চার সোয়া পাঁচ
একটু দমে খানের দিকে তাকিয়ে বলেন, মিয়াজি আন্নের অনুমতি লাগেতো। খান ঘাড় নাড়ালে কয়েকটি ছেলে মোবাইলে অপশন দিয়ে ছবি তুলে নেয়
পর্ব-৫
খানের মনে হয় আজ এত বছর পর তাকে করুণার পাত্র হতে হলো। বুড়োর অভিজ্ঞতা, দূরদর্শিতার কাছে হার মানতেই হলো। ছবি তোলার ফাঁকে ফাঁকে বুড়ো একাধিকবার খানের দিকে দন্তহীন হাসি বিকশিত করে তাকেও প্রলুব্ধ করছেন। প্রথম সংশয় কাটিয়ে খোলস উম্মুক্ত করলেন খান। দু’জনের উদ্ভাসিত হাসির সঙ্গে যোগ দিলেন আগত সকলেই।
আবুলের মনটা ভরে গেল। বাবুল তখনও অবাক হয়ে তাকিয়ে বড্ডাভাইয়ের দিকে। এ জীবনে প্রথম দেখলো বড্ডাভাইর আল্জিহ্বা আর উন্মুক্ত হাসি। এরইমধ্যে মোবাইলে ক্রমাগত চললো ফটোসেশন। কয়েকজন যুবক সোফার পেছনে জায়গা করে নিয়ে ছবি তুলে নিল, কেউবা সেলফি। সুযোগ হাতছাড়া করেনি মোতালেব। খান সাহেবের কাছ ঘেষে ছবি তুলে নিল সে। স্যারের সাথে ঘনিষ্ঠ এ ছবির মূল্য অনেক। নিকটতম বসদের নজরে নিয়ে ভাল সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে। পরপর অনেকেই খানের সাথে হাত মিলিয়ে প্রীত হন। খান সাহেব নিজে দাঁড়িয়ে সকলকে বসার আমন্ত্রণ জানান।
বাবুল এ ঘর ও ঘর মিলে সবার জন্য চেয়ার ব্যবস্থা করে। খান সাহেব বুড়োর দিকে তাকিয়ে বলেন, আপনার শরীর কেমন? বুড়ো লাঠি সামনে ঠেলে সোফায় হেলান দিয়ে বসেন।
‘মাইনষ্যে খালি জিজ্ঞায় আঁর শ’বছর হার অইছেনি? শোকর আল্লাহ্র কাছে। শ’বছর দি কিত্তাম! অসুখলই হাজার বছর দম থাকলে কি লাভ! আল্লাহ্তালা ভালা রাখছে। খাড়াই থাকতে-থাকতে, আল্লাহর নাম জপ্তে জপ্তে মইত্তে চাই। কি কন মিয়া সাব?’
‘জ্বী। আল্লাহ্ কবুল করুন।’
‘মাইনষে কয় আন্নের এই আছে, হেই আছে। আন্নের আছে, থাকলে আঙ্গো কামে না লাগলে আন্নের ইগিনদি আমরা কি কইরুম? আসল কথা ইজ্জত। এই ইজ্জত ভাগাভাগিও করা যায়। আন্নেগো লগে আত্মীয়তা কইচ্ছি আঁইতো মনে করি আঙ্গো ইজ্জত বাড়ছে’।
খান সাহেব বিগলিত হয়ে জবাব দেন, না আমরাও শোকর গুজার।
‘আসল কথা হইলো আন্নেরেদি কার কী উপকার অইছে! আন্নে বড় অইছেন, আল্লাহ্ বড় বানাইছে। প্রশ্ন আইয়ে বড় অই দেশের, দশের আর নিজের মাইনষের লাই কী কইচ্ছেন! আমরা গ্রামের মানুষ টোগাই ইগিন। আঙ্গো দাবি বেশি, বড় অবুঝ আমরা।’ বুড়ো আরেক পশলা হাসি বিলিয়ে দেন।
এরইমধ্যে দই, মিষ্টি, নানান জাতের পিঠা প্লেটে প্লেটে আসতে থাকে আসর ঘিরে।
খানের সামনে দই মিষ্টির প্লেট, দ্বিধা না করে তুলে নিয়ে বুড়োর হাতে দিয়ে নিজে এক প্লেট নেন। বুড়ো চামচ দিয়ে দই কেটে মুখে তোলেন, খানও তার দিকে তাকিয়ে চামচ কাটেন।
‘আন্নের ভাতিজিরে আমরা নিছি। আল্লায় চাইলে ইজ্জতের লগে থাকবো। অবহেলা অইতো’ন। আঁর নাতি ইংরেজিতে অনার্স পাস, বলেই হাঁক দেন কইরে আমিনুর’?
একপাশ থেকে বিয়ের পোশাক পরা একটা ছেলে এগিয়ে আসে। বুড়ো রেগে বলেন, তোমার পাগ্ড়ি কোনাই? একটা ছেলে ছুটে গিয়ে ওঘর থেকে পাগ্ড়ি এনে পরিয়ে দেয়। বুড়ো বলেন, মিয়া সাবেরে সালাম দাও। বর এগিয়ে আসতেই খান দাঁড়িয়ে বলেন, ঠিক আছে বাবা, পায়ে ধরে সালাম দিতে হবে না। একটু ঝুকে ওর কাঁধ ছুঁয়ে দেন খান।
‘নাতি কয় আরেক বছর আছে। ইনশাআল্লাহ্ ভালা ছাত্র। টিউশনি করি চলে, অসুবিধা নাই। কইবেন, ছাত্রের আবার বিয়া কিল্লাই? সময় খারাপ কোম্মুই কে টানি লই যায়, ডর আছে না? কইতে হারেন আল্লার ইচ্ছা। আমরা আন্নেরে আসরে হাইছি, আঙ্গো কইলজা ভরি গেছে। দাবিও নাই, ওয়াদাও চাই না। জামাই-ভাতিজির যাতে ভালো অয় এককানা রেনি চাইবেন’। বুড়ো ছেলের দিকে চোখ ঘুরিয়ে বলেন, খোদার হুকুমও থাকতে অইবো।
আলী আকবর খানের মোবাইল বেজে ওঠে। কলার দেখে লাইন কেটে দেন। মিনিট খানেক পর আবারও। এবার বাঁন অন করে ছোট করে বলেন, পরে কল দিচ্ছি।
এরইমধ্যে ট্রে করে চায়ের কাপ-প্লেট আসতে থাকে। অতিথিদের একজনের গায়ে ধাক্কা খেয়ে দু’টি কাপ পড়ে ভেঙ্গে যায়।
এতক্ষণে ভয়ে ভীত আবুলের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। অইছে, কিছু অইতো’ন।
বাবলু দূর থেকে বড্ডাভাইর রিএ্যাকশন লক্ষ্য করছে। গাঁও-গেরামের আধাশিক্ষিত, অশিক্ষিত মানুষগুলোর আচরণ কেমন হয়! আবার বড্ডাভাই কিভাবে তা গ্রহণ করেন, সেটাই তার দেখার বিষয়।
বড্ডাভাইর সরল আচরণে আগত মেহমানরা যেমন খুশি, তেমনি আবুলের মনেও তৃপ্তির পরশ বয়ে যায়। খোদার শুকরিয়া আদায় করে, অপেক্ষা করে পরবর্তী অবতারণার। মাগরিবের আযান সামনে রেখে মেহমানরা বিদায় নেন। অন্দরবাড়িতে চলছে মেয়ে বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা। বিকেল হতেই স্ত্রীর কতগুলো মোবাইল কল জমে আছে। খান কলব্যাক করলে ওপাশ থেকে তাতানো স্বর।
