বিগ ব্যাং-এর অদৃশ্য ভোর


বিগ ব্যাং-এর অদৃশ্য ভোর

দৃশ্য-১: পুরনো অবজারভেটরি, রাত ৯টা
আকাশে চাঁদের চারপাশে হালকা মেঘের আচ্ছাদন। দূরের গাছপালার কালো ছায়া যেন এই নিস্তব্ধ রাতের সঙ্গে একাকার।
পুরনো টেলিস্কোপের পাশে দাঁড়িয়ে সায়েম তাকিয়ে আছে তারার ভিড়ে।
তার পিছনে হেঁটে আসছেন ড. আরিফ হোসেন, হাতে এক কাপ গরম চা।

সায়েম: (চোখ না সরিয়েই) স্যার, আমি একটা কথা ভাবছিলাম।
আমরা বলি ১১৮টা মৌলিক পদার্থ আছে, এগুলো দিয়েই তো পৃথিবী, গ্রহ, নক্ষত্র—সব তৈরি। কিন্তু বিগ ব্যাংয়ের আগে এগুলো সব কোথায় ছিল? কিভাবে এক জায়গায় জমা হলো?

ড. আরিফ: (হালকা হাসি দিয়ে) খুব ভালো প্রশ্ন। কিন্তু মনে রেখো, বিগ ব্যাংয়ের ঠিক আগে আমরা যেমন কল্পনা করি “সব কিছু এক জায়গায় জমা”—এটা পুরোপুরি সঠিক নয়।

সায়েম: কেন সঠিক নয়? সব তো ওই বিন্দুতে ছিল, তাই না?

ড. আরিফ: “বিন্দু” শব্দটাই আমাদের বিভ্রান্ত করে। বিগ ব্যাংয়ের আগে মৌলিক পদার্থ যেমন হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, সোনা—এসব ছিলই না। তখন ছিল শুধুই শক্তি আর প্রাথমিক কণা—কোয়ার্ক, গ্লুয়ন, ইলেক্ট্রন—যারা তীব্র তাপ আর চাপের ভেতর এক ধরনের “প্রাথমিক স্যুপ”-এর মতো অবস্থায় ছিল।
সায়েম: কিন্তু পদার্থবিজ্ঞান বলে—কোনো কিছু কারণ ছাড়া পরিবর্তন হয় না। তাহলে বিগ ব্যাং ঘটার জন্য কি কারণ ছিল? কিছু না থাকলে হঠাৎ করে কিভাবে এত বড় বিস্ফোরণ?

ড. আরিফ: আহা, এখানেই তো রহস্য। আমরা যা বলি “বিগ ব্যাং”, সেটা কোনো বিস্ফোরণ নয়, বরং স্থান ও সময়ের এক হঠাৎ প্রসারণ। আর এর কারণ নিয়ে তিনটি বড় তত্ত্ব আছে।

দৃশ্য-২: মহাবিশ্বের কারণ খোঁজা
ড. আরিফ:
প্রথম তত্ত্ব—কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন।
কোয়ান্টাম স্তরে শূন্যতাও পুরোপুরি ফাঁকা নয়। সেখানে অদৃশ্যভাবে শক্তি জন্ম নেয় আর মিলিয়ে যায়। এক সময় হয়তো এমন একটি ফ্লাকচুয়েশন হয়েছিল যা এত বড় ছিল যে স্থান-কাল নিজেই জন্ম নিল।

সায়েম: মানে শূন্য থেকেও কিছু হতে পারে? তাহলে তো “কারণ ছাড়াই পরিবর্তন” হয়ে গেল?

ড. আরিফ: কোয়ান্টাম জগতে কারণ-কার্য সম্পর্ক সব সময় আমাদের সাধারণ জগতের মতো চলে না। সেখানে “সম্ভাবনা” রাজত্ব করে, নিশ্চয়তা নয়।

দ্বিতীয় তত্ত্ব—চক্রাকার মহাবিশ্ব।
হয়তো এর আগে অসংখ্য মহাবিশ্ব ছিল। প্রতিটি মহাবিশ্ব এক সময় সংকুচিত হয়ে আবার এক বিন্দুতে এসে মিশেছে, তারপর নতুন করে বিস্তৃত হয়েছে। আমাদের বিগ ব্যাং হলো আগের মহাবিশ্বের মৃত্যুর পর জন্ম নেওয়া নতুন সৃষ্টির প্রথম সকাল।

সায়েম: তাহলে আমরা হয়তো বহুবার জন্ম নিয়েছি? শুধু মনে নেই?

