রহমান হেনরীর কবিতা
দোয়েলের জন্য এলিজি
যশোরেশ্বরীর দধিজনশ্রুতি— ভেস্তে গেলো;
এখন, বিধ্বস্ত বনশ্রী পেরিয়ে, দিগন্তে,
তোমার উঠান ছুঁতে যাই—
আহ দোয়েল, উদ্বাস্তু হতে হতে, কমদামি
কাগুজে নোটের ভিতর, স্বর গুঁজে—
বসে আছো, বোবাধ্বনি!
তোমার দেখা না পেয়ে, নির্যাতিতের আর্তনাদ
শব্দমান হতে চেয়েও, আটকে যাচ্ছে:
আলজিভে
গ্রামাঞ্চলে, লাঙলের ফলায় গেঁথে, এখনও
উঠে আসে— ছটফট করতে থাকা
কেঁচোর অবয়ব; অপেক্ষা করে:
কীটপতঙ্গ আর শুয়ো পোকার দল—
তোমার শিস শুনতে না-পেয়ে, অনেকগুলো
সম্ভাব্য ভোরের উদ্ভাস— থমকে থাকছে
অস্পষ্ট আলোর আবছায়ায়…
তেল চিটচিটে ধাঁধার ক্যানভাস ফেঁড়ে
অপ্রতিরোধ্য সূর্যের মতো
কবে বেজে উঠবে— দয়াল?
দ্বিবিধ সন্তাপ
অপ্রকাশের হাওয়ায় দুলছে: বর্ণমালার শুচি
এই মাঠে, আজ, ফুল বলতেই মুগ্ধ-পাথরকুচি
চোখ ঠারছে: রঙবিভূতির ন্যূনতম লালে—
বন্ধু আমার টিয়ার মতন আতাফুলের ডালে
এক মনে গায় আত্নরতি, খুনখারাবির গান…
আমার ছিলো ছিন্নমতি, উল্টোস্রোতের টান—
সে-টান পানে, ছুটেই দেখি— এমন রুক্ষ দিন!
বন্ধুতা খুব নীলকণ্ঠ, বর্ণচোরা, জহরে রঙিন।
হাতের রেখায়— বিপুল ভাষা, বোবা ও বধির;
যে তারাটি নিয়েছে তার পাঠোদ্ধারের ব্রত—
এখন মৃত, অজ্যোতিষ্ক, কম্পিত, বিব্রত;
আকাশ ভেঙে ঝরছে কেবল দুগ্ধবেদন ক্ষির।
দৃশ্যভরা তোমার বেণী, বেণীর ভেতর সাপ;
দুই দেশে দুই খুশির দিনে— দ্বিবিধ সন্তাপ!
পর্যটক
তুর্কেমেনিস্তান থেকে, লোকটা, ভ্রমণে এসেছিলো: পূর্ব পাকিস্তানে; সঙ্গী ছিলো: একটা কুকুর।
যুদ্ধ সম্পর্কে, বহু তাত্ত্বিক কথাই, জানা ছিলো তার;
কিন্তু ততক্ষণে, স্বদেশ থেকে বহুবহু দূরে, বাস্তব একটা যুদ্ধের— প্যাঁচের মধ্যে, পড়ে গিয়েছিলো; এবং তখনও, তার জানা ছিলো না: যুদ্ধ, আসলে, নির্বিচার খুনের— এক প্রায়োগিক নেশা; যা, কোনও শিকারের, জাতীয়তা জানতে আগ্রহী নয়।
সন্ধ্যার আবছা আলো-অন্ধকারে, ভূমিতে লুটিয়ে পড়া সেই আসন্ন মৃতকে, অনেকক্ষণ পাহারা দিয়েছিলো— কুকুরটা; আর কুঁই কুঁই শব্দে: কেঁদেছিলো বহুক্ষণ— তারপর, হারিয়ে গেছে: রাত্রির ভেতর।
অনেক বছর আগের কথা; জানি না, সেই কুকুর কতদিন বেঁচে ছিলো; বেওয়ারিশ হয়ে পড়া: সেই তুর্কেমেনি-কুকুর, পরবর্তী দিনগুলোর জন্য, কী ধরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো— কাহিনীর শেষাংশ জানতে পারা, সত্যিই, অসম্ভব;
স্বাধীন স্বদেশের যেকোনও টিভি চ্যানেলে, আজও, যখন, উচ্চারিত হয় দেশটির নাম— কিংবা যেকোনও মুদ্রণমাধ্যমে, যখন, ছাপার হরফে দেখি— চোখের সামনে ভেসে ওঠে: তুর্কেমেনি লোকটার অন্তিম মুখাবয়ব; আর স্পষ্ট শুনতে পাই: কিংকর্তব্যবিমূঢ় একটা কুকুরের কুঁই কুঁই বিলাপ—
টের পাই: প্রতিদিন, একটু একটু করে, এমন অনেক বিষন্ন বাতাস— ছড়িয়ে পড়ছে, এশিয়ার সমগ্র ভূগোলে—
মিনতি
ও আমার স্বপ্নভূমি, শোনো, শুধু তোমারই উদ্দেশে—
নিত্যনূতন সুগন্ধী ফোটাই; আর তার পাপড়িগুলোকে, একটা একটা করে ছিটিয়ে দিই: মানুষের রুচিশীলতার দিকে…
তোমার অভিশাপ মুক্তির জন্যে, এ-ও এক যুদ্ধ আমার:
—নীরব ও রক্তপাতহীন; কিন্তু হৃৎপিণ্ড ঝলসানো
২.