‘তুমি কোথায়? কি করছো? আমাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ কর না? এত্তোগুলো কল দিলাম সবগুলো মিস্ড হয়ে গেলো। কিসের এত ব্যস্ততা তোমার’।
খান ধীর লয়ে জবাব দেন, আমার নিজ বাড়িতে ভালই আছি। তোমার টেনশনের কারণ নেই। লাইন কাটতে গিয়ে থামলেন ও প্রান্ত থেকে বাকিটুকু শোনা দায়িত্বের আওতাভূক্ত। ‘তোমার বাড়ি? ওখানে কি আছে না আছে- আমি জানি না? রাতে থাকলে আমাদের বাড়ি যাও। ওখানে ড্রাইভারেরও ভালো ব্যবস্থা আছে। তোমার শালার বউ তোমার রাতের মেনু জানে’।
বল্লামতো এখানে কারো অসুবিধা হবে না। খান আস্তে জবাব দেন।
গাড়ি কোথায় রাখবে? দুষ্ট ছেলেপিলের অভাব আছে? যদি গ্লাসটা ভেঙে দেয়? স্ত্রী যেন নাছোড়বান্দা।
আচ্ছা দেখি, বলে তিনি লাইন কেটে দেন। ঢাকার চেয়ে এ এলাকায় সন্ধ্যা নামে সাত মিনিট আগে। মাগরিবের আযান পড়ে গেছে। শিউলি ছুটে আসে হন্ত-দন্ত হয়ে, ‘ভাইজান কইন্যা বিদায় দিতে দেরি অইলো। আযান দিছে, নামাজ হড়ি লন। হিয়ার হর রাইতে কি খাইবেন কই দিয়েন। আন্নেরতো যিয়ান হিয়ান চইলতো’ন। আঁরে কইয়েন..’।
অযু নষ্ট হয় নাই মনে করে জায়নামাজে দাঁড়ান খান। অন্যেরাও নামাজ শেষে অপেক্ষায়। খান ভাবছেন, শ্বশুর বাড়ি যাওয়াটাই ঠিক হবে। ভোরে না হয় আবার আসা যাবে।
স্ত্রীর নির্দেশমতো ড্রাইভার এ্যাটাচি নিতে হাজির। বাড়ির অনেকেই ড্রাইভারের হাবভাব বুঝে অপেক্ষায়।
বাবুল সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে। খান মাগরিবের পর অনেকটা সময় নিয়ে দোয়া কালাম পড়লেন। আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা চাইলেন। ভাবছেন, জীবনভর লাল ফিতার ফাইল, সবুজ ফিতার ফাইল নাড়া চাড়া করেছেন। সব কিছুই জরুরী। এখন মনে হলো এত জুরুরত ভেবে নামাজে কখনো মনোযোগি হননি।
ভাইজান, হুইনলাম আন্নে হোর বাইত চলি যাইবেন? আন্নে আঙ্গোলগে থাকি যান। আঁই ভালা ব্যবস্থা করি দিউম। গাড়ির চিন্তা কইরেন না, আন্নের গাড়ি কেউ ছুঁইতো’ন। হিয়ার হরে আঁই নিজে দুইজন লই কাছারির সামনে বই থাইক্যুম। তবু আন্নে এক রাইত আঙ্গো লগে থাকেন। বাবুলের আবেদন শুনে খান নতুন করে ভাবছেন। ‘বাবুল, এতো ঝামেলার দরকার কি? সকালেতো আমি আসবো। নাশ্তা এখানেই করবো।’
বুইজ্জি, আন্নেতো আঁঙ্গো মতন আবার বেকার নন, লগে ফাইলও আইনছেন দেখছি, জরুরী মানুষ।
শিউলি এগিয়ে আসে, ‘বড্ডাভাইজান, আঙ্গো বাড়ির বউঝিরা রাইত করি নানান রঙের হিডা বানাইবো, আমুদ ফুর্তি কইরবো। আন্নে এককানা না থাকলে কেন্নে অয়? আঙ্গোতো ইচ্ছা করে এককানা আমুদ-ফুর্তি করার।’
কোথায় যেন আটকে গেলেন খান। বার বার ভাবছেন। শিউলি আরেক কদম এগিয়ে বলে, ভাবীর নম্বরগা দিলে আঁই এককানা আর্জি রাখতাম।
না না ঠিক আছে, বলে ঘরের বের হলেন।
বাবুল একটা টর্চ ধরিয়ে দিয়ে বলে, হাঁটি-হাঁটি চান বাপ- দাদার বাড়ি বহুতদিন হর।
ড্রাইভার ভাব বুঝে মোবাইলের আলো জ্বেলে কাছারির দিকে ফিরে যায়। কাছারি পার হয়ে বামে কবরস্থানের দেয়াল। আলো জ্বেলে দেখেন পাথরে খোদাই করা দোয়া, ‘আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহ্লাল কুবুরে …..।’ দেয়ালের ভেতরে একটা সতেজ নারিকেল পাতার অর্ধেক মাটিতে বিছানো। বুঝাই যায় নতুন কবর। বাবুলকে জিজ্ঞেস করতেই জানেন, নূরী ফুফুর কবর। মনে করার চেষ্টা করেন, না পারছেন না।
বাবুল স্মরণ করিয়ে দেয় হেতনেরে পাশের গ্রাম দেলিয়াই বিয়া দিছিলো। জামাই মইচ্ছে অনেক আগে। ঝি একগা আছিলো হেতিও মইচ্ছে। জামাই বাড়ির কোনো সম্পত্তি নাই; বাপের বাড়িতেও কিছু নাই। এ ঘর, হে ঘর খুঁজি খাইতো। বড়ই ছিদ্দতের জীবন আছিল। তিন-চাইরদিন আগে মরি গেছে।
একটু থমকে দাঁড়িয়ে দোয়া-দুরুদ পড়ে মোনাজাত করেন, পেছনে অনেকেই দাঁড়িয়ে পড়ে। একটু এগিয়ে সামনে টর্চ ফেলেন। টর্চের নিশানা নারিকেল গাছের গা বেয়ে একদম তুঙ্গে। গাছের মাথায় কাঁদি-কঁদি ডাব-নারিকেল। বাবার লাগানো এক সারিতে চারটি নারিকেল গাছ। উচ্চতা সত্তর ফুট ছাড়িয়েছে। প্রায় সমান উচ্চতায় গাছগুলো গত পঞ্চাশ ষাটবছর ধরে ফলন দিচ্ছে। বাবা মাঝে মধ্যে বাড়ি এলে গাছের গোড়ায় গোবর, তুষ ঢেলে দিতেন। গাছের গোড়ায় আলো ফেলে দেখেন নতুন মাটি। কেউনা কেউ এর পরিচর্যা করছে বুঝতে পারেন। বাবুল পেছন থেকে আওয়াজ দেয়, ভাইজান একগা ডাব কাডিদি। হাড়ি রাখছি আন্নের লাই।
খান বুঝতে পারছেন না। এ মুহূর্তে তার ডাব খাওয়ার ইচ্ছা আছে কী নাই! একবার ভাবেন, ড্রাইভারকে একটা কেটে দিতে বলবেন।
ওর চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে ও এখানে তেমন আরাম বোধ করছে না। খানের শ্বশুর বাড়িতে তারও জামাই আদর। শালার বউ খোঁজ খবর করে, আদর করে খাবার পরিবেশন করে। শোবার জায়গাটা আরামদায়ক করে দেয়। বাড়ির খোঁজ খবর করে।
