আশির দশকে রচিত ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর অনবদ্য সৃষ্টি। দীর্ঘকবিতা ‘বিদ্রোহী’র জন্য নজরুল যেমন বিদ্রোহী কবি, তেমনি ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’র জন্য ওবায়দুল্লাহ কিংবদন্তির কবি। কবিতাটি হলো-
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।/ তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল/ তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল।/ তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন/ অরণ্য এবং শ্বাপদের কথা বলতেন/ পতিত জমি আবাদের কথা বলতেন/ তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।/ জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ কবিতা,/ কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা। (সংক্ষেপিত)।
দীর্ঘকবিতাটি বিশ্লেষণ করলে যে দিকগুলো উঠে আসে, তা হলো : ক. জীবনচৈতন্যে কবিতার অপার্থিব শক্তি অবলোকন। কবি জীবনকে শিল্পের অনুগামী করে তুলেছেন; যেখানে জীবন ও শিল্পের ব্যবচ্ছেদ অসম্ভব। কবির চেতনায় কবিতা এবং সৃষ্টি, গতি ও অগ্রসরতা সমার্থক। খ. এ-কবিতায় কবির অভিসম্পাত বা অভিশাপ মূলত জীবনাভিজ্ঞতার কাব্যব্যঞ্জনায় উচ্চকিত ও উচ্ছ্বসিত।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৪ – ১৯ মার্চ, ২০০১) বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের পঞ্চাশের দশকের একজন মৌলিক কবি। তার পুরো নাম আবু জাফর মুহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ খান। তার দুটি দীর্ঘ কবিতা ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ ছাড়াও ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে অভূতপূর্ব সংযোজন। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা। ১৯৮২ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের কৃষি ও পানি সম্পদ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
ভাষা আন্দোলনে শহীদ হওয়া কোনো এক সন্তানের পকেটে থাকা ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা চিঠির রচয়িতা কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ লেখেন তার অন্যতম কবিতা ‘কোনো এক মা’কে’। কবিতাটি ১৯৫৩ সালে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ঐতিহাসিক ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলনে প্রকাশিত হয়। কবিতাটি হলো-
মাগো, ওরা বলে,/ সবার কথা কেড়ে নেবে।/ তোমার কোলে শুয়ে/ গল্প শুনতে দেবে না।/ বলো, মা, তাই কি হয়?/ তাইতো আমার দেরি হচ্ছে।/ তোমার জন্যে কথার ঝুড়ি নিয়ে/ তবেই না বাড়ী ফিরবো।/ লক্ষ্মী মা, রাগ ক’রো না,/ মাত্রতো আর কটা দিন।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ বরিশাল জেলার এর বাবুগঞ্জের বাহেরচরের ক্ষুদ্রকাঠি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আব্দুল জব্বার খান পাকিস্তানের আইন পরিষদের স্পিকার ছিলেন। ১৯৪৮ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক, ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে এম.এ. পাস করেন।
১৯৫৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৫৪ সালে তিনি ইংরেজিতে মাস্টার্স করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দেন। ১৯৫৭ সালে অধ্যাপনা পেশা ছেড়ে তিনি যোগ দেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে। ১৯৮২ সালে তিনি সচিব হিসেবে অবসর নেন এবং রাষ্ট্রপতি এরশাদের সরকারে মন্ত্রীসভায় যোগ দেন। কৃষি ও পানি সম্পদ মন্ত্রী হিসেবে দুই বছর দায়িত্ব পালন করে ১৯৮৪ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
পরবর্তী কালে ১৯৯২ সালে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে যোগ দেন বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থায়। ১৯৯৭ সালে তিনি একই সংস্থা থেকে পরিচালক হিসেবে অবসর নেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি ঢাকায় ফিরে একটি বেসরকারি সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবেও বেশ কয়েকদিন দায়িত্ব পালন করেছেন।
কাব্যের আঙ্গিক গঠনে এবং শব্দ যোজনার বিশিষ্ট কৌশল তার স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করে। তিনি লোকজ ঐতিহ্যের ব্যবহার করে ছড়ার আঙ্গিকে কবিতা লিখেছেন। প্রকৃতির রূপ ও রঙের বিচিত্রিত ছবিগুলো তার কবিতাকে মাধুর্যমণ্ডিত করেছে।[২] তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো হলো : কবিতা,
সাত নরী হার (১৯৫৫), কখনো রং কখনো সুর (১৯৭০), কমলের চোখ (১৯৭৪), আমি কিংবদন্তির কথা বলছি (১৯৮১), সহিষ্ণু প্রতীক্ষা (১৯৮২), প্রেমের কবিতা (১৯৮২), বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা (১৯৮৩), আমার সময় (১৯৮৭), নির্বাচিত কবিতা (১৯৯১), আমার সকল কথা (১৯৯৩) ও মসৃণ কৃষ্ণ গোলাপ প্রভৃতি।
জীবদ্দশায় তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৯) ও একুশে পদক (১৯৮৫) লাভ করেন। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ এই কবির আজ ৯২ তম জন্মদিন। এই দিনে কবির প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

