প্রাচীন চীনের চিরায়ত কবি ওয়েন থিয়ানসিয়াং
চীনা সাহিত্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বিশেষ করে থাং ও সং রাজবংশের শাসনকালের কবিদের কবিতা শুধু চীনা চিরায়ত সাহিত্যেরই নয়, বরং বিশ্বসাহিত্যেরও অমূল্য সম্পদ। থাং ও সং যুগে অনেক বিখ্যাত চীনা কবির আবির্ভাব ঘটেছে। এমনি একজন কবি ওয়েন থিয়ানসিয়াং।
দেশপ্রেম, কর্তব্যজ্ঞান, বিশ্বস্ততা , বীরত্ব এমন সব মহৎ গুণের সমাবেশ যার মধ্যে দেখা গিয়েছিল তিনি হলেন চীনের সং রাজবংশের সময়কার বিখ্যাত কবি ওয়েন থিয়ানসিয়াং। সেই সঙ্গে তিনি ছিলেন অসাধারণ কবি ও লেখক। তিনি শুধু চিরায়ত চীনা সাহিত্যের অন্যতম সেরা কবিই নন, তিনি একজন জাতীয় বীর।
চিয়াংসি প্রদেশের লুলিং বা চিয়ান শহরে ১২৩৬ সালের ৬ জুন জন্মগ্রহণ করেন ওয়েন থিয়ানসিয়াং। দক্ষিণ সং রাজবংশের শাসনকাল তখন। তরুণ বয়সে রাজকীয় পরীক্ষায় প্রথমশ্রেণীর ফলাফল করে সরকারি চাকরিতে ঢোকেন ওয়েন। তার ফলাফল এতই ভালো ছিল যে সম্রাট লিচং নিজে হাতে তাকে পুরস্কার দেন।
তিনি দক্ষিণ সং রাজবংশের সরকারের বিভিন্ন পদে চাকরি করেন। সেসময় দুর্নীতিবাজ জেলা প্রশাসক চিয়া সিদাও এর সঙ্গে তার ক্রমাগত সংঘাত হয়।
উত্তরচীনে এই সময় যাযাবর মঙ্গোলবাহিনীর আক্রমণ চলছিল। মঙ্গোলরা ছলে বলে কৌশলে উত্তরচীনের বিভিন্ন অংশ দখল করছিল। তারা বিভিন্ন উচ্চ পদস্থ ব্যক্তিকে ঘুষ দিয়ে দলে টানার চেষ্টা করতো। ১২০৬ সালে চেঙ্গিজ খানের সময়েই মঙ্গোল বাহিনী চীন আক্রমণ করে। উত্তর চীনের বিভিন্ন এলাকায় তারা আক্রমণ চালায়। কোন অংশ দখল করে। কোন অংশ থেকে বিতাড়িত হয়। ১২৭১ সালে মঙ্গোলদের ইউয়ান রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়। বেইজিং হয় ইউয়ানদের রাজধানী। চেঙ্গিজ খানের নাতি কুবলাই খান হন প্রথম ইউয়ান সম্রাট। এইসময় দক্ষিণ সং রাজবংশের সঙ্গে তাদের বিবাদ চলতে থাকে। দক্ষিণ সং রাজত্বের উপর মঙ্গোল আক্রমণ চলমান থাকে।
ওয়েন সবসময় মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতেন। তিনি সবরকম কাপুরুষতার বিরুদ্ধে তীব্রভাবে প্রতিবাদী ছিলেন। রাজদরবারের এক প্রভাবশালী ইউনাখ মঙ্গোল আক্রমণের ভয়ে রাজধানী লিনআন ছেড়ে পালিয়ে যাবার পরামর্শ দিলে তিনি তার কঠোর শাস্তির দাবি তোলেন। কিন্তু ওই ব্যক্তি ছিলেন দরবারের খুব প্রতিপত্তিশালী। তাই উল্টো ওয়েনেরই পদাবনতি হয়। তাকে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে অবসরে পাঠানো হয়।
পরে যখন যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও খারাপ আকার ধারণ করে তখন তাকে ফিরিয়ে এনে কানচৌ প্রিফেকচারের শাসক নিযুক্ত করা হয়।
তিনি স্থানীয় জনগণ থেকে নিয়োগ নিয়ে একটি বাহিনী গড়ে তোলেন এবং ফিংচিয়াং অধুনা চিয়াংসু প্রদেশের সুচৌ শহরের রক্ষায় তাদের নিয়োজিত করেন।
