চার সোয়া পাঁচ
ভাইজান শরীয়তপুর কোন ডিস্ট্রিকের আন্ডারে; শব্দটা বিভাজিত হয়ে কানে বাজলো খানের। না ফিরেই খান বললেন, শরীয়তপুর একটা জেলা। আগের ফরিদপুর ভাগ হয়ে……।
পর্ব-৩
ও বুইজ্জি। বাহিরে হাঁক শোনা গেল, কইরে শিউলি খাতি আয়।
খানের কাপের ছোঁয়াটা যেন নীল হয়ে যায়। ঘড়িতে চারটা বেজে গেছে। মেয়েটি খায়নি এখনো। হাসিমুখে এটা ওটা করছে। খানের দিকে বাড়তি নজর দিচ্ছে। অথচ, নিজের প্রতি উদাসীন। আবারও ভাবনা এলো খানের কে এই মেয়েটি! এতটা কষ্টসহিঞ্চু নারী। খানের কোন স্বজন? নাকি কোন ধান্দায় ঘুরছে। খানের মন জয় করার কোন চাল নয়তো? ও ঘরে থাকতে কতজনইতো নানান সমস্যার কথা বলে সাহয্য চাইলো। কেউ অসুস্থ, কারো ঘরের টিন দরকার, কারো চাকুরি প্রয়োজন।
আবুল সবাইকে ধমকে দেয়, হারামজাদীরা হরি যা। তোগো অন এই অইছে, হেই অইছে। এতোদিন চলে’ন তোগো? বড্ডাভাই আইছে মাত্র। তোগো জ্বালায়তো হেতন ঠিকমতো থাকতো হাইত্তো’ন। তোরা কি জানস্ হেতনের মর্তবা? কত অনুরোধ করি হেতনেরে আইনছি। আঁরে-তোরে গনেনি মাইনসে? যেতে জনমে দেয়’ন, হেতেও একনামে চিনে। তিন গেরামে খবর হই গেছে হেতন যে আইছে। আঁর মাইয়ার বিয়া ভূঁইয়া বাড়ির বড় ভূঁইয়ার নাতির লগে এন্নে এন্নে ঠিক অইছে নি? যেই হুইনছে হেতন আঙ্গো আপন জেঠাতো ভাই। হোলার চাচাতো ভাই মোজাম্মেল উঠি কয়, হেতনতো আঙ্গো বড় স্যার, ডাইরেক্টর স্যার। হেতনেরে একবার হরিচয় দি চেহারা দেখাইতে হাইল্লে আঁর প্রমোশন, ভালা পোস্টিং কে ঠেকায়? আর হেই মোতালেবের বড় চাকরিরলাই আমরা কতো সম্মান করি! কত ইজ্জত হেতের হেই গেরামে। হাছানি? বলে, ছেলের বাবা কথা আর বাড়ায়নি। মোতালেব চাচার কানে কানে বলে, কাক্কু আন্নে হেতাগো কাছে কিছু চাইছেননি কোন? মানে সোনা-দানা, টাকা-পয়সা? আমতা আমতা করে ছেলের বাবা।
মোতালেব সাবধান করে দেয়। আঁরে আইনছেন সমাজ উঁচা করার লাই। হেতনের কানে ইগিন গেলে, জেলেও যাইবেন চাকুরিও আঁর থাকতো’ন। হেতন এককানা রেনি চাইলে দেখবেন আঙ্গো চাচাতো ভাই কোনাই উডি যাইবো! ছেলের বাবা এতোক্ষণ ফিস্ ফিস্ করছিল। মোতালেব শেষ বাক্যটা একটু জোরেই উচ্চারণ করে। সেই কথার রেশ ধরে ছেলের বাবা হালিম ভূঁইয়া হাসিমুখে মেয়ের বাবার উদ্দেশে বলে, হাছানি বেয়াই? নিজেকে শুধরে নিয়ে বলেন, বিয়া ঠিক্-ঠাক্ না অইতে বেয়াই কই হালাইলাম। মানে কইছি, মনে কিছু করেন-ন’তো? চেয়ারে বসা বাবার দিকে চোখ পড়তেই ঘাবড়ে যায় হালিম ভূঁইয়া। এতোক্ষণ ভাবের মধ্যেই ছিলেন। নিজ পিতার অনুমতি ছাড়া এ সম্বোধন তাকে বিব্রত করে ফেলেছে। বাবা মোচড় দিলেই সব শেষ। অথচ আত্মীয়তা করার শতভাগ ইচ্ছা তার; এমনকি ছেলের মতামত না জেনেই।
