চার সোয়া পাঁচ
বুড়োর দুগাল বেয়ে আরো ক’ফোঁটা রক্তলাল পানের পিক্ গড়িয়ে পড়ে। এবার পাঞ্জাবি ভেদ করে লাল ফোঁটা সাদা পায়জামায় ছড়িয়ে পড়ে।
পর্ব-৪
বাহির বাড়িতে মৃদু হাহাকার গুঞ্জন তোলে। কে যেন বলছে, কোনাই হাইবো হে কাইল্লা চিলম্চি? কেউ কি আইজ-কাইল ইগিন ব্যবহার করেনি কন? কোনাইগার কোন আদ্দি কাইল্ল্যা বুইড়া কি চাইলো না চাইলো ইগিনলই হারা বাড়ি টোকাটুকি। আইজ কাইল ক’জনে ইগিনের নাম জানে। হইত কাইল্ল্যার বুইড়ার হইত কাইল্লা চিলম্চি। বাইছালির আর জায়গা হায়’ন।
মেয়েটি পর্দার ফাঁকে আবার দৃষ্টি এগিয়ে আনে। হবু বর কনের চোখাচোখি হতেই তাদের হৃদয় নদীতে তরঙ্গ তোলে। হবু বর দাদার দিকে চোরা দৃষ্টি ফেলে। বুড়ো তো আগে থেকেই ওঁৎ পেতে ছিলো। বুড়োর কাছে ধরা খেয়ে সে তার দৃষ্টি গলিয়ে দেয় বাইরের রোদেলা উঠোনে। বুড়ো চোখ মেরে নাতিকে উদ্দীপ্ত করে তোলেন।
হঠাৎ আসন ছেড়ে হবু বর দু’লাফে দৌড়ে যায় উঠোনে। ভরা বালতির পানি উঠোনে ঢেলে খালি বাল্তি নিয়ে আসে। বালতির কড়ার শব্দে বুড়ো যেন জেগে ওঠেন। হবু বর বালতি তুলে ধরে দাদার সামনে। বুড়ো ঘড়াৎ করে একগাল পিক্ ঢেলে দেয় বালতিতে।
আড়চোখে নাতির দিকে তাকিয়ে ইশারায় তার গাল আহ্বান করেন। হবু বরের গাল টিপে ফোকলা দাঁতে হেসে বলেন, অইলোরে! আয় আয় তোরে একগা চুম্মা দি। বুড়ো ওর কান টেনে গালে একটা চুমো বসিয়ে দেন। বুড়োর দু’ঠোটে পানের লাল পিক ওর গালে ছাপা মারে। আসর এতক্ষণে হো হো করে হেসে ওঠে। হবু বর দাদার মাথার রুমাল দিয়ে গাল মুছে নেয়। বুড়ো ছেলের হাত থেকে পানির গ্লাস নিয়ে মুখ পরিষ্কার করে বালতিতে ঝাড়েন।
বাড়ির উত্তর ঘরে একটা উৎসবের হল্লা শোনা যায়। সে হল্লা চলমান হয়ে উঠোনের পশ্চিম পার্শ্বে লিচু তলায় জিগির তোলে। ‘চিলম্চি পাওয়া গেছে, এটাই এখনকার বড় খবর’। ছেলে-পিলেদের জটলার ফাঁকে দেখা যায় কেউ একজন ছাই দিয়ে চিলম্চি ঘষামাজা করছে। বুড়ো পূর্ণদৃষ্টি ফেলে সন্তোষ প্রকাশ করেন। দ্বিতীয়বার চশমার ফাঁকে নজরে পড়ে একটা লিচুগাছের নিচে চক্রাকার ছায়া। ছায়া ঘিরে মোজাইক করা একটা পাকা বেঞ্চ। বুড়োর খুব ইচ্ছা হলো বেঞ্চে বসে এমুহূর্তে টোস্ট ভিজিয়ে এককাপ চা খেতে। মনে মনে ভাবেন, হবে হবে। আত্মীয়তা হলে সুযোগ মিলবে।
বরপক্ষের লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বুড়ো বলেন, তোমরা-তোমরা বেয়াই বনি গেছ! আঙ্গোরে জিগাইছ? যেতে বিয়া কইরবো হেতার মতামত নিছ? তুঁই আঙ্গোরে কিল্লাই হইসা খরচ করি আইনছ? হেতে যদি কবুল না কয়, তই? বুইজ্জি, আঁই বুড়ার উপর চাপি দিবা, বুড়ো খিক্খিক্ করে হাসতে থাকেন।
অইলো, আঁই বুইজ্জি। চাইর চোখ মিলি গেছেরে। আঁই ঠিকই টের হাইছি। মাইয়া পক্ষও বুঝি লন আঁর নাতির কত বুদ্ধি! আঁই যন উডি যাই ইগিন হালাই’ন, আঁর নাতি মশ্করার লগে আঁরে শিক্ষা দিছে, আসরের ভারও হালকা অইছে। হাছা ন’নি?