সেসময় বেইজিংয়ে মঙ্গোলদের ইউয়ান রাজবংশ রাজত্ব করছে। তারা সং রাজত্বকে দখল করার জন্য চারদিক থেকে যুদ্ধ শুরু করে।
মঙ্গোলবাহিনী সেনাপতি বাইয়ানের নেতৃত্বে চিয়াংসুর চিয়েচিয়াং আক্রমণ করে। তারা ফিংচিয়াং শহরকে এড়িয়ে ইয়ুহাং জেলায় আক্রমণ চালায়। খবর পেয়ে ওয়েন তার বাহিনী নিয়ে ইয়ুহাংকে রক্ষা করতে ছুটে যান। কিন্তু মঙ্গোলরা অন্যদিক দিয়ে অরক্ষিত ফিচিয়াং দখল করে। ওয়েন তখন তার বাহিনী নিয়ে লিনআন শহরে চলে আসেন।
ওয়েন প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। অনেক উচ্চপদস্থ মন্ত্রী ইউয়ান আক্রমণের ভয়ে পালিয়ে যান। প্রধানমন্ত্রী লিউ মংইয়াংও পালিয়ে যান।
অনেকে মঙ্গোলদের সঙ্গে অপমানজনক শর্তে সন্ধির পক্ষে পরামর্শ দেন। সং সম্রাট তোওয়াগার শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন। ওয়েনকে তিনি চ্যান্সেলর বা প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করে সং প্রতিনিধিদের নিয়ে ইউয়ানদের সঙ্গে সন্ধি করতে পাঠান।
মোঙ্গল পক্ষের সেনাপতি বাইয়ানের সঙ্গে বৈঠকে ওয়েন মোঙ্গলদের দুরভিসন্ধি টের পেয়ে ইউয়ান বাহিনীকে ফিরে যেতে বলেন। ওয়েনের কিছু কথা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি বলেন, যদি তোমরা উত্তর রাজবংশ(ইউয়ান রাজবংশ) সংকে একটি দেশ হিসেবে বিবেচনা করে তাহলে তোমাদের সৈন্যবাহিনী ফিংচিয়াং বা চিয়াসিংয়ে সরিয়ে নিয়ে যাও। তখন আমরা তোমাদের শ্রদ্ধা প্রদর্শনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবো। আমি তোমাদের বলতে পারি যে হুয়াই, চিয়ে, মিন বা কুয়াং দখল করা অত সহজ হবে না। সেখানে যোদ্ধারা তোমাদের কাছে বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণ করবে না। তোমাদের জয় এখনও সুনিশ্চিত নয় ।’
ওয়েন আত্মসমপর্ণে রাজি নয় দেখে বাইয়ান তাকে গ্রেপ্তার করে মঙ্গোল সদর দপ্তরে নিয়ে যায়। অসহায়ভাবে ওয়েনকে দেখতে হয় যে সম্রাট তোওয়াগার এবং অন্য সং রাজপুরুষরা বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্ণ করছেন। ওয়েন খুব কৌশলে মঙ্গোল শিবির থেকে পালিয়ে ইয়াং প্রদেশে যান।তিনি তাদের মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা যুদ্ধ চালাতে বলেন। কিন্তু কাপুরুষ সব জায়গাতেই রয়েছে। ইয়াং প্রদেশে তাকে মনে করা হয় ইউয়ানদের গুপ্তচর। তিনি আরও দক্ষিণে যান। ফুচৌও প্রদেশে তার সঙ্গে দুই বিশ্বস্ত পুরনো বন্ধু চাং শিচিয়ে এবং চেন ইচোংয়ের দেখা হয়। এসময় তারা রাজকুমার তুয়ানচোংকে নতুন সং সম্রাট হিসেবে অভিষেক করে তার অধীনে বিশ্বস্ত থেকে প্রতিরক্ষা যুদ্ধ চালিয়ে যাবার অঙ্গীকার করেন।
