বিগ ব্যাং-এর অদৃশ্য ভোর — পর্ব ২


বিগ ব্যাং-এর অদৃশ্য ভোর — পর্ব ২

দৃশ্য-১: রাত গভীর, অবজারভেটরির ছাদে
প্রথম রাতের কথোপকথনের পর আজ সায়েম আবার এসেছে ড. আরিফের কাছে। দূরে শহরের আলো নিভু নিভু, আকাশে ঝলমল করছে শীতের তারারা।
সায়েম: স্যার, গতদিন আপনার কথা শুনে ঘুমই আসেনি। কিন্তু এবার নতুন প্রশ্ন নিয়ে এসেছি।

ড. আরিফ: (হাসি দিয়ে) তোমার প্রশ্ন থামবে না, এটা আমি জানি। বলো, এবার কী ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়?

সায়েম: আমরা যদি ধরে নিই বিগ ব্যাং সত্যি হয়েছিল, তাহলে এত গ্যালাক্সি কিভাবে তৈরি হলো? আর এত নক্ষত্রের আকার এত ভিন্ন হলো কেন?
আরেকটা কথা—যদি আমরা সব গ্যালাক্সি একত্র কল্পনা করি, তাহলে সেটা এক অকল্পনীয় বিশাল পিণ্ড হবে। ওই পিণ্ড আবার বিগ ব্যাংয়ের আগে কিভাবে গঠিত হলো? তার উপাদান কী ছিল?

দৃশ্য-২: গ্যালাক্সির জন্ম
ড. আরিফ: শুরু করি গ্যালাক্সি দিয়ে।
বিগ ব্যাংয়ের পর মহাবিশ্ব একেবারে মসৃণ ছিল না। খুব সামান্য ঘনত্বের তারতম্য ছিল—কোথাও একটু বেশি, কোথাও একটু কম। মাধ্যাকর্ষণ সেই বেশি ঘন জায়গাগুলোকে ধীরে ধীরে আরও বেশি পদার্থ টেনে নিতে বাধ্য করল।
কোটি কোটি বছরের মধ্যে এই জায়গাগুলো থেকে বিশাল নক্ষত্রসমষ্টি গড়ে উঠল—এগুলোই গ্যালাক্সি।

সায়েম: মানে গ্যালাক্সি গঠন আসলে ছোট ছোট ঘনত্বের পার্থক্যের ফল?

ড. আরিফ: ঠিক তাই। আর এর প্রমাণ আমরা পাই Cosmic Microwave Background-এর ছবি দেখে। সেখানে বিগ ব্যাংয়ের ৩৮০,০০০ বছর পরের সেই সূক্ষ্ম ঘনত্বের পার্থক্য দেখা যায়।

দৃশ্য-৩: নক্ষত্রের আকার কেন ভিন্ন
সায়েম: কিন্তু নক্ষত্রের আকার এত ভিন্ন কেন? কেউ সূর্যের চেয়ে ছোট, কেউ আবার কয়েকশ গুণ বড়!

ড. আরিফ: নক্ষত্রের আকার নির্ভর করে প্রথমে তার জন্মের সময় কতটা গ্যাস ও ধুলো একত্র হয়েছিল তার উপর।
যদি গ্যাস-মেঘ বিশাল হয়, মাধ্যাকর্ষণে তা দ্রুত সংকুচিত হয়ে Massive Star তৈরি করে, যা জীবনে বেশি উজ্জ্বল কিন্তু কম সময় বাঁচে।
ছোট মেঘ থেকে হয় Red Dwarf, যারা ধীরে ধীরে জ্বলে কোটি কোটি বছর টিকে থাকে।
এছাড়া আশেপাশের পরিবেশ, ধূলিকণার ঘনত্ব, ধাতব মৌলের পরিমাণ—সবই প্রভাব ফেলে।

দৃশ্য-৪: সব গ্যালাক্সি একত্র কল্পনা
সায়েম: এবার আসল প্রশ্ন—যদি আমরা সব গ্যালাক্সি একত্র করি, এক বিশাল পিণ্ড কল্পনা করি, সেটা তো অকল্পনীয় হবে। ওই পিণ্ড বিগ ব্যাংয়ের আগে কিভাবে তৈরি হলো? তার উপাদানই বা কী ছিল?

