তীর্থের কাকের মতো মেঠো পথের বাঁকে বাঁকে
গহীন আঁধার
তীর্থের কাকের মতো মেঠো পথের বাঁকে বাঁকে
প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে ছুটির ঘণ্টার প্রত্যাশায়
তব দৃষ্টির আঙ্গিনায় আমার ছায়া দেখে
পথ আগলিয়েছ কতবার সহসা কারণ অকারণে।
ভীরু হিয়ায় সাহস যুগিয়েছিলে প্রশান্তির ডালি সাজিয়ে
তোমার আমার ধরার আলো দর্শনের দিনক্ষণের ব্যবধান
আর আভিজাত্য ঘুচিয়ে ঠাঁই নিয়েছে হৃদয় গহীনে।
আমার চেতনার ঘুম ভাঙেনি তখনও
আমি বুঝিনি-
কোন অমিয় সুধা পানের যন্ত্রণায়
তুমি কারত ছিলে
তনুর প্রতিটি ভাঁজ রোমন্থনে আমাকে বিধ্বস্ত করায়
বেদনার নীলাকাশে তোমার চাঁদমুখ উঁকি দিয়েছিল
সময়ের ব্যবধানে আজ তা পূর্ণ শশীরূপে আবির্ভূত।
আমি বুঝিনি-
এভাবেই তুমি হারিয়ে যাবে অমাবশ্যার আঁধার গহীনে।
যন্ত্রণার যে প্রদ্বীপ তুমি জ্বেলেছ তার তীব্র দহন
আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
তোমার দেখান মরিচিকা স্বপ্নে আজ ঘুণ পোকার নৃত্য !
খোঁপার ফুলগুলি করুণ নয়নে পথপানে চেয়ে ঝরিছে পদতলে ;
তুমি কোথায়?
ফুলে-ফলে সজ্জিত তনুর প্রতিটি শাখা বিদ্রোহে সোচ্চার
ওদের স্বাভাবিক জীবন প্রবাহে আজ অন্তরায়ের চিহ্ন
আমি যে আর সইতে পারি না !
আমার চারিদিকে মৃত্যুর হাতছানি গহীন আঁধার।
ঘুণপোকা
ঘরেই খুনি, বুকে পাষাণ চোখের ভিতর অন্ধকার
মায়ের কোলেও নেই নিরাপদ মানবতার বন্ধ দ্বার।
তুচ্ছ কথায় হানাহানি আপন হলেও নেই উপায়
কি ভয়ানক বিভীষিকা এমন সমাজ কেউ কি চায়?
পরকীয়ার বিষে বিষে কত জীবন হয় বলি
শান্তি খুঁজে বেড়ায় মানুষ গন্ধ ছড়ায় সব গলি।
পিচাশ যত পিষ্ট করে কোমল শিশুর স্বপ্ন সাধ
নিচ্ছে কেড়ে সবুজ সময় কেউ করে না প্রতিবাদ।
বদ্ধ ঘরে পুড়ছে নারী স্বামীর লোভের আগুনে,
স্বপ্ন যেন যাচ্ছে ঝরে যত্নে গড়া ফাগুনে।
মায়ের চোখে অশ্রু ঝরে কই হারালো তার ছেলে
শুনতে পেলো মিথ্যা কেসে ফেঁসে এখন সে জেলে।
এটাই কি সেই কাঙ্খিত সম্প্রীতির সুখ সমাজ?