নানচিয়ান প্রদেশে(বর্তমানের ফুচিয়ান প্রদেশের নানফিং)স্থানীয় জনগণকে নিয়ে তিনি একটি প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে তুলতে সমর্থ হন। তিনি বীরত্বের সঙ্গে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে জয়ী হন। তবে প্রবল পরাক্রমশালী ইউয়ান বাহিনী তাকে ঘিরে ফেলে এবং চাং হংফান নামের ইউয়ান সেনাপতির নেতৃত্বাধীন বাহিনীর হাতে বন্দী হন ওয়েন।
চাং হংফান জানতেন ওয়েন একজন বড় বীর। তিনি ওয়েনের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন এবং তাকে ইউয়ান বাহিনীতে উচ্চপদে যোগ দিতে বলেন। কিন্তু ওয়েন সেই প্রস্তাব বেশ কয়েকবার প্রত্যাখ্যান করেন। সং প্রতিরক্ষা বাহিনী ইয়ামেনের যুদ্ধে ১২৭৯ সালে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। এইবার তাকে বলা হয় যেহেতু সং রাজবংশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে এখন তো আর বিশ্বস্ততার প্রশ্ন ওঠে না। এখন যেন তিনি ইউয়ান রাজবংশের সরকারে যোগ দেন। কিন্তু ওয়েন বলেন, আমি সং রাজদরবারের চ্যান্সেলর (প্রধানমন্ত্রী) ছিলাম। আমি দেশকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করে মৃত্যুদণ্ড দিন। আমি নিজের প্রাণ রক্ষা করতে চাইবো কেন?’ সেনাপতি চাং তাকে বন্দী করে বেইজিংয়ে মঙ্গোলদের প্রধান কার্যালয় দাদুতে নিয়ে যান।
এখানে ওয়েনকে আবার ইউয়ান বাহিনীতে যোগ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়। তিনি এবারও সেটি প্রত্যাখ্যান করেন। বন্দী অবস্থায় তিনি বীরত্বসূচক ও দেশপ্রেমমূলক অসাধারণ সব কবিতা লেখেন। এবার ইউয়ান দরবারের পক্ষ থেকে তাকে অনুরোধ করেন সেই পালিয়ে যাওয়া চ্যান্সেলর লিউ মংইয়াং। তিনি এখন মঙ্গোলদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। তাকে দেখে ঘৃণায় জ্বলে ওঠেন ওয়েন। তাকে এক ধমকে ভাগিয়ে দেন সামনে থেকে। এবার মঙ্গোলরা নিয়ে আসেন সম্রাট তুয়ানচোংয়ের বালক পুত্র পুতুল সম্রাট কংকে। তাকে দেখে ওয়েন কেঁদে ফেলেন। বলেন, মহামান্য সম্রাট আপনি এখানে নয়, আপনার নিজস্ব প্রাসাদে চলুন। তখন আবার আমরা যুদ্ধ করে মাতৃভূমিকে উদ্ধার করবো।
ওয়েন থিয়ানসিয়াংয়ের আপন ভাই ওয়েন পি এবার আসেন একই অনুরোধ নিয়ে। ভাইকে দেখে ওয়েন থিয়ানসিয়াং বলেন, আমরা এক বাবামায়ের সন্তান হলেও এক আকাশের নিচে সেবা দিই না। তারমানে ভিন্ন ভিন্ন পথের পথিক তারা দুজন।
বন্দী অবস্থায় ওয়েনের কন্যা তাকে চিঠি লিখে জানান যে পুরো পুরিবারকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। একমাত্র যদি তিনি মঙ্গোলদের সঙ্গে যোগ দেন তবেই সবাই মুক্তি পাবেন। ওয়েন উত্তরে লেখেন, একথা জেনে আমার হৃদয় দুঃখে ভারাক্রান্ত। কিন্তু কি করবো? সকলেরই পরিবার পরিজন আছে। যারা যুদ্ধে শহীদ হয়েছে তাদেরও ছিল। তাদের রক্তের সঙ্গে তো আমি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না। আমার কাছে এখন মৃত্যু ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।