ভেতর থেকে মেয়েলি কণ্ঠের শব্দ শোনা যায়। দেখতে অইবোতো নাতিগা কার!
বুড়ো সপ্রতিভ হাসির ভাঁজ মেলে ধরে অন্দরের উদ্দেশ্যে বলেন, আন্নে কি অইবেন জানিনা। তই কথাখান হাছা।
মেয়ের চাচা পানদানি এগিয়ে ধরে মেহমানদের উদ্দেশ্যে বলে, তো বুড়া মুরুব্বী, আমরা কি আগাইতাম হারি?
বুড়ো ক্ষেপে গিয়ে বলেন। আর বয়স শ’ ন অইলেও কাছাকাছি। আঁরে বুড়া কইবেন না। আঁর বড়ই না পছন্দের কথা। আরে, আঁই অন্তাই হুইরে ডুবদি গোসল করি। হাঁচওয়াক্ত নামাজ জামাতের লগে আদায় করি। শোকর আলহামদুল্লিাহ্। হোলা হাইনের লগে ক্রিকেট খেলি। বুড়ো কইবেন, যেতারা মনে মনে বুড়া অইছে, ঘরে বই কাৎ কুৎ করে, গেছিরে-গেছিরে কই চিল্লায়, হেতাগোরে।
এরইমধ্যে ছেলে বয়েসি দু’জন ধরাধরি করে পিতলের বিরাট এক চিলম্চি নিয়ে আসে। ঘষা মাজায় কিছুটা চক্চক্ করছে। আসরের সবাই বুড়োর অভিব্যক্তি লক্ষ্য করে। বুড়ো চিলম্চিটা ধরে হি হি করে হেসে ওঠে থু থু ফেলার ভান করে বলেন, সাইচ্ছে-লইযান। অন্দর মহলের পর্দার দিকে তাকিয়ে বলেন, বুঝি গেছি আন্নেগো ইগা বনেদি বাড়ি। কাঁসা, পিতলের বদনা, চিলম্চি, জগ, মগ, থাল ইগিন আগে বনেদি বাড়িত থাকতো। আন্নেগো গোষ্টির গোড়া এক্কাই শক্ত, হাড্ডি নরম’ন মাশা-আল্লাহ্। অনতো চৗকিদার বাড়িরে কয় মেজিস্ট্রেট বাড়ি, জাইল্লা বাড়ি অই গছে সৈয়দ বাড়ি। বাপ মা ছোডকালে যেগুনরে বোলাইতো চোদরী কই, হিগুন বড় অই বনি গেছে চৌধুরী সাব। নিজের বংশ পরিচয় গোপন করে যেতারা নিজে নিজে সৈয়দ, চৌধুরী, জমিদার বনি যায়, ছরাছর কবিরা গুনাহ। এ গুনাহ আল্লায় মাফ না কইল্লে উপায় নাই।
কনে পক্ষের একজন কথার সূত্র ধরে নিজেদের বংশের তারিফ করতে যায়। বুড়া থামিয়ে দেন। কইছিতো আন্নেরা বনেদি বংশের, হিয়ার হরে কথা থায়নি আর? আন্নে কি নাতি-পুত্র কি অইবেন? অবশ্য সম্পর্ক অইলেই হে কথা। ন’অইলে কন আংকেল নয়তো মাম্মা। আইজ কাইলতো বেকে বাপের হালা বনি খোশ মেজাজে আছে।
ও, আঁর হুরান কথাত হিরি যাই। আঁর শর্ত……..
বুড়ো আবার চোখ মুদে ঝিম ধরেন। আসর আবার আতঙ্কিত হয়। সবাই থ’বনে যায় মুহূর্তে। মেয়ের বাবা আবুল অন্দর থেকে ফিরে আসতে বাধা পায়। স্ত্রী আগলে ধরে ফিস্ ফিস্ করে বলে, হেতন কি কইতে চায়? আঁর মাইয়ার জীবন লই বাইছালি চইলতো’ন, কই দেন।
আবুলের বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। সেই কখন থেকে খাবার তৈরি। কথাটা ফাইনাল হলে আপ্যায়ন পর্বটা শেষ করতে পারে। পাতিলের খাবার বাটিতে, প্লেটে সাজানো। আবার গরম করা কম ঝক্কির কাজ নয়। মেহমানসহ বাড়ির লোক মিলে প্রায় শ’খানেক লোকের এ আয়োজন।
শর্ত একখান। বুড়ো মুখে খিলাল পুরে আবার উচ্চারণ করেন। আন্নেগো বংশের হেতন, বড় চেরাগ ঐ যে কার নাম কইছিলেন? কথার খেই হারিয়ে ফেলে আসরের সবাই। বুড়ো আবার সুতা ছাড়েন ঐ যে বড় কর্পোরেশনের বড় ডাইরেক্টরসাব না কী হুইনলাম…।
মেয়ের চাচা হেসে উঠে বলে, বুইজ্জি আংগো বড্ডাভাই?
