একদিন শব্দোয়ালা একটি ছেলে বললো, ম্যাডাম শব্দ কিনবেন?
আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম! একী!
তারপর ভাবলাম, পুরো উঠান খালি। শব্দ কিনলে মন্দ হয় না।
ছেলেটি শব্দের ঝুড়ি উঁচিয়ে রাখলো। আমি বেঘোর, এক এক করে কুড়াচ্ছিলাম। ছেলেটির চপলতা বেড়ে গেলো। একেবারেই সব নিয়ে যাবেন!
হ্যাঁ না কিছু না বলে মৃদু হেসে আবারো হাত বাড়ালাম-
তারপর দেখি ছেলেটি ম্লান মুখে দাঁড়িয়ে।
গল্পটি এ ভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু বাঁধ সাধলো করুণ এক বাঁশির সুর। ঝুড়িটি প্রায় খালি হতে চলেছে। ছেলেটি কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো, সব যদি আপনিই নিয়ে যান তবে আমার নতুন বাজার যাওয়া হবে না!
থেমে যাবো কিনা ভাবতে ভাবতে দেখি ছেলেটি বাঁশিতে সুর তুলছে আর কাঁদছে। এতো করুণ কেন তার বাঁশির সুর! আমারো চোখ ভরে গেলো। বুকের ভেতর ভীষণ গর্জন শোনা গেলো। কোথা যেন পাহাড় ভাঙার শব্দ হলো! তারপর চিৎকার চেঁচামেচি। সে ভাঙনে কতো জনের প্রাণ হারালো কে জানে! আমি হাঁটু মুড়ে বসে পড়লাম। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো বাঁশির সুরে চারদিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি বেরিয়ে এলো। আমাকে ঘিরে সবাই মিছিল করছে। আমি তন্ময় বাঁশিতে। আঁচল থেকে ঝুরঝুর ঝরে পড়লো নানাবিধ শব্দ। এতোক্ষণ যা কুড়ালাম তার চেয়ে ঢের বেশি তার ঝুড়িতে ভরে গেলো! মৌমাছিরা ঘুরঘুর করতে করতে ক্লান্ত হলো বুঝি!
এখন শুধু আমি আর শব্দোয়ালা। শারদীয় আকাশে সোনালি মেঘের অভাবনীয় রূপ জানান দিচ্ছে দেবী আসার আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। দেবীকে কখনো দেখিনি। মানুষ মনের মাধুরি দিয়ে তার মূর্তি বানায়। দেবী আসলে কেমন? কিন্তু শব্দোয়ালা দখল করে নিয়েছে মর্ত্যলোকের দেবীর ভাঙাচোরা মন। হঠাৎ আকাশ আরো রঙিন হয়ে উঠলো। দূরের কাশবন যেন রূপার গয়না। পাখিদের কথা বুঝতে একটুও অসুবিধা হচ্ছে না। পাতারা ঝরে পড়ছে বলে মনে হলো না। ভেতর ঘর থেকে কে যেন ডাকলো, ঘরে ফিরো। আমার চোখে অনন্তকালের তৃষ্ণা। জোনাকীর চকচকে ডানায় স্বপ্নের বেহুলা। চারদিকে মহাসমুদ্র ঢেউ খেলে যাচ্ছে। আমি ভাসালাম বাঁশের ভেলা। ডুববে নাকি ভাসবে?
ছেলেটির ধূলোমলিন পোশাক যেন কর্পোরেট অফিসের কোন বসের গায়ের ঝকঝকে স্যুট। চুলে লেগে আছে বাণিজ্যিক কালার। ঠিক সে সময় চড়ুই পাখি ডেকে উঠলো, মনের দেয়াল এবার ভেঙেছে বুঝি!
সুজন সাইকেল নিয়ে পায়ে হেঁটে আমার ভাবীর সাথে চলছে আর কথা বলছে। ভাবীকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে। হাত নেড়ে মাথা নেড়ে না সূচক কথা বলে যাচ্ছে। কী বলতে চায় সুজন?
ছত্রিশ ভাঁজের চিঠির কথা? এলোমেলা বিকেলের কথা? উঠোনের এক পাশে আমার মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া, সুজনের কোলে করে ঘরে নেয়া? নারকেল তলায় মুখোমুখি আলাপ করা? ভাবী অস্বীকার করছে কোনটা?
