কবি জাহিদুল হক (জন্ম: ১১ আগস্ট ১৯৪৯ – মৃত্যু: ১৫ জানুয়ারি ২০২৪) বাংলাদেশের একজন আধুনিক বাংলা কবি, সাংবাদিক, গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও গীতিকার ছিলেন। বাংলা কবিতায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ২০০২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান।
তিনি বাংলা একাডেমির একজন ফেলো ও রেডিও ডয়েচে-ভেলের সিনিয়র এডিটর ও ব্রডকাস্টার হিসেবে কাজ করেছেন। দৈনিক সংবাদের সিনিয়র সহকারি সম্পাদক ছিলেন। বাংলাদেশ বেতারে তিনি উপমহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
জাহিদুল হকের জন্ম ১১ অগাস্ট ১৯৪৯ সালে ভারতের আসামের বদরপুর রেলওয়ে হাসপাতালে চিকিৎসক পিতার কর্মস্থলে। পৈত্রিক নিবাস কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গুণবতী ইউনিয়নের আকদিয়া গ্রামের ভূঞা বাড়ি। বর্তমানে বসবাস করছেন ঢাকার বনশ্রীতে। তার পিতা মোহাম্মদ নূরুল হক ভূঞা ছিলেন সরকারি চাকুরে একজন চিকিৎসক। মাতা-জাহানারা খাতুন চৌধুরী। পিতার চাকরির বদলির কারণে দেশের অনেকগুলো স্কুলে।
চট্টগ্রামের নগেন্দ্র্রচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৩ সালে মাধ্যমিক পাশ করেন। ১৯৬৬ সালে ফেনী সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
জাহিদুল হক লেখালেখি শুরু করেন স্কুল জীবন থেকে। প্রথম কবিতার প্রকাশ হয় ১৯৬৫ সালে দৈনিক সংবাদ এর ঈদ সংখায়। তিনি বাংলা একাডেমির একজন ফেলো ও রেডিও ডয়েচে-ভেলের সিনিয়র এডিটর ও ব্রডকাস্টার হিসেবে কাজ করেছেন। দৈনিক সংবাদের সিনিয়র সহকারি সম্পাদক ছিলেন। বাংলাদেশ বেতারে তিনি উপমহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৮ সালে রেডিওতে রেকর্ডকৃত তার প্রথম গানটি পরে ‘মহানায়ক’ ছবিতে যুক্ত হয়। গানটির সুর করেছেন শেখ সাদী খান।
ছিলেন ‘বেতার বাংলা’ পত্রিকার সম্পাদক। তিনি বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের সদস্য ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে শিল্প বাড়ি নামের একটি অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা করেন।
জাহিদুল হকের কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প গান মিলিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৮টি। তার প্রথম কবিতার বই প্রকাশ হয় ১৯৮২ সালে ‘পকেট ভর্তি মেঘ’ শিরোনামে। তার উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে-
পকেট ভর্তি মেঘ (১৯৮১), তোমার হোমার (১৯৮৪), নীল দূতাবাস (১৯৮৫), সেই নিঃশ্বাসগুচ্ছ (১৯৮৯), পারীগুচ্ছ ও অন্যান্য কবিতা (১৯৯৪), এই ট্রেনটির নাম গার্সিয়া লোরকা (১৯৯৬), এ উৎসবে আমি একা (১৯৯৭)।
লেখালেখির অবদান স্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (২০০২), বিশেষ সম্মাননা পুরস্কার -২০১৭ (সংগীত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), জসীমউদ্দীন সাহিত্য পুরস্কার (২০০০)সহ অন্যান্য পুরস্কারে ভূষিত হন।
কবি জাহিদুল হক ১৫ জানুয়ারি ২০২৪ মৃত্যুবরণ করেন।
২০২৩ সালে শিল্পসাহিত্যের কাগজ জলছবিতে তার গুচ্ছ কবিতা প্রকাশিত হয়। পাঠকদের জন্য সে কবিতা তুলে ধরা হলো।
বাড়ি ছিলো প্রিয়
বাড়ি ছিলো প্রিয়, সেই বাড়ি প্রিয় নেই,
সমস্ত গান ভুলে গেছে তোমাকেই।
সমস্ত দিন, ধানচাল, সোনানদী
প্রিয় ছিলো বলে আজ তারা প্রিয় নেই।
কারা প্রিয় নেই, কতো দেশ ভূগোলেরা,
কারা ভুলে গেছে, দরোজা কি দেয়ালেরা?
যারা খুব ছিলো, কাছে নেই দূরে নেই,
বাড়ি প্রিয় ছিলো, সেই বাড়ি প্রিয় নেই।
নের্ভাল, কোথায় যাচ্ছো
নের্ভাল, কোথায় যাচ্ছো? গোধূলি সেজেছে
বধূ, দীপ্র সোনা মুড়ে। স্বপ্নগুলো যেচে
আসে ঘন মস্তিষ্কের দীর্ঘ দীর্ঘ পথে
মদ্যপ, বেশ্যার দলসুদ্ধ অপঘাতে
কতোদিন, চুম্বনের শোকার্ত মুহূর্ত
মৃত হয়; শেয়ালেরা ডাকে স্বতঃস্ফূর্ত।
কেন যাবে হোটেলে কি সরাইখানাতে,
অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে গহন হানাতে
তুমি বন্ধু? তার চেয়ে অনুবাদও ভালো!