‘আঁর নাতি কইলো যে, বেশ-কম অইলে হেতার চাকরি নট্ অই যাইবো। হেই হেডমঅলা মানুষগারে দেখতাম চাই আসরে। আগের কথা হিছে রইগেছে, বাউরে। আঁর হুতেতো আঙ্গো মতামত ছাড়াই বেয়াই কই হালাইছে। হাড্ডি আঙ্গোও নরম নয়। হুত য’খন কই হালাইছে হিয়ার লগে মিলি গেছে চাইরচোখ অন আঁর আপত্তি কিয়ের? আমরা আন্নেগো লগে আত্মীয়তা কইরুম ইনশা-আল্লাহ্। কি কও আঙ্গো মিয়ারা? যদি আন্নেগো, মানে মাইয়াপক্ষের আপত্তি না থাকে’। একটু ফিস্-ফাস্ গুঞ্জন ওঠে আসরে। ভেতরের আবহ যেন শীতলতায় স্বাদ পাচ্ছে। বুড়ো মাথা নেড়ে বলেন, কথাতো আরো আছে। আন্নেগো অন্দর মহলের এজাজত দরকার। মাইয়ারে জন্ম দিছে, হালি-হুলি বড় কইচ্ছে যেতারা, কোলে-হিডে করি মানুষ কইচ্ছে হেতাগো মত বাদ দেওন যাইতো’ন। আঁই হেই কাইল্ল্যা অইলে ও এই কাইল্লার মন-মেজাজ বুঝি। হালাই ছরাইন্যা কামে আঁই নাই। কিও কি কন আন্নেরা? আসরের সবাই একমতে সায় দেন। মুহূর্তের মধ্যে মেয়ের ছোট চাচার জবাব আসে, কইছে আলহামদুল্লিাহ্……
বুড়ো না খোশ। জবাব দেন, অইতো’ন। জবানের-আওয়াজ বেরকম। হেতনগো বেকের এজাজত এত তাড়াতাড়ি কেন্নে নিলেন?
একটু পরে মেয়ের জেঠি স্বল্প উচ্চারণে বলেন, আমরা বেকে এর্ত্ত! ইনশা-আল্লাহ্, আমনেরা আগে বাড়েন, আঙ্গো অমত নাই। বুড়োর আমিন বলার সাথে আসরের সবাই যোগ দেয়।
‘এবার আইয়েন আঁর শর্তের কথায়’! বুড়ো নিজেও অনেকক্ষণ ধরে ক্ষুধায় কাতর। ভেতর থেকে মুরগির রোস্ট আর চিংড়ির মালাইকারির ঘ্রাণ জিহ্বাকে রসালো করে তুলেছে। আসরের সবার নাকে সে ঘ্রাণ ক্ষুধার কাতরতা বড়িয়ে দিচ্ছে। একটা ঢোক গিলে বুড়া বলেন, আন্নেগো বড্ডাভাই বড়মাপের মানুষ। আমরাও হেতনেরে সম্মান করি। শর্ত অইলো বিয়ার আসরে হেতনেরে দেখতাম চাই। এবার আন্নেরা মিলি যান। তারিখ ঠিক-ঠাক করেন। আঁর কথা আর নাই, খাওন দিবেন- দেরি নাই, জলদি করেন।
অন্দর-আসর সবাই খুশিমনে তৎপর ভেতর থেকে পুরুষকণ্ঠে আওয়াজ আসে, কইরে তোরা রেডি অ। মেহমানগো হাত দোয়াই দে। কইরে আলম, চিলম্চি লই আয়, মেয়ের চাচা বাবুলের হাঁকে সবই ছুটাছুটি করে।
মেয়ের চাচা চিন্তিত। বড্ডাভাই আপন মানুষ। আপন জেঠাতো ভাই। কিন্তু হেতনেরে আননতো সহজ কাম’ন। বাড়িতে কত বিয়া-শাদী, অনুষ্ঠান অইলো। পারিবারিকভাবে হেতনরে আনন যায়’ন। ব্যস্ত মানুষ। অতি ব্যস্ত। একদিনেরলাই যদি হাতে পায়ে ধরি আনন যায়! ভাবনায় একটা খেই নিয়ে আবুল মেহমানদারিতে ব্যস্ত হয়। খাবার শেষে বাড়তি লোকজনের পানমুখো বিদায়।
খাবার পর্ব শেষে বিয়ের দেনমোহর, উসুল, গেট, অন্দর মহলের লেনদেনের সাথে সাথে তারিখ ও নির্ধারিত হয়।
শুক্রবার ২২ আশ্বিন। অনেকের আপত্তি শুক্রবার খিলপাড়া হাট। কেনা-বেচায় অনেকের ব্যস্ততা থাকবে। রফা হয় জুম্মায় নামাজের পরপরই খাবার পর্বটা শেষ করতে হবে। উভয় পক্ষের দেড়শজন মেহমান আসবে-যাবে।
বড্ডাভাইয়ের জন্যই পিছিয়ে তারিখটা নির্ধারণ করা হয়। বড্ডাভাইয়ের দাওয়াত গ্রহণ এবং উপস্থিতি বিষয়ে মেয়ের বাবা আবুলের সংশয় কাটেনি।