মানব নামের ছায়ার ভেতর মিথ্যা রঙের কারুকাজ।
এবার সবাই হও আগুয়ান রুখতে হবে ঘুনপোকা
ঐক্য হলে ঘুচবে আঁধার আর দেবে কেউ ধোঁকা।
বৃষ্টির ছোঁয়া
সে দিনটিতে শ্রাবণ এসেছিল
মেঘের চাদরে ঢাকা ছিল আকাশ,
হৃদয়ের দ্বার চুপিচুপি খুলে দিয়েছিল বাতাস।
পথের বাঁকে স্বপ্নপরীর সম্মুখে পড়েছি কত শত
নির্বাক নিস্তব্ধ ভিরু বুকে দৃষ্টি বিনিময় হতো শুধু
মনে হতো নীল পদ্মের পাপড়িতে আলো ছুঁয়েছে,
চোখ দুটি যেন সুরলহরী,
হৃদয়ের গহীনে ভেসে যেত।
পথমাঝে সেদিন বৃষ্টি নামে সহসা ভূতলে
আশ্রয় খুঁজি দুজনে একই তরু তলে
ভয় পেও না তুমি আছি তব পাশে
নিরবতা ভেঙে বলি সাহসে তাকে
শুনে শুধু সে বাঁকা শশী ঠোঁটে আঁকে।
যেন ধরা দেয় আকাশের আঁচলে বাঁধা রংধনু।
হাতটা বাড়িয়ে চেয়ে নেয় মোর বইখানি
স্কুল ব্যাগে ঠাঁই দেয় চুপিচুপ, হয় না যেন জানাজানি
বৃষ্টি থামে ফিরে যাই দুজনে আপন নীড়ে
বইখানা হাতে নিয়ে দেখি আজো
তার লেখা যেন ভেজা কবিতার কোন খাতা
পরশ মাখা যার প্রতিটি পাতা।
দেখা হলে কথা হতো, কত কথা রয়ে যেত,
হয়নি বলা আর তো
তবুও, সেইদিন থেকে
বৃষ্টি মানেই সে মুখ, সে চোখ, সেই কৃষ্ণচূড়ার স্মৃতি
ক্ষণিকের ভালোবাসা মধুমাখা প্রীতি।
দেয়াল
ফিরে ফিরে আর চেও না
হঠাৎ শুনে কণ্ঠ মোর
মনের মাঝে গহীন আঁধার
কেটে গেছে প্রণয় ঘোর।
পূর্ণশশী ঠোঁটে এঁকে
মারলে বুকে শতেক তীর
নয়নকোণে ঢেউ তোলে আজ
ক্ষণে ক্ষণে তপ্ত নীর।
তনুর মাঝে গড়ে ওঠা
নানান রঙের কারুকাজ
ভরবে না মন আর কখনো
সব গিয়েছে ভেঙে আজ।
জানি তুমি স্বপ্নকলি
হয়নি তবু খেয়াল
তোমার আমার মাঝে আছে
একটা কাঁচের দেয়াল।
সুখ-দুঃখের আধার
জীবন এত মধুর যে হয় বুঝিনি তা আগে
তোমার পরশ পেতে হৃদয় দিবা-নিশি জাগে
তোমার মুখের কথাগুলো মিষ্টি মধুর সুর
হিয়ার সকল বেদনগুলো মুহুর্তে হয় দুর।
দাও যদি গো বুকের মাঝে একটু খানি ঠাঁই
সোনা রূপার খাট পালঙ্ক আর কিছু না চাই
একলা রেখে থাকলে তুমি লক্ষ যোজন দূরে?
ঘুণ পোকারা নৃত্য করে খাচ্ছে হৃদয় কুরে।
তুমি বিনা সকল কিছুই লাগে যে হায় রিক্ত
তাই বুঝেছি- দুখের বেদন হয় যে এত তিক্ত !
