চার সোয়া পাঁচ : পর্ব-১
ওর নাম শিউলি। ওর মুখ থেকে দু’বার উচ্চারিত হয়েছে। ভাইজান, আঁর নাম শিউলি। আরো একটু কাছে এসে বলে: ভাইজান, আঁরে চিনছেন নি?
ও, শিউলি! তুমি কেমন আছ শিউলি? ওকে চেনার কিছুটা ভান করে একটু হাসি ঝিকিয়ে দেন খান। আরেকটু আন্তরিক হয়ে জিজ্ঞেস করেন, তোমার খাওয়া হয়েছে শিউলি?
খানের প্রশ্নে ওর আত্মসচেতনা ফিরে এলো। খুশির ঝিলিক্ ওর পানমুখ লাল হয়ে উঠলো। আরেকটু হাসি বাড়িয়ে বলে, মেহমানগো খানা শেষ অইলে হরে খাইয়্যুম, অসুবিদা নাই। উঠানের উত্তর কোণে জাম্বুরা গাছের ছায়ার ঘেরে একটা প্লাস্টিকের চেয়ার পেতে শিউলি বলে, বড্ডাভাইজান, আন্নে এ খোলামেলা জায়গায় বইয়েন। চেয়ারটা চেপে-চুপে ঠিক করে আনমনে বলে; সবুজ সবুজ হাওয়া খাইবেন।
ওর কথার মধ্যে তেমন রহস্য নেই। তিনদিকে সজীব সবুজের বেড়। মাথার ওপরে জাম্বুরার সবুজ পাতার ঘন ছাউনি। খানের মনটাকেও যেন সজীব সচল করে তুললো পাতা কাঁপানো দক্ষিণা হাওয়া। গন্ধরাজ ফুলের ঘ্রাণ পাচ্ছেন খান। কিন্তু গন্ধরাজ গাছ দেখছেন না কোথাও। ঘরের দক্ষিণ কোণে একটা রক্তজবা গাছের কয়টা ফোটাফুল দোল খাচ্ছে যেন ঝির-ঝির বাতাসকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।
আবুলের মেয়ের বিয়ের দাওয়াত খেয়ে পানমুখো লোকজন চলে যাচ্ছে। বেশ তৃপ্তির ঢেঁকুর তাদের অবয়বে। রান্না ভালো হয়েছে, গোশ্তের বাড়ানো হাতা অনেকেই ফিরিয়ে দিয়েছেন। দু’চারজন উল্টোমুখি পা বাড়িয়ে খানকে সালাম জানিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। তাদের কাউকে খান চিনেন না, তবুও হাসিতে ওদের সাথে সৌজন্য বিনিময় করছেন। লম্বা নিশ্বাস টেনে টেনে শিউলি দক্ষিণ পশ্চিমের একটা টিনের ঘরের পাশ থেকে আবির্ভূত হলো।
ভাইজান, গন্ধরাজের ঘেরাণ হাইছেন? এ ঘরের হেই কোণায় আঁই লাগাইছি।
সরকারের উচ্চপদে চাকরির সুবাদে অনেকেই খানকে সমীহ করে যাচ্ছে। কেউ চিনে, কেউ ধারণা করে আড়ষ্ট হয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে সৌজন্য বিনিময় করছে। খানের তরফ থেকে না চিনেও ভান করাটা জরুরি। ওরা ছেলে পক্ষের মেহমান। বিয়েটা খানের চাচাতো ভাই আবুলের মেয়ের।
এরমধ্যে কেউ পানদানি নিয়ে, কেউ পানীয়ের নানান বোতল সেঁধে বিনয় করছে। ওদের প্রতি একটু হাসি, একটু বিনিময়ে ওরা যেন কৃতার্থ।
উচ্চপদে আসীন কঠোর মনোভাবের খান চেষ্টা করছেন খোলস থেকে একটু বের হতে। কেউ হাত বাড়িয়ে দিলে মনোযোগ দিয়ে কুশলাদি বিনিময় করছেন।
আবুল ব্যস্ত পরের ব্যাচের মেহমানদের নিয়ে। পাশের ঘরের জাকির একটা পানীয়ের বোতল খুলে খানের সামনে ধরে। আবুল ছুটে এসে তাকে চোখের ইশারায় বারণ করে।
বলে, কিয়া করস্ জাকির? বড্ডাভাইজানেরলাই ডাব হাড়ি রাখছি। ইগিন কিয়া দেস? সোডা-মোডা ফুট্টুস্ হছা জিনিস। খান হেসে বলেন, ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। তোমাদের কাজ শেষ কর। আমিতো আছিই।
জাকির উঠানে রাখা একটা ডাব দায়ের আগায় গেঁথে খানের সামনে বসে মুখ কাটতে থাকে। ডাবের কাটা মুখে শেষ কোপ দিতেই পিচকারির মতো পানি ছুটে খান সাহেবের কানের পাশ দিয়ে চলে যায়। জাকির জিভ কেটে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, বড্ডাভাই এমনে খাইবেন?
