছাপ। দীর্ঘদিনের চেনা মুখগুলোর দেখা মেলে না। হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া লোকেরা কী বেঁচে আছে, না মৃতদেহ তার খেয়ে গেছে শকুন-শেয়াল, এ নিয়ে সংশয় হয়। তবু আঁধার ভেদ করার স্বপ্ন দেখা কেউ ভোলে না। শাহাদাত ভাইয়ের মা তো গতকালই বললেন, ‘বেশিদিন নাই, লেজ গুটাইয়া পলাইতে হইব। আমাগো পোলারা কী এমনি এমনি ছাইড়া দিবো?’ আমিও ক্ষোভ নিয়ে বলেছি, ছেড়ে দিবে কী করে খালা? জানোয়ারদের ছাড় নাই। আমার জবাব শুনে খালার চোখের ভেতর ঝিলিক দিয়ে ওঠে। সম্ভবত শাহাদাত ভাইয়ের বাড়ি ফেরার স্বপ্নে তিনি বিভোর। কতদিন তাঁর ছেলে ঘরে ফিরে না।

চরদুঃখিয়া গ্রামে দ্রুতই সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। অগ্রহাছু মাস বলে কথা। হেমন্তকাল যে পৌষের জন্যে কিছু শীত বয়ে আনছে, গ্রামে না থাকলে এমনভাবে বুঝা যেত না। এর আগেও গ্রামে এসেছি অসংখ্যবার। অগ্রহায়ণে গ্রামের ঘরে ঘরে থাকতো উৎসব-আমেজ। পিঠা বানানো হতো। আত্মীয়-স্বজন বেড়াতে আসতো। সন্ধ্যায় আশেপাশের দু-চার ঘর মিলিয়ে গল্প-গুজব হতো অনেক। আমার মনে পড়ে, গতবছরও গ্রামে এসেছিলাম। ঠিক বেড়াতে নয়, ছবি আঁকতে। তখন শিক্ষার্থী হিসেবে চারুকলায় দারুণ সব দিন কাটছে। কামরুল হাসান স্যার একদিন আমাদের ডেকে বললেন, ‘এবারের হেমন্তটা একটু ভিন্ন। কোনো গ্রামে চলে যাও, দু-চারদিন থেকে প্রকৃতির কিছু ছবি এঁকে আনো।’ স্যারের কথা শুনে আমার প্রথমেই শাহাদাত ভাইয়ের কথা মনে হলো। তার চরদুঃখিয়া গ্রামে কতবার গিয়েছি।

ছবি আঁকার প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে কয়েকদিন পরেই সবান্ধব হাজির হলাম সেই গ্রামে। বান্ধবীরা সোৎসাহে রাজি হয়েছিলো। গ্রামের মানুষ এর আগে বোধহয় শিল্পীদের ছবি আঁকা দেখেনি। আমরা যখনি ছবি আঁকতে মাঠে কিংবা নদীর কাছে যেতাম, ভিড় লেগে যেতো। ক্যানভাসে অপলক তাকিয়ে তারা বুঝতে চেষ্টা করতো কী আঁকছি। খুব সুন্দর সময় কেটেছে আমাদের। মনে আছে, একদিন শাহাদাত ভাই বললেন, ‘আমার জন্যে একটা ছবি আঁকিস জেসমিন। ঘরে টানিয়ে রাখবো।’ তার কথা শুনে খুব রাগ হয়েছিলাম। তাকে কতবার বারণ করেছি, আমাকে যেন তুই করে না বলে। আমার খারাপ লাগে। বলেছিলাম, ছবি দিবো, তার আগে তুমি করে বলতে হবে। শুনে শাহাদাত ভাইয়ের কী হাসি! বললেন, ‘আমি কিন্তু বুঝি। তুই আমাকে জ¦ালাবি না, মাইর খাবি।’ আমি বলেছিলাম, সাহস থাকলে দেখি আসেন। শাহাদাত ভাইয়ের অত সাহস কখনো ছিল না। লাজুক লোকটাই রাজনীতির মাঠে কিভাবে সাহসী হয়ে উঠতো, আমি কখনো কূল-কিনারা পেতাম না।