হালিম ভূঁইয়ার ক্লিষ্টহাসি বাবার দিকে স্থির। কাঁচুমাচু হয়ে অনুমতি চায় আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়েকে দেখার।
বড় ভূঁইয়া বড় একটা কাঠের চেয়ারে গম্ভীর হয়ে বসে আছেন। মাথায় রঙিন রুমাল প্যাঁচানো। রুমালের একটা কোণ বাম কান হয়ে গলা অবধি ঝুলছে। প্রায় শ’বছর বয়েসি বড় ভূঁইয়া আসরে নিজ ছেলের বাড়াবাড়িতে মনে গোস্বা পয়দা করে নাক ফুলিয়ে রয়েছেন। বেশ কিছু সময় পার হয়। বুড়ো চোখ মুদে আছেন। আসরের সবার দৃষ্টি বড় ভূঁইয়ার চোখের দিকে। হালিম ভূঁইয়া মোতালেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মোতালেব একটু থেমে থেমে হেসে বলে, দাদা, দাদা আন্নে অনুমতি দিলে আমরা…। বড় ভূঁইয়া মাথা ঝাঁকিয়ে বলেন, মাইয়া চাইবা? চাও! কই’বা তোঁর কাম আছে জরুলী। ইমপটেন্ট্ ব্যক্তি, বুইজ্জি। আইচ্যা, বোলাও।
ইশারা পেয়ে আবুল লাল ওড়নায় ঘোমটা পরিয়ে শাড়ি পরা আমেনাকে হাজির করে। বড় ভূঁইয়ার সামনে একটা প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা হয়। মেয়েকে চেয়ারে বসিয়ে মেয়ের বড় বোন ঘোমটা নামিয়ে দেয়। বড় ভূঁইয়া চোখ খুলে বলেন, ইয়ানো কিল্লাই? আঁই যে কাছে কম দেখি জাননা? চালাকি আঁর লগে? মেয়ের বাবা আবুল অপ্রস্তুত। মোতালেব চেয়ারটা সরিয়ে মাঝ বরাবর মেয়েকে বসিয়ে দেয়। বুড়ো চশমার ফাঁকে তাকিয়ে বলেন, হেতনের মুখ কোনাই আঁইতো দেখি না। মোতালেব হেসে উঠে বলে, দাদা আন্নে হিছনদি চান। আন্নেরতো চাইর চোখ। বুড়ো বলেন, দুইচোখ আন্ধা, দুইচোখ বান্ধা। দেখ্রে তোরাই দেখ। আঁই সময়মতো চাই লইয়্যুম।
বুড়ো তাকিয়ে আছেন হবু বরের দিকে। মোতালেব মেয়ের হাতে কাঁটা চামচে একটা মিষ্টি গেঁথে বুড়োকে খাইয়ে দিতে বলে। মেয়ের হাত ধরে সাহায্য করে তার বড় বোন রোকেয়া। বুড়োর দন্তহীন মুখে ইয়া বড় হা-তে পুরে দেয় বড় রসগোল্লা। বুড়ো মুখ চেপে ধরতেই রসগোল্লার রস পিচ্ করে বেরিয়ে পড়ে মেয়ের আধ বোঁজা চোখ খুলে যায়।
বুড়োর হা হা হাসিতে সবাই মেতে ওঠে। মোতালেবের ইশারায় মেয়েকে নিয়ে অন্দরে চলে যায় তার বড়বোন। বরপক্ষের ফিস্-ফাসের মধ্যে কনে পছন্দের আভাষ তৈরি হয়। বুড়োর চোখ বন্ধ। হাতের লাঠি মাটিতে ঠোক্কর মেরে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। গলা ঝেড়ে উচ্চারণ করেন, আঁর একখান শর্ত। পানদানী হাতে মেয়ের বাবা আবুল দাঁড়িয়ে। শর্তের কথা শুনে তার চেহারা পানস্ েহয়ে যায়। দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকান ছেলের বাবার দিকে। সেখানেও শংকিত-সতর্ক অবয়ব।