উচ্চাকাক্সক্ষী আলী আকবর বেপারী নবম শ্রেণিতে বোর্ড রেজিস্ট্রেশন ফরমে বেপারী পাল্টে খান যোগ করেন। সে সময় তার এক দূরসম্পর্কীয় মামা চট্টগ্রামে খান নামে পরিচিতি পান। সরকারি পদবিটা ইউডিসি হলেও মর্যাদার দিক থেকে গ্রামে তার নিজস্ব পরিচিতি ছিল। খান সাহেব বলতে তার গ্রামে মোহাম্মদ আলী খানকে বুঝাতো। তার সে সময়কার চলন, বলন, কথন মোহাবিষ্ট করেছিল আকবর বেপারীকে। বাবা শুনে হা করলেও রা করেন নি। স্কুলে বরাবর তার ফার্স্ট পজিশন ছিল। টিচাররা তাকে আলাদাভাবে বিবেচনা করতেন। অঙ্কের স্যার জটিল সমীকরণ তার কাছ থেকে প্রকারান্তরে শিখে নিতে দ্বিধা করতেন না।
নূরী ফুফুর কথা মনে পড়ে খানের। বাবা নারিকেল গাছের গোড়ায় তুষ ঢেলে দিচ্ছেন। নূরী ফুফু কখন যে পেছনে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেন নি। নূরী ফুফুকে খুব ভয় হতো ছোট আকবরের। মুখ থেকে একটা চুমুর শব্দ তুলে আকবরের গালে হাত লাগিয়ে বলেন, ভাইজান আন্নের এ হুতগা আঁরে দি-দেন। আঁরেতো আল্লায় কোনো হুত দে’ন। আঁই হিগারে যত্ন করি বড় কইরুম।
আকবরের বয়স তখন চার হলেও সব বুঝতো। বসে থাকা বাবার কাঁধে খাম্ছি মেরে ধরে আছে আকবর। নূরী ফুফু জোর করে কোলে তুলে একটা চুমু লাগিয়ে দেন। আকবর বাম হাতে গাল মুছে নেয় কাঁদ কাঁদ হয়ে। নূরী ফুফু কৃত্রিম গোস্বা করে বলেন, আঁই তোরে আদর করি চুম্মা দিছি আর তুই মুছি হালাইছত্? চল ভাইহুত, আঁর লগে চল। আঁই চিড়া ভিজাই রাখছি, ঘরে হানা কেলা আছে, আখের গুড়ও আছে। নাইয়ল কোরাইদি বেকগিন মাখি দলা করি তোরে দিউম বা-জি। আকবর কুঁ-কা করে গা পিছলে নেমে যায়। নূরী আবার কোলে তোলার চেষ্টা করে বলেন, তোরে আঁই নিজের হুত করি রাইখ্যুম। নতুন জামা কিনি দিউম, রাতা জবাইদি রান্ধি খাওয়াইছ্যুম।
আকবরের বাবা গোবর তুষ নিয়ে ব্যস্ত। চোখ তুলে চাচাতো বোনের উদ্দেশে বলেন, নূরী তুই ইগারে বাইত লই যা। কইবি গোসল করাই দিতে। আঁর দেরি অইবো। নূরী অনেকটা জোর করে কোলে তুলে নেয় আকবরকে। আরেকটা চুমু দিয়ে বলেন, আঁরে মা’ক, তোরে কত কী দিউম। প্রতি ঈদে নূরী ফুফু ওর জন্য নুতন জামা কাপড় পাঠিয়ে দিতেন। নিজে এসে পরিয়ে দিয়ে চেয়ে থাকতেন আনমনে।
প্রায় প্রতিদিন-ই আসতেন আকবরকে দেখতে। কলা, ডিম, পেঁপে, আতাফল, জামরুল কিছু একটা নিয়ে। আকবরের মেট্রিক পরীক্ষার সময় রোজ-রোজ সেদ্ধডিম আর দুধ পাঠাতেন। বলতেন, যাদুর অন ভিটামিন দরকার। সহজ কথা! মেট্রিক হরীক্ষা, বাউরে বাউ ক’জনে এদ্দুর উঠতে হারে। আঁর যাদুরে আল্লায় বেরেন দিছে ইয়ার লাইয়েনা। আল্লার শোকর। খোদা মেহেরবাণী করিও।
আকবরের মা নূরীর এত বাড়াবাড়ি পছন্দ করতেন না। আকবরের বাবার নির্লিপ্ততা তাকে প্রতিবাদী করতে পারেনি। এ সব মনে করতেন, বাড়তি জ্বালাতন। আকবরের বাবা শুধু বলতেন, ওতো আমার ছেলের অকল্যাণ চায় না। ওর মতো ওকে করতে দাও। মেট্রিক পরীক্ষার সময় ফি’র পুরো চল্লিশটাকা জোগাড় করতে পারেন নি আকবরের বাবা। দশটাকার জন্য শেষদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। নূরী খবর পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে কায়দে আজম মার্কা দশটাকার একটা নোট জোর করে ভাবীর হাতে গুঁজে দেন। ‘আঁইকি তোগো হর নি? কিল্লাই আঁরে কস্’ন। যাদু এদ্দুর লেহাহড়া করি দশ টেঁয়ারলাই হরীক্ষা দিতে হাইত্তো’ন? নূরী ফুফু সে টাকাটা কখনো ফেরত নেয়নি।
কবর দোয়া করতে করতে মনে পড়ে ফুফুর খোঁজ-খবর কখনো নেয়া হয়নি। শেষ জীবন বহু কষ্টের মধ্যে ছিলেন কুনেছেন। স্বামী পাগল হয়ে যায়। কোনো সন্তান না থাকায় বাবার বাড়িতে উচ্ছিষ্টের দিন গুজরান করেছেন। স্বামীকে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েছিলেন দূরের এক গ্রাম্য চিকিৎসকের কাছে। সেখানেই মারা যায়। মৃত্যুর পর দেবর আর তার ছেলে মিলে উঠোনে পাকা খুঁটা লাগায়। ধানের জমি দখল করে নেয়। বলে, তার ভাই তাকে সব কিছু রেজিস্ট্রি করে দিয়েছে। একটা দলিল খাড়া করে তারা। নূরী জানতো এসব আচাভুয়া।
কে একজন পাশের বাড়ির দাঁড়িয়ে বলেছিল, হাগলে কেমনে জমিন রেজিস্ট্রি করি দেয়? সে লোকটাকেও পরে পক্ষে পাননি। বসত ঘরকে ঘিরে কাঁটাতারের বেড়া দেয় দেবর আর তার ছেলেরা। এ ঘর ও ঘর করে দু’মুঠো জুটতো। ইজ্জতের ভয়ে দূরের গাঁয়ে গিয়েও ভিক্ষে করছেন। বাবার বাড়িতেও তার দূরাবস্থা। বাবা-মা তো মরেছেন অনেক আগেই। ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী সন্তানেরা পথ দেখিয়ে দিল অজানার। সাথে জুড়ে দিল সতর্কবাণী, ‘আঙ্গো বাড়ির ঝি অই মাইনষের বাড়িত খয়রাত করস্? আঙ্গো ইজ্জত লই টানাটানি’?