নৈঃসঙ্গ্যের আরেক নাম: ইয়াজুজ-মাজুজ।
সারারাত, চেটে চেটে, ওরা আমাকে
আধা-দেহ-মানুষে পরিণত করে;
ভোর এসে, আবারও, পূর্ণতা দেয়। তখন,
উদ্ধারহীন ছুটে যাই— রাজাদের আগাছা বাগানে; দিনভর ঘাস কেটে, শূন্যহাতে ফিরতে ফিরতে, সড়কেই সন্ধ্যা নামে—
ও দুঃখিনী দেশ, ও সন্ধ্যা,
আমাকেও তোমরা দু’দণ্ডের ভালোবাসা দিও!
অঙ্গুরীয়
অনেক অনেক পঞ্জিকাজয়ী, উজ্জ্বল,
ফিরোজা পাথরখচিত অবিকল্প সে;
অযত্নে পড়ে আছে— সমুদ্রের গভীরতম
তলদেশে; প্রত্যাশার প্রতিসরণ এমন এক
দীপ্তিমিতি, যে, জলের উপরিতল থেকে
মনে হয়: খুব নিকটেই তার অবস্থান;
দিন: অধিক কিছু আলোকিত করতে
পারে না তাকে; রাত্রিও অধিক কোনও
আঁধারের আচ্ছাদন— আরোপ করতে
পারে না;
কত যুগ কেটে গেলো—
আমাদের কোনও আনন্দ-উৎসব নাই!
এসো, তুমি তাকে পরিধান করো, অনামিকায়!
শুরু হোক— প্রাণান্ত উৎসব…
সাধ্য কোনও ব্যাপার নয়
আপেল খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে, সতের বছর,
যারা তোমাদের জামালগোটা বনে ঘুরপাক খাওয়ালো;
দীর্ঘায়ু কামনা করো তাদের!
ইত্যবসরে, পসার ঘটলো: আঙুরমিষ্ট কামরাঙ্গা
আর দিগন্তবিস্তারী মরিচবনের;
সময় সমাগত; তৈরি হও!
বেড়া সাজাও কাঁটা-বরইয়ের ডাল পুঁতে;
তাদেরকেও তো ঘুরপাক খাওয়াতে হবে!
লৌড়ানি দিতেই হবে— অন্যরকম মরিচবনে!
সাধ্য কোনও ব্যাপার নয়; সবই সাধ এবং স্বাদ
দ্বিঘাত সমীকরণ
কেউ তাকে কখনও ডাকেনি
কিন্তু এক রক্তিম সকাল
নদী হলো— মৃত্যুর চোখের মতো লাল;
শাবল, হাতুড়ি, ইট, সিমেন্ট ও ছেনি
রাতারাতি, বেঁধে দিলো পাকা শানঘাট
:সে কোথায়? পাতালে সম্রাট?
—‘তার নাম উচ্চারণ মানা’
মৃত্যুগন্ধী হাওয়াকে বললাম, যখন সে, বনসন্ধানী
বাতাস জবাব দিলো, ‘জানি।
প্রত্যেকের চূড়ান্ত ঠিকানা
—রক্তনদী; কিংবা তার দু’পারের মাটি’।
আমার অন্তরে গেঁথে, স্থির হলো— সেই সন্ধ্যাটি।
জীবন— রক্তের মধ্যে স্রোতময় বেঁচে বেঁচে, ক্ষীণ
তারপর, কোনও একদিন
আততায়ী ওভাবেই খুন হয়ে যায়—
মাটি ও বাতাস আর বৃক্ষরূপনদী,
মানুষের প্রতিহিংসা, যুদ্ধ, প্রেম— সমস্ত হারায়;
নিরেট প্রকৃতি হয়ে জেগে থাকে
—ধংসের চূড়ান্ত অবধি