বুড়ো চোখ মুদে আছেন। কারো মুখে রা নেই। অনেকের চোখের মণি ঘুরছে, কিন্তু মাথা নড়ছে না।
কার্তিকের শেষ। এখনও দিনের গরম থামেনি। সিলিং ফ্যান ঘুরছে খট্ খট্ শব্দে। ফ্যানের বাতাস হঠাৎ যেন লু হাওয়া বইয়ে দিচ্ছে। মেয়ের বাবা, ছেলের বাবা দুজনেই ঘামছেন। উঠানের কোণায় লিচু গাছটা এতক্ষণ বাতাসে দুলছিল এখন যেন স্থিরতা লালন করছে। আসরের আলতো ছোঁয়ার পরিস্থিতি ক্রমেই যেন জমে কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বুড়োর শর্ত না আবার এতদিনের অগ্রসরমান সম্পর্ক চুরমার করে দেয়। আমেনার মা ঝুুলেপড়া পর্দার ফাঁক দিয়ে পরিস্থিতির বাঁক কোন দিকে হেলে অপেক্ষা করছেন। তার মুখের আধবোঁজা হা-টা স্থির হয়ে আছে। ছেলের বাবার দৃষ্টি তার পিতার আঁকে যাওয়া ঠোঁটে। কখন ছুটে কোন দিকে যায় তারই অপেক্ষায়।
মেয়ের বাবার শংকিত দৃষ্টি কৃপা প্রার্থনার ভঙ্গিমায় কাতর। বুড়ো কিছুই বলছেন না। এরইমধ্যে সামনে রাখা ছেঁচা পান দুবার তুলে মুখে দিয়েছেন। হবু বরের মাথা ক্রমেই নিচুতে যাচ্ছে। দাদার মুখের উচ্চারণ ত্রুটি তার জানা। দন্তহীন খিঁচে যাওয়া মুখায়ব থেকে কোন জাতীয় শব্দ নির্গত হয় তারই অপেক্ষায় অধিকতর সচেতন। এ মুহূর্তে তার বিরক্তির কারণ খট্ খট্ েবৈদ্যুতিক পাখাটা। তালগাছের আড়ার উপর ঝোলানো। যেন পুরো ঘরটায় কম্পন তুলেছে। বিদ্যুৎ চলে যাওয়াটা তার কাম্য। গরমের অস্থিরতা থেকে পীড়াদায়ক এ অপেক্ষা। এরপর দাদার মুখের নির্গত বাক্যের অর্থ না বুঝলে বিব্রতকর অবস্থা তৈরি হতে পারে। দাদার শর্ত যদি সাপেক্ষে হয় তবে সবকিছুই ফাইনাল। বুড়োর হুম্কি সবকিছুতেই। তিলে তিলে সম্পদ গড়েছেন। বাবার রেখে যাওয়া সম্পদকে নিজ বুদ্ধিগুণে কয়েকগুণ বাড়িয়েছেন। বুড়োর কথার অন্যথা হলে এ সম্পদের সীমানা খটুটি নড়বড়ে হয়ে যাবে। বাপ-চাচারা যে সম্পদের উপর ছড়ি ঘুরাচ্ছেন বুড়োর এক কথায় বেহাত হয়ে যেতে পারে।
বুড়ো প্রায়ই বলেন, আঁই মরণের হর তোরা আঁর সম্পদ লই কুডা-কুডি কইরবি। মামলা-শালিস কইরবি। তোগো হাহাকার বাড়বো। আর শখের লাগানো ফল গাছগুন কাডি বেচি হালাইবি। মামলা কইরবি, মোকদ্দমা কইরবি একজন আরেজনের বিরুদ্ধে। কি দি কইরবি মামলা? আঁর জমি বেচা টেঁয়াদি। বেগগিন আঁই বুঝি। কইবি, আঁর সম্পদের কারণে তোগো জীবন লতা-হাতা অই গেছে। আঁর কবরের কাছে যাই দোয়া’ন করি গজব দিবি। তোগো বেক কামে শয়তানি। কি গেরামে কি শহরে, হোলাহাইন-বুড়াহাইন বেকগুনের কবজায় মোবাইল।