বড় ছিদ্দতের মধ্যেও বেঁচেছিলেন আরো পাঁচ বছর। স্বামীর ঘরে মরে-পঁচে গন্ধ বের হলে তার খবর পায় স্বজনেরা। ভাইয়ের ছেলেরা এসে নিজের বাড়ির কবরস্থানে শেষ জায়গা করে দেয়। খান কারো কারো কাছে নূরী ফুফুর দুরাবস্থার কথা কুনেছিলেন; আজ মনে হচ্ছে, অনেক কিছুইতো করার ছিল। এমনিতো বহু ঋণ খেলাপি হয়ে আছে এ জীবনে আজ উপলব্ধি করছেন।
খান বাড়ির আশপাশ ঘুরে ঘুরে দেখছেন। এখানে সুপারির বাগান ছিল, আজ ধান ক্ষেত। ওখানে ধান ক্ষেত ছিল, এখন ফল-ফলাদির বাগান। খালের চিহ্ন নেই, কোথাও জমিন, কোথাও পাকা দালান। ঘুরতে ঘুরতে পছার বাড়িতে ঢুকেন। নাম পছারবাড়ি হলেও আসলে কোনো ঘরদোর নেই। কোনকালে হয়তো ছিল। নিচু জমিন, আলে গাব, নারিকেল, সুপারি-আমের গাছ; অনেকটা আগোছালো বাগান। পেছনে তাকিয়ে দেখেন দূরে নোয়াবাড়ির রাস্তায় শিউলি আড়ালে তার ড্রাইভার। ড্রাইভার শিউলির কাছে স্যারের খবর নেয়। দুইদিন থেকে স্যারের মোবাইল বন্ধ। ম্যাডাম স্যারের খোঁজ-খবর করেন ড্রাইভারের মোবাইলে।
শিউলির কাছে স্যার সাতদিন থাকবেন শুনে ও হতাশ। কি বলবে ম্যাডামকে? নিজের কী উপায় হবে! শিউলির পরামর্শ চায় ড্রাইভার। শিউলি পানের পিক নারিকেল গাছের গোড়ায় ফেলতে ফেলতে সামলে নেয়। সাহেবের বড় অপছন্দের জিনিস পানের লাল পিক। অথচ, মুখ ভর্তি পিকটা গিলবে না ফেলবে ধন্ধে পড়ে যায়। শেষবধি ড্রাইভারকে আড়াল করে বুড়ুত্ করে ফেলে দেয় রাস্তার বাইরে। ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে বলে, খান-দান, ঘুমান। ডাব, চা লাগলে কইবেন হাজির হই যাইবো। ম্যাডামকে বলবেন, চিন্তা না করতে। বলতে অসুবিধা হইলে, ফোন নম্বরটা আমাকে দিবেন, আমি বুঝিয়ে বলবো। শিউলি নিজেই ভাবে ওর মধ্যে যেন একটা অন্যরকম ভাব এসে গেছে।
ড্রাইভার যেন ছিট্কে পড়ে। গেঁও এ মহিলাকে ম্যাডামের ফোন নম্বরটা ধরিয়ে দিলে কী না কী বলে! শেষতক চাকরিটা চলে যাবে। তার চেয়ে আরেকটা দিন অপেক্ষায় থাকা ভাল। স্যার হয়তো নিজ থেকেই কিছু বলবেন! আকবর আলী খান ঘুরে ফিরে জমির আল দিয়ে বাড়ির রাস্তায় ওঠেন। একটা নারিকেল গাছের দিকে কিছুটা সময় দৃষ্টি ধরে রাখেন। শিউলি পেছনে দাঁড়ায়। বড্ডাভাই ডাব খাইবেন?
হুম, বলে খান সাহেব ওর দিকে তাকান। গাছটা কার?
ওম্মা কিয়া জিগান! আন্নে ডাব খাইবেন, ইয়ান বিষয়। কার গাছ, ইয়ান বিষয় না। যার গাছই হোক বলে, উচ্চৈস্বরে কাচারিমুখী একটা ছেলেকে ডাকে। ‘এরি লেদা হুনি যা। দৌড়ি আয় এম্মুই’।
ছেলেটা ক’কদম আসতেই শিউলি আবার বলে, হুন, এককান দা আর একগা বিড়া লই আয়, ডাব হাড়ন লাগবো। বড্ডাভাই ডাব খাইবো।
খানের চোখে পড়ে প্রায় পঞ্চাশফুট উর্ধ্বে গাছের মাথায় পাঁচটা ঝুনা নারিকেল। ইচ্ছে হচ্ছিলো নারিকেলের ছড়িটা নিয়ে স্ত্রীকে বুঝিয়ে দিতে। দশ-বারো বয়েসি একটা ছেলে ছুটে আসে। একহাতে সুপারি পাতার খোল দিয়ে বানানো একটা বিড়া, অন্যহাতে দা। ছেলেটি দুপায়ে বিড়া সেঁটে সাঁই সাঁই করে গাছে উঠে যায়। তাকিয়ে আছেন খান। কার ছেলে, কার কি! যদি অন্যরকম কিছু ঘটে যায়। এতটুকুন শিশুর প্রতি তার মমত্ববোধ পাক খেতে থাকে। দ্রুত যেন ছেলেটি সহি-সালামতে নেমে আসতে পারে সে ভাবনায় কাতর থাকলেন। ছেলেটি নারিকেল গাছের মাথায়; লুঙ্গির বেড়ে কোমরের পেছনে সেঁটে আছে দাটি। ভাইজান হরি যান, বলে সর্তক করে শিউলি। চিন্তা কইরেন না হিগার গাছে উঢনের অভ্যাস ভালা।
কইরে লেদা, ঝুনা নারিকেলের বিড়গা আগে হালাইদে, ভাইজান ঢাকাত লই যাইবো। নিজ বাড়ির নারিকেল-ভাবীরে কইতে হাইরবো। ইগার নারিকেল যা মিষ্টি এককাই কচ্কইচ্যা জিলাপির লাইন, বলে খানের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসে।
খান ভাবনার খাদে পড়েন, কে এই মেয়েটি? আবারও তার মনের ভাবনা ধারন করলো! ওকি রিডিং করছে আমাকে!’ ভাবনা হোঁচট খায় গাছের উঁচুতে তাকিয়ে। ছোট ছেলেটিকে প্রায় দেখা যাচ্ছে না।
নারিকেলের কাণ্ডের আড়ালে কখন যে চলে গেছে টের পাননি। শিউলি গলা উঁচু করে বলে, লেদা ডাব বাগানের ভিত্রে নরম জায়গায় হালা। রাস্তার মধ্যে হালাইলে শক্ত মাডিত হড়লে হাডি যাইবো। দক্ষিণের বিড়ে আট-দশগা আছে বেকগুন হালাইদে।
হঠাৎ নিচে সুপারিপাতার মাথা ধরে ঝপ্ ঝপ্ ঠাশ্ করে নারিকেলের বিড় মাটিতে পড়লো। একটা নারিকেল ছুটে এসে খানের পায়ের পাশ দিয়ে চলে যায়। আঁৎকে উঠে শিউলি।
চিৎকার করে বলে ভাইজান, আন্নে হরি যান। বড় দুষ্ট এই ঝুনা নারিকেল। খালি দৌড়ায়। একটা ডাব ছুটে সুপারি গাছের মাথায় বাড়ি খেয়ে রাস্তায় পড়ে ফেটে যায়। শিউলি চিৎকার করে বলে, লেদা কই’ন বাগানমুই হালাইতি।
‘ওরে দেড়িয়া, গেলনি হাডি ডাবগা?’