শ্যাম্পেনে অরুচি হলে, আঁধিতে সে আলো
লুপ্ত হলে, পারীর নারীতে হলে ব্যর্থ
পিছু নিও অন্য কোনো অসুখে, অব্যর্থঃ
এ যন্ত্রণা ভয়ঙ্কর, এ জীবনসুদ্ধ;
নের্ভাল, কোথায় যাচ্ছো-যাত্রায় উদ্বুদ্ধ!
দান্তের রাস্তা
এই কি দান্তের রাস্তা? বিকেল ওড়নায় ঢাকে, ঘন
হচ্ছে আলোহীন তারা। সন্ধ্যা সমাগত। আকাশের
উঠোনে গোধূলি তার সোনা-ধান ছড়াচ্ছিলো যেন।
দুঃখ নামে সিঁড়ি বেয়ে, ছোঁয়া লাগে কী দীর্ঘশ্বাসের!
পুরনো এ পাড়ায় কে বাঁধে গৃহ? কারা ফেরে ঘরে
স্ত্রীদের লোনাক্ত স্পর্শে, প্রেমিকার ক্ষীপ্র সুগন্ধিতে?
যেন এখানেই প্রেত ছায়া ফেলে, বাদুড়েরা ওড়ে;
তোমরা স্মৃতিরা ভাসে সামারের মৃদু এই শীতে।
কৌতূহলী মন ছোটেঃ স্মৃতি খুঁটে স্মৃতিরা বিবৃত।
আমাদেরও হতে পারতো গৃহ, বাড়ি, নিজেদের গলি।
হয়নি। তা বলে ক্ষ্ধুা লাগবে না, হৃদয় সতত
ছড়াবে না দোলা? বাজে অপার্থিব কথার আধুলি।
ট্যুরিষ্টের ঢল নামে, ওরা যেন স্বপ্নের গোয়েন্দা।
আমিও ওদেরই মতো স্বপ্ন খুঁড়ি, ভাসাই জাহাজ।
বিয়াত্রিচে আর তার গীর্জাটিকে পেরুতেই সন্ধ্যা
নামে বিমর্সতা সহ। প্রভূ, প্রভূ, কী আঁধার আজ!
তবুও সুবাস নামে, কী মৃদু, প্রত্যন্ত-এই প্রাণে;
অন্ধকারও এখনো তোমার জন্য কী ঔজ্জ্বল্য আনে!
তোমার স্তুতি খুব করি
সামার, তোমার স্তুতি খুব করি। কেন? বলি, শোনো,
এ এক আশ্চর্য বিপ্লবতা, কী মহান গৃহযুদ্ধ!
(তোমার অতীত নেই; ভবিষ্যতও অন্ধকারে বোনো!)
তুমি যেন আমাকে উদ্বুদ্ধ করো, কিছুটা বা শুদ্ধ
বৃষ্টিতে ক্লেদাক্ত দিন জুবুথুবু, শীতে ঠাণ্ডা প্রাণ
ওষ্ঠাগত; এ জীবন স্যাঁতস্যাঁতে-কবে দেখা হবে?
আলোকের সৈন্যদের সেনাপতি তুমি, অভিযান
শুরু করো; ফের তুমি ফিরে এসো বন্ধু, সবান্ধবে!
সামার
আমাদের চারিদিকে খেলা করে তপ্ত সামার
আর খেলা করে দুঃখ তোমার আমার।
দীপ্র দিনটি ছিঁড়ে-খুঁড়ে ফেলে বিষদাঁত কার?
টেম্পারেচার নামবে হঠৎ-সামার!
ফাটল
সিস্তিন চ্যাপেলে দেখা, সেই ফাটলটা মনে আছে?
কখনো তোমার চোখে তোমার মুদ্রার কালো নাচে
তোমার দেহের মধ্যে অন্তহীন সামারের ঘ্রাণে
সান্তামারিয়া নভেল্লা থেকে ফেরা অন্ধ কোনো গানে
খুঁজি তাকে!
কি আশ্চর্য সে ফাটল, যেন এক নদী;
নিঃসঙ্গ গণ্ডোলা বাওয়া কেউ যেন এখনো আঁধির
মধ্যে ডুবে গিয়ে খোঁজে অফুরন্ত সেই আর্দ্র ধারা;
তোমার কি মনে আছে আমাদের সেই আত্মহারা?
তুমি
ভোরের বাড়িতে ঘুম ভাঙে; দেখি ভোর মজ্জমান
কুয়াশায়। শার্সিতে জড়িয়ে আছে রাত্রির তলানি।
হিটার আতপ্ত থাকে, স্পর্শ পাই হৃদয় অবধি-
যেন তুমি, তোমার শরীর থেকে স্পর্শ গন্ধ গান
আমাকে জড়িয়ে রাখে; জীবনের ঝর্নাধারা নদী
ফুসলায় বুকের মধ্যে;
এই নিয়ে এখনো মাতলামি।
কাল রাত্রি শ্যাম্পেনে গিয়েছে ভেসে, তুমি ছিলে ভেলা,
তুমি ছিলে স্বপ্নচ্ছন্ন-কী মধুর চতুর্দশপদী!