চরদুঃখিয়ায় এসেছি কয়েকমাস হতে চললো। ঘরে আমি আর খালা। অথচ এই কয়মাসে শাহাদাত ভাইকে একদিনও দেখিনি। তিনি কোথায় আছেন কেউ বলতে পারেন না। খালা প্রায় রাতে কাঁদেন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলেন, ‘আল্লাহ আমার পোলাটারে তুমি দেইখা রাইখো। তুমি ছাড়া আমার কেউ নাই।’ আমি চোখমুখ শক্ত করে খালাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করি। অথচ আমার নিজেরই খুব কান্না পায়। মনে মনে বলি, কোথায় আছো শাহাদাত ভাই? একটা চিঠিও তো দিতে পারতেন, বা কারো মাধ্যমে জানাতেন আপনি ভালো আছেন। মনে মনে তাকে খুব বকি। আবার মায়াও লাগে। লাজুক লোকটা যুদ্ধের শুরুতেই ঘর ছেড়েছে। কোথায় থাকে, কী খায় কে জানে। আরেকটি প্রশ্নও প্রায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেÑতিনি কী বেঁচে আছেন? প্রশ্নটিকে নিজেই তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করতে চাই, তবু বুকের ভেতরটা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে। গ্রামের সবাই বলাবলি করছে, কিছুদিনের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। খান সেনারা পালাচ্ছে। আমারও মন টানে, দেশ স্বাধীন হতে দেরি নেই। হুট করে একদিন শাহাদাত ভাই ফিরে বলবেন, ‘তুই আমাদের বাড়িতে কী করিস?’

দুই.
জগৎ-সংসারে পিছুটানহীন আমি এক অদ্ভুত মানুষ। কতকাল থেকে বাবা-মা কেউ নেই। চাচার সংসারে মানুষ হয়েছি। আর স্বজন বলতে দূর সম্পর্কের শাহিনা খালা। যুদ্ধ শুরু হলে চাচার পরিবার কলকাতায় পাড়ি জমিয়েছেন। আমাকেও নিতে চেয়েছেন। আমিই জোর-জবরদস্তি করে একপ্রকার গ্রামে থাকতে চেয়েছি। চাচা পল্টন থেকে কত পথ ঘুরে আমাকে খালার কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। চরদুঃখিয়া খুব প্রত্যন্ত গ্রাম। এতদূর খানসেনারা হয়তো আসবে না, এই ভেবে চাচা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। কিন্তু তার ধারণা যে ভুল তা কদিন পরে স্পষ্ট হয়েছিল। হানাদারদের এখানেও এসেছিল কয়েকবার। বাজারের দোকানপাট পুড়িয়ে দিয়েছিল। আর এলোপাতাড়ি গুলি। আমি, খালা, আশেপাশের বাড়ির লোকেরা দূরের জঙ্গলে রাত কাটাতাম। কেউ টু-শব্দ পর্যন্ত করতো না। চারমাসেও খানসেনাদের আতঙ্ক যায়নি। এখনো রাতে কোনো ঘরে আলো জ¦লে না। আলো দেখে যদি খানসেনা আসে!

অবশ্য এরপরে আর কখনো এখানে খানসেনারা আসেনি। তবু সব চুপচাপ, আতঙ্কগ্রস্ত। আগে পাশের বাড়ির স্কুলপড়ুয়া মেয়েরা আসতো গল্প শুনতে। ঢাকায় যুদ্ধের কী পরিস্থিতি দেখেছি, কত কষ্ট করে গ্রামে পৌঁছেছিÑএ সবকিছু তাদের আলোচনার বিষয়। চারু ও কারুকলায় পড়ছি বলে ওরা ছবি আঁকা নিয়েও কথা শুনতে চাইতো।
আসার সময় ঢাকা থেকে কিছু রঙ-তুলি এনেছিলাম। ভেবেছি, পিকাসোর মতো যুদ্ধদিনের ছবি আঁকবো। কাগজ নেই, হলো না। একদিন ওদের দুজনের ছবি এঁকে দিয়েছিলাম স্কুলের খাতায়। খুব খুশি হয়েছিল তারা। দুদিন হলো ওরাও নেই। পুরো পরিবার কোনো আত্মীয়ের বাড়ি চলে গেছে। ফলে কথা বলার মানুষ বলতে একমাত্র খালা। আমার সময় কাটতে চায় না যেন।