গলায় যেন কাঁটা বিঁধেছে! এতোকাল যে আকাক্সক্ষাগুলোকে বালিশ চাপা দিয়ে রেখেছি, যে অনুভূতিগুলোকে কলাপাতার মোড়কে ঢেকে রেখেছি, যে সম্ভাবনাকে আলমিরায় তুলে রেখেছি তার অবমুক্তিকে সুজন অস্বীকার করছে? ভাবতে ভাবতে পা বাড়ালাম।
ঘরের দরজায় গাঁথা পেরেকে আমার শাড়ি ছিঁড়ে দিলো। খানিকটা কেটে গেলো আমার পা। এমন ভাবে রক্ত পড়ছে যেন কেউ আমাকে কোরবানীর গরুর মতো জবাই দিয়েছে। আমি গোঙড়াচ্ছিলাম। নাড়ি-ভড়ি বেরিয়ে পড়ার উপক্রম। থমকে দাঁড়ালাম। সুজনের ডাক ব্ল্যাক মিউজিশিয়ানের জাদুর মতো পট বদলে দিচ্ছে। সমস্ত প্রভাব অগ্রাহ্য করে আমি ছুটলাম। সুজন- দাঁড়াও আমি আসছি।
সুজনের তখন টনক নড়ার পালা। বাম রাজনীতি তাকে শিখিয়েছে কীভাবে আবেগকে বিসর্জন দিতে হয়। কীভাবে জেলে পাড়ার লক্ষ্মীকে অনাহারের হাত থেকে বাঁচাতে হয়! কীভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুটেরাদের শাস্তি দিতে হয়! কীভাবে প্রচ্ছন্ন স্বৈরাচারদের উৎখাত করার জন্য শহর-নগর ও বন্দরে জনমত তৈরি করতে হয়! মানুষেরর বাক-স্বাধীনতাকে পুনরুদ্ধার করতে হলে চক্রে বাঁধা পড়া যাবে না। মেহনতি মানুষের ঘামের মূল্য কে দেয়? একমুঠো চালের জন্য একজন কৃষককে কতদিন রোদে পুড়তে হয়? আজকাল অফিস আদালতে এম এল এস এস পদে নিয়োগ হয় না। নো ওয়ার্ক, নো পে নাম দিয়ে অন্যায্যভাবে শ্রম নিচ্ছে অফিস সহায়ক নাম দিয়ে। এ জুলুম! এ ক্রীতদাসের অধম। তাদের কথা বলতে দেয়া হয়না। তাদেরকে এ জুলুম থেকে বাঁচাতে হবে।অযুত স্বপনের চোখে কাশফুলের সৌন্দর্য বাঁধা পড়ে না।
আমি যতোই তার দিকে পা বাড়াই ততোই সে আকাশের পথে চলতে থাকে। আকাশ ছোঁয়া কী সহজ! আমি বলি তোমার বাঁশি কোথায়? যে বাঁশিতে সুর তুলে ধ্বসে দিয়েছো পাহাড়! তোমার শব্দ কোথায়? যে শব্দের জলতরঙ্গে ছুঁয়ে দিয়েছো মৃতপ্রাণ? সুজন ততোই পথহারা নাবিক। কোথা থেকে কোথায় যায় কে জানে!
সেদিন তাকে ছুটে আসতে দেখলাম। ভাবলাম এবার নিশ্চয়ই শব্দের নতুন ব্যঞ্জনা নিয়ে এসেছে। আমার ভাবনা অমূলক নয়। কাছারি ঘরে প্রবেশ করেই দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। বাড়ির দরজার ঘরে নারীদের প্রবেশ নিষেধ! এটা বৈঠকখানা। মুসাফিরখানা। এখানে নারীরা প্রবেশ করলেই কলঙ্কিত অধ্যায় রচিত হয়। সে নারীর জীবনে ঘটে নানান বঞ্চনা এবং লজ্জাজনক অধ্যায়। এসব জেনেও বেপরোয়া আমি তার সাথে কাছারি ঘরে প্রবেশ করলাম।
আমাকে দেখেই সুজনের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো কিন্তু সে ক্ষণিকের জন্য। তারপর কঠিন কণ্ঠে বললো, তুমি এখানে কেন? এক পা এগিয়ে এসে বললো, একটা কাজ করে দিতে পারবে? পারুকে একটা চিঠি পৌঁছে দিতে পারবে? আমার মনটা দমে গেলো। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। সুজন পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে আমার হাতে দিয়েই ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেলো। যেতে যেতে বললো, দ্রুত বেরিয়ে যাও। লোকে দেখলে নিন্দা করবে।
আমার চোখ থেকে টপটপ জল ঝরলো। শেষ পর্যন্ত পারু? ইচ্ছা হলো চিঠিটা পড়ি। ছিঁড়ে ফেলে দিই। কাছারি ঘর থেকে বের হলাম। চিঠিটা লুকিয়ে রাখলাম নিজের দেহের সাথে মিলিয়ে। যেন সুজনের হাত ধরে আছি। যেন তাকেই জড়িয়ে আছি। অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছে। এ অনুভূতিকে অনুভব করার আগেই চিৎকার দিলো সোলেমান। এই তুই কাছারি ঘরে কেন এলি? একটু আগে সুজন এসেছিলো না এখানে?
তার পরের ঘটনা বলাই বাহুল্য। গাঁয়ের মোড়লেরা আব্বাকে নাজেহাল করে এক ঘরে করে দিয়েছে। সুজনকে ধরে এনে বিচার যদি না করে তা হলে তারা আরো কঠোর ব্যবস্থা নেবে। সারা গাঁয়ে রি রি পড়ে গিয়েছে। আমার কিন্তু সামান্য লজ্জাও হয়নি। কারণ আমি জানি সেখানে কী হয়েছে। নারী হলেই সে কাছারি ঘরে যেতে পারবে না, কোন কারণে গেলেই তা মারাত্মক দোষের হবে তা কেন এ যুগেও আমাদেরকে সইতে হবে!
