ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি


ভ্রমণ: ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি

বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে কতো বীর পুরুষের সমৃদ্ধ ইতিহাস। যাদের মধ্যে একজন হলেন ‘বার ভূঁইয়া’ প্রধান ঈশা খাঁ। ঢাকার অদূরে সোনারগাঁও-এ ছিল তার রাজধানী। বীর ঈশা খাঁ তার দ্বিতীয় রাজধানী গড়ে তোলেন বৃহত্তর ময়মনসিংহের অন্তর্গত বর্তমান কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়িতে।

জঙ্গলবাড়ি একটি প্রাচীন স্থান মোগল, পাঠান, হিন্দু, মুসলমান বহুবার এই নগরটিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। কালের নিয়মে তা আজ একটি ছোট্ট গ্রামে পরিণত হয়েছে। কিন্তু নগরের স্মৃতি চিহ্ন আজ অবধি বিদ্যমান। প্রাচীন দূর্গের ভগ্নাবশেষ প্রাচীর ও পরিখার নিদর্শন আজও দেখা যায়। লোকমুখে ছড়িয়ে আছে এখানকার কত না গল্প কাহিনী। একদা এখানে গড়ে উঠেছিল একটি সুন্দর জনপদ। কালের বিবর্তনে আজ তার কোনো চিহ্ন নেই। বিধ্বস্ত প্রাসাদের ইট সুড়কির ফাঁকে ফাঁকে রয়ে গেছে কেবল সোনালি দিনের বর্ণাঢ্য ইতিহাস। জঙ্গলবাড়িতে আজও ছড়িয়ে আছে সুদূর সোনালি অতিতের ভুলে যাওয়া স্মৃতি চিহ্ন। ইতিহাস প্রিয় যে কাউকেই তা দারুণভাবে আকৃষ্ট করবে। ভ্রমণ করার জন্যেও ঐতিহ্যবাহী এই জায়গাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মনোরম। অথচ অজানা কারণে ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি রয়ে গেছে আজও দৃষ্টির আড়ালে, অবহেলিত ও পরিত্যক্ত।

বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার পথে প্রান্তরে অজস্র লোকগাঁথার ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে আছে হাজারো বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি বৃহত্তর ময়মনসিংহের বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলা শহর থেকে ৪ মাইল পূর্বে নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত।

ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্বতীরে এক সমৃদ্ধ জনপদের নাম কিশোরগঞ্জ। বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার অন্যতম একটি জেলা। জেলা হিসেবে কিশোরগঞ্জের প্রতিষ্ঠাকাল ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪ সাল। তার আগে বৃহত্তর ময়মনসিংহের একটি মহকুমা ছিল। মহকুমা হিসেবে এর আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৮৬০ সালে। ভারতীয় উপমহাদেশের এক সময়ের বৃহত্তম জেলা ছিল ময়মনসিংহ। ১৭৮৭ সালে এর ১ মে ময়মনসিংহ জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়।

মোগল সম্রাট আকবরের সময়ে তাঁর রাজস্ব সচিব টোডর মল্ল বাংলার ভূমি ও রাজস্বের সুব্যবস্থা করেন। ১৫৮২ সালে টোডর মল্লের এই বন্দোবস্ত বাংলাদেশকে ১৯টি সরকার এবং সরকারগুলোকে ৬৮২টি মহালে বিভক্ত করা হয়। এর ভিতর একটি সরকারের নাম ‘সরকার বাজুহা’। বলা হয়ে থাকে, সুলতান হোসেন শাহের সময়ে যে অঞ্চলটি ‘নছরত শাহী’ প্রদেশ নামে পরিচিত ছিল, টোডর মল্লের বন্দোবস্তে তারই নাম ‘সরকার বাজুহা’।

ইংরেজ আমলেই সরকার বাজুহা হল বিশাল ময়মনসিংহ জেলা। স্বভাবতই আজকের কিশোরগঞ্জ তখনকার সরকার বাজুহার অন্তর্ভুক্ত ছিল। খৃ:পূ: ৩০২ অব্দে প্রখ্যাত পর্যটক মেঘাস্থিনিসের ভারত ভ্রমণের অনন্য দলিল ‘ইন্ডিকা’ গ্রন্থের মানচিত্র থেকে অবগত হওয়া যায় যে, কিশোরগঞ্জ সহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল ছিল বিশাল কামরূপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত।

