আমিনুল ইসলামের নির্বাচিত ৫ কবিতা
আমার শিক্ষক
ছাদহীন পাঠশালা; কোনো টিনের বেড়া কিংবা
ইটের দেয়াল নেই
অফুরান আলো দিচ্ছে আট কোটি বাতি
কোনোটি চারপাশ দিন করে তোলা
আদিকালের হ্যাজাক লণ্ঠন
কোনোটি ঝুরঝুর রাতের মিষ্টি মোমবাতি
বাকিগুলো গুচ্ছ গুচ্ছ মাটির চেরাগ
ছাত্র না হয়ে কবি হলে,—
আমি তাদের রেশমি উপমার সুতায়
রাতের মঞ্চে নৃত্যরত
জোনাকির দলের সাথে বাঁধতাম।
পাঠশালাটা ছুঁয়ে কালবোশেখীর ঝাপটা যায়
শ্রাবণের বৃষ্টি নামে
বাধভাঙা উন্মত্ততায় মাতে
সিডর আইলা মহাসেন,
ভেঙে পড়ে
গাছের ডাল–ফসলের মঞ্চ,
কিন্তু বাতিগুলো নেভে না;
বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠি না কেন?
পারিবারিক শিক্ষা–
মা-বাবা দাদা-নানির কাছে পাওয়া হাতেখড়ি।
কোনো প্রাইভেট টিউটর নেই
তাই প্রতিদিন নিজহাতে ক্লাস টুকে নেয়াই
একমাত্র উপায়;
কত ফরমুলা! কত স্বতঃসিদ্ধ!
ঐকিকের কত কসরত!
চলিত নিয়মের কত যে চাল!
এসবের কোনোটাই মনে ধরেনি আমার ;
পথে বা পানশালায়
নদীর ঘাটে কিংবা খেলার মাঠে
রুমীর মসনবী অথবা
স্টিফেন হকিংয়ের এ ব্রিফ হিস্টোরি অব
টাইম পড়ার সময়-
আমার দুকানে বাজে
শুধু নিউটন স্যারের ক্লাসে শেখা মহাকর্ষের সুর;
এত বয়স হলো আমার অথচ সিলেবাস শেষ
হয়নি আজো;
‘আমিন একটা আজীবন আদুভাই!’
যতবার শুনি এই খোঁচা,
চক্রবৃদ্ধি সুদ হয়ে পাঠশালার প্রতি ততই
বেড়ে যায় টান-
প্লিজ আমাকে টিসি দিবেন না স্যার–
আমি আরও কিছুদিন পড়তে চাই!
অবশ্য হেড স্যারের সাথে দেখা হয়নি আজো।
মানবিক বিভাগ
আমাকে তুমি তোমার স্কেলের মাপে পেতে চাওনি কোনোদিন,
আমিও দেখিনি তোমাকে গজফিতায় ভিড়িয়ে আমার;
তুমি ছুটছো শুক্লপক্ষ-কৃষ্ণপক্ষ নিয়ে তোমার,
আমি সক্রিয় নিয়ে আমার একখানি ধুপছায়া সমুদ্র;
উপমাপ্রেমী কবিরা আমাদের ছবি দেখে মাঝে মাঝে বলে:
তুমি রয়েছো খরা ও মেঘের আকাশ হয়ে,
আর আমি আছি হয়ে অনিঃশেষ পিপাসার সমুদ্র;
সমুদ্র আর আকাশের মাঝে মহাশূন্যতা…
মহাশূন্যতা…
এবং মহাশূন্যতা…
সেই যে আপেল বাগানের মালী নিউটন,-
তার সূত্র গায়ে মেখে যত উপরেই উঠুক
ইস্কেপ ভেলোসিটির তরি,
ইজারাদারহীন সেই অকূল পারাবারের কূল পায় না:
‘…কূল নাই…… কিনার নাই রে…..’
কিন্তু একটা অন্যকিছু রচে রাখে সাঁকো
এই কাছের আর ওই দূরের মাঝে,
মহাকর্ষে-অভিকর্ষে টানটান পদার্থবিজ্ঞানের
সিলেবাসে তার সন্ধান নেই;
হয়তো-বা সেকারণেই তোমার তুখোড় সহপাঠী
ডাক্তার শামীম পারেনি,
এক ব্যাকবেঞ্চার,-অতএব মানবিক বিভাগ,
খুঁজে পেয়েছিল সেই সাঁকো… অ্যায় নয়ন, আমি কাজল!
পরকীয়ার দায়
কালা ভাসুরের দোষ ছিল না- দোষ কী কালো রায়ের!
