ক্ষমতার রসায়ন


ক্ষমতার রসায়ন

একটি চেয়ার তার জন্য দোয়েল, কোয়েল আর রাজহাঁস
কুহু কুহু, কেউ বা পা পা করে অভিন্ন অধ্যায়ের ক্রীতদাস
বিশ্বায়নের এই যুগে কত চেয়ার কত প্রাণীর পশ্চাৎ
দখল করে জীবনের মৃত্যুদিন গুনে অপেক্ষার ইস্পাত।

কখনো ঘাসফুল কখনো কলাগাছের ভেলার আবরণ
চেয়ারের টানে এফোঁড়-ওফোঁড় করে জনবিস্ফোরণ
এশিয়া-ইউরোপ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের নির্ঘুম রাত
আকাক্সক্ষাপ্রিয় জনতার চেয়ারে থাকে করাতের দাঁত।

সবুজ শ্যামল উর্বর মাটি সোনায় মোড়ানো উন্নয়ন
পৃথিবীর দ্রাঘিমা জুড়ে নক্ষত্রফেনা উল্কার দংশন
বাতাসের কানে সাইরেন বাজে নিত্যনতুন বিষাদের সুর
ক্ষমতার রসায়ন ইস্পাতে মোড়ানো জনতার মুমূর্ষুর।

উৎসর্গ

অনেক কিছু বলার ছিল
কখন, কীভাবে বলব?
কার কাছে বলব?
যেখানে মানুষ ভ্রান্ত-অশান্ত!
বিভ্রান্তির বেড়াজালে-
মরণজ্বরের বুনো উচ্ছ্বাস
কুরে কুরে খাচ্ছে!
সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত অবধি
জনমনের হাঁসফাঁস কে বুঝবে?
গাঢ় নলকূপ থেকে ধনকূপ
সর্বস্তরে দাহ্যতার ঘ্রাণ,
মানুষ আজ ইতিহাসের বদলে
ভূগোল আওড়ায় দলে দলে।

 

মমতাময়ী মা

নৈঃশব্দ্যের ভেতর শব্দের অস্তিত্ব
অনুরণিত হয় অন্তর্লীন সর্বস্ব,
রক্তমজ্জায়মানুষরূপে জন্মায়
আজ আমি ও আমার সত্তায়;
তোমার নামের সুধা অন্তর্বাহী
শিরার মতো নেপথ্যচারী।

পৃথিবীর বুকে তুমি শ্রেষ্ঠ শিল্পী,
তোমার হাতে আঁকা হয় একেকটি প্রাণ-পৃথিবী
জীবনে উত্থিত হয় সাত রং;
তোমার পরশে পৃথিবী পায় নতুন প্রাণ।

তুমি না থাকলে এ সুন্দর পৃথিবীর রূপ
দেখা হতো না দুচোখ মেলে,
তুমি স্বপ্ন না দেখলে
বাস্তব হতো না স্বপ্নের ঠিকানা;
তোমার রংতুলিতে আঁকা হলে
অনন্য সুন্দর রঙে রাঙা হয় শিল্পের বাক্সময়তা।

তুমি মা, মমতাময়ী-জন্মদাত্রী-জগৎমাতা,
পৃথিবীর বুকে অবিস্মরণীয় এক ঠিকানা
মা, মা, মা…

 

একুশ

একুশ আমার মায়ের ভাষা
বাঙালির অহংকার;
একুশ আমার কণ্ঠ থেকে আসা
বজ্রকণ্ঠের হুংকার।

একুশ আমার ভাইয়ের ভাষা
রক্তে রাঙানো প্রাণ;
একুশ আমার হৃদয় থেকে আসা
ভাইহারা একুশের গান।

একুশ আমার জ্বলজ্বলে তারা
মুক্তির আহ্বান;
একুশ আমার কৃষ্ণচূড়া
মুক্ত লেলিহান।

একুশ আমার রক্তিম সূর্য
গৌরবের ইতিহাস;
একুশ আমার শৌর্য-বীর্য
বীরত্বের প্রকাশ।

একুশ আমার বাংলা ভাষা
রক্ত দিয়ে লেখা;
একুশ আমার ভালোবাসা
বর্ণমালায় শেখা।

 

নিঃশব্দের অন্তরালে

প্রেম করে বড়োলোক না হলেও
বড়ো মাপের মানুষ হতে পারতে,
হতে পারতে মহৎ কিংবা উদার!
মাঝে মধ্যে এক্কাদোক্কা করে
মিশে যেতে পারতে মাটিতে;
এটা শুনতে খুব হাস্যকর হলেও
প্রেম করে কেউ কেউ ধনীর দুলাল
অথবা রাজকুমার হতে পারতো!
হতে পারতো ট্রয় নগরীর শাসনকর্তা;
আবার প্রেমের জন্য জীবনটাও
উৎসর্গ হতে পারতো প্রেমিকের
বাবা-চাচার চোখ রাঙানো
ভয়ংকর এক কালবৈশাখী ঝড়ে;
স্বপ্নভঙ্গ হতো রাত্রির নিদ্রায়,
পূর্ণিমাতে হঠাৎ করে সূর্যের দেখা পেতে,
হেঁটে যেতে বহুদূর গন্তব্যহীন গন্তব্যে;
মাঝে মধ্যে সময়-ভ্রমণে হারিয়ে যেতে
অন্য কোনো প্যারালাল ইউনিভার্সে
আটকে যাওয়া সময়ে;
পারি দিতে পানামাখাল আর সুয়েজখাল
এক নিমেষে নিঃশব্দের অন্তরালে;
এভাবেই প্রেম আসে, প্রেম যায়
থেকে যায় সময়, প্রেমের অপেক্ষায়
প্রেমিক-প্রেমিকার যুগলবন্দি ভালোবাসায়।

 

রক্তের দাগ

রক্তের দাগ স্বপ্ন দেখে ক্রমযাত্রার পথে
না-বলা গল্পগুলো বুলেটের রক্তভেজা খামে,
পারি দেয় অজস্র পথ-প্রান্তর হয়ে
সন্তানহারা মায়ের শূন্য বুকে;
সেদিনের ঘটে যাওয়া ইতিহাসে
অলি-গলি রাজপথ শহর-বন্দরে
স্মৃতির পাতায় ভেসে বেড়ায়
শত শত লাশের রক্তাক্ত স্মৃতি;
বুলেট, ককটেল আর বারুদের গন্ধ
আশাহত হয় বিদ্রোহী ছাত্র-জনতা,
শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান দীঘল-হাওয়ায়
হামাগুড়ি দেয় উষ্ণতার দীর্ঘশ্বাস;
বুকপকেটে স্বপ্ন উঁকি দেয় রক্তিম সূর্য
বিজয় নিশান উড়ে বেড়ায় জনতার মঞ্চে
মাঠেঘাটে তৃষ্ণার্ত স্বপ্নবাজ প্রতিজ্ঞায় ব্যস্ত;
নীতিশাস্ত্রের শতদলে কেবলই উদ্বেগ
বিভিন্ন ব্যঞ্জনায় হারিয়ে যায় স্বপ্ন,
ধীরে ধীরে উজ্জ্বলতা হারায় বিপ্লবী নক্ষত্র
সময়-সিদ্ধান্তের রসায়নে বাস্তবতার অতলে
শহীদের রক্তের দাগ বিষাদের সমুদ্রতলে।