জেগেছে স্বপ্নের চর


 

জেগেছে স্বপ্নের চর

স্বপ্নরা জড়িয়ে ধরে চতুর্দিক থেকে
স্বপ্নরা এখন কিলবিল করে
পথ চলতে চলতে মনে হয় উড়ে উড়ে যাচ্ছি
ছোট ছোট অলিগলি পার হয়ে যাব নিমিষেই
দীর্ঘ নাতিদীর্ঘ পথও সহজে পার হয়ে যাব
এবড়োথেবড়ো উঁচু নীচু সব পথ
নিজে নিজে পার হব কিংবা পথিকেরা সঙ্গী হবে
বুকে আশা ভর করে
স্বপ্ন ধরা পড়ে চোখে
তোমার কব্জায় আবদ্ধ হবার পর থেকে
তোমার লোভের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হবার পর থেকে
প্রায় ষোলটি বছর নির্ঘুম কেটেছে
দিনরাত আতংকের জামাজুতো পরে
গুমখুনের আগুনে আঁচ দিয়েছে আধিপত্যবাদ
অর্থনীতিটাও নাগালের বাইরে পালিয়ে ছিল
পকেটের কাগজ কলম পরের কৌশলে খাবি খেতো
জিহ্বাটাও নড়াচড়া করতো অন্যের তেঁতুল দেখে
স্বপ্নরাজি ধরা দিতে এসে চলে যেতো দূরে
যখন তোমার জামাজুতো ছিঁড়েফেড়ে গেল
দ্রোহের উত্তাপে গলে গেলে তুমি
স্বাধীনতা ফিরে আসে
স্বপ্ন ফিরে এসে দুয়ারে দাঁড়ায়
এখন স্বপ্নের সাথে কথা বলি
নিদ্রা আসে
আশা জাগে।

 

ছত্রিশ জুলাই হয়

তোমার তৃষ্ণায় সরবত দিয়েছি যদিও চেয়েছ পানি
তোমাকে দিয়েছি আত্মাভূমি বিনাশর্তে
স্বজল চাহনি তোমার করেছে ঘায়েল
মা বাবা হারা কোনো মানুষকে প্রত্যাখ্যান করা কত কঠিন সে শুধু আমিই জানি।
বিনিময়ে ঘুম কেড়ে নিলে কোটিকোটি মানুষের
জহীর রায়হানের গুম তোমার উত্তরাধিকার
আমি বিস্মৃত হলেও, তুমিতো ফিরিয়ে এনেছ
গুমের সংস্কৃতি
ঘুম কেড়ে নিলে ছয় বছরের শিশু রিয়া গুপ্তের মায়ের।
ঘুম কেড়ে নিলে শিশুদের রোদের, মাতার স্নেহের, ভ্রাতাদের সাহসের, বাবাদের ভরসার।
পড়শী শকুন তোমার বিশ্বস্ত সুহৃদ
আমার আস্থাকে ছিঁড়ে ফোঁড়ে মেতে ওঠো তার স্পর্শে
হয়ে ওঠো বিভৎস ফ্রাঙ্কোস্টাইন
হয়ে ওঠো জ্বীন, ভূত, পেত্নী
হয়ে ওঠো অদম্য ড্রাকুলা।
তোমার লুকানো ড্রাকুলার রক্তচোষা জ্বিব
বের হয়-
আয়নাঘর, বায়নাঘর, রান্নাঘর, ব্যাংক, মুদিপাড়া সর্বত্রই লুটেপুটে চেটে চেটে অমসৃণ করে দেয়।
নির্ঘুম ভীতির জামা পরে তিতুমীরের বাংলাদেশ!
নির্ঘুম ষোলটি বছরে দেখেছি
তুমি তোমার চাটার দল
দাঁতাল আঁচড়ে বিবস্ত্র করেছ ক্ষত বিক্ষত করেছ
মা মাটি মানুষ কোলাহল প্রাণস্পন্দন ও ঐতিহ্য।
সব সয়ে সয়ে নুয়ে পড়ি।
দুদন্ড শান্তির জন্য পাইনিতো কোনো বনলতাসেন! কোথায় জীবনানন্দ!
অবচেতনে ডাকাতদের গ্রামের কথা ভেবে ভেবে বিড়বিড় করেছি, আল মাহমুদ!
জেগে উঠুক আন্দোলনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ছুটে আয় কালা পাহাড়, গজনীর সুলতান মাহমুদ, কাজী নজরুল ইসলাম!
বখতিয়ার খিলজির ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনার প্রত্যয়ে আরো কত কত নির্ঘুম প্রলাপ!
একদিন জেগে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়
জেগে ওঠে ছাত্রনাগরিক
শ্লোগানে শ্লোগানে কেঁপে ওঠে রাজপথ
গুলিতে গুলিতে অট্টহাসি করে ফ্যাসিস্ট প্রেতাত্মা রক্তের উত্তাপে ভীত মায়েরা সাহসী হয়ে ওঠে
শিশুরা সাহসী হয়ে ওঠে
মানুষ সাহসী হয়ে ওঠে।
আবু সাইদ, মুগ্ধ, হৃদয় চন্দ্র, নাইমা সুলতানারা
জেগে ওঠে আশা হয়ে
জেগে ওঠে স্বপ্ন হয়ে
জেগে উঠে জীবন বিলায় ইতিহাস হয়ে।
যুদ্ধ হয়, রক্ত ঝরে
প্রতিরোধে প্রতিবোধে হয় প্রতিহত স্বৈরাচার!
স্বাধীনতা আসে, ঘুম আসে, শান্তি নামে
ছত্রিশ জুলাই হয়।