চতুর্থ শতকে কামরূপ রাজ্য গুপ্ত সাম্রাজ্যের করদ রাজ্যরূপে বর্ণিত আছে। পরবর্তীতে সপ্তক শতকে কামরূপ গুপ্ত শাসন মুক্ত হয়। কিশোরগঞ্জসহ ব্রহ্মপুত্রের পূর্ব তীর পুনরায় কামরূপ শাসনের অধীনে চলে আসে। তখন কামরূপের রাজা ছিলেন ভাষ্কর বর্মা। বিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ এর বিবরণ সাক্ষ্য দেয়। ৬৫০ সাল পর্যন্ত ভাষ্কর বর্মা বৃহত্তর ময়মনসিংসহ এ অঞ্চল শাসন করেন। তার মৃত্যুর পর পরবর্তী বংশধরগণ দশক শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ অঞ্চলের শাসনকর্তা ছিলেন। পরবর্তীতে বৃহত্তর ময়মনসিংহ চন্দ্রবংশের শাসনাধীন ছিল। এরপর একাদশ শতাব্দীতে বৃহত্তর ময়মনসিংহ পাল রাজাদের অধীনে আসে।

পরবর্তী ইতিহাস সেন রাজ বংশের। কিন্তু বৃহত্তর ময়মনসিংহের উপর তাদের কর্তৃত্ব পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সময়ের আবর্তে ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিম তীর সেন রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত হলেও পূর্ব তীর কামরূপ শাসন মুক্ত হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজত্বে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এ সকল রাজ্যের নেতৃত্বে ছিলেন কোচ, হাজং, গারো, রাজবংশী প্রভৃতি আদিম সম্প্রদায়। আজকের কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি ছিলো এই স্বাধীন ক্ষুদ্র রাজ্যের অন্যতম পীঠস্থান। কোচ অধ্যূষিত জঙ্গলবাড়িসহ সমগ্র কিশোরগঞ্জ অঞ্চল মুসলিম শাসনের অধীনে আসে সম্রাট আকবরের সময়।

এই শাসন বিস্তৃতির সূচনা পর্বে যার নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত তিনি বিখ্যাত বার ভুঁইয়ার অন্যতম ঈশা খাঁ। মোঘলদের সঙ্গে ঈশা খাঁর যুদ্ধের আগে জঙ্গলবাড়ি, এগার সিন্ধুর সহ অন্যান্য স্থানের কোচ, অহম সহ আদিম সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব ছিলো। ১৫৮০ সালে ঈশা খাঁর নিকট জঙ্গলবাড়ি কোচ সর্দারের পরাজয় ঘটে এবং ১৫৩৮ সালে মোঘল বাহিনীর নিকট এগার সিন্ধুর’র অহম রাজ্যের পরাজয় হয়।
অতঃপর ঈশা খাঁ জঙ্গলবাড়ি ও এগার সিন্ধুর দখল করে সেখানে গড়ে তোলেন দরবার ও বাস ভবন এবং এগার সিন্ধুরে নির্মাণ করেন দুর্ভ্যদ্যে দূর্গ। এর আগেই তিনি বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন।

ভারত বিজেতা মোঘল সম্রাটগণ সমগ্র ভারত দখল করে নিলেও সহজে কব্জা করতে পারেনি বাংলা। মোঘলদের যাত্রাপথ বারবার আটকে দিয়েছিল বাংলার স্বাধীন জমিদারগণ, ইতিহাসে যারা ‘বার ভুঁইয়া’ নামে পরিচিত। আর তার নেতা ছিলেন ‘মসনদে আলা’ ঈশা খাঁ। দীর্ঘদিন যুদ্ধ করে বাংলা দখল করতে হয়েছিল মোঘলদের। দেওয়ান ঈশা খাঁ ও তৎপুত্র মুসা খাঁর সাথে মোঘলদের দীর্ঘ সময়ের সশস্ত্র সংগ্রামের কথা ইতিহাসে কিংবদন্তী হয়ে আছে। ঈশা খাঁনের বীরত্ব, শৌর্য, বীর্য ও মানবিক মহানুভবতা তাকে করেছে মধ্যযুগের এক কিংবদন্তীর মহানায়ক। মোঘল আমলের তথা মুসলিম শাসনের সমাপ্তির সাথে সাথে অবসান ঘটেছে মধ্যযুগের ইতিহাসের এবং ইতিহাসের গতিধারায় অনিবার্যভাবে এসে পড়েছে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী তথা ইংরেজ শাসনামল।