এরইমধ্যে বাড়ির ছেলে-মেয়ে অনেকেই মজা পেতে ছুটে আসে। আবুলও ছুটে আসে বাড়ি থেকে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, বড্ডাভাই, আন্নেরে টোগাইতে টোগাইতে আঁই হয়রান অই গেছি। হইলা মনে কইচ্ছি, ঘুমেত্থুন বুঝি উডেন’ন। স্বপনের ঘরে টোগাইলাম, আন্নে নাই। গেলাম হচ্চুমমুই, কেউ কয় দেয়’ন।
আবুল নারিকেল গাছের দিকে তাকিয়ে বলে, লেদা দুই বিড় হাড়ি লইচ। চোখ নামিয়ে বলে, বড্ডাভাই আইয়্যেন নাশতা ঠাণ্ডা অই যায়। শিউলি, লেদারেদি ডাবগুন আনাই লইচ। খান ফেরার জন্য মোচড় দিতেই শিউলি ঠুশ্-ঠাশ্ ডাব পড়ার শব্দ মিশ্রণে বলতে থাকে, ভাইজান গাছ ইগুন আঁর বাপের লাগাইন্যা।
শিউলির হি হি হাসির শব্দে একটা আঁ…আঁর কম্পন উঠে খানের হৃদপিণ্ডে। আবারও ভাবনায় পড়ে, কে তার বাবা? কে এই শিউলি? ডানে বাঁয়ে নারিকেল, সুপারি বাগান। কেউ না কেউ লাগিয়েছে, কেউ পরিচর্যা করেছে। নিজের ভাবনায় উপলব্ধি যোগ হয় তাঁর। বয়স ষাট পেরিয়েছে। একটি গাছের চারাও লাগান নি এ জীবনে। মানব জীবনের সাথে পত্র-পল্লবের সজীব বন্ধন কত নিবিড়! এ হাত, এ উর্বরমস্তিস্ক কী দিয়েছে! জীবন কতোগুলো লাল, নীল, সবুজ, ফিতার বন্ধনে হরফের জটিল সমীকরণে আবদ্ধ। জীবনের শেষ অধ্যায়ে মনে হচ্ছে কর্মফল শুধু ধু ধু হাহাকারময়। যেখানে একটু সবুজ নেই, ছায়া নেই, এক ঝলক বায়ু নেই, বাতাসে নেই ঢেউ।
তিন-চার ঘরের বউ-ঝিরা, নানান রকমের পায়েস, পিঠা-পুলি নিয়ে ভোররাত থেকে ব্যস্ত ছিল। খানের সামনে টেবিল ভর্তি নাশ্তা। আবুল তাড়া দেয় ভাইজান, বাড়ির বউ-ঝিরা মিলি কী কাণ্ড-কারখানা ঘটাইছে! আন্নের ইচ্ছামতন লই-থুই খান। নারিকেলের পিঠা একসময় খানের প্রিয় খাবার ছিল। ডাক্তারের বারণ- এখন ওসব দেখাও নিষেধ। জীবনটা ডায়বেটিসের খোরপোষে আবদ্ধ। খান জানেন, পর্দার আড়ালে হাফডজন চোখ নিশ্চয় অপেক্ষায়। চিম্টি কেটে একটু একটু করে মুখে তুলে নেন। চোখ আর মুখের ইশারায় তৃপ্তি জানান দেন। ওপাশ থেকে মেয়েদের ঢলা-ঢলি, খোঁচা মারা আর চাপা হাসির শব্দ হচ্ছে। পরিবেশিত পিঠার স্বাদ, কারুকাজের মন্তব্য শুনতে চায় ওরা।
শিউলির চড়াগলায় শব্দ উঠোন থেকে, ভাইজান, হেতিরা প্রতিযোগিতা কইত্তাছে। যেতারগা বেশি হোয়াদের, অবশ্য আন্নের বিবেচনায়, আবুল ভাই হুরস্কার দিব কইছে। খান এবার মুচ্কি হাসিটিকে প্রশস্ত করে দেন অজান্তে। ‘কোনটা রেখে কোনটার কথা বলবো? সবইতো মজার, আসলে তোমরা সবাই খুব ভাল বানিয়েছ, চমৎকার নক্শাও।’
ওপাশ থেকে হাততালির ভেতর কারও গলার আওয়াজ ভেসে এলো, ‘না-না কাকাজান। বেকেরগুন খুব ভালা অইতে হারে না, আন্নেরে নিরপেক্ষ অইতে অইবো। আঙ্গোরে খুশিকরনের লাই কইয়েন না। যিয়ান আসলেই হাঁচা হিয়ান রায় দেন।’
খান সরব হলেন তোমরা ক’জনে বানিয়েছ? উত্তর এলো, পাঁচজন। খান মানিব্যাগ বের করে পাঁচটা পাঁচশত টাকার নোট প্লেটে রাখলেন। আবুল খেপে গিয়ে মেয়েদের বকা-ঝকা করে। তোরা কি বড্ডাভাইরে লই ইয়ার্কি করস? যা-যা কইলাম।
ভেতর থেকে আওয়াজ এলো, কাক্কু এইডাতো প্রতিযোগিতা, হেতনেরে আমরা বিচারক মাইনছি। এই বিচারতো অইলোনা বেক গড় হড়তা অইলো। খান মেয়েটির কথায় চম্কে উঠলেন, তাইতো। ভালোকে ভালো বলার সৎসাহস এখানেও যোগাতে পারলেন না। কম্প্রোমাইজ, কম্প্রোমাইজ, জীবনভরতো তাই করলেন। ম্যানেজ করলেন, কারো বিরাগভাজন না হয়ে। লাল ফাইল, সবুজ ফাইলের বিভাজনটা কেন? প্রাইয়োরেটি, টপ প্রাইয়োরেটি, অমুকে ডিজায়ার করেন, অমুক তমুকের লোক। ব্যবহার করেছেন প্রতীকী শব্দ ‘জনস্বার্থে’। সেটি আবার কি এবং কেমন? আজ নিজেকে প্রশ্ন করছেন।
জবাব দিতে পারছেন না খান। বোর্ড মেমো, রেজুলেশন, জরুরি, অতি জরুরি এর পর কি ডিজিটাল জরুরি বা ডিজিটাল ইম্পর্টেন্ট হবে! এর অর্থ কি দাঁড়াবে! একটা নারিকেল গাছের উচ্চতা বাড়তে ষাট-সত্তর বছর দরকার। জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উচ্চতা কত? শত ফুট, আরো বেশি, আকাশ ছোঁয়া? ভিত্তিটা কোথায়? কিসের উপর ভর করে।
শিউলি এক জগ ভর্তি ডাবের পানি নিয়ে তরতরিয়ে হাজির। পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে, কুরানো ডাবের সর। একসময়ের খানের প্রিয় জিনিস। ডাবের পানিতে চুমুক দিতে দিতে খান স্মরণ করেন বাবাকে। বাড়ির আশেপাশে খালি জায়গায় তিনি নারিকেল সুপারির চারা লাগাতেন। চাকুরিজীবী বাবা কেমন জানি সময় বের করে গ্রামে আসতেন। প্রতিটি মুহূর্ত তার কাজ চাই, বসে থাকতে পারতেন না। খান শুনেছেন নারিকেল, তালগাছ শ’বছর ফল দেয়। পরপর দু’গ্লাস ডাবের পানি খেয়ে তৃপ্ত। আবুলকে তৃতীয় গ্লাস ফিরিয়ে দিলেন মিষ্টি হাসি দিয়ে। বললেন, যথেষ্ট হয়েছে আবুল।