এদিকে সে চিঠির লোভ সামলাতে না পেরে আমি পড়তে শুরু করি। কিন্তু কী আশ্চর্য! চিঠিতে মাত্র তিনটি শব্দ- ‘রাত তিনটায় থানায়।’
মাস্টার দা সূর্য সেনের কথা মনে পড়লো। একী সে রকম সাংঘাতিক কিছু? সুজনের জন্য অস্থিরতা অনুভব করলাম।
তিনদিন বাদে পত্রিকায় হেডলাইন দুষ্কৃতিকারীদের হাতে লালফৌজের এগারো সদস্য নিহত। সে নিহতের ভেতর গ্রামের মাতব্বরদের চারজন ছিলো। পুরো গ্রাম থই থই করছে। পারু জিন্স-টপস পরে বাড়ির দরজায় শিস দিচ্ছে আর ব্যাডমিনটন খেলছে। তার চুলগুলো ছেলেদের মতো ছাঁটা। সে নাকি শহরের উচ্ছন্নে যাওয়া মেয়ে! সে কাছারি ঘরেই বসে বসে গিটার বাজাচ্ছে। আমি হতবাক হলাম, কই কেউ তো কিছুই বলছে না! পারু আমাকে দেখে মিটিমিটি হাসছে। একতাল মাংসই রয়ে গেলি! পট পাল্টাতে হলে মাথার ঘিলু পাল্টাতে হবে। এতো সাজিস কেন? পড়তে পারিস না?
আমি চুপ করে থাকলাম। পারুর সাথে ঝগড়া করা যাবে না। তাহলে সুজন আর আসবে না। এবার তোকে
কিছু বই দিয়ে যাবো মন দিয়ে পড়বি। মাস্টার্স শেষ কর। ফাঁকি দিস না। সামনে কঠিন দিন আসতেছে। লড়াই করতে হবে। সে জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
একটা সংগঠন দাঁড় করা। যার কাজ হবে শিশু কিশোরদের স্বপ্ন দেখানো। আমি রূপরেখা করে রেখেছি। তোকে মট্টু সাহায্য করবে। তুই তো ভালো গাইতে পারিস, গান শেখানোর দায়িত্ব তোর থাকবে। বাকী কাজ আমাদের।
চমকে উঠলাম। তারা বিপ্লব করবে? স্বাধীন দেশে আবার বিপ্লব?
শব্দোয়ালা ছেলেটি আবার ডাক দিলো শব্দ নেবেন শব্দ। এ রকম নিঝুম দুপুরে বাড়ির বউ-ঝি ঘুমায়। কিন্তু তার ডাক শুনে সবাই দরজা জানালা মেলে চেয়ে আছে। তাদের বাড়ানো হাত- আমাকে দাও আমাকে দাও ….
রঙবেরঙের পোশাক পরা হকার সবার হাতে একটি করে শব্দ দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি শব্দের রঙ এবং চেহারা একই। ‘জাগো’।
আছিয়া- জুলেখা- সুলেখা- মতির মা- গনির মা- মনির মা শব্দগুলো নিয়ে আমার কাছে দাঁড়িয়েছে- কী আছে এখানে?
বললাম, লেখাপড়া করো। জেগে ওঠো। পৃথিবী আমাদের, এরে পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব আমাদেরই। কথাগুলো তাদের বোঝার কথা নয় তবুও তারা এক এক করে তুলে নিচ্ছে ঝরে পড়া পাতা।
আমিও শব্দোয়ালার পিছু নিলাম। কিন্তু ত্রিমুখী গলির কোন পথে সে হারালো আমি বুঝতে পারলাম না!
তার কিছুদিন পর গাড়ি গাড়ি পুলিশ আর্মিতে গ্রাম ভরে গেলো। প্রচুর গোলাগুলি হলো। সবাই ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখলো। ঠিক সে সময় আমার ঘরের দরজায় টোকা পড়লো। আমি দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই গুলির শব্দ শোনা গেলো।
দরজা মেলেই আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম। এতো সেই যুবক যে শব্দ ফেরি করে! আমার রেখে দেয়া শব্দগুলো চারদিকে উড়োউড়ি করছে। আমি স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম।
এ যে সুজন!
কোথা থেকে পারু এসে সামনে দাঁড়ালো তার পরনে শাড়ি চুল ঘাড় অবধি ঝুলানো। দুহাতে কাঁচের চুড়ি –কে বলবে এ পারু! হাতে একটা চিরকুট- খুলতেই চোখ ঝরতে শুরু করলো।
যে দেশে বাঁচার অধিকার নেই, কথা বলার অধিকার নেই, ন্যায় বিচার নেই, মানুষ না খেতে পেয়ে মরে, সে দেশে ‘তোকে ভালোবাসি’এ কথা বলি কেমনে!
শব্দোয়ালা’।