ড. আরিফ: এখানে দুইটা ভুল ধারণা ঠিক করতে হবে।
প্রথমত, বিগ ব্যাংয়ের আগে এমন কোনো “পিণ্ড” ছিল না যেটা আমরা চোখে দেখতে পারি। সব গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, এমনকি মৌলও তখন ছিল না।
ছিল শুধু অসীম ঘনত্বের এক অবস্থা—যেটাকে আমরা বলি Singularity। এটা পদার্থবিজ্ঞানের প্রচলিত অর্থে “পিণ্ড” নয়।

সায়েম: মানে সেখানে হাইড্রোজেন, সোনা, অক্সিজেন কিছুই ছিল না?
ড. আরিফ: না। তখন ছিল একধরনের শক্তি, আর মৌলিক কণারা এক অদ্ভুত উচ্চ-শক্তির মিশ্রণে গলে ছিল।
তাপমাত্রা এত বেশি ছিল যে কোনো পরমাণু, এমনকি নিউক্লিয়াসও বেঁচে থাকতে পারত না।
তুমি যাকে “উপাদান” ভাবছো, সেগুলো তৈরি হয়েছে অনেক পরে—প্রথমে প্রোটন-নিউট্রন, তারপর হাইড্রোজেন-হিলিয়াম, পরে নক্ষত্রের ভেতরে ভারী মৌল।

দৃশ্য-৫: অসম্ভব মনে হওয়া যুক্তি
সায়েম: কিন্তু কল্পনায় সব গ্যালাক্সি একত্র করলে এত বড় জিনিসের বিস্ফোরণ মনে হয় অসম্ভব!

ড. আরিফ: হ্যাঁ, মানুষের চোখে তা অসম্ভব মনে হয় কারণ আমরা সবসময় স্থানকে ধরা মাপের মধ্যে ভাবি।
কিন্তু বিগ ব্যাং-এ কোনো “মহাকাশের ভিতরে” বিস্ফোরণ হয়নি—বরং মহাকাশ নিজেই প্রসারিত হয়েছে।
তোমার হাতের বেলুন ফোলানোর কথা ভাবো। বেলুনের উপর ছোট ছোট বিন্দু আঁকলে, বাতাস ঢুকলে প্রতিটি বিন্দু একে অপর থেকে দূরে চলে যাবে—কিন্তু কোনো বিন্দুই “বিস্ফোরণ” করে আলাদা হয়নি, বরং কাপড়টাই প্রসারিত হয়েছে। মহাবিশ্বও এমনই।

দৃশ্য-৬: দার্শনিক ছোঁয়া
সায়েম: মানে আমরা যে “সব এক পিণ্ডে গাদাগাদি” কল্পনা করি, সেটাই হয়তো আসলে ভুল কল্পনা?

ড. আরিফ: ঠিক তাই। আমাদের মস্তিষ্ক স্থান আর আকারের তুলনা দিয়ে বোঝে, কিন্তু বিগ ব্যাংয়ের আগের অবস্থা ছিল সেই তুলনার বাইরে।
সেখানে হয়তো পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মই ছিল অন্যরকম—যেমন আমরা জানি “কারণ ছাড়া কিছু ঘটে না”, কিন্তু কোয়ান্টাম স্তরে সেই নিয়ম ভেঙে যায়।

সায়েম: স্যার, যত শুনি তত মনে হয়—আমরা হয়তো মহাবিশ্বের খুব সামান্যটা জানি।

ড. আরিফ: হ্যাঁ, আর সেই অজানা অংশটাই আমাদের খোঁজ চালিয়ে যেতে বাধ্য করে।
বিগ ব্যাং-এর আগে কী ছিল, গ্যালাক্সির জন্মের আগে সেই ঘনত্ব কেমন ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হয়তো আরও প্রজন্ম লাগবে।

[চলবে]