সুখ-দুঃখের আধার তুমিই নয় তো কেহ ভিন্ন
যায় না ভোলা তোমার সকল রেখে যাওয়া চিহ্ন।
বৃষ্টি মেয়ে
জানালা খুললেই চোখে পড়ে পত্র-মঞ্জুরির আড়ালে
নীলবর্ণের দালানের কংক্রিটের ছাদ।
বরাবরের মতো আজও সূর্যটা ধূসর চাদরে
মুখ লুকিয়ে রয়েছে সেই সকাল থেকেই মেঘদূতেরা
ছোটাছুটি করছে যেন আমারই সন্ধানে আকুল হৃদয়।
শীতল বাতাসে ভর করে সহসা নেমে এসে
ধরণীর বুকে ছাদের পরে নূপুর পরে রিমঝিম সুরে
নৃত্য করে বৃষ্টি মেয়ে।
বৃষ্টি মেয়ের পরশ নিতে সঙ্গী হয়ে এলো
লাল বেশে এলোকেশে আনন্দ চিত্তে এক অপরূপা ষোড়ষী;
আমি মুগ্ধ হয়ে তার নৃত্য দেখেছি
দেখেছি রংধনুর সবকটি রং বুকের চূড়ায় লুটোপুটি খেতে
ঊর্ধ্বে প্রসারিত দু’বাহুর মাঝে তুলে ধরে বদনখানি
বৃষ্টি মেয়ে অবগাহন করেছ যেন আমারই চেতনা রঙে।
দেখেছি দু’চোখ ভরে-বিজলির ছটায় ঝলসে ওঠা
বৃষ্টি মেয়ের আনন্দ!
তারপর বৃষ্টি মেয়ের বিদায়ের সঙ্গে সেও বিদায় নিয়েছে
বর্ষার ক্ষণিক চিত্রকে অম্লান করে!
রাত্রির নিস্তব্ধতা ভেঙে নিশাচর প্রাণীর কোলাহল
ভোরের সূর্য উঁকি দিল পূর্ব দিগন্তে
তবু তার নৃত্যের সুর শুনি সারা হৃদয়জুড়ে অবিকল।
ধরাপরীর নৃত্য দেখার বাসনায় বাতায়নে
প্রতীক্ষায় চেয়ে আছি আজও আবার কবে আসবে?
আমি জানালার গ্রিল ধরে অপলকে চেয়ে থাকব
সেই অপরূপা ষোড়ষীর নৃত্য দেখার জন্য।
বৃষ্টি মেয়ে, তুমি আসবে কি তার সঙ্গে?
অমৃতের সন্ধানে
শত জনমের লালিত স্বপ্নের ভালোলাগার
অদৃশ্য পুষ্পে ডালি সাজিয়ে আমার চেতনার
ঘুম ভাঙিয়ে দাও কোমল পরশে
বড্ড অচেনা মনে হয় তোমাকে !
মনে হয় কোন ভিন্ন জগতের সুখ অন্বেষণকারী
ধরাবুকে সুখের আধারের দেখা পেয়ে ছুটে এসেছে,
সেই আধারের প্রতিটি কণা লেহন করে চলেছে
অমৃতের সন্ধানে।
স্থায়ী প্রশান্তি প্রাপ্তির ব্যর্থ প্রচেষ্টায় পৃথিবীর সকল ক্লান্তির
ভারে ন্যুজ হয় অতৃপ্ত হিয়া;
চেতনার ঘুম ভাংলে মরিচিকায় ঢাকা সুখের আধারকে
আবারও পুরানো ভয় মিশ্রিত শাসনের বেড়িতে
শৃঙ্খলিত করে আস্তাবলের জঞ্জালে ছুঁড়ে ফেলে দাও;
মুক্ত বিহঙ্গের মতো ধুলি-ধূসর কুয়াশা ঢাকা
অজানা বৃত্তের পথে চলতে শুরু কর।
ক্লান্তিদের বিশ্রাম দিতে যখন আলোর প্রহর
আঁধারের বেশ পরে আঙ্গিনায় নেমে আসে
ঠিক তখনই ভিন্ন রূপে ভিন্ন স্বাদের পসরা নিয়ে
আবার আবির্ভূত হও তনুর আঙ্গিনায় অমৃতের সন্ধানে,
তুমি বুঝলে না প্রিয় খুঁজলে না কভু বুকের ভিতরে
কিসের প্রতীক্ষায় কাহার তরে আগলে রেখেছে
প্রশান্তির উপহার নিয়ে ব্যথাতুর হৃদয়।