আমাদের মধ্যযুগের সমৃদ্ধ ইতিহাসের এক অনন্য চরিত্র ঈশা খাঁ। সে সময়ে দিল্লীর মসনদে আসীন ছিলেন মোঘল সম্রাট আকবর। এই সময়েই বাংলার ইতিহাসে ‘বার ভুঁইয়াদের’ একটা চমকপ্রদ এবং দুঃসাহসী অধ্যায়ের সূচনা। তাঁরা ছিলেন স্বাধীনচেতা জমিদার। দিল্লীল মোঘল শক্তিকে অস্বীকার করে, কর দেয়া বন্ধ করে তারা স্বাধীনভাবে রাজ্য চালাতে থাকেন। সম্রাট আকবরের রাজত্বের সমগ্র ঊনত্রিশ বছর এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রথম ছয় বছর প্রকৃত পক্ষে বার ভটুইয়ারাই বাংলার আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হন। এদের নেতা ছিলেন বিপুল শক্তির অধিকারী বীর ঈশা খাঁ। তাঁর বংশ পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় না। ঐতিহাসিকদের মতে, রাজপুত নেতা কালিদাস গজদানী তার পিতা। তিনি পরে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের ঢাকা অঞ্চলে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। পিতার মৃত্যুর পর অনেক সংগ্রাম ও সাধনার পর পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধার করেন।

ঈশা খাঁর জীবন ছিলো বিচিত্র। তিনি বহু দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তিনি জঙ্গলবাড়িতে রাজধানী স্থাপন করে এর চারধারে পরিখা খনন করে একে তাঁর দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন। ক্রমে ক্রমে রাজ্যের কলেবর বৃদ্ধি করতে থাকেন। স্থাপন করেন বিশাল রাজ্য। জঙ্গলবাড়ি দূর্গকে গড়ে তোলেন রাজধানী হিসেবে। এগার সিন্ধুর সহ বিভিন্ন স্থানে দূর্গ ও কেল্লা নির্মাণ করে শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। মোঘল আধিপত্য অস্বীকার করে ঈশা খাঁ রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। গড়ে তোলেন দূর্ধর্ষ সেনা ও নৌবাহিনী। ঈশা খাঁকে দমন করার জন্য ১৫৭৫ সালে মোঘল সম্রাট আকবর প্রেরণ করেন সেনাপতি শাহবর্দী খাঁনকে। বীরযোদ্ধা ঈশা খাঁর দূর্দান্ত বাহিনীর কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে দিল্লী ফিরে যান সেনাপতি শাহবর্দী খাঁন। ঈশা খাঁর রাজ্য আরও বিস্তৃত হয়। তিনি সোনারগাঁয়ে রাজধানী স্থাপন করেন। ১৫৮৫ সালে গৌড় বাংলার মোঘল সুবেদার শাহবাজ খাঁন ঈশা খাঁর রাজ্য ভাটি অঞ্চল আক্রমণ করেন। কিন্তু ঈশা খাঁর বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়ে ফিরে যান।

ঈশা খাঁ এতই শক্তিশালী হয়ে উঠেন যে, তাকে শায়েস্তা করার জন্য সম্রাট আকবর শেষ পর্যন্ত তাঁর সেনাপতি মানসিংহকে পাঠাতে বাধ্য হন। বিশাল সেই সৈন্যদলের সাথে ছিল ৫০টি কামান। কামানের তোপের মুখে সোনার গাঁ পতন হয়। ঈশা খাঁ এই সময় জঙ্গলবাড়ি ও এগার সিন্ধুর থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করতে থাকেন। মানসিংহ ও ঈশা খাঁর যুদ্ধের কাহিনী উপন্যাসের মতই চমকপ্রদ। এগার সিন্ধুর নিকট এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সারাদিন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধেও জয় পরাজয় অনিশ্চিত থেকে যায়। যুদ্ধে উভয় পক্ষের ব্যাপক প্রাণহানিতে ঈশা খাঁ বিচলিত বোধ করেন। তিনি সেনাপতি মানসিংহের কাছে দূত মারফত পত্র প্রেরণ করেন। ঈশা খাঁ পত্রে উল্লেখিত ছিলোÑ উভয় পক্ষের এ লড়াইয়ে হাজার হাজার সৈন্যের জীবন নাশের বদলে মানসিংহের সঙ্গে সম্মুখ সমরের প্রস্তাব। বললে “আমি যুদ্ধের নামে অনর্থক রক্তগঙ্গা বওয়াতে চাইনা। চাইনা লোকক্ষয়। সেনাপতি মানসিংহের সাথে আমার দ্বন্দ্ব যুদ্ধ হবে। আমাদের হার-জিতেই নির্ধারিত হবে জয় পরাজয়।” রাজপুত সেনাপতি সে আহ্বান গ্রহণ করলেন।