ভালা কথা, ফোন করি জরুলি কথা কই শেষ করি হালা। না, দিন রাইত কাটুস্-কুটুস্ ইন্দুরের লাইন আচরণ। শয়তান হগল। আন্দারের মইদ্যে তোগো হলাহলি খেলা। টেঁয়াতো বেকগুন আঁর।
খোদা যন জিজ্ঞাইবো, তোর টেঁয়া কেমনে খরচ কইচ্ছস্? কি জবাব দিউম আঁই? আঁর রক্ত তোগো শইল্যে। যদি খোদা কয়, তোর রক্তের মধ্যে এতো শয়তানি কিল্লাই? আঁই কি জবাব দিউম? হায় হায়রে হেদিন আঁই কি জবাব দিউম আল্লা-তালার কাছে? আঁর তো জবাব নাইরে। দিতান্ন তোগোরে আঁর ধন-সম্পদ। আঁর কষ্টের জমি-জিরাত বেগগিন অইবো শয়তানের হেফাজতখানা। খোদা আঁরে হালাইবো দোযগে। সত্তুর হাত লম্বা গুর্জুুদি আঁরে হিলাইবো। বাউরে বাউ বড় কষ্টের হিলানী। আঁর মরণের হর তোরা হিরিও চাইতি’ন। আঁর কবরের কাছে যাই কতি’ন আছালামু আলাইকুম ইয়া আহ্লাল কুবুর। দিতিনো একগা ছালাম। তোগো হেই শিক্ষা নাই, আদব-লেহাজ নাই। আঁইও ঠিক কইচ্ছি ধন-সম্পদ, জমি-জিরাত যা আছে দি দিউম এতিমখানাত। হোলাহাইন হাফেজ অইবো, দোয়া শিখবো আল্লায় যদি আঁরে হেতাগো উছিলায় মাফ করি দেন।
নিজের হাঁচ হোলার একগারেও হাফেজ, ইমাম বানাইতে হাইল্লাম না। কইলাম, নাতি-নাতিন কোনগারে মাদ্রাসায় দে। হুইনলো না আঁর কথা। তোগো কথাও চিন্তা করলি না। কবরের কিনারে খাড়া অইন্না একগা হোলাহাইনও বানাইতে হাইল্লি না। ইংরাজি শিখবি, হাফ প্যান্ট হইরবি। প্যান্টের উপরে-নিচে পকেট আর পকেট। হাঁটুদি, হোন্দেদি জালের লাইন ছিঁড়া। বেককামে তোগো শয়তানি। বুইজ্জি, আঁর চিন্তা আঁরে কইত্তে অইবো। খোদা আরে মাফ করি দাও। হায় আফচোচ।
বুড়ার গতিবিধি চাল-চলন নিয়ে সবাই শংকিত। পারত পক্ষে কেউ খেপাতে চায় না বুড়াকে। বুড়োর খেদমত নিয়ে বউ-ঝিরা তৎপর। বুড়ো চোখ বন্ধ করে ঝিম ধরে আছে। বিশ-পঁচিশটা জোড়া চোখ তার দিকে তীরের দৃষ্টিতে অপেক্ষমান। মেয়ের বাবা সে কখন থেকে পানদানি হাতে অনড়। যেন নিশ্বাস নিতেও ভুলে গেছেন। ছেলের বাবা মনে মনে “লা হাওলা অলা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিউল আজিম” পড়ছেন।
অন্দরের পরিস্থিতি ভয়াবহ। কোনো শব্দ নেই, কেউ কেউ বাচ্চাদের দূরে সরিয়ে রেখেছেন। এতক্ষণের টুং টাং আয়েজনের উচ্ছ্বাসে হাহাকার বাড়ছে। মনে হচ্ছে দেহের অঙ্গ-ভঙ্গি, নড়ন-চড়ন স্থবির। কী জানি বুড়োর কোন শব্দতলে সব অপেক্ষা চূর্ণ হয়ে যায়। মেয়ের মায়ের অর্ধচিবানো পানের গাল হা হয়ে আছে। দুর্ভাবনার কালশিরে তার কপালে ভর করেছে। মেয়ের বিয়ে ভেঙ্গে গেলে সমাজে অবজ্ঞা হবে। চতুর্দিকে মেয়ের ক্রটির কথা গুনিতকহারে অপবর্ণনায় শাখা মেলবে। বড়বোন আমেনাকে নিয়ে একান্তে বসে আছে। তার অভিব্যক্তিতে শুভ সূচনার কৃত্রিম আভাষ।