 

মুক্তির পথযাত্রায় সাথী হবো

জানতাম দুঃসহ প্রতীক্ষা শেষ হবে
একদিন ফ্যাসিজমের আতুর ঘর চুরমার হবে
কুরে কুরে খাবে সব অহংকার।
জানতাম না শুধু জানতাম না
আমিও মুক্তির পথযাত্রায় সাথী হবো
নতুন স্বাধীনতার পথযাত্রায় সাথী হবো
আবু সাইদ, মুগ্ধ বা ওদের রচিত ইতিহাসের দর্শক হবো
টিয়ারশেলের গ্যাস জেঁকে বসবে বুকে
শ্বাস রুদ্ধ হতে যাবে কণ্ঠনালি,
চোখে ঝাপসা দেখব, আগুণ আগুণ চোখে
অলিতে গলিতে দৌড়ে যাবো
কিশোর, যুবকদের সাথে, বৃদ্ধদের সাথে
মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে ধোঁয়াচ্ছন্ন রাজপথে
শতসহস্র জনতা ইটের কণা হাতে দাঁড়িয়ে থাকবে
খুনপিয়াসীদের প্রতিরোধে অটল পাথর হবে,
পাহাড় পর্বত হবে জীর্ণ শীর্ণ ক্লান্ত প্রতিটি মানুষ।
সমগ্র বাংলাদেশ সাগরের ঢেউয়ের তালে তালে
ছিল উত্তাল যেমন আমি তা স্বচক্ষে দেখেছি
গণ ভবন, ডাইনীর আবাস থেকে অনতিদূরে দাঁড়িয়ে।
জানতাম না শুধু জানতাম না
অবুঝ শিশুরা চঞ্চল কিশোর আর জনতা
সীসা ঢালা প্রাচীর বানিয়ে রুখে দেবে
স্বদেশের প্রতি রাক্ষসের থাবা
চোখের সামনে রাবার বুলেটে লুটিয়ে পড়বে
টগবগে রক্তের কিশোর, যুবক
আর সাথীরা অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে
গ্রেফতার, মৃত্যুকে তাচ্ছিল্য করে
আমিও ওদের সাথী হবো।

 

রাজপথ রক্তাক্ত দলীল

এই রাজপথ আজ স্বাধীন সত্ত্বার রক্তাক্ত দলীল
এখানে বেড়াচ্ছে ঘুরে ঘুরে পদ্মলাল রক্ত ফোঁটা
যুবতীর প্রৌঢ়কুঁজো ভঙ্গিতে চিত্রিত হয় আইয়ামে জাহেলিয়াত।
রক্ত ফোঁটার উচ্ছ্বাসে, গুম খুণের সন্ত্রাসে নীলকণ্ঠ
পথ ছুটে যায় মুক্তির প্রণয় মোহনার খোঁজে
আজ তার দ্বার প্রান্তে এসে দেখে
সামনেই হাজারো তারুণ্য নদ গতিমান
বেশুমার নিপীড়িত জনপ্রাণে ঘৃণার প্রলয়
দুর্নীতির নখে ছিন্নভিন্ন পরিবারগুলো হাত পাও নাড়ে
আর্তস্বরে ডাকে কোথায় যৌবনের ঢেউ!
রক্ত ফোঁটার উচ্ছ্বাসে আশার স্ফুরণ দেখে
সংগ্রামের রাজপথে যুবতীর কুঁজো করা প্রৌঢ়ভঙ্গি
রণ উন্মাদনা নিক্ষেপণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়াল ছুঁয়ে শহরের অলিতে গলিতে
তোমাকে প্রণতি জানাই মা আমার
তোমার এ মুদ্রা
যত্রতত্র ভয়ভীতি উপেক্ষা করে
নগরীর জমাট বিস্তৃত রুক্ষতাকে কুরে কুরে খাবে।

 

আমি না, আমি না

শক্ত কিছু কইতে আমার ইচ্ছে করে
বলি না
বড় কিছু করতে আমার ইচ্ছে করে
পারি না
বড় বেশী ভীতুর হাড্ডি এই আমি
জানি না
কত্ত কিছু করার আছে এই আমার
করি না!
কত্ত কিছু লেখার আছে মনে আসে
লেখি না
হয়ত কেউ করবে এসব
হয়ত কেউ বলবে এসব
আমি না, আমি না!

 

পথিক

বাঁকা চোখে বাঁকা পথ সোজা করে দেখা যায়
মন ছুটে যাক দূরে তাতে কিবা আসে যায়
দূর সেও আসে কাছে মনযোগ দিলে হায়
পাঠ কর দৃষ্টির দিগন্তে যা যা এসে যায়
পথে দেখো পথিকেরা আছে আরও প্রকৃতি
ম্যানহোলের ঢাকনাটা না থাকাই বিকৃতি
কেউ করে কানাঘুষা কেউ চলে আনমনে
কেউ খোঁজে ফুলপাখি কারো থাকে গান মনে
ভেবে নাও কোনভাবে পথে যাবে ছুটে
হেলাফেলা করে কেউ দেখে পথ বড় বিদঘুটে
অন্ধও পথিক বটে দেখো চলে পথে ঘাটে
তাই বলে সকলের এলোমেলো চলাটা কি খাটে?
লক্ষ্যটা সঠিক হলে ঠিকমত পৌঁছে যাবে তুমি
বেহেস্তও হতে পারে পথিকের আত্মাভূমি!