বড় মেয়ের বিয়েতে ঢাকায় গিয়ে হাতে-পায়ে ধরে রাজি করালেও শেষমেশ অজুহাত সৃষ্টি হয়। গ্রামের লোকের ধারণা ভাবীটাই মূল কারণ। ভাবীর আপত্তির কারণে বিগত দিনেও কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে তিনি হাজির থাকতে পারেননি। গ্রামের মানুষের সাথে মিশলে তার পদমর্যাদায় হানি হবে আশংকায়।
বড্ডাভাই নিজ গ্রাম থেকে তিন কিলোমিটার দূরে শ্বশুর বাড়িতে বছরে দু’তিনবার যাওয়া আসা করেন। ফরেন পোস্টিং না থাকলে তার চেয়েও বেশি। কিন্তু নিজ বাড়িমুখো হন না কখনো। এর মধ্যে আরাম ব্যারামের কি আছে, গ্রামের মানুষের বোধে ধরা দেয় না। তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন উচ্চশিক্ষিত সমাজে উপস্থাপনযোগ্য, একটা কারণ থাকতে পারে। আবার হতে পারে নিজ বাড়ি আসলে বাড়ির বা গ্রামের লোকজনের নানান চাহিদা মেটাতে অপরাগ; অথবা তার স্ত্রীর পছন্দ নয়। ছেলে মেয়েরাও মাঝে মধ্যে এলে নানা বাড়ি থেকে ফিরে যায়। আবুল খবর পেলে ও বাড়ি ডাব-নারিকেল নিয়ে যায়। ভাইয়ের সাথে দরকারি আলাপ করে নেয় এটাও ভাবীর নাপছন্দ, এতে খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি মনে করেন। স্ত্রী-সন্তান মাঝে মাধ্যে নিজ বাড়িতে ঘর নেই, দালান নেই বলেও খোঁটা মারে। মন কিছুটা আহত হলেও মেনে নেন।
স্ত্রীর ভাবনা ভিন্নতর, কে থাকবে অজপাড়াগাঁয়ে! একদিকে আর্সেনিক বিষ, কোথায় কোন গ্লাসে লুকিয়ে আছে! সর্তকতা হিসেবে চলার পথে এবং অবস্থানকালীন সময় হিসাব কষে দরকারি পানির বোতল সাথে রাখেন। বোতল-জাত পানিকে নিরাপত্তা কবজ মনে করেন। আবার বিদ্যুতের অদ্ভুত খেলাটাকে বিরক্তিকর ভাবেন। ফুড়ুত্-ফাড়ুত্ আসে যায়, এটা ওটা নষ্ট হয়। এদো-কাদায় পথ বিবেচনায় শীতকালটা না হয় পছন্দনীয়। এখানেও সমস্যা। বাড়ির অপরিছন্ন ঘরের কাঁথা, বালিশ, প্রস্রাবের দুর্গন্ধ, ঝোঁপ-ঝাড় আড়াল করে রাখে পথ। চলতে ফিরতে সারাক্ষণ একটা বিরক্তির বেড়াজালে ডুবে থাকতে হয়।
খাবার শেষে বুড়ো ইচ্ছে করেই চিলম্চিতে হাত ধুতে বেশ সময় নেন। চিলম্চি পানিতে পূর্ণ হলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে তোয়ালে দিয়ে হাত মুছেন। মেয়ের বাবার চিন্তাযুক্ত কপাল লক্ষ্য করে বলেন, কী মিয়াজি আন্নেগো বড্ডাভাইরে বিয়ার তারিখে উপস্থিত হাইয়্যুমতো? দরকার অইলে হেতনের লগে যোগাযোগ রাখি তারিখ ঠিক-ঠাক করেন।
মেয়ের বাবার জবাবের মধ্যে খানিকটা সংশয়। বুড়ো লক্ষ করে বলেন, রক্ত যদি আপন হয়, আইতোনোকা? আঁর বড় নাতিরে বিয়া করাইছি, হেতার ছোডভাই ইতালীতুন হাজির। ইয়ান অইলো মহব্বত। মহব্বতের লগে দায়িত্ব যোগ কইল্লে কি অয়? বেক কিছুই অয়। দিলের টান না থাকলে বেকগিন মিছা, ইয়ানই হাছাকথা! অজুহাত। শয়তানের কারসাজি। মনের মইধ্যে শয়তান লালন কইল্লে খালি ছেদা টোগাইবো। দুনিয়া আখিরাতে বেকগিনে টানা-টানি। মেয়ের চাচা বাবুল অভয় দেয় ‘আঁই বড্ডাভাইয়ের চাপদি ধইল্লে বেরাজি অইতো’ন।
বুড়ো গলা-খাঁকারি দিয়ে বলেন, ‘বাজি আন্নে ইগিন কীয়া কন? আন্নেরা যারে লই গর্ব করেন, সম্মান দেন, আমরাও মত দেই, হেতন সম্মানিত; এতে হেতার মতন ন’। আন্নেগো আপন মানুষ অইলে চাপি ধরন লাগবো কিল্লাই? সম্মান হাইতে অইলে সম্মান দিতে অয়। কিও কি কন আন্নেরা?