দীর্ঘশ্বাসের সাথে সাথে খোদার প্রতি কৃতজ্ঞতায় চোখের কোণ ভিজে এলো। কি এক নিয়ামত খেয়েছেন গাছের চূড়া থেকে? মুহূর্তে সতর্ক খান, নিশ্চয় দশ-পনের জোড়া চোখ অন্দরমহল থেকে দেখছে। তার মত লোকের চোখের কোণের পানি কোনো না কোনো দুর্বলতার প্রতীকী হয়ে যায়।
হঠাৎ দূর থেকে মাইকে গানের সুর ভেসে এলো। বাড়ির ছেলেমেয়েদের মধ্যে হুটো-পুটি পড়ে যায়। বিরক্তি চিহ্ন আবুলের চোখে। চলমান গান কাচারির সামনে এসে থেমে যায়। তারপর ঠাশ্-ঠাশ্ তিনটে ঢালার শব্দ। বাড়ির ছেলে-মেয়েরা টিনের ভাঙ্গাচোরা, প্লাস্টিকের বোতল, জুতা, লোহার টুকরা যে যা পাচ্ছে নিয়ে ছুটছে। ‘আর কইয়েন না বড্ডাভাই, এই বদজাইত্যা আইসক্রিম ওলাগোলাই জুতা, বদনা কিচ্ছুু থোন যায় না। হেদিন একগারে দিছিলাম হিছাদি বাড়ি ক’দিন আর আইয়্যে’ন, আবার শুরু অইছে।’ খান ভাবছেন, গ্রামের ছোটবেলা সবারইতো এমন ছিল। গেল ষাট-সত্তর দশকে আইসক্রিম গ্রামে পাওয়া যেত না, তখন মিঠাই-মোয়া, খাস্তাবিস্কুট নিয়ে আসতো ফেরিওলা।
জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যায়, পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে দাঁত ব্রাশ করছে ড্রাইভার। দ্বিতীয়বার দেখেন খান। মনে হলো, নিশ্চিন্তে রাত পার করে এখন ন’টায় বিছানা ছেড়েছে। কোন ক্ষোভ নেই খানের। ও রিলাক্সমুডে থাকলেই ভাল। খান সকালে গাড়িটা কাচারির সামনে দেখে এসেছেন। না, কেউ আঁচড়ও কাটেনি। নিশ্চয়ই রাতভর বাবুল পাহারা দিয়েছে। এখন হয়তো ঘুমিয়ে আছে। নাশ্তা খেয়ে খান হাঁটি-হাঁটি পায়ে কাছারির সামনে দাঁড়ান। আবুল পেছন পেছন হাঁটছে। কাচারির ভেতর থেকে দুইজন আধাপাকা দাঁড়িওয়ালা পায়জামা পাঞ্জাবি পরা লোক বেরিয়ে এসে সালাম দেয়। আবুল পরিচয় করিয়ে দেয় বড্ডাভাই, আঙ্গো কাচারিতে থায়, একজন মাস্টর আরেকজন হুজুর। একজন বেয়াইন্যা হোলাহাইনরে আরবি হড়ায় অন্য জন-। আবুলের কথা শেষ হয় না। খান ওদের দিকে হাত বাড়িয়ে দেন, ওরা কাচু-মাচু হয়ে খাট হয়ে পড়ে। ওরা এতটা বিনয়ী হয়ে পড়ে, খান অবাক হন না। খান নিজের খোলস থেকে বেরিয়ে জিজ্ঞাসা করেন আপনারা ভালো আছেন তো?
এতক্ষণে ওরা একটু জড়তামুক্ত হয়, মৃদু হাসি বিনিময় করে হেসে বলেন জ্বি, জ্বি।
খানও হাসিতে ওদের সাথে যোগ দিয়ে বলেন, আমি জানি। আপনারা আমাদের বাড়িরও মুরুব্বি, শিক্ষক, আমি আপনাদের সম্মান করি।
পাশে দাঁড়ানো আবুল বড্ডাভাইয়ের সহজিকরণে আবিষ্ট হয়; উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে আঙ্গো বড়ির হোলাহাইনগো হেতনরা লেয়াহড়া, আদব-কায়দা, শাসন, মহব্বত বেক কিছু করেন, আমরা বেকে খুশি। আবুল জানিয়ে দেয়, ইনি খিলপাড়া স্কুলের অঙ্কের টিচার, অন্যজন মল্লিকা দিঘির পাড় মাদ্রাসার শিক্ষক। বহু বছর ধরি আঁঙ্গো বাড়িত আছেন, বাড়ির ছোড-ছোড হোলা-হাইনরে শিক্ষা দিতেছেন। বাড়ির আঠারো ঘরে হেতনগোরে খাওয়ানের ব্যবস্থা করা হয়। কাচারির ভেতর দু’টি চৌকি বিছানো। দেয়াল পাকা হলেও মেঝে কাঁচা।
‘বাড়ির এজমালি পুকুর লিজের টাকা দি কাচারি পাকা কইচ্ছি বড্ডাভাই। এমনেতো কেউ টেঁয়া দিতে চায় না। অবস্থাও কারো তেমন ভালা’ন।’
খানের দৃষ্টি জানালা গলিয়ে যায় পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে। কবরস্থানের শেষাংশে বাঁশঝাড়। ঝাড়ের বাঁশ বাতাসে কাঁপছে।
মনে পড়ে দু’বছর আগে আতর আলী গিয়েছিল ঢাকায় তাঁর বাসায়। সাথে তার ছেলে খোকন। কাচারি মেরামতের খরচের জন্য বাড়ির সবাই মিলে তাকে পাঠায়। খান অফিসে যেতে তৈরি হচ্ছেন। ওদের কথা শুনে ধম্কে বলেছিলেন, কিসের টাকা চাস? পুকুর লিজ দিয়েছিস্ জানিয়েছিস্ আমাকে? আমারওতো অংশ আছে- যা কোনো টাকা পাবি না। ওরা ফেরার জন্য মোচড় দিতেই খান বলে ওঠেন, আমার অংশের টাকা পাঠিয়ে দিবি।
আতর আলী ফিরে তাকায়, বড্ডাভাই, জাইনতাম- ইগিন কইবেন। আঁই আইতাম চাই’ন, বাড়ির বেকে মিলি জোর করি আন্নের কাছে হাডাইছে। আন্নে বোলে বড় মানুষ, দশের কামে টেঁয়া হইসা দিবেন।
চুপ, বেয়াদপ! বড্ডাভাই! কে তোর…? কথা শেষ না হতেই খানের স্ত্রীও রুম থেকে হাতঘড়ি পরতে পরতে বেরিয়ে আসেন।
‘যা, বের হ, বেয়াদপ কোথাকার!’