মেয়ের মায়ের মাথা ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে। একটু পরে তার মাথা ধরে আসবে। তারপর তিনদিনের জন্য বিছানায় কাতরতা। এরইমধ্যে বুড়ো আবার পানদানি হতে ছেঁচাপান তুলে মুখে পুরে ঝিম্ ধরে আছেন। বুড়ো মুখ খুললেন। স্বল্প উচ্চারণে চাইলেন ‘চিলম্চি’। বুড়োর ছেলে ছাড়া শব্দটা কারো কানে স্পষ্ট পৌঁছায়নি। সবার ভিতরে ভিতরে উচ্চারণটা ঘুর্ণিঝড় তোলে। কী বলেছেন ছেলের দাদা! ছেলের বাবা অন্দরের দিকে তাকিয়ে পুনরায় উচ্চারণ করেন একখান ‘চিলম্চি’ আনেন তো।
‘চিলম্চি’! ‘চিলম্চি’! মেয়ের বাবা পানদানি রেখে অন্দরে ছুটাছুটি শুরু করে দেন। তার মাথা এখন নির্বোধের মাথা। জানেন, নিজের ঘরে বা অন্য কারো ঘরে প্রাচীনকালে ব্যবহৃত এ জিনিসের অস্তিত্ব নেই। তবু বাড়ির সব ঘরে তল্লাশি চলে। বুড়ো মুখে পিক্ চেপে চোখ বুজে অপেক্ষা করেন। সারাবাড়ির লোকজন এ ঘর ও ঘর খটুজছে। পাটাতনের উপর পুরানো আসবাবপত্র ঘেঁটে ঘেঁটে দেখছে। না নেই কোথাও।
উত্তরের ঘরের জয়ীফ হনুফা বুড়ীর কানেও কথাটা যায়। একজনকে ডেকে বলেন, ‘এ’রে আমিনুরের ঘর এককাই হুরান। হেতাগো কাঁড়ে চাইতে হারস্। হইতকালে হেতাগো ঘরে হিতলের চিলম্চি, বদনা, থালাবাসন দেখছি আঁর মনে আছে। বেচিও হালাইছে আগে আগে। হিয়ার হরেও দেইখতি হারস। মেয়ের বড়ভাই কাদের একটা মই নিয়ে ছুটলো সে ঘরের দিকে। বুড়োর গাল বেয়ে ক’ফোঁটা রাঙ্গা পিক্ সাদা পাঞ্জাবিতে পড়ে ছিটিয়ে যায়। মেয়ের চাচা একটা তোয়ালে হাতে এগিয়ে যায়। বাধা দেয় ছেলের বাবা, জিব্বা কামড়ে সতর্ক করেন তাকে। বুড়ো একটু উঠে বাইরে ফেলে আসবে সে চেষ্টাও নেই। বুড়োর ছেলে-নাতিরা বুড়োর নাড়ি বুঝে, কিছু বলতে গেলে বিপরীত হবে। নিজেই যা করার করুক। হবু বরের কাছে বিষয়টি উপভোগ্য। দাদাকে যেমন পছন্দ করে। আবার উল্টা পাল্টা কিছু বললে বা করলে মৃদু শিক্ষাও দিয়ে দেয়। তার সাথে দাদার ঝাল-মিষ্টি বিনিময় চলে।
পর্দার ওপাশে আলো-ছায়ার হবু স্ত্রীর উৎকণ্ঠ দৃষ্টি দেখে কানি চোখে। এক মুহূর্তে চোখে চোখ পড়তেই কাচের চুড়ির ঝনাৎ্ শব্দ তোলে। মেয়েটি আড়ালে চলে যায়। দীর্ঘসময় পর অন্দর-বাহির মিলে প্রায় পঞ্চাশজন নারী পুরুষের কাছে একটুখানি শব্দ ভঙ্গ হয়। বুড়োর দুগাল বেয়ে আরো ক’ফোঁটা রক্তলাল পানের পিক্ গড়িয়ে পড়ে। এবার পাঞ্জাবি ভেদ করে লাল ফোঁটা সাদা পায়জামায় ছড়িয়ে পড়ে।
[চলবে]