গোশ্তের মাল্সা হাতে ছুটে আসে আবুল। জাকিরের দিকে তাকিয়ে বলে, এরে হিলাইয়া, এন্নে কেন্নে খায়? গ্লাস লই আয়। এন্নে খায়? সাদা কোর্তার মইদ্যে ডাবের হানি হড়লে কষ কষ দাগ হড়তো’ন? অন্তাই বড্ডাভাইর লগে আঁর-ঝিয়ের হোরগো, হদ-হরিচয় অয়’ন। বেকগিন তোগোরে আঙ্গুলদি দেয়াই দিতে অইবো?
এ পাশ থেকে আবুল হাঁক মারে, কইরে হালিম, মেহমানগো প্লেটেরমুই নজর রাখছস্নি? কার হাতে কী লাগবো খেয়াল রাখ। বেক্কলগুন, খালি আকামে ঘুরে। কইরে সালাম, খাড়াই রইছস্ কিল্লাই? ঐযে মেহমান কী চায় জিগাই দেখ। সুন্দর করি, আদবের লগে জিগা-কি লাগবো না লাগবো!
আবুলের মেজাজ সকাল থেকেই তেতে আছে। বাবুর্চি সালাম যখন বললো, আবুল কাকা খাসির গোশ্তের লগে একগা হানা কুমড়া ছেঁচিদি, এককানা তেল বাড়াই দিলে খানা কম লাগবো। খাদিমদারী কইত্তে থালে এককানা ঝোল বেশি ঢালি দিলে খানা শর্ট হড়তো’ন।
আবুল খ্যাক্ খ্যাক্ করে ওঠে। হারামজাদা সালইম্যা বাবুর্চি, তুই আঁরে কুবুদ্ধি দেস্। আঁই ঝিয়ের বিয়াত মাইনসেরে দাওয়াত দিছি এককানা ভালা-মন্দ খাওয়ানেরলাই, আর তুই কস্ কুমড়া ছেঁচিদি মেহমানগো খানা নষ্ট কইত্তি। হারামি, চলি যা আঁর বাড়িথুন। তোরে ছেঁচি আঁই ডাইলের লগে গুঁডি দিউম, বাইর’হ। তোরে দি আঁই রান্দাইতান্নো। বড্ডাভাইর ঠেঙ্গে-হাতে ধরি ঢাকাথুন আনাইছি। হেই মজলিশে তোর কুপরামর্শ? তোর হছাকথা আঁই হুনতাম চাই না। চলি যা কইলাম। ইয়ানো আইছত আঁর ইজ্জত লই টানাটানি কইত্তি।
বাবুর্চি ছোট্ট করে বলে, আঁইতো কইছি আন্নের খরচ কমাইতে।
আবুল আবার ক্ষেপে উঠে তেড়ে যায়। আবুলের ছোট ভাই বাবুুল আর ভায়রা ভাই ছলিম দৌড়ে এসে দুজনের সামনে দাঁড়ায়। বাবুর্চিকে দুই ধমক দিয়ে বলে, যা তোর কামে। বেক্কল কোনাইগার, সময়-গময় বুঝে না। যিয়ানো হিয়ানো হছাবুদ্ধি ঢালি দেস্।
আবুল গোস্বা কিছুুটা নিংড়ে ফিরে যায় ঘরে। বাবুর্চি পাতিলের ভেতর গোশ্তো নেড়ে-চেড়ে সগোক্তি করে, আঁর দোষ কোনাই! আন্নেরাইতো কইছিলেন মানুষ বাড়লে কেমনে সামলাইবেন? আঁর কাছে বুদ্ধি চাইছিলেন। চুপ থাক, বলে বাবুল বাবুর্চিকে চোখ রাঙিয়ে প্যান্ডেলের দিকে এগোয়।