গতকাল খালাকে বলেছি, ঘরবাড়ির যা অবস্থা, একটু পরিষ্কার করি। গুছিয়ে রাখি। আমার কথা শুনে খালা অনেকদিন পর হেসে উঠলেন। বললেন, ‘তোর যা ভালো লাগে কর।’ আমি কাজে লেগে গিয়েছিলাম। খালার ঘরটা বড়। ছয়টা রুম আছে। কিন্তু থাকার লোক বলতে খালা আর শাহাদাত ভাই। ঝাড়ু দিচ্ছি, ছড়ানো-ছিটানো জিনিসপত্র গুছাচ্ছি, এমন সময় কাপড়ে মোড়ানো ছবির ফ্রেমটা চোখে পড়লো। খুলে দেখি আমার আঁকা গতবছরের ছবিটাÑঅগ্রহাছু-১৯৭০। ছবিটা দেয়ার সময় শাহাদাত ভাই বললেন, ‘ছবি তো দিলি। এখন বল ছবির ভেতরে ফসলের মাঠে থাকা মানুষ দুটি কে?’ প্রশ্ন শুনে হাসতে হাসতে বললাম, একজন তো আমি। আরেকজনকে আপনি নিজ দায়িত্বে চিনে নেন। শাহাদাত ভাই আর কথা বাড়াননি।

একবছর পর ছবিটা দেখে কত স্মৃতি মনে পড়লো। ঘর গোছানো আর হয়নি। খালা রান্না করছিলেন। তার কাছে গিয়ে বসলাম। রান্না বলতে ভাত, আলু, আর ডিম ভাজি। আমার কাছে কিছু টাকা আছে। কিন্তু বাজার করা যাচ্ছে না। ভাগ্য ভালো, খালাদের গোলায় ধান আছে। তাই ভাতটা অন্তত খাওয়া যাবে। কথাটা খালাকে বলতেই বললেন, ‘তুই তো গতবার আইছত। ক্ষেতে ক্ষেতে কত ধান দেখছত। তোরে পিঠা খাওয়াইছি। আর এইবার দেখ। ক্ষেতে ফসল নাই, মানুষ নাই। জানোয়ারদের কারণে দেশটা গোরস্তান হইয়া গেছে।’ আমি চুপ করে থাকি। কী বলবো। কথা ঘোরানোর জন্যে বলি, খালা, তুমি না কালকে বললা, পাশের গ্রামের দুজন মুক্তিযোদ্ধা বাড়ি আসছে। শাহাদাত ভাইয়ের খবর তাদের কাছে থাকতে পারে। খালা উৎসুক চোখ নিয়ে মাথা নাড়ে। ‘হ, অইখানে আইজই যামু। তাগো কাছে খবর থাকতে পারে।’

আমি রাতের অপেক্ষা করি। কখন খালা খবর আনতে যাবেন? ভেবেছিলাম তার সঙ্গে যাবো। কিন্তু যাওয়ার সময় খালা নেননি। বললেন, ‘যামু আর আমু। এর মধ্যে কোনো সমস্যা হইলে আমার বাপের বাড়ি চইল্যা যাবি। কওয়া তো যায় না, কখন জানোয়াররা আসে।’
আমি দরোজা বন্ধ করে বসে আছি। সত্যি বলতে ভয় লাগছে না। মন কেন যেন বলছে, ভালো খবর আসবে। আমি অন্ধকারে পায়চারি করি। শাহাদাত ভাইয়ের মুখটা মনে পড়ছে। খালা কুপি জ¦ালতে মানা করে গেছেন। কিন্তু আমার অগ্রহাছু-১৯৭০ ছবিটা দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। ফ্রেমবন্দী ছবিটা শাহাদাত ভাই কত যত্ন করে কাপড়ে মুড়িয়ে রেখেছেন, যেন নষ্ট না হয়। তিনি কী যুদ্ধে যাওয়ার আগে ছবিটা এভাবে রেখে গেছেন? যেন ফিরে এসে দেখতে পান ফসলের মাঠে তিনি এবং আমি বসে আছি?

দু’ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। খালা এখনো ফিরেননি। নিজের অজান্তেই কুপি জে¦লে বসে আছি। সামনে অগ্রহায়ণে আঁকা ছবিটা। একসময় মনে হলো, সত্যি সত্যি চরদুঃখিয়া গ্রামের সবচেয়ে বড় ক্ষেতের কাছে পা ছড়িয়ে আমরা বসে আছি। সামনেই কৃষকরা ফসল তুলছে। আমাদের মধ্যে আর কোনো দেয়াল নেই…।
ঘরের দরোজায় মৃদু করাঘাতের শব্দে তন্দ্রা কেটে যায়। খালা ফিরলেন বোধহয়।