আতর আলী ঘুরে দাঁড়ায়। ‘আন্নের অংশের টেঁয়া নিবেন না? আন্নের বাপের দুইআনা হিস্যা, আন্নেরা ছয় ভাই-বইন, আন্নের অংশের তের’শ তেত্রিশ টাকা এই খামে রাখছি। লই আইছি আলাদা করি। এরুম কইরবেন জাইনতাম। এই লন, টেয়া বুঝি লই রশিদ দেন।’
খান প্রচণ্ডভাবে খেপে উঠেন, কত্তোবড় স্পর্ধা তোর? আমার কাছে রশিদ চাইছিস্? হাত তুলে এগিয়ে যেতেই আতর ঘাড় বাড়িয়ে দেয় মাইরবেন? মারেন… দারোয়ান ডাকবেন? খানের স্ত্রী ইন্টারকম তুলে দারোয়ান কে বকাঝকা করে।
‘না-না আঙ্গোরে ঢুকতে দেয়’ন দারোয়ান। গলা ধাক্কা দিতে আইছিল। কইলাম, আন্নেরে টেঁয়া দিতাম আইছি, আন্নের দেনা শোধ কইত্তে আইছি। টেঁয়া দেখাইছি হেতারে, হরে হেতে সোন্দর করি ফ্ল্যাট দেখাই দিছে আন্নের। ম্যাডাম, দারোয়ানের কোনো দোষ নাই। কইরে খোকন, চলি আয়। আইছিলামতো বাড়ির কামের লাই, দশের লাই।’
ওরা খামটা টেবিলে রেখে ফিরে যায়। স্তম্ভিত খান! দু’মিনিটে কি ঘটে গেল। একটা অস্বস্তিকর অবস্থা কিছুক্ষণ মনকে তাড়িত করে। তারও ক’বছর আগে প্রায় তেমনটি ঘটেছিল অফিসে।
পরদিন কর্পোরেশনের বোর্ড মিটিং। কতোগুলো ফাইল পাঠিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কম্পোজ করা পাতায়-পাতায় কালো হরফগুলো যেন পোকার মত কিলবিল করছে। চশমা পরিষ্কার করে আবার তাকান ফাইলে। নাহ্ পড়তে পারছেন না। মাথার ভিতর অস্বস্তিকর অবস্থা। আতর আলীর খোঁচা খোঁচা কালো দাড়িগুলো যেন চোখে বিঁধছে। আতর আলী খানের ছোটচাচার ছোটছেলে। টেনে টুনে ক্লাস টেনের ক্লাসে বসেছে। টেস্ট পরীক্ষার আগেই ভয়ে কক্ষচ্যুত হয়ে যায়। আধাকৃষক, আধাব্যবসায়ী বাবা কোনোভাবেই তাকে স্কুলে আর পাঠাতে পারলেন না। বিশ-পঁচিশ মাইল দূরে ফুফুর বাড়ি পালিয়ে যায় সে। কোনো রকম মারধর তাকে শায়েস্তা করতে পারেন নি। এখন হাটবারে বিভিন্ন হাটে তরকারি কেনা-বেচা করে। মেট্রিকে আকবরের রেজাল্ট খুব ভালো ছিল। তিনটি লেটারসহ ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছিলেন। তখন কোনো স্কুলে এক-দুইটা ছেলে ফার্স্ট ডিভিশন পেলে স্কুলের গৌরব বেড়ে যেত।
চৌমুহানি কলেজে ভর্তির সময় আতর আলীর বাবা আকবরের হাতে শ’টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিয়ে বললেন, আঙ্গো গোষ্ঠীর মইদ্দে তুই-ই হইলা শিক্ষিত। আরো বেশি লেয়াহড়া কইল্লে আঙ্গো বাড়ির নাম অইবো, ইজ্জত অইবো।
আকবর নোটটা মেলে ধরে বলেছিল, কাক্কু ভর্তি ফিস্তো তের টেঁয়া, এতো টেঁয়া লাগতো’ন। আব্বায় বিশ টেঁয়া দিছে। আতরের বাবা বলেছিলেন, চৌমুহানি কলেজ কত্তোদূর! থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, বই-খাতা, কলম, কত্তো খরচ! রাখি দেও বা-জি, কামে লাগবো। তখন আতর আলী প্রাইমারি স্কুলে যাওয়া আসা করছে। নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আল্লায় জানে ইগার কপালে কী আছে! লেয়া-হড়া এক্কাই কইত্তে চায় না।
খানের স্মৃতি তাকে কিছুটা বেহাল করে দেয়। আতর আলীর বাবা মারা যাওয়ার সময় আকবরকে দেখতে চেয়েছিলেন। লন্ডন থেকে এসে ছুটি কাটাচ্ছিলেন তখন ঢাকায় বসে। খবর পেয়েও যাননি। সে সেদিনটা ভারী বোঝা হয়ে এখনও তাড়া করে। খানের স্ত্রী অস্থীরতা দেখে বার বার জিজ্ঞেস করেছিল, খারাপ লাগছে? ডাক্তার ডাকবো? খান দু’টো ঘুমের অষুধ খেয়ে শুয়ে পড়েন।
পরদিন সকালে নাস্তা খেতে বসে টেবিলেই ফাইলগুলো নিয়ে বসেন। স্মৃতির হাল যেন উজান ঠেলে তাকে কাতর করে দিচ্ছে। জীবন জগতের ব্যস্ততা তাকে কখনো এতটা নিম্নমুখী করেনি। টেবিলে রাখা টাকার খামটা কাজের ছেলেকে সরিয়ে রাখতে বলেন। ছেলেটা খাম খুলতে গেলে রাগান্বিত হয়ে আবার বলেন; যা, তুই যা এখান থেকে।
খানের স্ত্রী রুম থেকে বেরিয়ে আসেন। আজ বিকেলে তোমার বোর্ড মিটিং। আমারও কাজ আছে ফিরতে দেরি হবে। আমাদের গাড়িটা নষ্ট, তোমার কর্পোরেশনকে বলো আরেকটা গাড়ি পাঠিয়ে দিতে। শোনো, ঐসব ছোট লোকগুলোর কথা ভেবে মাথা নষ্ট করো না। জরুরি ফাইল তোমার হাতে। ‘লাল পতাকা’ লাগানো দেখতেই পাচ্ছি। একদম মাথা থেকে ওসব মুছে ফেল।
একটা খোলসের ভেতর খানের পরিপাটি জীবন। এখন বুঝতে পারছেন জাগতিক প্রাপ্তি যত ব্যাপক হোক, আত্মচেতনার কাছে বিচ্যুতিগুলো সবসময় চেপে রাখা যায় না।