ড. আরিফ: হতে পারে। তবে প্রমাণ জোগাড় করা খুব কঠিন।

তৃতীয় তত্ত্ব—বহুমহাবিশ্ব (Multiverse)।
আমরা হয়তো অসংখ্য বুদবুদের একটি—প্রতিটি বুদবুদে আলাদা মৌলিক ধ্রুবক, আলাদা পদার্থ, এমনকি ভিন্ন ভৌত নিয়ম। আমাদের বুদবুদের শুরুটাই আমরা বিগ ব্যাং বলি।

দৃশ্য-৩: মৌলের কারখানা
সায়েম: ঠিক আছে, ধরলাম বিগ ব্যাংয়ের কারণ হতে পারে এদের মধ্যে যেকোনো একটা। কিন্তু তবুও আমার প্রশ্ন—মৌলগুলো এল কিভাবে? ১১৮টা মৌল তো খুব আলাদা আলাদা।
ড. আরিফ: খুব ধৈর্য ধরো, এখন আসি মৌলের গল্পে।
বিগ ব্যাংয়ের প্রথম তিন মিনিটে কেবল সবচেয়ে হালকা মৌল—হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম—তৈরি হয়েছিল। একটু লিথিয়ামও। বাকিগুলো তখন ছিল না।

সায়েম: তাহলে সোনা, ইউরেনিয়াম, লোহা এসব?
ড. আরিফ: সেগুলো তৈরি হয়েছে অনেক পরে—তারার ভেতরে।
যখন বিশাল তারারা জীবনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে বিস্ফোরিত হয় (সুপারনোভা), তখন ভেতরের প্রচণ্ড চাপ আর তাপে নিউক্লিয়াসগুলো জোড়া লাগতে লাগতে ভারী মৌল তৈরি হয়।
এভাবেই পৃথিবীর সোনার আংটি বা তোমার রক্তের লোহা—সবই এসেছে তারার মৃত্যুর ভস্ম থেকে।

দৃশ্য-৪: বিগ ব্যাংয়ের আগের অবস্থা নিয়ে বিতর্ক
সায়েম: কিন্তু স্যার, আমি একটা জিনিস বুঝি না—যদি বিগ ব্যাংয়ের আগে সব কণা গুটিয়ে ছিল, তাহলে তো ওখানে অসীম চাপ আর তাপ থাকত। ও অবস্থায় কণা টিকে থাকে কিভাবে?

ড. আরিফ: সেটা নিয়েও দ্বিমত আছে। কেউ বলে—বিগ ব্যাংয়ের আগে কোনো “পদার্থ” ছিল না, ছিল শুধু এক ধরনের শক্তির ক্ষেত্র। সেই ক্ষেত্রের শক্তি হঠাৎ “ভেঙে” পদার্থে রূপ নেয়, আর মহাবিশ্ব ছুটে বেরিয়ে যায়।
আরেক দল বলে—আমরা যতদূর দেখতে পাই, তার আগের অবস্থা সম্পূর্ণ অজানা, কারণ সেই সময়ের ভৌত নিয়মগুলো আজকের মতো নাও হতে পারে।

সায়েম: মানে বিজ্ঞানও এখানে কিছুটা অসহায়?

ড. আরিফ: হ্যাঁ, আর সেই অসহায়তাই আমাদের কৌতুহলের উৎস।

দৃশ্য-৫: মানুষের জায়গা এই মহাবিশ্বে
সায়েম: তাহলে আমরা যারা এখানে বসে আছি, তার মানে আমাদের শরীরের মৌলগুলো একসময় কোনো নক্ষত্রের ভেতরে ছিল?

ড. আরিফ: ঠিক তাই। তোমার হাড়ের ক্যালসিয়াম, মস্তিষ্কের ফসফরাস, রক্তের লোহা—সবই এসেছে বহু কোটি বছর আগে মারা যাওয়া তারাদের দেহ থেকে।
আমরা সবাই তারার সন্তান—কিংবা বলতে পারো তারার ধুলো থেকে তৈরি।

সায়েম: ভাবতেই গা শিউরে ওঠে… বিগ ব্যাংয়ের সেই প্রথম আলোয় আমরা ছিলাম না, কিন্তু সেই আলোর পথ ধরে একদিন আমরা এসে দাঁড়ালাম এই রাতের আকাশের নিচে।

ড. আরিফ: আর সেই জন্যই বিগ ব্যাংয়ের গল্প আসলে আমাদের গল্প। ১১৮টা মৌলের জন্ম, গ্রহের গঠন, জীবনের বিকাশ—সবই এক মহান কসমিক নাটকের অধ্যায়।

দৃশ্য-৬: অমীমাংসিত রহস্য
সায়েম: কিন্তু আমার শেষ প্রশ্ন—আপনার মতে বিগ ব্যাংয়ের সূত্রটা কি ছিল? কোন কারণে এটা হলো?

ড. আরিফ: (কিছুক্ষণ চুপ থেকে) আমি মনে করি—আমরা এখনও উত্তর পাইনি। হয়তো কোনো দিন পাব না।
কিন্তু হয়তো এটাই ভালো, কারণ উত্তর না থাকলেই আমরা প্রশ্ন করে যাই, খুঁজি, নতুন তত্ত্ব বানাই।
যদি সব জানতাম, তাহলে আকাশের দিকে তাকানোর আকর্ষণই হারিয়ে যেত।

সায়েম: (হেসে) তাহলে বিগ ব্যাং শুধু মহাবিশ্বের জন্ম নয়, এটা আমাদের কৌতুহলেরও জন্ম।

ড. আরিফ: ঠিক তাই। আর আজকের এই আকাশও হয়তো কোনো এক ভবিষ্যৎ জ্যোতির্বিদের প্রশ্নের উৎস হয়ে থাকবে।

গল্প শেষ হয়, কিন্তু আকাশে জ্বলজ্বলে তারা যেন বলছে—”আমরা এখনো তোমাদের জন্য অনেক রহস্য রেখে দিয়েছি।”

[চলবে]