পরদিন দ্বন্দ্ব যুদ্ধ শুরু হলো। কিন্তু মানসিংহ এক চালাকির আশ্রয় নিলেন। নিজে যুদ্ধে অবতর্ঢু না হয়ে তার মিথ্যা পরিচয়ে পাঠালেন তার সহকারী বীর যোদ্ধা জামাতাকে। কিন্তুঈশা খাঁ এই চালাকি ধরতে পারেন নাই। ফলে মানসিংহের জামাতার সাথে লড়াইয়ে প্রবৃত্ত হলেন। দ্বন্দ্ব যুদ্ধ শুরু হলো কিন্তুঈশা খাঁর তরবারির নিপুণ আঘাতে মানসিংহবেশী জামাতা অচিরেই ধরাশায়ী হলেন। প্রাণ হারালেন ঈশা খাঁর তরবারীর নিপুণ আঘাতে। এমনি সময়ে স্বপরিচয়ে এগিয়ে এলেন মানসিংহ। এবার রাজপুত সেনাপতি ঈশা খাঁর সাথে যুদ্ধে নামলেন। অশ্বপৃষ্ঠে দুই বীরের মধ্যে চললো লড়াই। দুইদিন চলে গেল, “কেউ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান।”

তৃতীয় দিনে দুই বীর পুরুষের লড়াইয়ে ঈশা খাঁর তলোয়ারের প্রচণ্ড আঘাতে মানসিংহের তলোয়ার খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায় এবং তিনি অশ্ব থেকে ভূপাতিত হন। খোলা তরবারির সামনে নিরস্ত্র মানসিংহ প্রমাদ গুণলেন। এবার তার মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু না। ঈশা খাঁ অশ্ব থেকে নেমে ভূপাতিত সেনাপতিকে হাত ধরে মাটি থেকে উত্তোলন করলেন। নিজের কোষ থেকে তরবারি বের করে বললেন, “হে বীর সেনাপতি এই নিন আমার তরবারি। নিরস্ত্রকে হত্যা করা বীরধর্ম নয়। আমি নিচ্ছি আরেকটা। অস্ত্র ধরুন, যুদ্ধের মধ্যেই নিষ্পত্তি হোক জয় পরাজয়ের।” বিমুগ্ধ মানসিংহ ঈশা খাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “না আর যুদ্ধ নয়, আপনার বীরত্ব, উদারতা ও মহানুভবতার কাছে আমি পরাজিত। বাদশাহ আকবর নিশ্চয়ই আপনার এই বীরত্বের মূল্য দেবেন।” এক স্বর্গীয় দৃশ্যের অবতারণা হলো এগার সিন্ধুর দূর্গের সামনে।