আসরে সকলের দৃষ্টি মেয়ের চাচা বাবুলের দিকে। বাবুল ঘাড় নেড়ে মৌন সায় দেয়। মেয়ে পক্ষের একজন মুরুব্বী মাথা নেড়ে বলেন, কথাতো হাছা। সম্মান এক তরফা অয় কেন্নে? হাইতে অইলে দিতে অয়। ইয়ান এক্কাই হাছা বাছাকথা।
আবুল সংশয় নিয়ে পেছনের কথা ভাবে। বড় মেয়ের বিয়েতে বড্ডাভাইজানরে দাওয়াত দিতে ঢাকায় গিয়েছিল। তিনদিন আগে। ভাইজান আমেরিকা থেকে ছুটিতে এসেছেন। আবুলের আকুতিতে ভাইজান একরকম রাজিই ছিলেন। ভাবি কোথাও যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়ায় ভাইজানের পাশে। স্বামীকে বলেন, যাবে বললেতো যাওয়া হয়না। কত কাজ বাকি পড়ে আছে। তাছাড়া কোথায় থাকবে? কি খাবে ভেবেছ? তোমার তো নানান কিছুতে অরুচি। পরের বিছানায় শোবে? হাই কমোড পাবে কোথায়? পরের ঘরে অন্যের ব্যবহৃত জিনিষ আমার ভাবতেও ঘেন্না হয়। নিজের একটা ঘর-দুয়ার থকলেও হতো?
বড্ডাভাই আবুলের সামনে স্ত্রীকে বললেন, তুমিও চলো। সকালে রওনা দেব, বিকেলে চলে আসবো। আবুল খুশি হয়ে ওঠে। কিন্তু তার খুশি স্তিমিত হতে সময় নেয় না। ভাবী বেরিয়ে যেতে যেতে বলে, তোমারও যাওয়ার দরকার নেই। এমনিতেই কত বাছা-বাছি। প্রেশার, ডায়বেটিস, শেষে ছোয়াঁছুঁয়ির কোন রোগ বাঁধিয়ে আসো। বড্ডাভাই আবুলকে যেতে যেতে বলেন, আচ্ছা দেখি আবুল, সুযোগ করতে পারলে যাব।
ভাই-ভাবী বেরিয়ে যায় আবুলকে এড়িয়ে। কাজের মেয়েটা চা বিস্কুট নিয়ে আসে ওর সামনে। আবুল ভাবে না খেয়েই ফিরে যাবে। আবার ভাবে বড্ডাভাই শুনলে বেয়াদবি ভাববে। চায়ের কাপে দু’চুমুক দিয়ে বের হয়। কাজের মেয়েটা কিছু বলতে চায় যেন। আবুল জানে ও হয়তো বলবে, গরীবের দৌড় বড়লোকের দুয়ার পর্যন্তই ভাইজান। হয়তো সামনে হাটু ভাঁজ করে-দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলবে, খামাকা পিছে না ঘুইরা নিজের কামে যান।
স্বপনের ঘরের সোফায় বসে ইতি-উতি ভাবছেন আকবর আলী খান। এ বিয়েতে দুই-ঢিল ছোঁড়ার ইচ্ছা জেগেছে মনে। নিজের অবস্থানে যাচাই করা আর সংসদে বসার চাপা ইচ্ছাকে জাগিয়ে তোলা। কেন্দ্রে মাঝারি গোছের দু’চার নেতার সাথে আলাপ হয়েছে। ওদের পরামর্শ গ্রামের ভাবসাব বুঝেন, গতি-প্রকৃতি দেখেন। টিকেটতো শহরে মিলবে না, ওখান থেকেই চেষ্টা করেন। মনের গোপন ইচ্ছাটা অন্য কাউকে তো নয়ই, স্ত্রীকেও বলেন নি।
এতোকালের বর্ণচোরা মানুষ হঠাৎ করে যাকে তাকে ধরে কৃত্রিম ভাঁজে কাঁদতেও পারবেন না। গেলবারতো দেখেছেন, ডাকসাইটে আমলা একজন ভিক্ষুককে ধরে মা-বাবা ডেকে দোয়া চেয়েছেন। আকবর আলী খানের পক্ষে শামুকের শক্ত খোলস ছেড়ে বেরিয়ে পড়াটা কত কঠিন এখানে এসে বুঝতে পারছেন। ভাব জানলে লোকজন ঘাড়ে চড়ে বসবে। ভালো বলবে আবার খারাপের চূড়াতে উঠার জন্যেও তৈরি থাকতে হবে। কম্প্রোমাইজ এর সাথে চাতুরতার মিশ্রণে এক নতুন অঙ্গণ তৈরী করতে হবে। উপরতলা থেকে নেমে যেতে হবে কালোমাটি আর কালো-ধূঁয়ায় জনারণ্যে।