‘ভাইজান, চা খাইবেন, না কফি?’ চেনা শব্দ যেন অচেনার ধ্বনিতে বাজে। তাকিয়ে দেখেন শিউলি। কাচারির সামনে থেকে পায়ে পায়ে কখন যে স্বপনের ঘরের খোলা দরজা দিয়ে ঢুকেছেন খেয়াল করেন নি। শিউলির আহ্বানে যেন জানালার বাইরের কলাপাতার দোল। মনটা কিছুটা হালকা হয়ে আসে। চায়ের কথায় সম্মতি দিয়ে আবার তাকান বাইরে। জানালার পাশ ঘেঁষে দুটো নারিকেল গাছের কাণ্ড দেখা যাচ্ছে। তারপর কিছুটা জলাভূমি পেরিয়ে সরু পায়ে চলার রাস্তা। রাস্তার পাশেই সারি সারি কলাগাছ। কয়েকটা কলার ছড়া গাছগুলোকে ভারিক্কি করে রেখেছে।
পুরাতন কথা মনে এলো, সত্যিই যে ফলন দেয়, সে নত থাকে। এটাই বুঝি প্রকৃতির ধর্ম। কী দিয়েছেন জগতকে যার কল্যাণে নিজেকে ভাংতে পারছেন না। ঘরে বিদ্যুত নেই। শিউলি দরজা খুলে রেখেছে। কলাপাতা দোল খাচ্ছে বেশ দূরে, অথচ তারই পরশ যেন খানের গায়ে ছোপ্ ছোপ্ লাগছে। কলাপাতার বেষ্টনি পেরিয়ে বিস্তৃত এক সময়ের ধানক্ষেত আর নেই। পাশের বাড়িটি বেগদের। ওদেরই কোনো স্বজন মূল বাড়ি ছেড়ে আপন হালতে বাড়ি বানিয়েছে। কারো মা বাবার একটি স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রবাসী ছেলেদের কীর্তি।
জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়ান খান। এ ঘরে কারো বসবাস না থাকলেও শিউলি গ্রিলগুলো পর্যন্ত ধূলামুক্ত করে রেখেছে। খানের প্রসারিত হাত থেমে যায়। চায়ের কাপ হাতে পেছনে শিউলি। ওর কথা যেন প্রতিধ্বনিত হয়। বড্ডাভাই, ঘসি-মাজি বেক হরিষ্কার করি রাখছি। গ্রিলে হাত দিতে অসুবিধা নাই। থাই ফিটিংসের গ্লাস একদিকেই খোলা। গলা বাড়িয়ে আবার দেখেন বেগদের বাড়ি। সেই দু’টো তালগাছ। চল্লিশ বছরের পরিক্রমায় উঁচু হয়েছে, কিন্তু কারো রোষাণলে পড়েনি। নইলে এতদিনে চিরে কারো না কারো ঘরের আড়ায় স্থান হয়ে যেত।
ছোটবেলার কথা মনে জেগে যায়। ভোররাতে আশে পাশের তালতলায় তাল টোকানোর মুহূর্তগুলো। যে যার আগে ভোর রাতে উঠতে পারে রাতের ঝরা পাকা তাল তার মালিকানায় চলে যায়। খান আর লায়েছ একদলে, অন্যদিকে হাফেজ দাদার ছেলে ইউসুফ। দুর্দান্ত সাহসী সে। অন্ধকারে একা একা চলে যেত তালতলায়। লায়েছ বা খান একা কখনো বের হতো না। ওদের দুজনের কেউ আগে জাগলে চুপি চুপি বাঁশের বেড়ায় টোকা মেরে অন্যকে জাগাতো। ইউসুফ আগে টের পেলে প্রায় সব তালই তার দখলে যেত।
একদিনের ঘটনা মনে হতেই খান নিজে নিজেই হেসে ওঠেন। আড়চোখে দেখেন কেউ কাছাকাছি আছে কিনা! ভোরের আযানের আগেই বেগদের বাড়ির তালতলায় লায়েছ আর খান। এক গাছের তলাতে চারটা তাল পেল। গাছের পাতায় ঝুপ্ ঝুপ্ শব্দ তোলে আরেকটা তাল পড়লো সামনে। মনে মনে ভয়ও জেগে উঠলো। সেটা কুড়িয়ে পাশে রেখে অন্ধকারে ঝোপের ভিতর আরেকটা তাল নজরে এলো। আলো-ছায়ার এবারের তালটা বেশ বড়সড় মনে হলো। খান ত্রস্তহাতে তালটা তুলতে গিয়ে বিপাকে পড়ে। সেটা তাল নয় গোবরের তাল। দু’হাত লেপ্টে সেদিন করুণ অবস্থা।
লায়েছ এ নিয়ে জনে জনে কানা-কানি করে হাসি উস্কে দেয়। তিনদিন কথা বলেনি লায়েছের সাথে। ভোর বেলা নাশ্তার পরে দাদি আর মা’র সময় কাটে পাকা তালের রস চিপা-চিপিতে। তাল বেশি পেলে দুজনের কাজ বেড়ে যায়। আনন্দও ভর করে কাজের মধ্যে। জ্বাল দেয়া তালের রসে বিকেলে চিড়াভাজা মিশ্রণ। তালের নানান পিঠা, সারাক্ষণ ঘরদোর মিলিয়ে রসালো ধুঁয়ার ঘ্রাণ। এ ঘর ও ঘর পিঠা বিতরণের মধ্যে যোগ হতো বাড়তি আনন্দ। একদিন দাদি মাকে প্রশ্ন করেন, ‘আইচ্যা বউ, মাইনষ্যের গাছের তাল যে টোকাই আনে হিগুনে, গুনা অইতো’ন?’
মা তালের বিচি চিপ্তে চিপ্তে জবাব দেন, আল্লায় মাফ কইরবো। হারা জীবনইতো দেখলাম, তাল যেতে হায় হেতার। আর ফলফলাদির গাছতো মাইনষ্যে লাগায় আল্লাহর ওয়াস্তে। ঠিক কইছ্ত বলে দাদি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
সে দীর্ঘশ্বাসের রেশ আজ খানকে আচ্ছন্ন করে। মনে করতে চায় ষাট বছরের জীবনের ফলাফল শূন্যতায় ভরে আছে। মেমোরি বুমেরাং হয়ে এম্পটি সাইন দেখিয়ে দিচ্ছে স্ক্রিনে। নিজেকে মনে হচ্ছে সর্বহারা। বর্ণাঢ্য এ জীবনের সবটাই যেন সাদাকালো হয়ে যায় একটা বার্ঁনের চাপে।
[চলবে]

