বাংলার কৃষক আন্দোলন ও নজরুল
নজরুলের সাহিত্যিক সত্তা পূর্বাপর সমকালীনতার বোধে শুরু। যে সমকালীনতার অন্যতম মূল বৈশিষ্ট্যই ছিল উপনিবেশিকতা। নজরুলকে আমরা পাই উপনিবেশবাদ- বিরোধিতার ধারকরূপে। তাঁর কবিতা, প্রবন্ধ, সম্পাদকীয়, অভিভাষণপ্রভৃতিতে এর বহিঃপ্রকাশ প্রত্যক্ষণীয়। এ-ক্ষেত্রে ফ্রাঞ্জ কাফকার সঙ্গে নজরুলের মিল পাওয়া যায়। সর্বগ্রাসী ধ্বংস, সংকট ও মানবতার লাঞ্ছনার পটভূমিতে রচিত কাফকা ও নজরুলের সাহিত্য যেন প্রচলিত যে-কোনো ভঙ্গির অস্বীকারÑতা বিষয়বস্তু বা আঙ্গিকগত সবদিক দিয়েই।
নজরুলের কৃষক আন্দোলন মনোভাব মূলত তাঁর বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে সাম্মাজ্যবাদ-বিরোধিতা, আধিপত্যবাদ-বিরোধিতা, উপনিবেশবাদ-বিরোধিতা এবং জাতীয়তাবাদ ও সাম্যবাদী চেতনার অংশত প্রতিফলন। তাঁর প্রতীক উচ্চারণÑ‘পরের মুলুক লুট করে খায়, ডাকাত তারা ডাকাত।’ কিংবা-
ঘোর রে ঘোর রে আমার সাধের চরকা ঘোর
ওই স্বরাজ-রথের আগমনী শুনি চাকার শব্দে তোর।
নজরুলের চেতনায় ভারতীয় জাতীয়তাবাদ যেমন প্রবল ছিল, তেমনি প্রবল ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ। নজরুল যখন বলেন, ‘তুই ভারত বিধির দান/এই কাঙ্গাল দেশের প্রাণ’ কিংবা ‘ক্ষুদিরাম গেছে, কিন্তু সে ঘরে ঘরে জন্ম নিয়ে এসেছে কোটি কোটি ক্ষুদিরাম হয়ে’Ñতখন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের আহ্বান শুনি। আবার তিনি যখন বলেন, “বাঙালি যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবেÑ‘বাঙালির বাংলা’ সেদিন তারা অসাধ্য সাধন করবে”Ñতখন আমরা বাঙালি জাতীয়তাবাদের মন্ত্র শুনতে পাই।
নজরুলের উপনিবেশ-বিরোধিতা, সাম্রাজ্য-বিরোধিতা বোধের সহযোগী ছিল সাম্যবাদী চেতনা। যখন তিনি বলেন, ‘মিথ্যা শুনিনি ভাই, এই হৃদয়ের চেয়ে বড়োকোনো মন্দির কাবা নাই।’Ñতখন সাম্যবাদী চেতনার বাণী ধ্বনিত হয়।
উপর্যুক্ত পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় রেখে কৃষক আন্দোলনে নজরুলের ভূমিকা নিয়ে অল্প কিছু কথার অবতারণা করা যেতে পারে। মনে রাখা দরকার, ইংরেজরা বঙ্গদেশ দখলের পর ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করলে মূলত বাংলার মুসলমানরা ভৌমিক আধিপত্য হারায়। এরপরে ১৮২৮ সালের তিন-আইনি বিজ্ঞাপনের ছোবল থেকে লাখেরাজ সম্পত্তি ভোগী কোনো মুসলমানই পরিত্রাণ পায়নি। তাই দেখা যায়, ইংরেজরা ক্ষমতা দখলের পর বাংলায় হিন্দুরা ভূমি অধিকারের দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, ক্ষতিগ্রস্ত হয় মুসলমানরা। প্রমথ চৌধুরীর “রায়তের কথা”-এর উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলার অধিকাংশ জমিদার ধর্ম পরিচয়ে হিন্দু এবং প্রজা বা রায়ত মুসলমান। তিনি এও দেখিয়েছেন, মধ্যস্বত্বভোগী ভদ্রশ্রেণির মানুষ কিভাবে গ্রাম উজাড় করে ধ্বংস সাধন করছে।
কৃষকের জীবন হলো জমি। অথচ জমির প্রতি কৃষকের কোনো অধিকার নেই। তাই নজরুল জমিলগ্ন কৃষকের মৌলিক অধিকারের প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন :
জনগণে যারা জোঁক সম শোষে তারা মহাজন কয়
সন্তান সম পালে যারা জমি তারা জমিদার নয়
মাটিতে যাদের ঠেকে না চরণ
মাটির মালিক তাহারাই হয়।
সেই জন্য কবি সব ধরনের শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানিয়ে বলেন :
আজ জাগবে কৃষান, সব ত গেছে, কিসের বা তার ভয়
এই ক্ষুধার জোরেই করব এবার সুধার জগৎ জয়
ঐ বিশ্বজয়ী দস্যুরাজার ভয়রে করব নয়
ওরে দেখবে এবার সভ্যজগৎ চাষার কত বল।
বাংলার কৃষকদের অবস্থা তুলে ধরে তাদের অবস্থা জানাতে কবি বলেন, ‘যাহাদের অস্থি মজ্জা ছাঁচে ঢালিয়া রৌপ্য মুদ্রা তৈরি হইতেছে, যাহাদের চোখের জল সাগরে পড়িয়া মুক্তা মানিক ফলাইতেছে, তাহারা আজ অবহেলিত, নিষ্পেষিত ও বুভুক্ষ।’ কৃষকের প্রতি কবির মমত্ববোধ অপরিমেয় অনন্য। ময়মনসিংহের কৃষক শ্রমিকের প্রতি সম্ভাষণে কবি বলেন,
আমার এই কৃষান ভাইদের ডাকে বর্ষায় আকাশ ভরিয়া বাদল নামে, তাদের বুকের স্নেহধারার মতোই মাঠ-ঘাট পানিতে বন্যায় সয়লাব হইয়া যায়, আমার এই কৃষান ভাইদের বধূদের প্রার্থনায় কাঁচা ধান সোনার রঙে রাঙিয়া ওঠেÑএই মাঠকে জিজ্ঞাসা কর। মাঠে ইহার প্রতিধ্বনি শুনিতে পাইবে। এ মাঠ চাষার এ মাটি চাষার।
কবি লক্ষ করেন, ভারতবর্ষে শতকরা সত্তরজন চাষি। অথচ চাষের সাথে মহাজনের কোনোরকম যোগসূত্র না থাকলেও জমি স্বত্ব ক্রমান্বয়ে মহাজনের হাতে চলে যাচ্ছে। জমিদার আর গ্রামের সকল কর্মের ত্রাণ-স্বরূপে উপস্থিত নন। তিনি শহরে এসে বাস করে মদ-মাংস-মেয়েমানুষ-মটর-মামলা নিয়ে ব্যস্ত। গোমস্তার অত্যাচারে প্রজার প্রাণ ওষ্ঠাগত। মহাজনের হাতে জমির স্বত্ব চলে যাচ্ছে। জমিতে চাষির স্বত্ব নাই। যত্নের অভাবে জমির উৎপাদন শক্তি নষ্ট হচ্ছে। উৎপাদিত পণ্যে প্রজার লাভের পূর্ণ অংশ নাই। তাই কবি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেনÑ‘স্বরাজটা হাতে পাবে কে?’ কবি শুধু প্রশ্নই তুলেননি; স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন,
আমরা স্বরাজের মামলা আর এটর্নি দিয়ে করাতে চাই নাÑএবার নিজেদেরকেই বুঝতে হবে। মথুরার লীলা রে দেখেছি- আমাদের দেবতা যিনি তাঁকে বৃন্দাবনের শ্যামল মাঠে ফিরিয়ে আনতে চলেছি,…যদি সেই দেবতার আহ্বান কেউ বাধা দেন,…লাঙলের আঘাতে তাকে মরতেই হবে।
তাই তো নজরুল আন্দোলন ঘোষণার শুরুতেই বলেছিলেন :
আমি সেই দিন হব শান্ত
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না!
পরিশেষে বলা যায়, সাম্রাজ্যবাদের করাল গ্রাসে নিপীড়িত বঙ্গদেশের অরাজক ও অসহযোগ আন্দোলনের চরম মুহূর্তে সাহিত্যে নজরুলের আবির্ভাব ঘটে। বিশ শতকের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের বিচিত্র তরঙ্গ-তাড়ন নানা অস্থিরতা ও জ্বালা-যন্ত্রণা ধারণ করেই নীলকণ্ঠ হয়েছিলেন নজরুল। সাহিত্যে যার প্রকাশ উচ্চকিত। নজরুলের এই প্রতিবাদী সত্তা আমরা খুব কম সাহিত্যিকের মধ্যে পাই। আসলে নজরুল জনগণের কবি, তাই জনগণ চিরকাল শ্রদ্ধার সাথেস্মরণ করবে এই কবিকে।
লেখক : গবেষক ও কবি, উপপরিচালক, বাংলা একাডেমি

