স্মরণ: সাংস্কৃতিক বুদ্ধিজীবী কবি হায়াৎ সাইফ


কবি হায়াৎ সাইফ (১৬ ডিসেম্বর ১৯৪২ – ১৩ মে ২০১৯) একজন বাংলাদেশি আধুনিক কবি এবং সাহিত্য সমালোচক। বাংলাদেশের সমসাময়িক জীবন ও সাংস্কৃতিক  বুদ্ধিজীবী। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৮ বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক তিনি একুশে পদক লাভ করেন।

সাইফ ১৯৪২ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মোসলেম উদ্দিন খান ও মাতার নাম বেগম সুফিয়া খান। পিতার কর্মস্থল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার সুবাদে তিনি তার শৈশব কাটান রাজশাহীতে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

হায়াৎ সাইফ লেখালেখি শুরু করেন ষাটের প্রথমার্ধে, তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় সিকান্দার আবু জাফর-সম্পাদিত বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা সমকালে, ১৯৬২ সালে। ষাটে শুরু করলেও প্রথম গ্রন্থ সন্ত্রাসে সহবাস প্রকাশিত হয়েছে ঢের পরে, ১৯৮৩ সালে। সর্বশেষ গ্রন্থ মনোরথ শেষ হয় নাই প্রকাশিত হয়েছে ২০১৩ সালে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তিনি খুব সক্রিয়। সুদীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে সৃষ্টিশীল থাকা প্রমাণ করে কবিতা ফল্গুধারার মতোই এ-কবির অন্তঃসলিলে প্রবহমান। বিশেষ করে যখন আমলে নিই কর্মজীবনে তাঁর পেশাগত দায়িত্বের বিস্তৃততর পরিধি, অনিঃশেষ সাংসারিক ও সামাজিক দায়িত্ব, তখন এ-প্রতীতি দৃঢ়বদ্ধ হয়।

তিনি যে কাব্যমগ্নতায় ছিলেন সে-কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, কেননা, কবিতার প্রথম পাঠক কবি নিজেই, কেউ বরমাল্য নিয়ে এগিয়ে না এলেও তিনি গোপন প্রণোদনায় কাব্যমাল্যে নিজেকে ভূষিত করবেন। নিভৃতচারী এ-কবি পুনঃমনোযোগ দাবি করেন পাঠের, বিশেষ করে তাঁর কবিতার নিরীক্ষা ও বিবর্তনের দিকে ফিরে তাকাবার সময় এসেছে। ষাটের কবিদের ভেতর নিঃসন্দেহে তিনি বিশিষ্ট, যাকে ঠিক অন্য কারো সঙ্গে মেলানো যায় না। যিনি বিশ্বাস করেন ‘কবিতার উচ্চারণ একটি অত্যন্ত গভীর নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার ভেতর দিয়ে উঠে আসা স্ফটিক, যা একটি ভাষার সমূহ সম্ভাবনাকে উন্মোচিত করে’ এবং  এ-প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, ‘বাংলাভাষার শৈল্পিক সম্ভাবনা কবিতার জন্য প্রায় অসীম’ এবং যিনি পাঁচ দশকের পরিক্রমায় এখনো সৃষ্টিশীল, তাঁর কাছে বাংলা ভাষা নতুন নতুন কাব্য সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত করেছে।

লেখালেখি ও কর্ম জীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ব্রোঞ্জ উলফ পুরস্কার (২০০৫), কবি ফজল শাহাবুদ্দীন কবিতা পুরস্কার (২০১৫) ও একুশে পদক (২০১৮) লাভ করেন।

১৬ ডিসেম্বর প্রয়াত কবি হায়াৎ সাইফের ৮৩ তম জন্মদিন। জন্মদিন স্মরণে কিছু কবিতা-

 

সাজানো সংসার

বাইরে থেকেও চোখে পড়ে তার সাজানো সংসার।
সমস্ত গৃহস্থালি যেন দিনযাপনের কঠোর সম্রাজ্ঞী হয়ে
অবিরাম আত্মকেন্দ্রিক। গতরে দারুণ রাগ। এখনি আমরা সব
বেবাক এতিম পরিত্রাহী রব ছেড়ে ছিটকে যাবো এদিক ওদিক।
মাংসের মন্দিরে তার বিগ্রহ হৃদয় কোথা? আছে কি না আছে।
দোর্দন্ড প্রতাপে অন্ততঃ অাঁচলে ওজনদার চাবির গোছা থাকে।
কতো ধানে কতো চাল দেখে নেবে এখনি আবার এই ফাঁকে।
আটপৌরে সবই আছে ঘটিবাটি বাসনকোসন শিল নোড়া।
দেহের তদবিরে বেশ রয়েছে গোছানো তুংগে তোলা যৌবন
তাহার
পড়ন্ত হলেও তার পাট করে রাখা আছে যেখানে যেমন
প্রসাধনী শাড়ি গয়না পেটিকোট ব্রা ব্লাউজের উপচানো স্তূপ।
তবু কজন বাউন্ডুলে উটকো প্রজা মৃত্যুঞ্জয় জেগে আছে।
সহজ দেখার চোখ জ্বেলে রাখে যখন তখন। অতএব
এবম্বিধ দেখে যাই অবরোহী কিস্তিমাত খেলা। তুমুল
গ্যাঞ্জাম চারভিতে। একরোখা রগচটা জীবনযাত্রার
রীতিনীতি বেমালুম ভুলে গিয়ে পড়ে আছি তাই আপাতত
কণ্ঠরোধী
পাঁকে। চারদিক অাঁস্তাকুড় আর পোকার দংগল। অাঁশটে
গন্ধ মিশে থাকে বিবর্ণ চাতালে। দেয়ালে লিখন থাকে
এবং কখনো নেপথ্য থেকে শুনি বিষণ্ণ গলিতে
কে যেন বলছে হেঁকে জোরে – ওরে ও বেল্লিকের দল
তৈরি থাক কখন যে বেজে ওঠে মেঘের মাদল।