জানালা দিয়ে মহিলাদের ফিস্ফিস্ শোনা যাচ্ছে। একজন বৃদ্ধার আকুতি, হেতনেরে তোরা কস্না আঁর নাতিগারে একগা চাকরি দিতে। টেঁয়া চাই না, হইসা চাই না হেতনের কাছে। হোলাগার একটা ব্যবস্থা কইল্লে আল্লার কাছে দোয়া কইরগুম। আরেক মহিলার কথা ভেসে আসে, আঙ্গোও বংশের মইদ্দে এতবড় হেডঅমলা মানুষ আছে জাইনতাম না। হেতন যদি আঙ্গো মুই হিরি না চায় তই কেন্নে অইবো।
বাইরের জটলা ক্রমেই বাড়ছে বোঝা যায়। আকবর আলী খান কি করবেন ভাবছেন; মোবাইলে কল আসে, স্ত্রীর ফোন। অবস্থান জেনে নির্দেশ দেন, ঢাকায় ফিরে এসো, নয়তো আমাদের বাড়ি যাও। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন না।
এরিমধ্যে আসরের নামাজের ওয়াক্ত শুরু হয়েছে। শিউলির গলার আওয়াজ শোনা যায়। বড্ডাভাইর তত্ত্বাবধান যেন তার হাতে। এরই তোরা ইয়ানো কি করস্? যার যার কামে যা? অন্তাই গেলি না? ভাইজান, অন নামাজ হড়বো, হিয়ার হরে বহুত কাম।
মহিলাদের গুঞ্জন ভেসে আসে। ‘হেতন কি তোর একলার মানুষনি? আঙ্গো কেউ না? আঙ্গোও আত্মীয়-স্বজন। খালি হরিচয় নাই। হরিচয় দিলে ঠিকই চিনবো। তুই যে খট্-খটাশ্ তোরে নি চিনে?
আকবর খানের বুকে একটা ধাক্কা লাগে। হয়তো ওদের কথার মধ্যে শিউলির পরিচয়টা বেরিয়ে আসবে। কে সে? নিশ্চয় নিকটতর কেউ না হলে এত অধিকার নিয়ে ভাইজান বলতো না, কিম্বা এটা ওটা চাহিদার বাহক হতো না।
কান পেতে রাখে খান। না, দূরে কোথাও শোনা যায় শিউলির কথা, ‘মাইজ্জা ভাই একখান নামাজের ভালা মসল্লা দেন। বড্ডাভাই নামাজ হড়বো’।
পাশের কোন মসজিদে আযানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। অজু করার জন্য বাথরুমে ঢুকেন খান।
গ্রামের আশে-পাশে অনেক মসজিদ হয়েছে বোঝা যায়। চতুর্দিক থেকে দু’এক মিনিট আগে পরে মসজিদের আহ্বান মুসুল্লিদের সজাগ করে দেয়। অথচ এ এলাকায় আগে মাত্র একটি মসজিদ ছিল। হেনার বাড়ির জামে মসজিদ নামে ছিল পরিচিতি। খানদের বাড়ি থেকে আধামাইল পশ্চিমে। মুরুব্বী শ্রেণির মুসল্লিরা ফজর নামাজের সময় হারিকেন জ্বালিয়ে বের হতেন। আজকাল টর্চলাইটের ছড়াছড়ি। তখন পুকুরপাড়, বাগান, তিনহাত প্রশস্ত রাস্তা দিয়ে চলতে সাপের ভয়ও ছিল। এখন বার-পনের ফুট পাকা রাস্তা। সময় বদলে দিয়েছে চলার প্রশস্ততা; কিন্তু সংকর্ঢু করেছে মানুষের মন। শহরের মত এখানেও দুই হাত জায়গা নিয়ে আইল ঠেলা-ঠেলি। কারো গাছের ডাল কাটা-কাটি নিয়ে নালিশ মামলা। গ্রামে কম আসা-যাওয়া হলেও খোঁজ খবর রাখেন। দলীয়করণ, দলবাজি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রতিশোধপরায়ণ করে তুলেছে মানুষকে। মাঝে মধ্যে মন বিক্ষিপ্ত হলে চুপস্ েযান। ভাবেন শহরেই ভালো। কে কার খোঁজ খবর রাখে! যার-যার মত তার তার পথ।