রিয়াজ পেন্ডেলের পশ্চিম প্রান্ত থেকে হাঁক দেয়, জাকির ভাই, ডাইল আকুলান। এরিমধ্যে পোলাওর সাথে একই প্লেটে ডিম, মুরগির রোস্ট, মাছ পরিবেশন করা হয়েছে। তারপর গরুর মাংস আর খাসির মাংস এক টেবিলে দু’বাটি করে দেয়া হয়েছে। যার যার ইচ্ছামতো চামচে করে তুলে নিচ্ছে। পরের স্তরে বালতি করে হাড্ডি আর মুগডালের সিমা বিতরণ, খাদিমদারের বালতিতে শর্ট পড়েছে। মেহমানদের খাবারে যাতে ছন্দ পতন না ঘটে সেজন্য দ্রুত আরেকটা ডালের বালতি পৌঁছে দেয় রিয়াজের হাতে। পাতে পাতে জিজ্ঞেস করে রিয়াজ। বড় হাতার চামচ দিয়ে হাড্ডি ডাল বিতরণ চলছে। শেষ পর্যায়ে মাল্সা ভর্তি দই। উত্তরের ঘরে চৌকির নিচে পাতানো দইয়ের ভাণ্ড নিয়ে জাকির ছুটে যায়। ভাণ্ডের উপরের কাগজ পরিষ্কার করতে গিয়ে খানিকটা ছিটা এসে পড়ে খানের গায়ে। আবুলের চোখ এড়ায়নি।
‘এরে হাতাইল্ল্যা, কিচ্ছত? কিচ্ছত? দিছস্নি বড্ডাভাইর কাপড়-চোপড় নষ্ট করি? বেক্কল কোনাইগার?’ আবুল তেড়ে এসে জাকিরের গায়ে থাপ্পড় তুলে আবার খানের দিকে তাকিয়ে জিভ কেটে নামিয়ে নেয়।
‘তোগোরে কত কইলাম! নষ্ট কাপড়েনি বড্ডাভাইর লগে আঁর মাইয়ার আত্মীয়গো হদ-হরিচয় অইবো! ইজ্জত লই টানাটানি।’
বাবুল প্যান্ডেলে ছুটে যায়। মেহমানদের শেষ ব্যাচের খাবার চলছে। এরিমধ্যে বাড়ির মহিলাদের পাশের প্যান্ডেলে জড় করার জন্য শিউলিকে নির্দেশ দেয়।
খানের ড্রাইভার গাড়ি থেকে একসেট নতুন কাপড় নিয়ে অপেক্ষা করে। ড্রাইভার দূরে দূরে থাকলেও খানকে সব সময় নজরের আওতায় রেখেছে। দু’টো ডাবের পানি ওদের চাপাচাপিতে পান করতেই হলো। খান ইতস্তত করছিলেন, টয়লেটের কি ব্যবস্থা হবে। বয়স এবং অভ্যাসের কারণে কমোড ছাড়া বিপন্ন বোধ করছেন। কাউকে যে জিজ্ঞেস করবেন সুযোগও পাচ্ছেন না। শিউলি কোথা থেকে ছুটে আসে। তার হাতে একছড়া চাবি।
ভাইজান, আন্নে উডেন, ড্রাইভারের হাত থেকে কাপড়গুলো নিয়ে বলে, চলেন আঁর লগে স্বপন ভাইয়ের ঘরে। খান কী করবেন বুঝতে পারছেন না।
চিন্তা কইরেন না। স্বপন ভাইর ঘরে এক্কাই হরিষ্কার কমোড আছে।
গ্রামে টয়লেটের ব্যবস্থা সব সময়ই খারাপ। জরুরী বিষয়টিকে গ্রামের মানুষ কখনো ভালো বিবেচনায় রাখে না। অথচ, অসুস্থতার অজুহাত সৃষ্টি হয় অপরিচ্ছন্নতা থেকেই।
একটু আগেও খান বিপদাপন্ন বোধ করছিলেন। এরপর দুটো ডাবের পানির চাপ। একটু পরেই বেগ বাড়বে সেটাই উদ্বেগের কারণ হতে যাচ্ছিলো। মেয়েটি সে মুহূর্তেই যেন সুবার্তা নিয়ে এলো। আবার ভাবছেন, কে এই মেয়েটি। সময়মতো সব কিছু এহছান করে দিচ্ছে। খানের চাহিদা, ভাবনা সারাক্ষণ এগিয়ে দিচ্ছে। ভাইজান, স্বপন ভাইয়েরে চিনবেন। আমেরিকা থাকে। বাড়িত থাকনের কেউ নাই। একটা দীর্ঘশ্বাস ঝেড়ে বলে, আর কে থাকবো!