তিনি কোন ভয়ভীতি বা প্রলোভনে নিজের আদর্শকে বিসর্জন দিতে রাজি হননি।
ইউয়ান সম্রাট কুবলাই খান তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাকে দরবারের একটি উচ্চপদ দিতে চান। তিনি স্বয়ং তাকে অনুরোধ জানান। ওয়েন বলেন, আমি সং রাজবংশের চ্যান্সেলর ছিলাম। আমি আরেকটি রাজবংশের চাকরি করতে পারি না। আমি শুধু মৃত্যুকে গ্রহণ করতে পারি। যদি আমি আপনার প্রস্তাব গ্রহণ করি তাহলে মৃত্যুর পর আমার বীর শহীদ সহযোদ্ধাদের, বন্ধুদের কাছে কি জবাব দিবো? আমাকে মৃত্যুদণ্ড দিন। এছাড়া আমার আর কিছু বলার নেই।’
এদিকে তখন একটি বিদ্রোহ ঘনিয়ে আসছিল এবং জনগণের প্রিয় চ্যান্সেলর ওয়েনকে উদ্ধার করার জন্য মোঙ্গল কার্যালয় দাদু আক্রমণ করার জন্য বিদ্রোহীরা প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সে সময় কুবলাই খান বাধ্য হয়েই ওয়েনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ১২৮৩ সালের ৯ জানুয়ারি তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। তার বয়স তখন মাত্র ৪৬ বছর।
ওয়েন থিয়ানসিয়াংয়ের একটি বিখ্যাত কবিতা পাঠকদের জানাচ্ছি
নিঃসঙ্গ সাগর পাড়ি
পরিবর্তনের পুঁথির ভিতর দিয়ে চলছি,
বড় কষ্টের ভিতর দিয়ে বিকশিত আমি
চারটি দীর্ঘ বছর ধরে শত্রুর বিরদ্ধে মরিয়া হয়ে লড়েছি
উইলো মোচার মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূমি জনশূন্য হয়েছে
আমি ডুবেছি, সাঁতার দিয়েছি বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া শ্যাওলার মতো
বিপদসংকুল এক সৈকতে দাঁড়িয়ে আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি
এই অকূল সাগরে আমি ভীষণ একাকী, নিঃসঙ্গ
প্রাচীনকাল থেকে এমন কোনো মানুষ আছে কি
যে এখনও বেঁচে আছে এবং মৃত্যুবরণ করেনি?
ইতিহাসে রেখে যাবো আমার বিশ্বস্ত নাম।
চীনের ইতিহাসে ওয়েন থিয়ানসিয়াং এক শ্রদ্ধা ও সম্মানের নাম। ইউয়ান রাজবংশের পতনের পর মিং রাজবংশের শাসনকালে ও অন্যান্য সময় চীনের বিভিন্ন স্থানে চ্যান্সেলর ওয়েনের স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলা হয়। বেইজিং, চিয়াংসি, কুয়াংতোং, তাইওয়ান, হংকংসহ বিভিন্ন স্থানে চ্যান্সেলর ওয়েনের স্মৃতির উদ্দেশ্যে স্মারক স্তম্ভ ও স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে। তিনি যুগে যুগে মাতৃভূমির রক্ষার যুদ্ধে দেশপ্রেমিক বীরদের প্রেরণা হয়ে থেকেছেন। তিনি ইতিহাসে সত্যিই বিশ্বস্ততার পরম উদাহরণ হিসেবে অমরত্ব পেয়েছেন।
ওয়েন থিয়ানসিয়াং তার জীবন ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিশ্বস্ততা, দেশপ্রেম, সাহসিকতা ও আদর্শের অমরকাব্য লিখে গেছেন। তার কবিতা এখনও চিরায়ত চীনাসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।