নামাজ শেষে স্টিলের আলমিরায় সাঁটানো আয়নায় নিজেকে দেখেন। বাহিরের আলো কিছুটা স্তিমিত হলে হঠাৎ বিদ্যুতের আবির্ভাব। আয়নার সামনে চুল আঁচড়াতে গিয়ে জমিয়ে দেখেন নিজের চেহারা। কপালের তিনটে ভাঁজ এতদিন চোখে পড়েনি। গলায় দুটো রগ ভেসে উঠেছে। যেন, টান-টান উত্তেজনা। মাথাটাকে টেনে রেখেছে রশির বাঁধন, যাতে পেছনে না হেলে যায়। চশ্মা পরিষ্কার করে আবার তাকান নিজের দিকে। কাঁচা-পাকা দাড়ি ইদানিং দ্রুত লম্বা হয়ে যাচ্ছে; বুঝতে পারছেন দিন কত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছে। কানের দুপাশের চুল সম্পূর্ণ পাকা। ক্লিস্ট হাসি ঠোঁটের কোণায়। এটা নাকি ইন্টেলেক্চুয়েলম্যান সাইন। মনে প্রশ্ন উঁকি মারে, সত্যি কী আমি সে গ্রুপে পড়েছি, না বুড়ো হয়ে গেছি! আয়নার পিছনের ছায়া ধরে তাকান, শিউলি পান চিবুতে চিবুতে হাসছে।
ভাইজান, পাশের রুমে আন্নে এককানা কাইত অন, আরাম করেন। আঁই নতুন চাদর বিছাই দিছি। অন কি চা খাইবেন, না কফি? আবুল ভাই আন্নেরলাই কফির ডিব্বা আইনছে। আঁই সোন্দর করি কফিও বানাইতাম হারি। শিউলি ফিরে যায়।
খান ফিরে তাকান, আবারও প্রশ্ন মনে কে এই মেয়েটি? কি সম্পর্কীয়? মেয়েটি সপ্রতিভ হলেও কপালের ভাঁজে একটা দুঃখবোধ যেন স্থায়ী রেখা তুলেছে। অপুষ্টিতে চোখ কোঠরাগত। এতক্ষণ চোখের কোণে খান যা ভেবেছিলেন তা কাজল নয়। পরনের কাপড়টাও তেমন দামি মনে হয় না, তবে পরিছন্ন। বউ-মেয়েরা কোনো অনুষ্ঠানে দামি কাপড় পরে আসে, ও তেমন নয়। ওর দেহের দীনতা কাপড়ের ভাঁজে মিশে আছে।
শিউলি ব্যস্ত হয়ে ফিরে আসে। হাতে একটা ব্যাগ। লক্ষ্য করে, ‘আকবর আলী খান’ লেখা তামার প্লেট ব্যাগের মাঝখানে সেঁটে আছে। একটা কৃতিত্বের দাবি নিয়ে শিউলি বলে, ‘বড্ডাভাই ডেরাইভাররে কফি দিছি। আন্নের ব্যাগ চাইছি, দিতে চায়’ন। কইছি আন্নে কাপড় বদলাইবেন। হরে আন্নের লগে ফোন করি হিসাব মিলাইছে। আঁরে চিনতে হারে’ন, আঁই কন?’ বলে খিক্ খিক্ করে চাপা হাসি সেরে নেয়। খান কান খাড়া করে, ওকি এখন নিজের পরিচয় মেলে ধরবে? না, ফিরে যায় শিউলি। হতাশ খান ব্যাগ হাতে পাশের রুমে ঢুকে।
বাবুল ছুটে আসে আবুলের উঠোন থেকে। গলা চড়িয়ে বলে, শিউলি, শিউলি, বড্ডাভাইরে ক’হেতন য্যান অন কাপড় না বদলায়। জামাইর পক্ষের লোকজন এ ঘরে বই হেতনের লগে চা খাইবো। সাহেবী ড্রেস বদলাইলে হেতনরে যদি কম বিবেচনা করে! শিউলি ছুটে এসে একই কথা জানান দেয় খানকে।
খান সবে মাত্র এ্যাটাচি খুলে পায়জামা পাঞ্জাবী বের করেছেন। টাইয়ের নটটা খুলতে গিয়ে আর খোলেননি। উত্তরের ঘরের আলতার মা এদিকে এগিয়ে আসে। শিউলি তখনো স্বপনের ঘরের সামনে দাঁড়ানো। আলতার মা জিজ্ঞাসা করে, হেতন কি রাইত আঙ্গো বাড়িত থাকবো না চলি যাইবো? হেতনের ড্রাইবার কইলো ম্যাডাম নাকি কইছে চলি যাইবো হোর বাইত। যদি চলি যায় আঁর বিএ পাস হোলাগার চাকরির কথা কইছ্যুম কোন সময়? তুই হেতনরে বুঝাই ক, আঙ্গো দুই চাইর কথা হুইনতো।
পশ্চিমের বাড়ির কুতুবের বোন অনুনয় করে বলে শিউলিরে বইন, আঁর মাইয়াগার, জানসতো বিয়া অয়না টেঁয়ারলাই।