ওর পিছু পিছু খান বাড়ির সর্ব দক্ষিণের ডুপ্লেক্স ভবনটির সামনে দাঁড়ায়। এতক্ষণ এ বাড়িটি খানের নজরে পড়েনি। উত্তরের এ ঘরটা মাঝের ঘরের বেড়ার আড়ালেই ছিল। শিউলি তালা খুলে কলাপ্সিবল গেট টেনে ফাঁক করে নেয়। পরেরস্তর সেগুনকাঠের নকশা করা একপাল্লার বার্নিশ করা দরজা। খান ওর পিছু পিছু ঘরে ঢুকে দেখেন টাইলস্রে নকশা করা ঝক্ঝক্ েফ্লোর। মনে হচ্ছে একটু আগেই কেউ যত্ম করে মুছে গিয়েছে। দেয়ালে অফ হোয়াইট প্লাস্টিক পেইন্ট। খানের মনে হলো নতুন পেইন্ট করা ঘরে প্রবেশ করেছেন। ঘরে কারো বাস না থাকলে সাধারণতঃ এর পরিচর্যা হয় না। একটি মাকড়সার জালের কোনো কোণায় বিস্তার নেই। ড্রইং রুমে ভিক্টোরিয়ান ডিজাইনের দামি সোফা। কাঠের বার্র্নিশ একটুও মলিন হয়নি। শিউলি একটা বাথরুমের দরজা খুলে বাতি জ্বলিয়ে দেয়। আধুনিক ফিটিংস্ এ ঝক্মক্ করছে বাথরুমের দেয়াল এমনকি কমোডও। প্রত্যন্ত গ্রামে আমেরিকান কমোড দেখে অবাক হন খান। ঢাকায় তার নিজের ফ্ল্যাটটি এতটা ঝক্মকে পরিছন্ন থাকে না সবসময়। কোথাও একটু আঁচড় পর্যন্ত নেই।
খানের বাড়ির সর্ম্পকীয় চাচাতো ভাই স্বপন। বয়সেও অনেক ছোট। ও বিমান, এয়ার লাইন্স-এ চাকরি করতো এক সময়। পাঁচবছর চাকরি শেষে ইন্টারন্যাশনাল রুটে ফ্রি প্যাসেজে ভ্রমণের সুবিধা পেয়ে যায়। দ্বিতীয় ভ্রমণে লন্ডনে এক আত্মীয়ের কেয়ারে থেকে নতুন পথ খুঁজে নেয়। বছর দুই লুকোচুরি খেলে আমেরিকায় পাড়ি জমায়। দুই যুগের ব্যবধানে গ্রিন কার্ড, স্ত্রী পুত্রের আইনানুগ থাকার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করে ফেলে। দু’টি হোটেলের মালিক বনে যায় তৎপরতা আর বুদ্ধি বিনিয়োগ করে। গ্রামে মায়ের আবদার রক্ষা করতে বাড়িটির নির্মাণ সম্পন্ন করে। মার জন্য বরাদ্দ ছিল। নতুন ঘরে একরাত।
পরের রাতেই মায়ের হার্ট ফেইলিউর। মার মরদেহ শহরের হিমঘরে সপ্তাহ খানেক রেখে স্বপরিবারে দেশে ফিরে দাফন সম্পন্ন করে। তিনদিন চলে শোকের জিয়াফত। তিন গাঁয়ের কেউ বাদ পড়েনি। শোকের সাথে উৎসবের আয়োজন শেষ করে ফিরে যায় আমেরিকা। নিউইয়র্কে দু’টি বাড়ি ছাড়াও ঢাকা শহরে একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে তার। সব মিলিয়ে তার আর্থিক অবস্থান বেশ মজবুত। স্বপনের সাথে খানের যোগাযোগ ভালই ছিল। গত এক দশক ধরে বিভিন্ন সময় সরকারি সফরে গিয়ে খান একাধিকবার তার ফ্ল্যাটে ওঠেন। সময় সুযোগ করে সে খানকে নিয়ে লং ড্রাইভেও গিয়েছে কয়েকবার। ওর বড় দুইভাই কানাডায় সেটেল্ড। দেশের সাথে তেমন যোগাযোগ নেই। বাথরুমে কাপড় বদল করে শিউলির অনুরোধে ড্রইং রুমে বসেন খান।
ভাইজান, দই-মিষ্টি আনি আন্নের লাই?
[চলবে]