নন্দঘোষ তো খুঁটায় বাঁধা- হাড় ভেঙে দাও পায়ের!
কাশবনে কুড়িয়ে পাওয়া কবিতা
দ্যাখো, পাখিদের রাষ্ট্রে নিজেদের কোনও গণহত্যা নেই
রাষ্ট্র তোলেনি কোনও কাঁটাতারের বেড়া
নেই বিভেদের ধারাযুক্ত প্রেমবৈরী কোনও সাম্প্রদায়িক আইন;
ডিএম এর অনুমতি?
তাদের কাছে ডিএম শব্দটি মস্ত বড়ো একটা
ঘোড়ার ডিম-
যাতে একটা ঠোকর দিয়েও দেখে না তারা;
তাকিয়ে দ্যাখো নিকলী হাকালুকি টাঙ্গুয়ারের
সুরভাষী OLOX উৎসবে
সেখানে বিভাজনের ফ্ল্যাগে সয়লাব কোনো
জাতিসংঘ নেই
নেই ঠোঁটে শান্তি হাতে বোমা নিরাপত্তা পরিষদ;
আইরন ডোম? সে তো শয়তানের শামিয়ানা!
তা দিয়ে কী কাজ তাদের যারা ভালোবাসে
বৃষ্টির স্নান
জোছনার ক্রিম
প্রভাতের রুজ
আর শীতের বিকেলে রোদের আসমানি উত্তাপ- আহ!
পাখিরা ভালোবাসে গান আর কবিতা
কবিতা ও গান
কিসের দ্বীন-ই এলাহী রে বোন!
সিংহাসন নেই
সম্রাট নেই
শুধু রাজধানীহীন মহামিলনের মুক্ত রাজ্য-
আকাশভরা গান-
‘আমি মুক্ত বলাকা মেলে দেই পাখা
ওই দূর নীল আকাশে…..’
সাদা মাখামাখিতে হেসে ওঠে শরতের কাশবন
আর পূর্ণিমার টপলেস চাঁদ
দুটি হাতকে দুদিকে প্রসারিত ডানা বানিয়ে
শূন্যতার সিঁড়ি বেয়ে
যেদিন নেমে এসেছিলেন
আদম ও ইভ-
বৃক্ষ নদী রোদ হাওয়ার মাহফিলে
সেদিন থেকে
যুগের পর যুগ
শতাব্দীর পর শতাব্দী
গ্রহজুড়ে মানুষেরও একটাই অবিভক্ত রাষ্ট্র ছিল
তখন পাদুকাহীন পা দেখেনি কোনো টুকরায়িত
ভূগোলের ধুলো;
পাসপোর্ট? সে তো সাম্রাজ্যবাদীর গতকালের মেধা।
কাশবনের ওপর দিয়ে হাওরমুখী উড়ে চলা
বলাকা
পোচার্ড
আর্কটিক টার্ন
সমস্বরে বলে-
হে কবি, হরপ্পার স্নানঘর আর খাপুর পিরামিড
নিয়ে বানালে তো মোহন পরাবাস্তব চিত্রকল্পের বাগান,
অবচেতনের আকাঙ্ক্ষাকে জেতাতে
নেফারতিতির সুডৌল বুক এনে লাগিয়েছ
তোমার বাদামি প্রেমিকার বুকে,
যারা কবিতা লেখে না
আমাদের প্রণয়ী ডানার নকল নিয়ে বানিয়েছে
বারুদের ডানা
আমাদের অভিসারী উড্ডয়নে খুঁজে নিয়েছে
ইস্কেপ ভেলোসিটির উপমা,
সেখানেই শেষ নয়,
সোসিয়োলজি আর নৃবিজ্ঞান রচে রচে ভরে তুলেছে
আলেকজান্দ্রিয়া-
বায়তুল হিকমাহ-
বৃটিশ মিউজিয়ামের তাক
ফাইনালে বিবর্তনবাদ হয়ে উঠেছে নতুন পূজার মন্ত্র;
কিন্তু তোমরা কখনো কি খুঁজে দেখেছ
মানুষের শতযুগের অভিন্ন পৃথিবীকে ভাগ করেছিল
কবে- কারা?
দেও দানব?