শিউলি চটে যায়, হেতনে ইয়ারলাই বাড়িত আইয়ে না। এককানা আরাম কইরবো, দুই মিনিট শান্তিতে থাকবো তোগোলাই হারে না। হেতনে কি ইয়ানো চাকরি লই আইছে নাকি দান খয়রাত কইত্তে আইছে? বেশি অইলে হেতনের ঢাকার বাড়িত যা নইলে অফিসে যা। ইয়ানো বিরক্ত করিস না।
কদমের বাপ পাশেই সুপারি বাগানে জঙ্গল সাফ করছে। গলা বাড়িয়ে বলে, ঢাকাত বাড়িত যাইবো দারোয়ানের ঠেডা খাইতো না অফিসে? চামচারা কইবো হেতন দরকারি কামে ব্যস্ত। আঁই যাইছ্যুম হাজার টেঁয়া খরচ করি হেতনের মাইনষে কইবো কামে ব্যস্ত, আঁরতো বেক শেষ, হিরি আইয়ো আবার। আঁর এক’শ নাইল বেচা টেঁয়া শেষ। উপকার কইত্তে চাইলে হিয়ান আর ইয়ান কি? আঙ্গোঁরে কথা কইতে দে, চাই হেতনকি আসলেই আঙ্গো আপন মানুষ? কই দেখলামনাতো এ জীবনে কারো দুই-চাইর হইসার উপকার কইত্তে।
ও ঘর থেকে বাবুল ছুটে আসে। জটলা দেখে বলে, এরি তোরা অন হরি যা। জামাইর বাপ-চাচারা এম্মুই আইবো অন। বাড়ির ইজ্জত নষ্ট করিস না। এত হাহাকার কিয়ের? হেতন আইজ থাকবো, বেকের কথা হুইনবো। হেতন না হুইনলে আমরা কোনাই যাইছ্যুম। আল্লারস্তে রাস্তা হরিষ্কার করিদে। মেহমান বিদায় দে, তই আমরা বইয়ু্যম।
এরইমধ্যে আবুল আট-দশজন মেহমান নিয়ে স্বপনের ঘরে আসে। সোফায় বসা খান দাঁড়িয়ে সবাইকে আমন্ত্রণ জানান। মেহমানদের প্রতি বড্ডাভাইর প্রীতি ভাব দেখে আবুলের ভেতরটা খুশিতে ভরে যায়। আগত সকলে সমস্বরে সালাম বিনিময় করে। ছেলের দাদাকে সবাই এগিয়ে দেয়।
বড্ডাভাই সকলের সাথে মোসাফা করে নিজের বিনয় অবস্থান তুলে ধরেন। ছেলের দাদাকে পুনরায় সালাম দিয়ে হাত টেনে নিয়ে বসিয়ে দেন। বুড়ো লাঠি ঠেলে ধরে সামনে ঝুঁকে খানের মুখের দিকে তাকিয়ে নাটকীয় ভঙ্গি নিয়ে বলেন, আন্নে তাহইলে আলী আকবর খাঁ? আবুল একটু এগিয়ে এসে বলে, মিয়াসাব বড্ডাভাই-খান, খাঁ’ন। বুড়ো একটু ঝিম্ মেরে চোখ বন্ধ রেখে বলেন, আন্নেগো বেপারী বাড়ি। খাঁ গো বাড়ি আন্নেগো হইছমে। হেতন যদি খান অয় তইতো আন্নেগো বাড়ির কেউ না। আবুল কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলে, আসলে বাড়ি ইগাই হেতনের, আঙ্গো বাপ দাদাগো। আঙ্গো বেকের হিজ্জা একজন। হেতনের নামের হরের খান পদবি’ন, নামেরই অংশ ধরি লন।
বুড়ো ঘাড় না তুলেই বলেন, ধরা যায় না যায় হেতনের ব্যাপার, আঙ্গো’ন।
কি কন খান সাব?
আকবর আলী খান ভেতরে ভেতরে কিছুটা বিব্রত হলেও চেহারায় প্রকাশ ঘটেনি। যেমন টিভি ক্যামেরার সামনে লাইভ অনুষ্ঠানে ভেতরের কম্পন ছাপিয়ে কখনো পর্দায় প্রকাশ ঘটান নি। অনুষ্ঠান শেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে টাইয়ের নটটা ঢিলা করেছেন, আর এক গ্লাস জল চেয়েছেন।
বুড়ো কিছুটা স্তিমিত মুহূর্ত সামলে নিয়ে খানের হাত টেনে নিয়ে দন্তহীন মুখে হা হা করে হেসে উঠেন। একজনকে বললেন, এরি তোরা ছবি তোল, আঁই খান সাহেবের লগে বইছি। একটু দমে খানের দিকে তাকিয়ে বলেন, মিয়াজি আন্নের অনুমতি লাগেতো। খান ঘাড় নাড়ালে কয়েকটি ছেলে মোবাইলে অপশন দিয়ে ছবি তুলে নেয়।
[চলবে]