অতঃপর এক নাটকীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়। অকস্মাৎ সেখানে ঝড়ের বেগে উপস্থিত হন মানসিংহ পত্নী। এতোক্ষণ তিনি শিবিরে বসে দেখছিলেন সবকিছু। তখনকার দিনের সকল রীতি রেওয়াজ উপেক্ষা করে রাজপুত রমনী ঈশা খাঁর পায়ের কাছে বসে মিনতি জানালেন তার স্বামী পরাজয়ের কলঙ্ক নিয়ে ফিরলে তার শিরচ্ছেদ হবে। কারণ পরাজিত ব্যক্তির প্রতি আকবরের ক্ষমা নেই। ঈশা খাঁ কি তাকে পতিহারা এবং সন্তানদের পিতৃহারা দেখে খুশী হবেন? ইতোমধ্যেই তার প্রিয় কন্যা হয়েছে বিধবা। তিনি ঈশা খাঁকে তাদের সাথে দিল্লী যেতে এবং সম্রাটের কাছে ক্ষমা চাইতে অনুরোধ জানান। মানসিংহপত্নী বললেন, “আপনি চলুন আমাদের সঙ্গে দিল্লীতে। বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি আকবর। তাঁর সাথে শত্রুতা করে লাভ হবে না।। তার সাথে বন্ধুত্বে বরং সুখ আছে, গৌরব আছে। তিনি বীর। অন্য বীরের মর্যাদা তিনি দিয়ে থাকেন আপনাকেও দিবেন। স্বাধীন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করবেন আপনাকে।”

রাজপুত রমনীর অশ্রু ভেজা করুন আবেদনে ঈশা খাঁর চিত্ত বিগলিত হলো। আর একবার দেখালেন উদারতা। তিনি তাদের সাথে দিল্লী যেতে রাজী হলেন।

দিল্লী পৌঁছলে মানসিংহ প্রথমে বাঙালি বীর ঈশা খাঁর কাছে তার পরাজয়ের কথা সম্রাট আকবরকে বলতে সাহস পাননি। সম্রাট আকবর ঈশা খাঁকে একজন সাধারণ বিদ্রোহী আফগান মনে করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। সম্রাটের এই অনভিপ্রেত ব্যবহারে বিস্মিত ঈশা খাঁ। রাগে, দুঃখে, অভিমানে মেনে নিলেন বন্দী জীবন। সম্রাটের কাছে ব্যক্ত করলেন না সত্যিকার ঘটনা।

কিন্তু মানসিংহ পত্নী সহ্য করতে পারলেন না এই অবিচার। সম্রাটের দরবারে হাজির হয়ে ব্যক্ত করলেন সব ঘটনা। সম্রাটকে জানালেন তার বীরত্ব ও ঔদার্যের কথা। সবকিছু শুনে অভিভূত হলেন সম্রাট। সাথে সাথে মুক্তি দিলেন বাঙালি বীর ঈশা খাঁকে। তিনি বুঝতে পারলেন এমন হৃদয়বানের সাথে বন্ধুত্ব করে লাভ আছে। অশান্ত বাংলাকে শান্ত করতে ঈশা খাঁর প্রয়োজন। তিনি এক আড়ম্বর পূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঈশা খাঁকে ‘মসনদে আলা’ উপাধীতে ভূষিত করে বাংলার সিপাহশালার নিযুক্ত করেন এবং তার রাজধানীর পাশ্ববর্তী চব্বিশটি পরগনা তাকে দান করেন। বললেন, “আপনার বীরত্ব ও মহানুভবতায় আমি মুগ্ধ। আপনাকে উপযুক্ত মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে আমি কৃতার্থ হতে চাই। আজ থেকে আপনি আমার বন্ধু।

অতঃপর ঈশা খাঁ ফিরে এলেন জঙ্গলবাড়িতে। জঙ্গলবাড়ির সুরম্য দরবারে বেজে উঠল শান্তির নবহত। সন্ধি হলো মোঘল শক্তির সাথে। ঈশা খাঁ স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা করতে লাগলেন। বহাল তবিয়েত মৃত্যু দিন পর্যন্ত রাজত্ব করেন এদেশে। তিনি তার রাজ্যকে বারোটি অংশে বিভক্ত করে প্রত্যেকের উপর প্রদেশের এক একটি অংশের দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং ঈশা খাঁর নামে স্ব-স্ব অংশের শাসনকার্য পরিচালনার নির্দেশ দান করেন।

ঈশা খাঁর আমলে বাংলাদেশ প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে। ব্যবসা বাণিজ্যে হয়েছিল প্রভূত উন্নতি। এক টাকায় তখন চার মণ চাল পাওয়া যেত। ঈশা খাঁর আমলে রানী এলিজাবেথের দূত রালফ ফিস পূর্ব বাংলা সফর করেন। তিনি লিখেছেন, এই সব দেশের রাজার নাম ঈশা খাঁ। তিনি এ অঞ্চলের সকল রাজার রাজা।