সে তো শুধু তোমাদের ভয়ার্ত মেধার রূপকথা;
না, না,–কালো আফ্রিকার লালচে হায়েনা নয়
রয়েল বেঙ্গল টাইগার নয় সুন্দরবনের
আমাজনের কালো কেম্যান কিংবা
আটলান্টিকের হা-খোলা হাঙরও নয়
টুকরায়নের মাথাগুলোই মানুষের আদি
ও আসল দুশমন
যাদের উত্তর প্রজন্ম ব্যস্ত এখন
শয়তানের সিলেবাস হাতে
রোদের আড়ালে- বারুদের কারখানায়…
ঝগড়া বানু
আর সে আমার কেউই ছিলো না; অথচ হঠাত দমকা হাওয়ায় একদিন সে আমার ভালোবাসার নদী। স্রোত-স্রোত। ঢলাঢলি। টোকা দিলে জোছনার সাগরের মতো আছড়ে পড়বে নিজেরই তীরে! সমুদ্রচারী হাওয়া কবেই বা সংযমী হয়েছিল! অতএব তার তাতা জলে ডুব দিয়ে তৃপ্ত আমার বোশেখী রোদের পিপাসা। অবশ্য তখন আমার নিজের উঠোনে নিজেরই একখানি ইছামতী; অন্য জলে ডুব দেওয়ার কথা নয়। তো কেন এমন হয়? কে জানে তা। শুধু দেখি,– তার কটিদেশে শ্রাবণের পুনর্ভবা, গাংচিলের ডানায় প্রতিধ্বনিত ঢেউয়ের আবৃত্তি, জলভেজা হাওয়ার দেওয়ালে পাল হয়ে ওঠা শিবগঞ্জ সিল্কের দোপাট্টা; আর পদ্মপাড়ের ডাগর কিশোর আমি; আমার শরীরে শেষ আষাঢ়ের বানের মতন যৌবনের মাতলামি; নদীর ভালোবাসা প্রাণের পাঠশালা হয়ে শিখিয়ে দেয় জলের বর্ণমালার স্বর ও ব্যঞ্জনা। অবশ্য কেউ কোনোদিন এ আমাকে ওম্যানাইজার বলেনি; আর মহাপুরুষের যুগ তো চলে গেছে বিংশ শতাব্দীর আঙুল ধরে যেমন করে চলে যায় চঞ্চল কৈশোর আলঘেঁষা মেঠোপথ দিয়ে মাথায় নিয়ে অবারিত আকাশের ছাতা। তো মাঝখানের সেই অবস্থান সেদিন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নতুন ব্যঞ্জনায় আর বাড়তি সম্মোহনে যা আদম ও ইভের স্বর্গীয় রেকর্ড থেকে খানিকটা ভিন্নতা দাবি করতেই পারে।
ও ধরলা, ও ধলেশ্বরী-, পুনরাবৃত্তি এতটা মধুর হয়! আমাদের মাঝে কোনো ঝগড়া ছিল না। না, না, পুশ ইনের মগজ নিয়ে সে কাঁটাতারের বেড়া নয়। অথচ মীনাকুমারী কিংবা কবরী নয়, ববিতা বা কাজলও নয়, কারা তার নাম দিয়েছে ঝগড়া বানু; তার ওপর কি কখনো ভর করেছিল সোনার বাংলার রাজনীতি যা নেতানেত্রীর সবুজ উপাধির গায়ে লেপে দেয় রক্তমুখ শব্দের ব্যঞ্জনা যা দেখে হেসে ওঠে হিটলার-মুসোলিনির সমাধি আর দা-বটি রেখে অভূতপূর্ব প্রতিবাদ সম্মেলন ডাকে কসাই সমিতি!
এগারো বছর দেখা নেই; তবে শীঘ্রই দেখা হবে আবার। মন বলে। তার নাম? কী হবে সেই নামটি জেনে? কাননবালার নাম কে জানতে চায় আর! তো রসিকজনের দেওয়া নামটাই থাক; ঝগড়া বানু। কথায় বলে- হাতি মারা গেলেও লাখ টাকা! ঝগড়া বানুর আবাদী অধরে কাজী জালালের জ্যেষ্ঠের আমাবাগান; ভাগ হওয়ার পরও যা আছে সেটাও অতুলনীয়। দিন গেছে ব্যাগে ভরে নিয়ে সেইদিন; কিন্তু সে আমার গেরিলা চুমুর ট্রেনিং নিয়ে যায়নি ভরে নিয়ে তার রংচটা রুকস্যাকে; যদি পুনরাবৃত্তি ঘটে পূর্ব অভিজ্ঞতার, ঝগড়ার হাতে সে কি শাড়ি পেঁচিয়ে নেবে স্রোতময় কোমরে? লাফিয়ে উঠবে তার মহানন্দার খালঘাটের মতো নাভি? যা হবে হউক! ঝগড়াশেষে জানবে ট্রাম্পের পৃথিবী: ভারত-পাকিস্তান কাজিয়া নয়,—-আমাদের এ ঝগড়াটা ভালোবাসার।