 

কবরের হাত

কবরের ভিতরে ছিলো হাত
সেই হাত বাহিরে ফিরেছে
ভিতর বাড়িতে থিতু ভীতু রাতে
তার হাত প্রতীক বাসর বিছায় –
তারপর অবুঝ প্রেমের বশে
প্রীতিরসে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে থাকে
কবরের সুনসান শব্দহীর ঘরে
যেন এক নিষ্প্রভ বিকট পাথর।

 

নদী ও মানুষ

কোনো সত্যই নিরঙ্কুশ সত্য  নয় কোনো সুন্দর নয় বিশুদ্ধ সুন্দর
কোনো জন্মই নয় জীবনের মৌলতম শুরু কোনো মৃত্যুই নয়
নিরন্তর
চলমানতার শেষ
কোনো শুভ বা অশুভ নয় অবিমিশ্র শুভ অশুভ
নিরন্তর নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের মধ্যেই জন্ম ও মৃত্যুও চিরায়ত দোলাচল
জীবনের মধ্যে ভয় ভরা মেঘনার মত্ত স্রোত ভাঙা ও গড়ার অমোঘ ইতিহাস
প্রজ্ঞা নয় বিশ্বাস বা অবিশ্বাস নয় কেল বহমান অবিনয়ী কালের কম্পন

 

এখনো তো মনোরথ শেষ হয় নাই

মাঝে মাঝে মনে হয় এই সব প্রাত্যহিক প্রকট দায়িত্বাবলী
এই সব অর্থহীন অনুপুঙ্খ বাধ্যবাধকতা,
এইসব তথাকথিত অসার সামাজিক প্রবণতা
সবকিছু ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে একেবারে
কপর্দকহীন চলে যাব কোনো এক দিগন্তের দিকে;
যদিও সেখানে দিক-চক্রবাল সরে সরে যায়,
চারদিকে বয়ে যায় সময় আর বাতাসের স্রোত;
এইভাবে দ্রুতগামী চলে গেলে
তথাকথিত জগত সংসার পিছে ফেলে দিয়ে
এর চেয়ে অসম্ভব প্রত্যয়ী কোনো অস্তিত্বের
দিকে হয়তো বা যাব চলে।

 

অন্তর্জলি

রমনার আশেপাশে ফিরি নিউমার্কেট থেকে কাঁটাবন হয়ে,
রেলের লাইন ধরে নীলক্ষেত পাশে ফেলে বরাবর বিদ্যাপীঠে
উঠি।
হলের ক্যান্টিনে একদল তরুণ তাপস ঝড় তোলে কাপে,
উস্কখুস্ক চুল রক্ত-চোখ, সিগারেটে সিগারেটে দিনক্ষণ মাপে,
রিলকে থেকে শুরু করে আরো দূরে চলে যায় হেঁটে হেঁটে,
কখনো বা কাম্যু কখনো বা বোদলেয়ার আসে,
কখনো বা র্যাঁবোই প্রধান ব’লে মনে হয়,
হ্যামলেট মাঝে মাঝে এসে সোলিলোকি ভাঁজে
কখনো বা ওফেলিয়ার মৃতমুখ আধো অন্ধকারে ভেসে ওঠে;
ঘুরে ঘুরে এলোমেলো কত কী যে আসে আর বারবার চলে যায়,
কৃশ মানুষেরা আসে শ্মশ্রুময় প-িতেরা আসে
সুধীন জীবনানন্দ খাবি খায়, প্রায়শই উঁকি দেয় মার্কস ও লেনিন,
কমরেডের দল হাততালি দিয়ে ওঠে কখনো সখনো,
কখনো সখনো খানসেনাদের দোসরেরা আসে ভিন্ন চেহারায়।

 

প্রাথমিক ভ্রুণ

সব কিছু আজ দেখি বাউরি বাতাসে কাঁপে,
ধাপে ধাপে কেঁপে যায় স্মৃতির দরোজা;
বাংলার বামপন্থী তান্ত্রিকের শবাসন,
লালনের গান, দক্ষিণের দামাল ঝড়, কখনো বা
নীলগন্ধা নদী, কখনো বা নীলকান্ত ধরণীর গলে
সমুদ্রের কুসুমিত ফেনা দোলে,
কেওড়া আর সুন্দরী জেগে থাকে,
হিম সৈকতে বহুদূর দূরগামী জাহাজের মাস্তুল দোলে,
একজন হেমকান্ত সৈকত দেখেছিল,
কুলকু-লিনী জেগেছিল কোনো এক দুর্বাসা তান্ত্রিকের;
অথচ আজ দুই কুড়ি পনেরোটা বছরের পর
সে মানুষটা নেই আর, শুধু ভেসে আসে তার ঋত্বিক কণ্ঠস্বর, …

উল্লেখ্য: কবিতাগুলো বিভিন্ন অনলাইন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে কোন কোন কবিতা সংক্ষেপিত হতে পারে। সচেতন পাঠকের দৃষ্টিগোচর হলে সংশোধনের জন্য অবশ্যই জানাবেন।